গেণ্ডারিয়ায় শিশুকে ড্রামের পানিতে চুবিয়ে হত্যা

বাবাকে জবাইয়ের চেষ্টা
রাজধানীর গেণ্ডারিয়া এলাকায় বাসায় ঢুকে দুর্বৃত্তরা দীপ্ত দাস শুভ নামের এক শিশুকে হাত-পা বেঁধে গোসলখানার ড্রামের পানিতে চুবিয়ে হত্যা করেছে। এ সময় তারা শিশুটির বাবা ব্যবসায়ী বিভূতিরঞ্জন দাস বাবুলকে (৪৫) জবাই করে হত্যার চেষ্টা চালায়। আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাঁকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। সন্ত্রাসীরা চলে যাওয়ার সময় বাসার আলমারি ভেঙে টাকা-পয়সা লুট করে নিয়ে যায়।

গতকাল শনিবার দুপুরে গেণ্ডারিয়ার ৩৪ কেবি রোডের পাঁচ তলার ফ্ল্যাটে এ ঘটনা ঘটে। পুলিশের ধারণা, একই বাড়ির সাগর নামে মাদকাসক্ত এক যুবক এ ঘটনায় জড়িত। নেশার টাকা জোগাড় করতেই নির্মম এ ঘটনা ঘটানো হয়েছে।

নিহত দীপ্ত দাস শুভ গেণ্ডারিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণীর ছাত্র ছিল। আহত বিভূতিরঞ্জন বাবুল লালবাগ এলাকায় ট্যানারির ব্যবসা করেন।

পুলিশের ওয়ারি জোনের ডিসি গাজী মোজাম্মেল হক কালের কণ্ঠকে জানান, প্রাথমিকভাবে ঘটনায় জড়িত এক যুবককে চিহ্নিত করা হয়েছে। আহত বাবুলও ঘাতককে চিনতে পেরছেন। তাকে ধরার চেষ্টা চলছে। তার নাম সাগর। একই বাড়ির চার তলার একটি ফ্ল্যাটে সে থাকে। সে মাদকাসক্ত বলে জানা গেছে। মাদকের টাকা জোগাড় করতে ঘটনাটি ঘটানো হতে পারে বলে মনে হচ্ছে। তার পরও অন্য কোনো কারণ আছে কি না খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে স্বজনদের অভিযোগ, একজন নয়, ঘটনার সঙ্গে একাধিক লোক জড়িত ছিল।

দীপ্ত দাসের মামা স্বপন দাস তাঁর ভগি্নপতি আহত বিভূতিরঞ্জন দাসের বরাত দিয়ে কালের কণ্ঠকে জানান, দুপুর ১২টা থেকে সাড়ে ১২টার দিকে অজ্ঞাতপরিচয় দুই-তিনজন সন্ত্রাসী বিভূতির কৈশোর ব্যানার্জি রোডের পাঁচ তলার বাসায় যায়। সন্ত্রাসীরা বাসার দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকেই শিশু দীপ্ত দাসকে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে। তারা রশি দিয়ে দীপ্ত দাসের হাত-পা এবং কাপড় দিয়ে মুখ বেঁধে ফেলে। পরে বিভূতিকেও জিম্মি করে। প্রথমে দীপ্তের বাবাকে বিছানার ওপর রেখে ধারালো অস্ত্র দিয়ে জবাই করে হত্যার চেষ্টা চালায় তারা। পরে দীপ্তকে বাথরুমে নিয়ে যায়। সেখানে পানিভর্তি ড্রামের ভেতরে ঢুকিয়ে তার মুখ বন্ধ করে দেয়। পরে আলমারি ভেঙে টাকা-পয়সা লুট করে সন্ত্রাসীরা বাড়ির সিঁড়ি বেয়ে পালিয়ে যায়। এর মধ্যে বাবুলের গোঙানির শব্দ হলেও সাহস করে কেউ এগিয়ে আসেনি। তবে ওই ভবনের লোকজন ঘটনাটি পুলিশকে জানায়।

স্বপন দাস আরো জানান, ওই অবস্থায়ই বিভূতিরঞ্জন তাঁর স্ত্রী স্কুলশিক্ষিকা শেফালী দাসকে মোবাইল ফোনে বিষয়টি জানান। শেফালী তখন মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখানের কুচিয়ামারা হাইস্কুলে ছিলেন। সংবাদ পেয়ে তিনি বাসায় ছুটে আসেন।

পুলিশ জানায়, দুপুর ২টার দিকে তারা ওই বাসায় গিয়ে ব্যবসায়ী বাবুলকে উদ্ধার করে প্রথমে স্থানীয় একটি হাসপাতালে এবং পরে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায়। কিন্তু তখনো পুলিশ দীপ্তের পরিণতি জানতে পারেনি। গুরুতর অবস্থায় বাবুলকে হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। তাঁর গলার শ্বাসনালী প্রায় কেটে গেছে। তাঁর অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে কর্তব্যরত চিকিৎসক জানান।

এদিকে বিভূতিকে উদ্ধারের আধা ঘণ্টা পরও শিশু দীপ্ত কোথায় আছে কেউ জানত না। দুপুর আড়াটার দিকে শেফালী বাসায় ফেরেন। তিনি এসে গোসলখানার ভেতরে ড্রামের পানির মধ্যে শিশু দীপ্তকে দেখতে পান। সেখান থেকে উদ্ধারের পর হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। পাগলপ্রায় শেফালী : সন্তানের এ রকম মৃত্যু এবং স্বামীর এ অবস্থায় পাগলপ্রায় অবস্থা স্কুলশিক্ষিকা শেফালী দাসের। তিনি কালের কণ্ঠকে জানান, প্রতিদিনের মতো শনিবার সকাল সাড়ে ৮টার দিকে দীপ্ত দাস শুভকে নাস্তা খাইয়ে তার বাবার সঙ্গে স্কুলে পাঠিয়ে তিনি স্কুলে যান। দুপুর ১টার দিকে তাঁর স্বামী মোবাইল ফোনে বলেন, ‘বাসায় ডাকাত পড়েছে। ডাকাতরা আমার গলা কেটে আমাদের শুভকে নিয়ে চলে গেছে। আমি জানি না শুভ কোথায় আছে। তুমি দ্রুত বাসায় আসো।’

শেফালী বলেন, ‘ফোন পেয়েই স্কুলের কাজ ফেলে বাসায় চলে আসি। বাসায় এসে দেখি, আমার স্বামীকে রক্তাক্ত অবস্থায় পুলিশ উদ্ধার করে নিয়ে যাচ্ছে। পুলিশের কাছে জানতে চাই, তাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন? পরে ওপরে উঠে বাথরুমে ড্রামে ছোট্ট একটি পা দেখা যায়। ভাই স্বপনও সেখানে আসেন। পরে ড্রাম থেকে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় শুভকে পাওয়া যায়।’ এ কথা বলেই মাটিতে গড়াগড়ি দিয়ে কাঁদতে থাকেন শেফালী।

এ ঘটনায় পুরো গেণ্ডারিয়া এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে। শত শত লোক ভিড় জমায় কেবি রোডের ওই বাসায়। কান্নায় ভেঙে পড়ে সবাই। নির্মম এ ঘটনায় হতবিহ্বল হয়ে পড়ে সবাই।

গেণ্ডারিয়া থানার ওসি সুভাষ কুমার পাল কালের কণ্ঠকে জানান, এ ঘটনায় দীপ্তের পরিবার মামলা দায়ের করবে বলে তাদের জানিয়েছে।

[ad#bottom]