আড়িয়াল বিলের এঁটেল মাটি হবে হীরার খনি: আবদুল মান্নান খান

আড়িয়াল বিলে প্রস্তাবিত বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নির্মাণের ধারণাকে স্বাগত জানিয়ে গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী আবদুল মান্নান খান বলেছেন, এখানে বিমানবন্দর হলে এ এলাকার মাটি হীরার খনিতে পরিণত হবে। এখানকার এক ফসলি জমি থেকে যতটুকু শস্য উৎপাদন হয় তার চেয়ে অনেক বেশি উপযোগী হয়ে উঠবে এ জমি।

এক বিঘার জমির পরিবর্তে ক্ষতিপূরণ হিসেবে এর মালিক পাবেন ৫ থেকে ১০ কাঠার প্লট। আর যখন বিমানবন্দর নির্মিত হবে, তখন বঙ্গবন্ধু সিটি ও আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এরকম একটি প্লট পেলে ওই জমির মালিকের জীবনটাই পাল্টে যাবে।

সোমবার রাজধানীর মিন্টোরোডে নিজ বাসভবনে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে আবদুল মান্নান খান এসব কথা বলেন।

দীর্ঘ আলোচনায় তিনি তুলে ধরেন আড়িয়াল বিলে প্রস্তাবিত বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হলে শ্রীনগর, দোহার ও নবাবগঞ্জের মানুষের ভাগ্যের যে পরিবর্তন আসবে তার আদ্যোপান্ত।

আবদুল মান্নান খান বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের গত আমলেই একটি নতুন বিমানবন্দর নির্মাণের চিন্তাভাবনা করা হয়েছিল। রাজধানী ঢাকার সঙ্গে যোগাযোগ, বিমানবন্দরের তেল সরবরাহ, জরুরি অবতরণ ও আশেপাশের বিমানবন্দর থাকাসহ ১৭ টি কারণ বিবেচনায় নিয়ে বঙ্গবন্ধু আর্ন্তজাতিক বিমানবন্দরের জন্য জায়গা খোঁজা হচ্ছে। বিভিন্ন জেলার প্রস্তাবিত স্থানগুলো সরজমিন পরিদর্শনও করা হয়েছে। সার্বিক দিক বিবেচনা করে রাজধানীর অদূরে ঢাকার দোহার ও নবাবগঞ্জ এবং মুন্সিগঞ্জের শ্রীনগর উপজেলার বিশাল এলাকা জুড়ে বিস্তৃত আড়িয়াল বিলকে বিমানবন্দর নির্মাণের জন্য মনোনীত করা হয়।

জলাশয় ও বিল ভরাট করা যাবে না মর্মে সরকারের স্পষ্ট নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও কেন বিমানবন্দর নির্মাণের জন্য আড়িয়াল বিলকেই বেছে নেওয়া হল–সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে মান্নান খান বলেন, ‘এমনিতেও দিনদিন আড়িয়াল বিল ভরাট হয়ে যাচ্ছে। ’

তিনি বলেন, আমি এ এলাকায় বড় হয়ে উঠেছি। ছোটবেলায় বিলের এপার থেকে ওপার যেতে প্রায় সারাদিন লাগতো আর এখন দু’ঘন্টাও লাগে না। বিভিন্ন এলাকার জনসংখ্যার স্থানান্তরজনিত কারণে বিল ভরাট হয়ে যাচ্ছে উল্লেখ করে মান্নান খান বলেন, ‘পদ্মার ভাঙ্গনের কারণে শরীয়তপুর, মাদারীপুরসহ বিভিন্ন এলাকার লোকজন এসে বিলে অপরিকল্পিতভাবে ঘরবাড়ি তৈরি করছে। তা বিলকে আরও অকেজো তুলছে। ’

গত ১২ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে বঙ্গবন্ধু সিটি ও আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নির্মাণ সংক্রান্ত একটি পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশনের মাধ্যমে তুলে ধরা হয় জানিয়ে মান্নান খান সাংবাদিকদের জানান, ওই বৈঠকেই প্রধানমন্ত্রী প্রাথমিক পর্যায়ে ঢাকার দোহার, নবাবগঞ্জ ও মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগর উপজেলার আড়িয়াল বিলে বঙ্গবন্ধু সিটি স্থাপনের জন্য প্রাথমিকভাবে ২৫ হাজার একর জমি অধিগ্রহণ করার বিষয়ে অনুমোদন দেন।

সেখানে বিমানবন্দরের জন্য ১০ হাজার একর জমি এবং বাকি ১৫ হাজার একর জমিতে উন্নত বিশ্বের আদলে সব ধরনের নাগরিক সুযোগ-সুবিধা দিয়ে বঙ্গবন্ধু সিটি স্থাপনের জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী।

অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত, বিমান ও পর্যটনমন্ত্রী জিএম কাদের, প্রধানমন্ত্রীর প্রশাসন ও সংস্থাপন বিষয়ক উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম, পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা, নিরাপত্তা বিষয়ক উপদেষ্টা, বিমান সচিব শফিক আলম মেহেদী, বিমানবন্দর নির্মাণ সংক্রান্ত সেলের প্রধান ও যুগ্ম-সচিব জয়নাল আবেদীন তালুকদারসহ উর্ধ্বতন সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তারা এসময় উপস্থিত ছিলেন।

মান্নান খান বলেন, প্রধানমন্ত্রীর এ ঘোষণা শোনার পর ওই এলাকার প্রায় ৯৯ শতাংশ মানুষ আনন্দচিত্তে বিমানবন্দর নির্মানকে স্বাগত জানায়। যেহেতু ওই এলাকা আমার জন্মস্থান ও নির্বাচনী এলাকা তাই আমিই এটা ভাল জানি।

‘এলাকার অনেকে বিমানবন্দর নির্মানের বিরোধিতা করছে’ এমন প্রশ্নের জবাবে পূর্ত প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘আমার জানা মতে আড়িয়াল বিলকে ঘিরে দোহার, নবাবগঞ্জ ও মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগর –এই তিন উপজেলার প্রায় ১০ লাখ লোক বসবাস করছে। তাদের কেউই বিমানবন্দর নির্মাণের বিপক্ষে নয়। ’

তিনি বলেন, ‘এখানে বিমানবন্দর হলে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ ব্যবস্থা আকাশচুম্বী হবে। কোটি কেটি টাকার কাজ হবে। এলাকার হাজার হাজার বেকার যুবকের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হবে। এলাকার খেটে খাওয়া মানুষের কর্ম সংস্থানের দ্বার উম্মোচন হবে। গ্যাস, বিদ্যুৎ ও ওয়াসার সংযোগ দেওয়া হবে। মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত হবে। রাজধানীর সঙ্গে সড়ক, রেলসহ বিভিন্ন ধরনের যোগাযোগ ব্যবস্থা হাজার গুণ উন্নত হবে। অবকাঠামোগত উন্নয়ন হবে। এমনকি বিমানবন্দর নির্মাণে মাটি ভরাটের যে কাজ হবে সেখানে হাজার হাজার শ্রমিক কাজ করবে।

মান্নান খান বলেন, এখানে মানুষের জীবনযাত্রার মান কি পরিমান উন্নত হবে তা অকল্পনীয় ও অচিন্ত্যনীয়।

বঙ্গবন্ধু সিটিতে বিমানবন্দর, আইটি ভিলেজ, শিল্পনগরী, গার্মেন্টপল্লী, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, মনোরেল, সুবিশাল বাণিজ্যিক ভবন, পর্যটনকেন্দ্র, খেলার মাঠ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয়, হাসপাতাল, ফায়ার স্টেশন, নিরাপত্তা-বেষ্টনী, উন্নত সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং আধুনিক ও পরিকল্পিত ভবন স্থাপনসহ অত্যাধুনিক সকল নাগরিক সুযোগ-সুবিধা থাকবে বলেও জানান তিনি।

পূর্ত প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘কাজেই এই এলাকায় বসবাসকারী কোনো ব্যক্তি এ বিমানবন্দর নির্মাণে বিরোধিতা করছে বলে আমার জানা নেই। যারা বিরোধিতা করছে তাদের ব্যাপারে আমি খোঁজখবর নিয়েছি। আমাদের এলাকায় পাকিস্তান আমলেরও আগে কুন্ডু নামে একজন রাজা ছিলেন। সেই রাজার বাড়ি যেখানে সেখানকার কয়েক হাজার একর জমি ও খাসজমি যারা অবৈধভাবে দখল করে আছে তারাই কেবল এ বিমানবন্দর নির্মাণের বিরোধিতা করছে।’

তিনি বলেন, ‘এ লোকগুলো সিএস পরচা বা আর এস খতিয়ানের মালিক না। যাদের হাতে একটি কাগজও নেই। তারাতো ক্ষতিপূরনের টাকাও নিতে পারবেন না। তাদেরতো স্বপ্নভঙ্গ হয়েছে। তাদেরই বুকে কাঁপন ধরেছে। তাদেরতো স্বর্গ থেকে পতন হচ্ছে।’

মান্নান খান বলেন, এই লোকগুলোই বিমানবন্দর নির্মাণের বিপক্ষে এলাকার কিছু লোককে বিভ্রান্ত করছে ও অপপ্রচার চালাচ্ছে।’

তিনি জোর গলায় বলেন, বসতভিটার জমি বা জমির মালিকের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোনো জমিই অধিগ্রহণ করা হবে না। পদ্মা সেতুর অনুসরণে প্রয়োজনীয় ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে। যারা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন তাদের জীবনযাত্রার মান অনুযায়ী পুনর্বাসন করতে প্রয়োজনীয় নীতিমালা করা হবে।

পূর্ত প্রতিমন্ত্রী বলেন,‘আমি মনে করি এতে তাদের বিন্দুমাত্র ক্ষতি হবে না, বরং লাভ হবে,’।

যুদ্ধাপরাধী ও স্বাধীনতাবিরোধীরা বিমানবন্দরের বিরোধিতা করছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘এলাকার মানুষ এত বোকা নয় যে তারা পায়ের লক্ষ্মী সরিয়ে দেবে। এ বিমানবন্দর হবেই হবে।’

উবায়দুল্লাহ বাদল, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম

[ad#bottom]