আড়িয়াল বিলে আতঙ্ক

আনিস রায়হান
আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে মুন্সীগঞ্জের সাধারণ মানুষ। আড়িয়াল বিলে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট সিটি নির্মাণকল্পে জমি অধিগ্রহণকে কেন্দ্র করে এ অবস্থা তৈরি হয়েছে। আড়িয়াল বিল সংশ্লিষ্ট ১৪টিরও বেশি ইউনিয়নের লোকজন এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। বঙ্গবন্ধু বিমানবন্দরের পরিকল্পনার কথা শোনা যাচ্ছিল বিগত বছরজুড়েই। প্রথমে ময়মনসিংহের ত্রিশালের কথা শোনা গেলেও পরবর্তীতে ঢাকা ও মুন্সীগঞ্জের আড়িয়াল বিল এলাকার ৫০ হাজার একর জায়গায় এ প্রকল্প বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার বলে জানা যায়। এটি বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বিল। এর বিস্তৃতি ৩টি উপজেলায়। বিলটির আকার প্রায় ২০ হাজার একর। এর মধ্যে ১১ হাজার একর জমি শ্রীনগর উপজেলা ও বাকি ৯ হাজার একর ঢাকা জেলার নবাবগঞ্জ (উত্তর-পশ্চিমে) ও দোহার (পশ্চিমে) উপজেলায় পড়েছে। খবরে প্রকাশ, এর মধ্যেই জমি অধিগ্রহণের নির্দেশনা জারি হয়েছে। শ্রীনগরের ১৪টি, দোহারের ৭টি ও নবাবগঞ্জের ৯টি মৌজা থেকে এ জমি অধিগ্রহণ করা হবে। এতে তিন উপজেলার প্রায় দেড় লাখ লোকের জমি অধিগ্রহণ করতে হবে। জানা গেছে, থাইল্যান্ডের সুবর্ণভূমি বিমানবন্দরের আদলে ৯ হাজার ফুট দৈর্ঘ্যরে দুটি রানওয়ে সংবলিত বিমানবন্দর নির্মাণের মাধ্যমে প্রকল্পটি শুরু হবে। সরকারি বেসরকারি অংশীদারিত্ব বা প্রাইভেট পাবলিক পার্টনারশিপের (পিপিপি) অধীনে বিল্ড-ওন-অপারেট-ট্রান্সফারের (বিওওটি) ভিত্তিতে বিমানবন্দরটি নির্মিত হবে।

সরকারের পরিকল্পনার প্রেক্ষিতে সম্ভাব্য ক্ষতিগ্রস্ত জনগণ তাদের সম্ভাব্য ক্ষতির একটা হিসাব প্রচারপত্র ছেপে বিলি করেছেন। এতে তারা দেখিয়েছেন, এ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে স্থানীয় ১০ লাখ ও বহিরাগত ১ লাখ মানুষের জীবিকা ধ্বংস হবে। বাংলাদেশ বছরে প্রায় ১০ লাখ টন ধান ও ১০ কোটি টাকার মাছ থেকে বঞ্চিত হবে। যা জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশ বিপর্যয়ের এই কালে গোটা দেশের খাদ্য নিরাপত্তাকে হুমকিতে ফেলে দেবে। প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে শ্রীনগর উপজেলার লোকজনই বেশি সমস্যায় পড়বে। এই প্রকল্পের আওতায় শ্রীনগর উপজেলার প্রায় ১৪ টি মৌজা রয়েছে। শ্রীনগর উপজেলার হাঁসাড়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘আড়িয়াল বিলে আলু, মরিচ, পেঁয়াজ, রসুন, সরিষা, ভুট্টা, মাষকলাই ও বিভিন্ন তরি-তরকারি উৎপন্ন হয়। এখানকার জমির উর্বরতা অনেক বেশি। প্রতি বিঘা জমিতে ৩৫-৪০ মণ বোরো ধান ও ৮০-১০০ মণ আলু হয়। আমার নিজের জমিতে একটা কুমড়ার ওজন হয়েছে ৮৫ কেজি। অন্যান্য স্থানে তিনবারে যে ফসল ফলে এখানে একবারে তা ফলে। সরকারের এই জায়গাটা বাদ দিয়ে অন্য কোথাও যাওয়া উচিত। আড়িয়াল বিলে বিমানবন্দর হলে আমরা শ্রীনগর উপজেলাবাসী একেবারে পথের ফকির হয়ে যাব।’

আড়িয়াল বিলে বিমানবন্দর স্থাপনের বিরুদ্ধে এলাকার শতাধিক গ্রামের প্রায় ৩০ হাজার অধিবাসী গত ২৭ ডিসেম্বর ঢাকা-মাওয়া সড়ক অবরোধসহ বিক্ষোভ-প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করে। সরকারের পক্ষ থেকে এ ঘটনার প্রেক্ষিতে বলা হয়েছে, মুন্সীগঞ্জে প্রস্তাবিত বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নির্মাণের জন্য আড়িয়াল বিলের ফসলি জমি নষ্ট করা হবে না। বসতবাড়িও হুকুম-দখল করা হবে না। ৩০ ডিসেম্বর দুপুরে মুন্সীগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে এক সভায় এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর প্রকল্প সেল প্রধান যুগ্ম সচিব জয়নাল আবেদীন তালুকদার। তিনি বলেন, ‘ব্যাপক হারে ফসলি জমি ও কোনো বাড়ি হুকুম-দখল না করার জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ রয়েছে।’ সরকারের এ ঘোষণায় বিস্ময় প্রকাশ করেছেন আড়িয়াল বিল রক্ষা কমিটির নেতৃবৃন্দ। তারা বলেছেন, এখানে কোনো অনাবাদি জমি নেই। অনাবাদি জমি খুঁজতে হলে সরকারকে আড়িয়াল বিল ছাড়িয়ে অন্য কোথাও যেতে হবে। অনাবাদি জমি আছে এমন কোথাও বিমানবন্দর করা হলে সরকারকে সহযোগিতা করা হবে।

স্থানীয় সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দল-মত নির্বিশেষে তারা আবাদি জমি ও বসতভিটা গ্রহণের যে কোনো প্রচেষ্টাকে প্রতিহত করতে এখন ঐক্যবদ্ধ। আড়িয়াল বিলে শস্য ফলিয়ে এবং মাছ চাষ করে যুগ যুগ ধরে বেঁচে থাকা কৃষি পরিবারগুলো সরকারকে এ প্রকল্প বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছে। তবে প্রকল্পের আওতার বাইরের মানুষদের মধ্যে উত্তেজনা ও উৎসাহ লক্ষ্য করা গেছে। প্রকল্পের ভেতরে অবস্থানরত সরকারদলীয় সমর্থকরা কিছুটা অস্বস্তিতে রয়েছে। অস্তিত্ব সঙ্কট এবং দলীয় স্বার্থ এই দুইয়ের দ্বন্দ্বে তারা মুখ বুজে আছে। তবে ইউনিয়ন পর্যায়ের জনপ্রতিনিধিরা অনেকেই সরকার দলীয় নেতা-কর্মী হওয়া সত্ত্বেও তীব্রভাবে প্রকল্পের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। বিরোধীদলীয় রাজনৈতিক কর্মীদের মধ্যে এ প্রকল্পকে ঘিরে তৈরি হয়েছে ব্যাপক উত্তেজনা ও কর্মতৎপরতা। ইতোমধ্যে বিভিন্ন এলাকায় তৈরি হচ্ছে আড়িয়াল বিল রক্ষা কমিটির স্থানীয় উপ-কমিটি। প্রায় প্রতিদিনই হচ্ছে মিছিল-সভা। পরিস্থিতি এখন এমন যে, জমি অধিগ্রহণের যে কোনো চেষ্টা এ অঞ্চলে সংঘাত ডেকে আনবে।

সবার মুখে এক কথা
আড়িয়াল বিল সংশ্লিষ্ট এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, স্থানীয় জনগণের মুখে এখন একটাই কথা ‘বিমানবন্দর’। শিশু-কিশোর, যুবক-যুবা, বৃদ্ধ-বৃদ্ধা কেউ বাদ নেই। মাঠে, ঘাটে, হাটে, গাঁয়ের চায়ের দোকানে, এমনকি ঘরের ভেতরও আলাপ চলছে বিমানবন্দর নিয়ে। বিমানবন্দর হলে কী কী লাভ-ক্ষতি হতে পারে তার হিসাব নিয়ে সকলে যে যার মতো করে মতামত রাখছেন। এলাকার বিভিন্ন জায়গা ঘুরে দেখা গেছে, এ ধরনের আলোচনা শেষ হচ্ছে ব্যাপক হতাশা ও ক্ষোভের বহির্প্রকাশের মধ্য দিয়ে। শ্রীনগরের আলমপুর বাজারের একটি চায়ের দোকানে গত ৩০ ডিসেম্বর সকালে এমনই এক আলোচনায় অন্য সবাইকে থামিয়ে দিয়ে বৃদ্ধ কৃষক গফুর মিয়া বলে ওঠেন, ‘শোনো মিয়ারা, সরকার যদি এতগুলো মাইনষের মুখের দিকে না তাকায়া এই কাম করতে যায় তাইলে সরকারের মরণ এইখানেই হইব।’

বিক্ষুব্ধ জনতা
জনগণের অধিকাংশের বক্তব্যে সংঘাতমূলক মনোভাব প্রকাশ পেয়েছে। ‘এয়ারপোর্ট হইলে তো আমরা মইরা গেলাম। তা মরুমই যহন লইড়া চইড়া মরুম। জীবন গেলেও এয়ারপোর্ট আমরা হইতে দিমু না’ জানান শ্রীনগরের কাঁঠালবাড়ি এলাকার কৃষক নাসির হোসেন।

একই এলাকার ৮০ বছরের বয়স্কা আনোয়ারা খাতুন বলেন, ‘লোকজন যদি না খাইয়া মরে তাহলে প্লেন দিয়া কি হইব। সরকার কি আমাগো মাইরা প্লেন চালাইব?’

সেনাবাহিনীর সাবেক নায়েক, বীর মুক্তিযোদ্ধা বয়োবৃদ্ধ মো. ইদ্রিস বলেন, ‘সরকার যদি বিমানবন্দর বানাইতে চায় তাইলে অন্তত পাঁচ-দশ হাজার পুলিশ ও আর্মি এইখানে শেষ কইরা যাইতে হইব। আমি যদি ১০টা আর্মি মারি, মইরা গেলেও আমার আপত্তি নাই। মরার আগে নিজেরে তো বুঝা দিবার পারুম।’

বাড়ৈখালি ইউপি সদস্য মো. মালেক বলেন, ‘আমি একাত্তরে পাকসেনাদের সঙ্গে যুদ্ধ করেছি দেশ রক্ষার জন্য। এবার ২০১১ সালে জমি রক্ষার জন্য যুদ্ধ করব সরকারের সঙ্গে। সরকারকে আমার একটা কথা বলার আছে। আপনারা তো জনপ্রতিনিধি। আপনারা কি জনগণের মতামত নিচ্ছেন। কাউকে জিজ্ঞেস করছেন? আপনারা নিজেরা নিজেরা সিদ্ধান্ত নেয়ার কে? আমাগো কাছে আইতে হইব। না আইয়া উল্টা-পাল্টা কিছু করতে চাইলে রক্তারক্তি হইয়া যাইব। আমরা মইরা যাইতে রাজি মাগার এই বিল, ভিটা-জমি দিতে রাজি না।’

শেখেরনগর এলাকার রিকশাচালক নূরুল হক মাঝি বলেন, ‘এয়ারপোর্ট হইলে আমরা একদম মইরা যামু। আমাগো বাঁচনের আর কোনো কায়দা থাকব না। তয় মরার আগে আমিও কয়ডার মরণ দেইখ্যা লমু।’

আতঙ্কে কাটছে প্রতিটি ক্ষণ
অনেকের দিন কাটছে আতঙ্কে। কি জানি কখন র‌্যাব-সেনাবাহিনী চলে আসে। এসে জমি খালি করতে বলে। বর্গাচাষের ওপর ভিত্তি করে জমিহীন অনেক মানুষ টিকে আছে আড়িয়াল বিল সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোয়। তাদের চিন্তা অন্যত্র চলে যেতে হলে কার কাছ থেকে তারা জমি পাবে। কোথায় করবে কৃষিকাজ। জমি হারানোর আতঙ্কে দিনরাত পার করছে এসব মানুষ। কামারখোলার কৃষিমজুর আরাফাত হোসেন বলেন, ‘সরকার জমির দাম দিব। কিন্তু জমি থেইকা বছরে যে লাখ লাখ টাকা আয় হইতাছে তা তো দিব না। আমরা তো আর কোনো কাম জানি না। এয়ারপোর্টঅলারা আমাগো কই পাঠাইব? অইখানে যাইয়া আমরা কি কইরা খামু?’

শামুক, মাছ, রবিশস্য, ধান প্রভৃতি পাওয়া যায় আড়িয়াল বিলে। এখানে জমি কখনো পতিত থাকে না। বর্ষায় মাছ, শীতে শস্য ও গরমে ধান পাওয়া যায়। জমিই আড়িয়াল বিলের সাধারণ মানুষের মূল সম্পদ, আয়ের প্রধান উৎস। এখন এই জমি হারানোর আতঙ্ক তাদের প্রতিনিয়ত তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। লস্করপুরের কৃষক মনসুর হোসেন বলেন, ‘আমরা যেই ধান পাই, মাছ পাই, লাউ, কুমড়া, সবজি পাই বিমানবন্দর হইলে এইগুলা কই পামু। সব ধরনের তরি তরকারি এইহান হয়। যেই মাছ হয় একেকটা কত বড়। তা না দেখলে বুঝবেন না। সরকার কয় টাকা দিব। টাকা দিলে আমরা কোতায় যাইয়া বাস করমু। এইহানই আমাগো সব কিছু। আর কোতাও তো আমাগো কিছু নাই। সরকারের ডরে এহন সবাইর ঘুম-খানা হারাম হইয়া গেছে।’

পুঁটিমারা এলাকার বয়োবৃদ্ধ কৃষক শ্যামল চন্দ্র বলেন, ‘রাইতে ঘুমাইতে পারি না। দিনে বাড়ি থুইয়া বেশি দূরে যাই না। কহন কী হইয়া যায়।’

রয়েছে আরো অনেক জেলার মানুষ
ধারণা করা হচ্ছে, বিমানবন্দর ও স্যাটেলাইট সিটি প্রকল্পের প্রভাব পড়বে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। কারণ অন্যান্য অঞ্চল থেকে আগত অসংখ্য শ্রমিক রয়েছে আড়িয়াল বিলে। রংপুর, কুড়িগ্রাম, ময়মনসিংহ, পঞ্চগড়, নেত্রকোনা, শেরপুরসহ বৃহত্তর উত্তরাঞ্চলের অসংখ্য শ্রমিকের উপস্থিতি দেখা গেছে এ অঞ্চলে। এমনকি ফরিদপুর, কুষ্টিয়া, শরীয়তপুরের লোকজনও এখানে কাজ করে। বছরের প্রায় সাত মাস টানা কাজ করে এসব মজুর। ময়মনসিংহ থেকে আগত সাহেব আলী বলেন, ‘আমি এইখানে রিকশা চালাই। আমাগো অঞ্চলের হাজার হাজার মানুষ আছে এইখানে। এয়ারপোর্ট হইলে শুধু এই মুন্সীগঞ্জের মানুষ না, আমরাও জানে মারা পড়মুু।’

পূর্বপুরুষের স্মৃতি
মদনখালি এলাকার আনোয়ার হক মধ্যপ্রাচ্যে শ্রমিকের কাজ করেন। দেশে ফিরেছেন কয়েকদিনের জন্য। বিমানবন্দর প্রকল্প তাকে চিন্তায় ফেলেছে বলে জানান। তিনি বলেন, ‘বিমানবন্দর হলে হয়ত লাভ হতে পারে। কিন্তু সেটা তো হওয়ার পরের ব্যাপার। কিন্তু জমি নিয়ে নিলে আমরা ক্ষতিগ্রস্তই হব। আর যে ক্ষতি আমাদের হবে তা কোনোভাবে পূরণ করা যাবে না। বাপ-দাদার কবরের সামনে দাঁড়ানোর সুযোগটাও আমরা আর পাব না।’ স্থানীয় জনগণের ক্ষোভের অনেকাংশজুড়ে আছে পূর্বপুরুষদের স্মৃতি। তারা মনে করছেন বিমানবন্দর ও স্যাটেলাইট সিটি হলে বাকি জীবনে আর তারা এ অঞ্চলে পা রাখতে পারবেন না। অথচ এখানেই বেড়ে উঠেছে তাদের পূর্বপুরুষেরা। তাদের সেই স্মৃতিচিহ্ন, সমাধি ফেলে অন্যত্র যাওয়ার কথা ভাবতেও পারছেন না সাধারণ মানুষ। ধর্মীয় চেতনাও যোগ হয়েছে এর সঙ্গে। স্থানীয় জনগণের বিরাট একটি অংশ মসজিদ, মন্দির, দরগাহসহ যাবতীয় ধর্মীয় স্থাপনা ভাঙার যে কোনো চেষ্টা রুখে দেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।

এ প্রসঙ্গে আড়িয়াল বিল রক্ষা কমিটির নেতা বাড়ৈখালি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ইকবাল হোসেন মাস্টার বলেন, ‘মানুষের যখনই মনে পড়ছে বাপ-দাদার বসতভিটা ছেড়ে চলে যেতে হবে তখনই তারা ক্ষুব্ধ হয়ে উঠছে। সরকার যদি দ্রুত এ প্রকল্প প্রত্যাহারের ঘোষণা না দেয় তাহলে বুমেরাং পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।’

মানবাধিকার বিপর্যয়ের আশঙ্কা
এই প্রকল্পের ফলে নিম্নবিত্তদের অনেকেই অর্থনৈতিকভাবে চরম ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। অনেক শিশু হারাবে শিক্ষার সুযোগ, সুস্থভাবে বেড়ে ওঠার অধিকার। বর্ষাকালে শামুক বেচেই বিলের চারপাশের হাজার হাজার মানুষ জীবন ধারণ করেন। বিমানবন্দর হলে এসব পরিবার বিপর্যয়ের মুখে পড়বে।

সতরভোগ এলাকার স্কুলশিক্ষক আমজাদ হোসেন বলেন, ‘অনেক ছেলেমেয়ে এখনই স্কুলে আসা ছাইড়া দিছে। পোলাপাইন দেহি রাস্তায় খেলে, প্লেন উড়ায় আর কয় এইহান প্লেন উড়ব আমরা প্লেনে উড়মু। দুধের এইসব বাচ্চারা জানে না। এই প্লেন তাগো কি সর্বনাশটাই না ডাইকা আনতাছে।’

সিদলপুরের মৎস্যজীবী হরিহর পরামাণিক বলেন, ‘এয়ারপোর্ট আমরা চাই না। আড়িয়াল বিলের থন মাছ মারি, শামুক তুলি এই দিয়া চলি। সংসার চালাই। পোলামাইয়ারে পড়াই। ঠাকুরের ঘরে বাতি জ্বালাই। এয়ারপোর্ট হইলে আমি শেষ। আমার পোলা মাইয়ার ভবিষ্যৎ শেষ। রাস্তাঘাটে কাম কইরা খাওন ছাড়া ওগো আর কোনো উপায় থাকব না।’

অস্বস্তিতে স্থানীয় সরকার সমর্থকরা

প্রকল্পকে ঘিরে স্থানীয় সরকার সমর্থকদের মাঝে এক ধরনের অস্বস্তি লক্ষ্য করা গেছে। তবে অনেক নেতাকর্মীই সরাসরি প্রকল্পের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। শ্রীনগর উপজেলার লস্করপুরের একজন সরকার দলীয় নেতা প্রকল্প সম্পর্কে মতামত ব্যক্ত করতে গিয়ে বলেন, ‘দশজনের যেভাবে শান্তি আমারও সেভাবে শান্তি, দশজনে যেদিকে যায় আমিও সেদিকে যাব।’

অপরদিকে এ প্রকল্পকে ঘিরে মুন্সীগঞ্জসহ সারা দেশের বিরোধীদলীয় সমর্থকদের মধ্যে দেখা গেছে ব্যাপক কর্মতৎপরতা। কারো কারো মতে, এ প্রকল্পের মাধ্যমে সরকার রাজধানী পরিবর্তনের চেষ্টা চালাচ্ছে। আবার কেউ কেউ বলছেন, এ প্রকল্পের মাধ্যমে দেশের মানুষকে পথে বসিয়ে বিদেশিদের মনোরঞ্জনের চেষ্টা করা হচ্ছে।

দূরের মানুষের ভিন্ন ভাবনা

শ্রীনগরের হাঁসাড়া ইউনিয়ন পরিষদের মহিলা সদস্য (মেম্বর) সুফিয়া বেগম বলেন, ‘আড়িয়াল বিলে বিমানবন্দর হইলে মানুষের অনেক সমস্যা হইব। আর যদি সিটি বানাইতে যায় তাইলে তো এই এলাকা বেবাক উজাড় হইয়া যাইব। আমরা এই এলাকার মানষেরা অনেক গরিব-দুঃখী। আমি নিজেই জীবনের লগে অনেক যুদ্ধ কইরা একটা বাড়ি করছি। এই বাড়িটা যদি অহন আমার না থাহে তাইলে তো আমার আত্মহত্যা করত হইব। সরকার যেই টাকা দিব তা দিয়া কি ঢাকার এত কাছে আর অন্য কোথাও বাড়ি আমি করত পারমু? আমার মতো লোক এই রকম অনেক আছে। এরা যাইব কই? বিমানবন্দর করলে আড়িয়াল বিলঅলাগো সব শেষ হইয়া যাইব। আর সিটি বানাইতে গেলে আমরাও শেষ। এর লাইগাই আমরা হাঁসাড়ার লোকরা বিশেষ কইরা এই সিটির বিরুদ্ধে।’

প্রকল্প থেকে অনেক দূরে যারা বাস করছেন তাদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহের খবর পাওয়া গেছে। এ সমস্ত এলাকার মানুষেরা ভাবছেন, প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে আশপাশের এলাকার জমির দাম বেড়ে যাবে। এভাবে লাভবান হওয়ার আশায় দিন কাটাচ্ছেন তারা। এদের মধ্যে কেউ কেউ বিমানবন্দর প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য মাঠে ময়দানেও তৎপরতা দেখাচ্ছেন। শ্রীনগর উপজেলা চেয়ারম্যান বেলায়েত হোসেন ঢালী জানান, ‘আমরা মনে করি, এই বিমানবন্দর হলে মুন্সিগঞ্জবাসীর অনেক উপকার হবে। মুন্সিগঞ্জ এই বিমানবন্দরের কল্যাণে ঢাকার মতো অভিজাত হয়ে উঠবে। এই এলাকায় উন্নত মানের বিদ্যালয়, হাসপাতাল, শিল্প ইত্যাদি তৈরি হবে। এর ফলে এখানকার লাখ লাখ মানুষের উপকার হবে। তাদের কর্মসংস্থান হবে। কিছু লোক এই প্রকল্পের বিরোধিতা করছে তাদের নিজেদের স্বার্থ রক্ষার খাতিরে। তারা আড়িয়াল বিলের সরকারি খাস সম্পত্তি ভোগ করে আসছে দীর্ঘদিন ধরে। এখন প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে তো তাদের সেই সম্পত্তি চলে যাবে। অবৈধ দখলদারিত্ব কায়েমের লক্ষ্যেই তারা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা চালাচ্ছে। সরকারকে আমরা আশ্বাস দিচ্ছি, এলাকার লাখ লাখ লোক এ বিমানবন্দরের পক্ষে আছে। আগামী ৪ ডিসেম্বর অন্তত ৫০ হাজার মানুষ নিয়ে আমরা মানববন্ধন করতে যাচ্ছি। ওই মানববন্ধন দেখেই সারা দেশের মানুষ জানতে পারবে যে, মুন্সিগঞ্জের আপামর জনতা আড়িয়াল বিলে বিমানবন্দরের পক্ষে।’

[ad#bottom]