আমরা বাঁচব মাথা উঁচু করে

সাগুফতা ইয়াসমিন এমিলি
গর্ভবতী মায়ের শিশু প্রসবের সময় পুরো পরিবেশটাই যেন পুত্রের জন্য অপেক্ষা করে। যখন ভেতর থেকে খবর আসে, ছেলে হয়েছে, খুশির চিৎকারে কান ভরে যায়। এ শুধু বাংলাদেশে নয়, সুদূর আফ্রিকা, এমনকি উন্নত বিশ্বের দেশগুলোতেও একই চিত্র। আরব দেশে একসময় কন্যাসন্তান জন্ম হলে জ্যান্ত পুঁতে ফেলা হতো। কারণ পুরুষ প্রধানত নারীকে ভোগের সামগ্রী হিসেবে দেখে। পুরুষের এই দৃষ্টিভঙ্গির জন্যই কন্যাকে আর তার শরীরকে নিয়ত পাহারা দিয়ে রাখতে হয়। এই নিরাপত্তাহীনতা থেকেই মূলত মানসিকতার এই সমস্যা সৃষ্টি। এই প্রবৃত্তি বদলে দেওয়া সহজ নয়। সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় এবং নেতৃত্বে এখন পৃথিবীজুড়ে নারীর অবস্থান সুদৃঢ় করার বিরামহীন প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে নারীসমাজ।

রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, ‘আমি অন্তঃপুরের মেয়ে, চিনবে না আমাকে।’ এই অন্তঃপুরে রাখার জন্যই নারী বিকশিত হওয়ার সুযোগ পেয়েছে কম। অন্তঃপুরের বাইরের বিশাল সাগর, রোদে উজ্জ্বল আকাশ আর তারা ভরা রাত, পর্বত সারি সারি দেখা হয়ে ওঠেনি নারীর। তবু নারী বিকশিত হচ্ছে। ঘরের চৌকাঠ পেরিয়ে পা দিয়েছে বিশাল পৃথিবীর বুকে। নারী কোথায় তার অবস্থান করে নেওয়ার চেষ্টা করছে না? ব্যবসা, শিক্ষা, চাকরি, রাজনীতি আমরা আছি সর্বক্ষেত্রে। বেগম রোকেয়া কিংবা তারও আগে থেকে যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, আমরা তারই পথ ধরে অনেকটুকু এগিয়েছি। কিন্তু মুক্তির আলো আমরা সবাই এখনো ছুঁতে পারিনি। আমরা কজন মাত্র। আর আমরা বাকিরা এখনো পথ পাইনি, আমরা আলোবঞ্চিত।

শরৎচন্দ্র-রবীন্দ্রনাথের কলমের তুলিতে আঁকা নারীর জীবনচিত্র থেকে আজও বের হতে পারিনি আমরা। পিচ্ছিল-বন্ধুর পথ পেরিয়ে বহুদূর যেতে হবে। আলোর সেই দেশে, যেখানে প্রাণ ভরে হাসা যায়, বুকের সবটুকু দিয়ে ভালোবাসা যায়, যেখানে ভালোবাসাহীন ক্ষুধিত চোখের দৃষ্টি থেকে ষোড়শী কিশোরীকে তার শরীরটুকু রক্ষা করতে আর জড়সড় হয়ে থাকতে হবে না।

সেই যে বৃদ্ধা, গভীর রাতে তাঁর ঘরে ঢুকে ভোট চাইতে গেলে বলল, ‘একটু দাঁড়াও’। অপলক চোখে কাঁপা কাঁপা হাতে কুপির আলো জ্বালিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে কথা দিল, ‘তোমারে আমি ভোট দিমু।’ সেই চোখে কী যে ভালোবাসা, বিশ্বাস আর নির্ভরতা ছিল, তা বলে বোঝানো যাবে না। আমি প্রাণ দিয়ে হলেও এই বিশ্বাস রক্ষা করতে চাই। আমি কি পারব শেখ হাসিনার দানের প্রতিদান দিতে? কক্ষনো না! সব দানের প্রতিদান হয় না। যখন জীবনের এক কঠিন সময়ে নিষ্ঠুর বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ছিলাম, কানের কাছে একটা গানই বাজত, ‘কূল নাই, কিনার নাই’। সেখান থেকে শেখ হাসিনা আমাকে হাত ধরে এনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন কর্মময় পৃথিবীতে। মানুষকে সেবা করার, সাধারণ মানুষের সমস্যা সমাধান করার। আসলে রাজনীতি মানেই মানুষের সেবা। কর্ম হলো তার ধর্ম। এই কর্ম দিয়েছে আমাকে নতুন জীবন। বিশেষ করে রাজনীতিতে নারী নেতৃত্বকে সাধারণ কর্মী আর ভোটাররা মেনে নেয়, মনেও নেয়, কিন্তু নেতারা সমভাবে মেনে নিতে পারেন না। কত যে ষড়যন্ত্র! কত গভীর, কত বিচিত্র সব ষড়যন্ত্র! কুৎসিত মিথ্যাকে তাঁরা একেবারে সত্যের মতো করে বলেন, তুলে ধরেন।

স্থানীয়ভাবে বহু রকম অপচেষ্টা করে সফল না হলে ওপরের দিকে গিয়ে মিথ্যাকে সত্যের রং দিয়ে একেবারে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলে ধরেন। এগুলো মোকাবিলা করে এগিয়ে যাওয়া খুবই কঠিন। নারী কি তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করবে, না কাজ করবে?

মনের আকাশ ছেয়ে যায় বেদনার মেঘে মেঘে। তুমি নারী, তোমার হাসিমুখ দেখবে সবাই। বেদনা লুকিয়ে রেখে মনের ভেতর চোখের জল ফেলতে হবে গভীর অন্ধকারে। রাতের বুকে তা হারিয়ে যাবে। এ ব্যথা কাউকে দেখিয়ো না। কাউকে আমরা করুণা করার সুযোগ দেব না। কাজ তো করতেই হতো। এ কাজ, নয় অন্য কোনো কাজ। হয়তো ইট ভাঙতাম কোনো এক পথের পাশে। সেখানে সখিনা বিবি পাঁচ মাসের বাচ্চা পেটে, দেড় বছরের আরেক বাচ্চা পাশে বসিয়ে ইট ভাঙছে বিশাল ইমারত নির্মাণের জন্য। রবীন্দ্রনাথের ‘স্ত্রীর পত্র’ এই জীবনে অন্তত ২০ বার পড়েছি। যতই পড়েছি, ততই বাঁচতে শিখেছি। নারীর মর্যাদা রক্ষার পথ তিনি সঠিকভাবে তুলে ধরেছেন। অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গিয়ে জমিদার বাড়ির মেজো বউ ঘর ছেড়ে পথে বেরিয়ে এসেছিল। নিরাশ্রয় মেজো বউ বিশাল সাগরের পাড়ে বসে অনুভব করেছিল_’জায়গা আছে’! আমরা নারীরা যেন নিজেকে অসহায় মনে না করি। জীবনের যেকোনো স্থানে সৃষ্টিকর্তা আমাদের জায়গা করে দেবেনই। নিজের পথ নিজেকেই বের করে নিতে হবে। দরকার প্রচণ্ড মনের জোর।

একদিন পরিবার পরিকল্পনার বিষয় নিয়ে মায়েদের সঙ্গে বসলাম। অনেক কথা হলো। এক মা উঠে এসে বললেন, “আপা, আপনাদের জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি খাইলে আমার শরীর মোটা হইয়া যায়, সমস্যা হয়। আমার স্বামীরে বুঝাইয়া কন, ও যেন কিছু করে। আমি কইছিলাম। ও কয়, ‘পারুম না, তোর ঠেকা লাগলে তুই কর’।” তা ঠিক, সন্তান যে নারীই ধারণ করে। রেবেকার বাড়ি গাঁওদিয়া। বিয়ে হয়েছে বছর এগারো। হঠাৎ করে স্বামী রমিজ শেখ মারা গেল। দুটো ছেলেমেয়ে নিয়ে রেবেকা বাকি জীবনটা স্বামীর ভিটায় কাটাতে চায়। কিন্তু চাইলেই কি সবকিছু হয়? শ্বশুরবাড়ির লোকজন নানা অসিলায় বাপের বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়। আসল উদ্দেশ্য_সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করা। বৃদ্ধ পিতা। রেবেকা এখন কোথায় যাবে? সেদিন আমার কাছে এক মেয়ে এল ফরিয়াদ নিয়ে। তার ডাগর দুটি আঁখি মেলে বলল, ‘আপা, আমাকে বিয়ে করে ও বিদেশে চলে গেছে। কয়েক মাস পরে স্বামী হাতখরচের টাকা পাঠালে দেবর ও ভাসুর বলল, এ মেয়ের চরিত্র খারাপ। একে রাখা যাবে না। আমার স্বামীকেও চিঠি দিয়েছে। এখন আমার কী হবে?’ বর্তমানে এটি একটি নিত্যনৈমিত্তিক চিত্র।

জননেত্রী শেখ হাসিনা প্রণীত নারীনীতির ভেতর দিয়ে এসব অনেক সমস্যার সমাধানের আলো উঁকি দিচ্ছে। এই নীতি অবিলম্বে বাস্তবায়ন করা দরকার। এ দেশের নারীরা ধর্মীয়, সামাজিক, কখনো বা ব্যক্তির অনুশাসনে নির্যাতিত হয়। বিধবা এবং তালাকপ্রাপ্তা নারীদের মর্যাদাপূর্ণ পুনর্বাসনের সুযোগ খুবই সামান্য। নারীর পুনর্বাসনের বিষয়টি আরো গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে। মানুষের সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন হতে হবে। এখনো অনেক রাত। প্রভাতের আলো পেতে হলে আরো পথ চলতে হবে। যেতে হবে অনেক দূর। পথ চলতে হবে বুকের ভেতর প্রচণ্ড ইচ্ছা ও অদম্য সাহস নিয়ে।

লেখক : সংসদ সদস্য ও সরকারদলীয় হুইপ, বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ; এবং সদস্য, জাতীয় কমিটি, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ

[ad#bottom]