মুন্সীগঞ্জে বিমানবন্দর নির্মাণ, একদিকে উচ্ছ্বাস অন্যদিকে আতঙ্ক

কাজী সোহাগ, মুন্সীগঞ্জ থেকে: মুন্সীগঞ্জের আড়িয়াল বিলে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নির্মাণ ইস্যুতে একদিকে উচ্ছ্বাস, অন্যদিকে আতঙ্ক বিরাজ করছে। চলছে পক্ষে-বিপক্ষে মহড়া। এলাকার প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ছে নানা ধরনের গুজব। এ নিয়ে উস্কানির অভিযোগও উঠেছে। এদিকে পক্ষে-বিপক্ষের সমর্থকরা প্রস্তুতি নিচ্ছেন নানা কর্মসূচির। এরই মধ্যে বিমানবন্দর নির্মাণবিরোধীরা আগামী রোববার জেলার আলমপুর হোসেনতলী হাইস্কুল মাঠে সমাবেশ ডেকেছেন। অপরদিকে পক্ষের সমর্থকরা মতবিনিময়সহ নিয়মিত মানববন্ধন করার ঘোষণা দিয়েছেন।

মামলা আতঙ্ক: এদিকে গতকাল থেকে মুন্সীগঞ্জের আড়িয়াল বিলের পাশের বেশ কয়েকটি গ্রামের মানুষের মধ্যে দেখা দিয়েছে মামলা আতঙ্ক। সরজমিনে সেনারগাঁ, আলমপুর, বারইখালি, মদনখালি, মণ্ডগ্রাম ও মরিচপট্টি গ্রামে গেলে এলাকাবাসী এ অভিযোগ করেন। তারা বলেন, বিমানবন্দর নির্মাণের বিরোধিতা করে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করায় তাদেরকে হুমকি দেয়া হচ্ছে। এমনকি মিথ্যা মামলা দিয়ে আটক করার কথাও বলা হচ্ছে। তারা অভিযোগ করেন- এরই মধ্যে র‌্যাবের কিছু সদস্য গ্রামে গ্রামে টহল দিয়ে ভয়ভীতি দেখিয়েছে। এর আগে ২৭শে ডিসেম্বর বিমানবন্দর নির্মাণের প্রতিবাদে সড়ক অবরোধ করার সঙ্গে কারা জড়িত তা জানতে চায় তারা। এমনকি মসজিদের মাইকে কে গ্রামবাসীদের ডেকে সমবেত করেছে তারও খোঁজ নেয়া হয়েছে। এসব গ্রামের কৃষক অশোক গায়েন, মনোহরী, আবদুল মালেক, কুদ্দুস মির্জা, আওয়াল মাঝি, শরীফ, মনোয়ারা বেগম, চায়না, মনোরঞ্জন মণ্ডল বলেন, আমাদের লাশের ওপর দিয়ে সরকারকে বিমানবন্দর তৈরি করতে হবে। মামলা, হামলা হুমকি- এসব আমাদের দমাতে পারবে না। তারা বলেন, এসব আমাদের ভিটেমাটি ও বেঁচে থাকার একমাত্র সম্বল। এদিকে গতকাল আলমপুরের শতাধিক কৃষক তাদের বিল সংলগ্ন আবাদি জমিতে গিয়ে মিছিল বের করে। এ সময় তারা বিমানবন্দর নির্মাণ বিরোধী নানা স্লোগান দেয়। পরে মিছিলটি এলাকার বিভিন্ন গলি প্রদক্ষিণ শেষে টেম্পো স্ট্যান্ডে গিয়ে শেষ হয়।

উচ্ছ্বাস:
একই ইস্যুতে মুন্সীগঞ্জের বিভিন্ন এলাকার মানুষের মধ্যে উচ্ছ্বাস দেখা গেছে। তারা জানিয়েছেন, বছরের অর্ধেক সময় এ এলাকার জমি পানিতে ডুবে থাকে। নিচু হওয়ার কারণে এতদিন এলাকায় উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি। আমরা চাই এখানে বিমানবন্দর নির্মিত হোক। তাহলে মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন হবে। মুন্সীগঞ্জ উপজেলা চেয়ারম্যান বেলায়েত হোসেন ঢালি বলেন, এখানে বিমানবন্দর নির্মিত হলে এলাকার চেহারা বদলে যাবে। এলাকাবাসী জানান, এখানে একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হলে এলাকাবাসীর মর্যাদা বাড়বে। এলাকার জমির দাম কয়েক গুণ বেড়ে যাবে। কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হবে। এখান থেকে দেশের সব এলাকার সড়ক ও রেল যোগাযোগ স্থাপিত হবে। রাজধানী ঢাকার পর মুন্সীগঞ্জকেই চিনবে দেশের মানুষ। শিগগিরই তারা বিমানবন্দর বাস্তবায়নে মানববন্ধনসহ আরও বেশ কিছু কর্মসূচি পালন করার কথাও বলেন।

পরস্পরবিরোধী বক্তব্য ও গুজব: এ ইস্যুতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের পরস্পরবিরোধী বক্তব্য ও গুজব। স্থানীয় সরকার সমর্থকরা বলছেন, বিএনপি ও জামায়াতের কিছু লোক এলাকার উন্নয়ন কাজে বাধা দিয়ে ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের চেষ্টা চালাচ্ছে। কারণ, তারা বিলের খাসজমি অবৈধভাবে ভোগদখল করছে। বিমানবন্দর নির্মিত হলে তাদের অবৈধ দখলদারিত্ব থাকবে না। অন্যদিকে জমি হারাবার আশঙ্কা করে একাংশ বলেছে, সরকার জোর করে ভয়ভীতি দেখিয়ে ভিটেমাটি ও আবাদি জমি কেড়ে নেবে। ক্ষতিপূরণ দেবে নামমাত্র। উপজেলা চেয়ারম্যান বলেন, বিরোধী দলের নেতাকর্মী ও দীর্ঘ মেয়াদে লিজ নেয়া জমির মালিকরা বিমানবন্দর নির্মাণ ইস্যুতে কৃষকদের ক্ষেপিয়ে তুলছে। তাদের নানা ধরনের কর্মসূচিতে অংশ নিতে বাধ্য করছে। সামনেই ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন। একে কেন্দ্র করেই জনমত নিজেদের দিকে আনতে বিএনপি আপ্রাণ চেষ্টা করছে। তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন বিএনপি নেতাকর্মীরা। শ্রীনগর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন বলেন, বিষয়টিতে রাজনৈতিক রঙ লাগানোর চেষ্টা করছে সরকারি দলই। তিনি বলেন, এ ইস্যুতে দলগতভাবে বিএনপি কোন অবস্থান নেয়নি। আমরা চাই, বিমানবন্দর হোক তবে সাধারণ কৃষকদের যেন ক্ষতি না হয়। সরজমিনে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, স্থানীয়রা নিজেদের ভিটেমাটি রক্ষায় আন্দোলনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা বাজেটের আধুনিক এই বিমানবন্দরের জন্য আড়িয়াল বিলের ২৫ হাজার একর জমি অধিগ্রহণ করা হবে। এর মধ্যে রয়েছে মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগর উপজেলার ১০ হাজার ৮৯৫ একর জমি। ১৪টি মৌজার এই জমির ক্ষতিগ্রস্তদের সংখ্যা প্রায় দেড় লাখ। এছাড়া ঢাকার দোহার উপজেলার ৭টি মৌজায় রয়েছে ৭১৮৮ একর ভূমি। বাকি জমি ঢাকার নবাবগঞ্জ উপজেলার ১৮টি মৌজায়। তবে মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখান উপজেলার এলাকায় আড়িয়াল বিলের কিছু অংশ পড়লেও বেশি বসতি থাকায় তা বাদ দেয়া হয়েছে।

[ad#bottom]