আড়িয়াল বিলে বিমানবন্দর : রাজনীতির নতুন ইস্যু!

শুভ কিবরিয়া
সরকার বঙ্গবন্ধুর নামে একটি নতুন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে। বড় আকারে, বড় আয়োজনে এই বিমানবন্দরটি তৈরি করতে চায় সরকার। এ জন্য প্রথমে ময়মনসিংহের ত্রিশাল, পরে ফরিদপুরের ভাঙ্গায় বিমানবন্দরের জন্য জায়গা নির্ধারণ করার চেষ্টা চলে। এই বিমানবন্দর নির্মাণের জন্য যে বিপুল জমি দরকার তা অধিগ্রহণ করতে গেলে এসব এলাকায় অনেক আবাদি জমি ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে, জনগণের নানামুখী প্রতিবাদ ঘটতে পারে এই বিবেচনায় সরকার এই দুই জায়গা থেকে সরে আসে।

পরবর্তীতে জানা যায়, এই বিমানবন্দর নির্মাণের জন্য সরকার ঢাকার পাশে একটি স্থান নির্ধারণ করেছে। ঢাকা জেলার নবাবগঞ্জ ও দোহার উপজেলা এবং মুন্সীগঞ্জ জেলার শ্রীনগর উপজেলায় অবস্থিত আড়িয়াল বিল এলাকাই চিহ্নিত হয়েছে এই বিমানবন্দর নির্মাণের জন্য। এই এলাকাটি সাবেক বিক্রমপুর জেলার অধীন। আড়িয়াল বিল এলাকাটি বহুকাল থেকে জলাভূমি হিসেবে বিখ্যাত। মুন্সীগঞ্জ ও ঢাকা জেলার এই জায়গায় যে কয়টি সংসদীয় আসন আছে তাতে অতীতে বিএনপির মনোনীত সংসদ সদস্যরা জয়লাভ করলেও এবার এখানকার সব ক’টি সংসদীয় আসনে জনগণ ভোট দিয়েছে আওয়ামী লীগকে। এই এলাকা থেকে মন্ত্রীও হয়েছেন। সুতরাং রাজনৈতিক বিবেচনায় এলাকাটি সরকারের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

২.
আড়িয়াল বিল এলাকায় বিমানবন্দর নির্মাণ হচ্ছে প্রায় ৫০ হাজার একর জায়গাজুড়ে। এই কথাটি চাউর হবার পর বিল এলাকা, এই সংলগ্ন এলাকার মানুষজনের কৌতূহল বাড়ে। প্রথমত বিল এলাকায় যাদের আবাদি জমি আছে, তাদের মধ্যে আশঙ্কা ছড়িয়ে পড়ে জমি হাতছাড়া হবার। বিল এলাকাকে ঘিরে যেসব জীবিকা আছে, তাতে যারা সম্পৃক্ত আছেন, তাদের উদ্বেগ এখানে বিল না থাকলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে তাদের জীবিকা। অন্যদিকে বিমানবন্দর হলে যাদের জমি যাবে না, কিন্তু তাদের জায়গা-জমির আশেপাশে বিমানবন্দর হবার কারণে, যাদের জমির মূল্য বাড়বে তারা খুশি হতে থাকে। ক্ষতিগ্রস্ত হবার আশঙ্কা যেমন কিছু মানুষকে সন্ত্রস্ত করে তোলে, অন্যদিকে তেমনি লাভের আশায় কিছু মানুষ এতে আনন্দিত হয়ে ওঠে।

সম্প্রতি এই দুই পক্ষের মানুষ সংঘবদ্ধ হতে শুরু করেছে। ইতোমধ্যে বিমানবন্দর নির্মাণের উদ্যোগ বাতিলের দাবিতে ঢাকা-মাওয়া সড়কে মানববন্ধন, বিক্ষোভ হয়েছে । অন্যপক্ষে এই প্রকল্প বাস্তবায়নের পক্ষে আনন্দ মিছিল করেছে সংগঠিত একটি গ্রুপ। সরকারের মন্ত্রী এবং ঢাকা-২ (নবাবগঞ্জ, দোহার) এলাকার এমপি আবদুল মান্নান খান এই প্রকল্প বাস্তবায়নের পক্ষে বক্তব্য রেখেছেন। সরকারদলীয় আরো ক’জন স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও নেতা এই প্রকল্পের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। দু’পক্ষেই সংগঠিত হবার চেষ্টা চলছে। ক্ষুব্ধতা, আশঙ্কা, আতঙ্ক, উদ্বেগ বাড়ছে।

৩.
বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নির্মাণের বিষয়ে সরকার আসলে কি করতে চায়, সেটি খুব পরিষ্কার নয়। জনসমক্ষে এই প্রকল্পের বিষয়ে কোনো সুস্পষ্ট পরিকল্পনা উপস্থাপন করা হয়নি। পত্রিকান্তরে খবর এসেছে এই প্রকল্পের জন্য জায়গা লাগবে ৫০ হাজার একর। আড়িয়াল বিলের বৃহত্তম জলাভূমি এই প্রকল্পের আওতায় আসবে বলে সংবাদপত্রে খবর বেরিয়েছে। স্থানীয়ভাবে জমি অধিগ্রহণের প্রাথমিক প্রস্তুতি চলছে। যেহেতু প্রকল্পটি সম্পর্কে পরিষ্কার কোনো ঘোষণা আসে নাই, সে কারণেই জনমনে নানারকম তথ্য, কথা ভাসছে। কখনো কখনো অতিরঞ্জিত, উদ্দেশ্যমূলক তথ্য জনগণকে বিভ্রান্ত করছে। এই প্রকল্প হবেই, সরকার দলের স্থানীয় নেতা বা কর্মীদের এই উদ্যোগও জনগণকে বিক্ষুব্ধ করছে। যেহেতু এই এলাকাটি ঢাকার খুবই সন্নিকটে সে কারণেই জন-অসন্তোষের এই খবর দ্রুতই মিডিয়ায় চলে আসছে। ভবিষ্যতেও আসবে।

৪.
এই সরকার ক্ষমতায় আসার পর জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নাম পরিবর্তিত হয়েছে। রাজনৈতিকভাবে সরকার ও বিরোধী দলের অবস্থান এখন অত্যন্ত সংঘাতমুখর। অন্যদিকে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের বিষয়ে সরকারের কঠোর অবস্থানের ফলে জামায়াতে ইসলামীসহ সমমনা রাজনৈতিক দলগুলো সরকারের বিষয়ে ক্ষুব্ধ। সংবিধান সংশোধনসহ ধর্মনিরপেক্ষতাকে নতুন করে প্রতিষ্ঠা, অসাম্প্রদায়িক শিক্ষানীতির বাস্তবায়ন, বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের বিচার করাসহ সরকারের ঐতিহাসিক সব সাফল্যের কারণেও সরকারের ওপর রুষ্ট আছে বিশেষ মহল।

এ রকম সময় বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নির্মাণ নিয়ে কোনো অস্পষ্টতা, অদূরদর্শিতার ফলে বড় ধরনের সংঘাত বা সংঘর্ষের সৃষ্টি হলে তাতে অবাক হবার কিছু থাকবে না। যে কারণে সরকারকে এ বিষয়ে অধিকতর সতর্কতা ও স্বচ্ছতার সঙ্গে কাজ করতে হবে।

প্রথমত, প্রকল্প এলাকা সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা জনসমক্ষে ঘোষণা করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, কত একর জমি অধিগ্রহণ করা হবে, অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া কি হবে, ক্ষতিগ্রস্ত জনগণকে কিভাবে পুনর্বাসন করা হবে তার বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ্যে জানাতে হবে। যাতে জনগণ সঠিক তথ্য জানতে পারে এবং সুযোগ-সন্ধানীদের বিভ্রান্তিতে না পড়ে।

তৃতীয়ত, ক্ষতিগ্রস্ত লোকদের সঙ্গে কথা বলতে হবে। তাদের ক্ষুব্ধতা শুনতে হবে। তাদেরকে যথাযথ ক্ষতিপূরণসহ স্বস্তিদায়ক পুনর্বাসনের আশ্বাস ও নিশ্চয়তা নিশ্চিত করতে হবে।

চতুর্থত, এ বিষয়ে ক্ষুব্ধ ক্ষতিগ্রস্ত জনগণের পাশে দাঁড়াতে হবে সরকার এবং আওয়ামী লীগকে। সরকার এবং আওয়ামী লীগ যদি জনগণের অনুভব ও বেদনার বিপক্ষে দাঁড়িয়ে যায় তবে সংঘাত দ্রুতই ছড়িয়ে পড়বে।
পঞ্চমত, সরকারপ্রধানসহ সরকারের দায়িত্বশীল মহলকে এ বিষয়ে স্বচ্ছতা ও সহানুভূতিশীলতার পরিচয় দিতে হবে। তাদেরকে এমন অভয় প্রদান করতে হবে যাতে জনগণ মনে করে দেশের প্রয়োজনে, জনগণ সরকারের সঙ্গে আছে।

৫.
আমাদের মতো অধিক জনসংখ্যার দেশে জমি খুব স্পর্শকাতর বিষয়। যে কোনো উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নকালে জনগণের এই স্পর্শকাতরতার বিষয়টি খেয়াল করতে হয় অধিকতর গুরুত্বের সঙ্গে। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের নন্দীগ্রাম, সিঙ্গুরের অভিজ্ঞতাও আমাদের জানা আছে। সেখানে সামান্য ভুলের কারণে তৃণমূল পর্যন্ত বিস্তৃত এবং সংগঠিত বামফ্রন্টের উদ্যোগে রক্তপাত এবং প্রাণহানি ঘটেছে। সুদৃঢ় বাম রাজনীতির বিপর্যয় পর্যন্ত দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামের কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ প্রকল্প, ফুলবাড়ী কয়লা প্রকল্পের অভিজ্ঞতাও স্মরণে রাখতে হবে।

সরকারকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে, এই বিষয়টি যেন রাজনৈতিক ইস্যু হিসেবে না দাঁড়ায়। সরকারবিরোধী মহল যেন একে রাজনৈতিক ইস্যু হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ না পায়।

সরকার যদি আগ্রাসী হয়ে ওঠে, ধরপাকড় শুরু করে, ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের ভয়ভীতি দেখাতে থাকে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মাঠে নামায় কিংবা দলীয় ক্যাডাররা এই প্রকল্প বাস্তবায়নে মাঠে নামে তবে জনঅসন্তোষ রাজনৈতিক রূপ নেবার সম্ভাবনা হয়ে দেখা দেবে।

সরকারের বিরোধী সকল পক্ষ এই রকম বিপর্যয়কর পরিস্থিতিকে পুঁজি করে রাজনৈতিক ইস্যু খুঁজতে চাইবে। সেক্ষেত্রে এই প্রকল্পের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত জনগণকে ঐ পরিস্থিতির পাশে পেলেও অবাক হবার কিছু থাকবে না।
এ কারণেই সরকারের উচিত, এই উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ে আরো বিস্তর ভাবনা-চিন্তার। আরো পরিকল্পনার। আরো জনসম্পৃক্ততার। আরো সতর্কতার।

[ad#bottom]