একটি অপ্রেম কাহিনী

সরকার মাসুদ
জাহিদ শরীরের প্রসঙ্গ তোলায় মারুফ একটু চুপসে গিয়েছিল। সে ভাবে, জাহিদটা ঠিক রোমান্টিক টাইপ নয়। তার ওপর ফ্রয়েড পড়ে মাথাটা একপেশে হয়ে আছে। তবে মনটা ওর সরল। আর ও হচ্ছে সেই বন্ধু যে ভালুকের সামনে বন্ধুকে একা অসহায় রেখে গাছে উঠবে না। শুধু মেয়েদের সঙ্গে মেলামেশার ব্যাপারে ওর শর্ট-কাট পদ্ধতিটা মারুফের পছন্দ নয়। তাই বলে আমাদের নায়ক দেহের ছোঁয়া শূন্য ব্যালকনি প্রেমে বিশ্বাসী নয়। সিগারেটে লম্বা টান দিয়ে জাহিদ বলে, কি যেন নাম মেয়েটার?

নুনাহার।

বাহ্্ কী চমৎকার নাম রে! নুরুন নাহার না, নুর নাহারও না; নুনাহার! তা কী পড়ে তোর ঐ নুনাহার?
এবার এইচএসসি পাস করলো। আসলে ওর এতদিনে গ্র্যাজুয়েট হওয়ার কথা। আরো ভাল রেজাল্টের আশায় ড্রপ দিয়ে দিয়ে এ অবস্থা। নুনার বয়স অবশ্যই বিশের ওপর। মারুফের ৩৫ পস্নাস, জাহিদ জানে। মেয়েটার বয়স যদি ২০ও হয়, তবু প্রেমিকের তুলনায় প্রেমিকার বয়সটা অনেক কম হয়ে যাচ্ছে না? অনত্মত শোনায় কম। এটা ভেবেই মারম্নফ আরো যোগ করে। ডোন্ট থিঙ্ক শি হ্যাজ নো ডেপ্্। শি ইজ ম্যাচুরড ইনাফ টু আন্ডারস্ট্যান্ড লট্্স অব থিংস।

আর এঙ্পেস্নইন করার দরকার নেই। এখন তুই কী চাচ্ছিস সেটা বল।

আমি চাচ্ছি আপাতত পুরো একটা দিন ওর সঙ্গে কাটাতে। মানে ও যেখানে থাকে, সাইনপুকুর, ওখানে দীর্ঘ সময় ওকে একা পাওয়ার স্কোপ নেই। মফস্বলের বাড়ি তো!

উপায় কি তাহলে?

উপায় আছে। মামার বাড়ি থেকে মাঝেমাঝে ও নিজেদের বাড়ি যায়। বাসে করে একাই যাতায়াত করে। রাজি হলে সেই সুযোগে ওকে ঢাকায় বেড়াতে নিয়ে আসা যায়। তারপর ওর সঙ্গে লম্বা একটা সিটিং দিয়ে সম্পর্কটা খুব ইজি করে ফেলতে চাই, পরে যাতে আমাকে ভুল না বোঝে।

ও আচ্ছা!

মারম্নফের হাতে সিগারেট। অনেকৰণ পর পর টান দেয়। সন্ধ্যাবেলা সুপার মার্কেটের বইপাড়া ঝলমলে। লোকজনের সমাগমও আজ অন্যদিনের চেয়ে বেশি। আড্ডাবাজরা যেন সব ঝাঁপিয়ে পড়েছে। ‘বইমেলা’ নামের দোকানটার ডানদিকের সিঁড়ি বেয়ে তেতলার/চারতলার কোণে উঠে যান কিংবা ‘প্যাপিরাস’ সংলগ্ন সিঁড়ির ওপর দোতলায়, যেখানে ৪-৫টা চা-টেবিল পাতা আছে, ওঠেন; দেখবেন পাতাবাহারের টব শোবিত ত্রিভুজাকৃতি ছায়াছায়া জায়গাটায় বই হাতে যুবক-যুবতীরা ক্লোজ হয়ে বসে আছে। কোনার দিকে ব্রিলিয়্যান্ট ছেলেরা বন্ধুর কাঁধে হাত রেখে হয়তো সিগারেটে ভরা ক্যানাবিস খাচ্ছে। ব্রিলিয়্যান্ট কেন? কারণ ওরা কেবল ক্যানাবিস খাচ্ছে না, ইংরেজিও বলছে চমৎকার! ওদের হাতে প্রায়ই দেখা যায় আপডাইক অথবা ইলিয়াস, অস্কার ওয়াইল্ড অথবা অমিয়ভূষণ অথবা অন্য কোন সিরিয়াস লেখক। না, ওদের পোশাক-আশাকও ভদ্র ছেলেসুলভ। তিনতলায় বন্ধু বাহার রহমানের দোকানে যেতে যেতে মারম্নফ একবার ভেবেছিল, এরা ইংরেজি বলে কেন! ক্যানাবিস খাচ্ছে তো কি? আমরা ফালতু ছেলে না, এ-রকম বোঝানোর জন্যই কি? ইংরেজিটা কিন্তু ওরা বেশ ভালই বলে। মারম্নফ খেয়াল করে শুনেছে।

একটু আগেই বয়স্ক এক দম্পতি সামনে দিয়ে চলে গেল। ভদ্রলোকের হাতে সদ্য কেনা বইয়ের প্যাকেট। ভদ্রমহিলার মুখটা হাসি-হাসি। ‘ঘাস ফুল নদী’র দরজা বরাবর একটু বামে দেয়াল সংলগ্ন বেঞ্চটায় বসেছে জাহিদ ও মারম্নফ। এখানে ভিড় নেই। ভিড় কোথায়ই বা আছে বইপাড়ায়? তবে এ জায়গাটার একটা ব্যাখ্যা অসম্ভব আকর্ষণ আছে। ‘ঘাস ফুল নদী’ ঘিরে প্রায়ই লেখক-শিল্পীদের আড্ডা বসে সন্ধ্যাবেলা। জাহিদ তো আবার গল্পটল্প লেখে। মারম্নফ লেখক নয়, কিন্তু নিয়মিত বই-পুসত্মক পড়ে। কবি-সাহিত্যিকদের সঙ্গ ভালবাসে।

কী করে বুঝলি নুনাহার আমার সাথে ঢাকায় আসতে চাইবে না? জাহিদ কিঞ্চিৎ বিরক্ত হয়, শোন্ সেটা কেবল তখনি সম্ভব যখন মেয়েরা দিওয়ানা হয়ে যায়। তোর জন্য ওর সে অবস্থা তো আর হয়নি। বরং তুইই বেশি ঝুঁকে আছিস মনে হচ্ছে! সেজন্যই বলেছিলাম, আহাম্মক, চুমু-টুমু খেতে দিয়েছে কি না; খুব তো সাধুগিরি দেখালি!
ধরা পড়ে একটু চুপসে গেছে মারম্নফ। বললো, ধর ওসব শেষ হয়েছে কিংবা এখনো চলছে ঐ পর্ব। তবে ব্যাপারটা কি জানিস? যথেষ্ট ড্যামকেয়ার ভাব নেই ওর মধ্যে, মানে আমার সাথে এতদূর একা ট্রাভেল করার মতো সাহস….

তাহলে ও মেয়ে তোর সাথে আসবে না। আর এলেও সে মেলা সময়ের ব্যাপার। তুই এতো ধৈর্য পাস কোত্থেকে বল তো? পঁচিশ-টচিশে এসব মানায়!

তাহলে কী হবে দোস্্?
কী আর হবে? কেচ্ছা-কেলেঙ্কারি হবে।
মারম্নফ লৰ্য করে, জাহিদ গোঁফের নিচে হাসছে।
সে বলে, এসব ভাল না বন্ধু, বিয়েশাদি করেছিস। এখন আর উটকো ঝামেলায় জড়াস না। ইউ হ্যাভ বেটার ফরগেট হার। ভাল থাকবি।

তারপর দু’জনেই চা খেতে বেরিয়ে গেছে। মারম্নফ বলতে চেয়েছিল, ভুলতে পারছি না যে! মানে মেয়েটাই আমাকে ভুলতে দিচ্ছে না ওকে! তা না বলে বললো, মেয়েটা, ফ্রেন্ড, ভিন্ন জাতের ক্যারেক্টার। এমন মেয়ে আমার অভিজ্ঞতায় প্রথম। আমাকে একদিন কী বলেছে জানিস? বলেছে, আপনি অনেক গুণী মানুষ। মেলা বই-পুসত্মক পড়েছেন। মেয়েদের মন বোঝার মতো জ্ঞান নাই আপনার! আমি তো শুনে অবাক। কোন বইয়ে নারীর মন বোঝার মতো জ্ঞান আছে বলে আমি জানি না। মারম্নফের বলতে ইচ্ছে হয়েছিল, জাহিদ, তুই তো জানিস, মন সবসময় মাথার শাসন মানে না। এখন আমি যদি হঠাৎ ওর সঙ্গে কথাবার্তা বন্ধ করে দিই, কাজটা যদিও সহজ না, তাহলে কী হবে জানিস? নুনাহার নতুন কৌশল অাঁটবে। চোখের সামনে থেকে, একটাও কথা না বলে, অভিনয় কায়দায় সে আমার মাথাটা অশানত্ম করে তুলবে। সেটা আরও খারাপ হবে। এ বড় অন্য ধাতুতে গড়া। হাউ ক্যান আই গেট রিড অব দ্য ক্রাইসিস, ফ্রেন্ড? হায়! এসব কথা সে জাহিদকে শেষ পর্যনত্ম বলতেই পারলো না। সব কথা ঠোঁট পর্যনত্ম এসে কাঁপতে কাঁপতে ফিরে গেল।

মারম্নফ একসময় গ্রীষ্মের ছুটি কাটাতো পাথরঘাটার বাগানবাড়িতে। ভরা সন্ধ্যায় গ্রামের আম-জাম বাঁশ ঝোপের ভেতরের রাসত্মাটা পাখ-পাখালির রাত্রিআবাহনী কাকলীতে ভরে ওঠে। নিচে কত ছিন্ন পালক, পুুরিষ, হলুদ পাতার মর্মর! এ মুহূর্তে তার মাথা ভরে উঠেছে ঐ গূঢ় কিচিরমিচিরে এবং স্মৃতির ভেতর সমসত্ম মরিচ ৰেত লাল করে দিয়ে সূর্য ডুবে যাচ্ছে নাগর নদীর ধনুক বাঁকে। একই সময় বাইরে বিকট আওয়াজ তুলে ‘বইপত্র’র সামনের রাসত্মা দিয়ে গড়িয়ে চলেছে সভ্যতার অসহ্য বুলডোজার। মারম্নফ কেবল মুখ দিয়ে অস্ফুট কী একটা শব্দ করেছে। তারপর চায়ের কাপ তুলে নিয়েছে হাতে।

নুনাহারকে মারম্নফ তিন তিনবার কথা দিয়েছিল, সাইনপুকুর বেড়াতে যাবে। একবারও কথা রাখতে পারেনি। শেষের দু’বারতো ইচ্ছে করেই রাখেনি। শ্রীনগর জায়গাটা বরং তার বেশি ভাল লাগে। খুব সিনিক আর পাহাড়ি নৈঃশব্দ্য আছে গোটা এলাকায়। নুনাহার সাইনপুকুরেই বেশি থাকে। ছোটবেলা থেকে সে ওখানেই বড় হয়েছে। এবং সেজন্যই মারম্নফ একসময় সাইনপুকুরের নদী-নিঃসর্গের প্রেমে পড়ে যায়। বিশেষ করে ছনবাড়ি বাসস্টপের পিছনে যে রাসত্মাটা বেঁকে গাছ-গাছালির ভেতর ঢুকে গেছে, তার কথা আর ছোট, নির্জন বাজারসংলগ্ন লম্বা টানা বাঁশের সাঁকো, গুণচিহ্নের মতো বাঁশের ক্রস, এদিকে কালো পানির ওপর ঝুঁকে পড়া বউন্না গাছের ডাল-পাতা কোনদিন সে ভুলবে না। আরেকটু এগোলেই পাওয়া যাবে নুনাহারকে যার চোখে-মুখে সবসময় পড়নত্ম বিকালের আলো-ছায়া। তার জুমাঝুমা দৃষ্টি ভরা বড়-বড় চোখের গভীরে তাকিয়ে এক সন্ধ্যায় মারম্নফের মনে পড়েছিল ভাঙা রাজবাড়ির পিছনের ঘন শ্যাওলাসবুজ কালো দিঘি। মেয়েটার দিকে না তাকিয়েই বলেছে, তুমি যে কাশ্মীরের কথা বলো, সেখানকার মেয়েদের চোখের পাতা খুব বড় বড়, জানো?

অবাক চোখে ‘কী রকম’ বলার পর মারম্নফ তা খাতায় এঁকে দেখিয়েছে। মুগ্ধ চোখে নুনাহার বলেছে, ‘খুব সুন্দর লাগে, না?’

হঁ্যা। পাকিসত্মানী ছবিতে কয়েকবার দেখেছি, নাইনে পড়ার সময়। তখন, মানে ‘৭৫ সালে, রংপুর ক্যান্টের সিনেমা হলে প্রায়ই ওসব ছবি দেখাতো। যা হোক, নুনাহারের প্রতীৰার প্রহরগুলো মাটি করে দিয়ে মারম্নফ কেন নির্বিকার শুয়ে বসে, বই পড়ে, কাটিয়ে দিল ছুটির অবসর তার ব্যাখ্যা আমরা দিতে পারব না। যাত্রাবাড়ী বাজারে মেয়েটার মামার সঙ্গে দেখা হয়েছিল মারম্নফের, আমাগো বাড়িত না আপনের যাওনের কথা আছিল। নুনা ব্যসত্ম হইয়া অপেৰা করল, সাইন্্জ্যা তরি! কবে আইবেন, কন?

কোনরকমে অস্বসত্মি কাটিয়ে উঠে মারম্নফ বলেছিল, এবার আর কথা দেব না, মামা! তবে ৫-৭ দিনের ভেতর একবার আসব ঠিক। পর মুহূর্তে অনত্মর্মুখী হয়ে ছেলেটা। নুনা আমার জন্য অধীর হয়ে অপেৰা করেছে! না না, কাজটা ভাল করিনি আমি। সন্ধ্যার পর হতাশ হয়ে মেয়েটা নিশ্চয়ই কষ্ট পেয়েছে। আমাকে ফালতুও ভাবতে পারে, তৃতীয়বারও কথা না রাখার জন্য। কিন্তু তখন আর কী করার ছিল? শুভবুদ্ধি এবং হৃদয়াবেগের টানাপোড়েনে ছিন্নভিন্ন মারম্নফ সাইনপুকুর যাবো কি যাবো না করে দিনের শেষ বাসটাও মিস করলে শেষ পর্যনত্ম উল্টোদিকের বাসে উঠে কাঁঠালবাগান চলে গিয়েছিল বন্ধুদের গুলজার আড্ডায় এবং সে রাতে বাড়ি ফেরেনি।

আজ সাইনপুকুরগামী বাসে উঠেই মারম্নফ ভাবল, শেষ পর্যনত্ম যাচ্ছি তাহলে। সামনের দিকে, বাঁয়ে, জানালার পাশে বসেছে সে। এতে সুবিধা দুটো। এক, বাইরের দৃশ্য ভালো করে দেখা যায়। দুই, সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়া যায় বাইরে যাতে সহযাত্রীদের অসুবিধা না হয়। কয়েক মিনিট পরেই একটা গোল্ডলিফ ধরায় সে। কেন যাচ্ছি আমি? কিসের আশায়! বাসায় থাকলে বরং ইনকমপিস্নট কাজগুলো শেষ করতে পারতাম। নুনার ওখানে গিয়ে ওর দীর্ঘশ্বাস শুনতে একদম ভালস্নাগে না। আবার ঐ মাহবুবের কথা তুলবে। কাঁদবে। দীর্ঘশ্বাস ছাড়বে। মাহবুব ছেলেটা নুনাকে বিট্রে করে (৭ বছর প্রেমালাপ করেছে টেলিফোনে আর, তাকে বিয়ে করবে এই মর্মে কথাও দিয়েছিল) অন্য এক মেয়েকে বিয়ে করেছে। ৭-৮ মাস হয়ে গেছে, কিছু করার নেই। তারপরও নুনাহার একবার ছেলেটাকে বকে, অভিশাপ দেয়। আরেকবার আবেগে আপস্নুত হয়ে বলে, ও কিভাবে পারলো এইটা করতে! আমার মতো একটা মেয়ের সঙ্গে বেঈমানি করতে পারলো! এ্যাত্তো ভালোবাসছিলাম। ছেলেটারে…! ওসব কথা তুলে নুনাহার কি আবার প্যাশনেট হয়ে উঠবে? আবার চাঁপাকান্নার উথলে ওঠা! আবার সেই চোখ মোছা, আবার দীর্ঘশ্বাস…। মারম্নফ মনে-মনে বলে, আহা! ঐ দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি যেন না হয়। আমি কী করে দুঃখী মেয়েটাকে বোঝাবো, শুধু সুদূর থেকে ফোনে বারংবার ভালবাসার কথা বললেই একটি ছেলেকে নিজের করে রাখা যাবে তার কোন গ্যারান্টি নেই। মুখে আর মনে এক এবং বিশ্বাসের মর্যাদায় বিশ্বাসী যুবকের সংখ্যা আজ এত কম। নুনাহার, অতএব, ব্যাপারটা যতো তাড়াতাড়ি ভুলতে পারে ততই মঙ্গল। হু হু করে বাস ছুটছে। বাতাসে ঝাঁকড়া চুলের গোছা এসে পড়ে মারম্নফের চোখের ওপর। চুল সরিয়ে অর্ধেক পুড়ে যাওয়া সিগারেট মনোযোগ দিয়ে টানে। প্রায় শুকিয়ে আসা জলাভূমির ওপর কয়েকটা ছাই রঙ চিল হেঁটে বেড়াচ্ছে। সোলেমন ফকিরের বাড়ির ঝোপঝাড় ফুঁড়ে উঠেছে লম্বা লেজঅলা লাল নিশান। পতপত করে নিশান উড়ছে। মারম্নফভাবে, আমার জন্য নুনার যে টান সেটা কেমন? সেটা সরাসরি ভালোবাসা নয়। কিন্তু প্রেম-ভালোবাসা ছাড়া আর কি নাম দেয়া যায় ঐ প্রচ্ছন্ন আকর্ষণের? নুনাহার মেয়েটা গড়পড়তা রকমের নয় বলেই তার হৃদয় প্রকাশের রীতিও আলাদারকম। তা সে যাই হোক, যতো প্রতিকূলতাই তার জীবনের আসুক, বুকে হাত দিয়ে সেকি বলতে পারবে মারম্নফের কথা ভেবে কোনো ছায়াচ্ছন্ন ভাবাতুর মুহূর্তে খুশি ও লজ্জার মিশ্র অনুভূতিতে সে দোলেনি, তারপর মন খারাপ করে বসে থাকেনি অনেকৰণ?
ষোলঘর স্টপেজে ঝাঁকুনি দিয়ে বাস থামলো।… ভিতরে চাপেন ভিতরে চাপেন। এই যে বাই, ভিতরে যান তো! রাসত্মার মইদ্দে খাড়াইয়া রইছেন ক্যা? গেট খালি করেন। আগে নামবার দ্যান… মারম্নফ ঘড়ি দ্যাখে। সাড়ে দশটা। আর মিনিট বিশেক পরেই পৌঁছে যাবো। নুনা যদি বাসায় না থাকে। যদি শ্রীনগর গিয়ে থাকে, ওদের বাড়িতে অথবা অন্য কোথাও। ব্যাপারটা তাহলে খুব বাজে হবে। নাহ্্ ওর দেখা আজ পাবো মনে হচ্ছে। পরৰণেই ভাবে, নুনার মামি যদি কোন কারণে স্কুলে না গিয়ে থাকে তো পুরোটাই লস। অবশ্য ঐ খাটাশ মহিলা বাড়িতে না থাকলেও যে মেয়েটা মারম্নফের সামনে সারাৰণ বসে থাকবে তা বলা যায় না। তবু ছেলেটা ভেবেছে, বিরতি দিয়ে হলেও নুনাহার তার সঙ্গে অনেকটা সময় ধরে গল্পস্বল্প করবে। সে ভুল ভাবেনি। মামি যথারীতি স্কুলে থাকলে তো কথাই নেই। তখন অনেক কথা মন খুলে বলা যাবে।

বাইরের দিকের ঘরে সোফায় বসে মারম্নফ পুরনো পত্রিকা আর দু’একটা বই উল্টেপাল্টে দেখছিল। ৫-৭ মিনিট কথা বলেই নুনাহার ভেতরে গেছে। অনেকৰণ হয় গেছে। পাশের কোন বাড়ি থেকে রান্নার সুগন্ধ ভেসে আসছে। মারম্নফের মনে পড়লো, গেলবার পাথরঘাটার বাগানবাড়িতে ছুটি কাটানোর সময় (পাশেই নুনাহারের ছোট খালার বাসা) দুপুরের মেনুতে একদিন হঠাৎ শুঁটকির অপূর্ব চাটনি যুক্ত হয়েছিল নুনার ইচ্ছাতেই। আরেকদিন শেষ বিকালে মটরশুঁটি-গাজর-ডিম মেশানো এক বাটি কী চমৎকার নুডুলসকে পাঠিয়েছিল, নুনাহার নয় কি? আর এখন, আশ্চর্য, আমাকে একা বসিয়ে রেখে সে চা-নাশতা বানাতে ঢুকে গেল পর্দার ওপারে। নুনা, আমি তো পেটে আগুন নিয়ে আসিনি। তোমার অনেক প্রতীৰার পর এই প্রথম বেড়াতে এলাম তোমাদের বাসায়। হতে পারে এ-ই আমার শেষ আসা। কোথায় একটু স্থির হয়ে বসবে, কুশলাদি জিজ্ঞেস করবে, তা না, এক দৌড়ে গিয়ে চুলা জ্বালালে…। কিন্তু এসব দুঃখের কথা মারম্নফ তাকে বলতে পারলো কই? সে কেবল নাশতা-চা শেষ করে সোফায় হেলান দিয়ে ঐ যেদিকে পাকা রাসত্মা টার্ন নিয়েছে বাজারের মোড়ে ওদিকে ভাবলেশহীন তাকিয়ে থাকতে থাকতে সিগারেট টানলো। অনেকটা সময় পর পর্দা ফুঁড়ে উদিত হলো নুনাহার। এসেই বললো, মামাকে খবর দিয়েছি।

মারম্নফ বিব্রত হয়। বেলা এগারটার সময় সে এখানে এসেছে এই আশায় যে, মেয়েটাকে একটু একলা পাওয়া যাবে। একলা অবশ্য পেয়েছেও; কিন্তু ‘কিছুৰণের মধ্যে মামা এসে পড়বে’ এ দুঃসংবাদ তাকে কে দিতে বলেছে? এমন নিঝুম দুপুরে মফস্বলের ছায়াঘেরা বাড়িতে মারম্নফ নিশ্চয়ই মামার সঙ্গে গল্প করার জন্য আসেনি। মেয়েটা তা বোঝে ঠিকই। মারম্নফ ভাবলো, তাহলে মামাকে খবর দেয়ার মানে কী? সন্দেহের সামাজিক চোখ থেকে নিজেকে বাঁচানো? দুপুরবেলা একটা সুন্দরী মেয়ে বাড়িতে একা। বাড়িটাও নিঝুম। একজন ইয়াংম্যান বেড়াতে এসেছে। গার্জেনকে কতৰণ খবর না দিয়ে পারা যায়? তবু অত তড়িঘড়ি সংবাদটা না পাঠালেও পারতো নুনা। আধঘণ্টা দেরিতে জানালেও কোনো ৰতি ছিল না। মারম্নফ এ মুহূর্তে অন্য কথা ভাবছে। মেয়েটাকে কি বোঝাতে পারবো, শূন্য গস্নাসই শুধু পানি দিয়ে ভরানো যায়। আবার ভরা গস্নাসও ভরানো যায়, সেৰেত্রে আগের পানিটা ফেলে দিতে হয়। মারম্নফ মনে মনে বলে, নুনা যদি প্রত্যাখ্যানের কষ্টটা কাটিয়ে উঠতে পারে আর আমাকে ভুল না বোঝে, তাহলে ওকে সুখি করার জন্য কোন পিছুটান আমাকে যদি ছিন্নও করতে হয়, আমি প্রস্তুত। যে খরস্রোতা খাঁড়ির ঢালে আমি নামতে চাইনি, হঁ্যা সত্যিই ভেজাতে চাইনি আমার পরিপাটি জামা-জুতা, আমার লাইফস্টাইল; আজ কী নিয়তি! সেই তীৰ্ন তীব্র স্রোতস্বিনীর চোরা ঘূর্ণিই আমাকে ভাসিয়ে নিয়ে চলেছে নিরম্নদ্দেশে!

পুরনো একটা ‘রোববার’-এর পাতা উল্টাচ্ছিল মারম্নফ, অন্য মনস্ক ভঙ্গিতে। এৰুণি হয়তো মামা এসে পড়বেন। আমার আজ আসাটাই মাটি। সে একবার ফিরে যাওয়ার কথা ভাবলো। আবার ভাবলো, নাহ্ সেটা খারাপ দেখাবে। ভদ্রলোক বাসায় এসে আমাকে না পেলে কী ভাববেন! অস্বসত্মিতে পড়বে নুনা। মারম্নফ মাঝারি স্বরে দুবার ডাক দেয় নুনাহারকে। সাড়া নেই। পাশের ঘরে নেই বোধ হয় মেয়েটা। আশপাশে কোথাও যেতে পারে। হঠাৎ তার মাথার ভেতর বেজে ওঠে মেয়েটার আবদারমাখা গলা, ভাত না খেয়ে যেতে পারবেন না। যদি যান, আর কোনোদিন কথা বলবো না আপনার সঙ্গে। কী ছেলে মানুষি কথা! মারম্নফ নিজের মনে হাসে। নুনাহার তাই বলে ছেলে মানুষ নয়। তার গভীর মনের পরিচয় সে পেয়েছে অনেকবার। ‘টানাপড়েন’ নামে জনৈক সজল দত্তের একটা গল্প বেরিয়েছে ম্যাগাজিনে। মারম্নফ অগত্যা লেখাটা পড়তে আরম্ভ করে। ওদিকে, কী কা- দেখুন, আমেনার মাকে মুরগি কাটতে বলে একটা পেস্নট ধোয়ার অজুহাতে পুকুরের ঘাটলায় বসে নিজের সঙ্গে বকবক করছে নুনাহার_আমি কী করবো? আমার কি ইচ্ছে করে না ভাইয়ার সঙ্গে গল্প করতে? কিন্তু… এ বাড়ির মানুষগুলোর চোখ যে ভাল না সেটা উনাকে কী করে বোঝাবো? আর উনিই বা এত উতলা হয়েছেন কেন? আমাকে যদি এত ভাল লাগে তাহলে সময় থাকতেই কেন সব খুলে বলেননি? এখন ওসব করতে গেলে একটা সংসারে আগুন লাগবে। না না, তা সম্ভব নয়… কিন্তু একানত্ম নিজের করে যদি না-ই পেলাম, এই লুকোচুরি খেলার কী সার্থকতা আছে? উল্টো আরও কষ্ট পাওয়া!

প্রিয় পাঠিকা, মেয়েরা এত বেশি হিসাবি হয় কেন? এত লজ্জাকর রকমের হিসাবি? কিন্তু নুনাহারের মতো মেয়েও কেন এতটা হিসাব কষবে বিশেষত মন নিয়ে যেখানে কারবার! এ প্রশ্নের সমাধান আমাদের কাছে নেই।

ভালোবাসলেই বিয়ে করতে হবে কিংবা স্বামী হিসেবে পাওয়ার সম্ভাবনা না থাকলে কাউকে ভালোবাসা যাবে না, এ কথার কোনো মানে নেই। তার চেয়ে আসুন দেখা যাক, ক্যামেরা এখন কোনদিকে।

একটু আগেই বাহির উঠোনে পায়চারি করে মারম্নফ এইমাত্র ঘরে এসে বসেছে। আপাতত কিছুই করার নেই বলে পুরনো একটা রেকর্ড পেস্নয়ার চালানোর চেষ্টা করে। কিন্তু চেষ্টাই সার। যন্ত্রটা থেকে কোনো গান বের হয় না। নুনাহার এক পেস্নট মুড়ি-চানাচুর ও কিছু বিস্কুট নিয়ে ঘরে ঢোকে। নিচু টেবিলের ওপর খাবার রেখে দাঁড়িয়ে আছে মেয়েটা। তাও কী রকম দাঁড়ানো? ফুলের ওপর বসেও ছোট্ট প্রজাপতি যেমন পাখা নাড়াতে থাকে, মানে এৰুণি আবার উড়বে… সেরকম। অস্বসত্মিবোধক কণ্ঠে মারম্নফ বলে, নুনা, তুমি স্থির হয়ে বসবে, না খালি এ-ঘর ও-ঘর করবে? আসার পর থেকেই দেখছি চঞ্চল হয়ে আছো! এমন করলে কিন্তু আমি আর আসবো না।
এক চিলতে আধভাঙ্গা হাসি দিয়ে নুনাহার বলে, ‘আপনি খান। আমি তো আছি।’

অল্প ক’টা চানাচুর মুখে দিয়ে মারম্নফ দেখলো মেয়েটা খাটের কোনায় বসে পড়েছে। নৈকট্যের সুযোগে সে ওকে একটু চানাচুর খাইয়ে দেয়।

মস্নান মুখে নুনাহার বলে, জানেন, আপনার কথা মনে হলে খুব খারাপ লাগে। আবার আপনার কথা ভাবতে ভাবতে মনে পড়ে মাহবুবের কথা। সেও তো আপনার মতোই অনেক ভালোবাসার কথা বলতো…! মিথ্যা কথা বলতো! ছেলেটা কখনোই তোমাকে ভালোবাসেনি। ভালোবাসার অভিনয় করে গেছে দিনের পর দিন!

মারম্নফ লৰ্য করে, মেয়েটার ঠোঁটজোড়া বৃষ্টিভেজা ছোট পাখির মতো কাঁপছে। কাঁপতে কাঁপতে থেমে গেল। কয়েক সেকেন্ডের নৈঃশব্দ পেরিয়ে ধরা গলায় যেন অনেক কষ্ট করে নুনাহার বলে, ভাইয়া, আর যাই করেন, আমাকে পরীৰায় ফেলবেন না। কঠিন হবেন না, পিস্নজ!

ঠেলে বেরিয়ে আসা কান্না আড়াল করতে দুহাতে মুখ ঢেকে দ্রম্নত বেরিয়ে যায় সে।

আমি তো নুনার সঙ্গে কখনও কঠিন ব্যবহার করিনি! তাহলে ও কথা বললো যে! হতভম্বের মতো বসে থাকলো মারম্নফ। আমার আজকের কোনো কথায় ও আঘাত পেল কি? বাড়ির সামনে পাকা রাসত্মা। একটা বাস বিকট শব্দ করে মাওয়ার দিকে চলে গেল। জানালার ফ্রেমে দেখা গেল ছোট ছোট পা ফেলে মামা আসছেন।

পৌনে তিনটার দিকে মারম্নফ ও নুনাহার বেরিয়ে পড়েছিল। পাকা রাসত্মা পেরিয়েই ছেলেটা সিগারেট কিনতে গেল। নুনাহার দাঁড়িয়ে আছে। কাঁধে চকলেট রঙের শাল ভাঁজ করা। ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা হবে তো। দোকান থেকে ফিরে মারম্নফ বলে, সাত বছর আগে প্রথম এসেছিলাম। তখন মোড়ে এত দোকানপাট ছিল না। দু’পাশে এত বাড়িঘরও ওঠেনি। শুধু কাঁচা রাসত্মাটা আগের মতোই আছে।

যেন আর কোনো কথা খুঁজে না পেয়ে নুনাহার বলে, তখন আমি সেভেনে পড়ি। মেয়েটা হাঁটছে মারম্নফের ডান পাশে, মাথা নিচু করে। মুখটা চিনত্মামগ্ন। মাটির রাসত্মা গিয়ে মিলেছে বাজারের বড় ব্রিজের গোড়ায়। তার আগে একটা কাঠের পুল পড়ে। শহরে যাবার শর্টকাট পথ এটা। শীতের দিন। আর ঘণ্টাদুয়েক বেলা আছে। গ্রামের মানুষ লাউ, তরকারির ডালা, দুধের বালতি_ এসব নিয়ে বাজারে চলেছে। একটু যে মন খুলে কথা বলবে মারম্নফ তার উপায় আছে? লোকজনের যাওয়া-আসার বিরাম নেই। নুনাহার বললো, বাজারের দিন বিকালে এদিকে আসতে ভালস্নাগে না।

একদিন না হয় এলেই আমার জন্য। মারম্নফ আড় চোখে নুনাহারকে এক পলক দেখে নেয়। যা সুন্দর লাগছে শ্যামলা মেয়েটাকে! পরমুহূর্তে। মুলমুলে একটা চাপা গন্ধ তার নাকে এসে লাগে। কুমারী মেয়েদের শরীরের গন্ধ কী অদ্ভুত। না, খালি শরীরের না, মারম্নফ ভাবে, শরীরের ও কসমেটিকসের_ দুয়ে মিলে এই গন্ধ! মারম্নফ এবার বলে, তুমি আজ আমার সঙ্গে না বেরোলে মনটা সত্যিই খারাপ হয়ে যেত। তাছাড়া কিছু দরকারি কথা তোমাকে বলা হয়নি।

কাতর চোখে মেয়েটা একবার তাকায়, এখন বলেন।

নুনা, একটা কথা মনে রেখো, পৃথিবীতে কারও জন্য কোনো কিছু থেমে থাকে না। তোমার জীবনও থেমে থাকবে না। যা ঘটে গেছে সে জন্য তো আর তুমি দায়ী নও। কাজেই বিট্রেয়ারকে ভুলে থাকাই বেটার। হঁ্যা, ভোলা সহজ হবে যদি তুমি তার প্রতারণার কথাটা মনে রাখো! জবাবে নুনাহার কিছু বলে না। অনেকৰণ মাথা নিচু করে থেকে অবশেষে মুখ তুলে তাকায়। কোমল দৃষ্টিতে কষ্টের স্পষ্ট ছাপ। স্মৃতিকাতর সেই অসহায় দৃষ্টি।

মারম্নফ আবার বলে, জানি না তোমার জীবনে আমার আবির্ভাবকে তুমি কিভাবে নিচ্ছো। কিন্তু এটা জানি, মানে পরিষ্কার বুঝতে পারছি, তোমার কষ্ট পাওয়া মনটাকে ভালোবেসে ফেলেছি অজানত্মেই। দিনে দিনে সেই ভালোবাসা গাঢ় হয়েছে আমার মধ্যে। নুনা, বিশ্বাস করো, আমার প্রয়োজন ছিল ঠিক তোমার মতো সফ্ট একটা মেয়েকে। আমি ভুল নারীর সঙ্গে জীবনটাকে জড়িয়েছি।

নুনাহার কি যেন বলতে চাইলো; তার ঠোঁট জোড়া কাঁপছে। দ্বিধাগ্রসত্ম সে একসময় বলেই ফেলে, এখন আর কী করার আছে মারম্নফ ভাই? আছে! তুমি চাইলে অনেক কিছু করার আছে!

কিন্তু আমি ডিসিশন নিয়েছি সংসার-টংসার করবো না। আমার মনটা ভেঙ্গে গেছে মারম্নফ ভাই!
মারম্নফ যুক্তি দেয়, এখনো তোমার মনের অবস্থা ভালো না, তাই এ রকম বলছো। কিন্তু জীবনটা অনেক বড়, নুনা। কীভাবে কাটবে তোমার দিন?

কাটবে। কেটে যাবে। এনজিওতে অনেক ব্যসত্মতা। কাজের মধ্যে ডুবে থাকলে কোন দিক দিয়ে সময় চলে যাবে টেরই পাবো না। তাছাড়া, সবইতো অভ্যাসের ব্যাপার, তাই না?

উত্তরে মারম্নফ কিছু বললো না। তার চোখ-মুখের দিকে তাকিয়ে তার মনে পড়লো পাহাড়ের ওপর ঝুঁকে থাকা মেঘদলের কথা। গাঢ় চাই রঙ মেঘের মোটা একটা লেস পাহাড়ের মাথায়। একটু একটু ভেজা হাওয়া বইছে। যেন এৰুনি বৃষ্টি নামবে ঝপঝপিয়ে। বৃষ্টি শেষ পর্যনত্ম নামেনি। নুনাহার অতো হালকা মেয়ে না। সে আবেগ সামলে রাখতে জানে।

বড় ব্রিজ পেরিয়ে ডান দিকের রাসত্মা ধরেছিল ওরা। মোড় থেকে দুটো ছেলে ওদের লৰ্য করে। একজন ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসলোও। বাজার এখন জমজমাট। হোস্টেল থেকে বেরিয়ে কলেজ পড়ুয়া মেয়ের দল স্টোরগুলোতে এটা-ওটা কিনছে। মারম্নফ আনন্দময়ী গার্লস স্কুলের উল্টোদিকের ছোট্ট গলিতে ঢোকে। পিছনে নুনাহার। একটু এগিয়ে আটচালা বড় ঘরের পাশের গেট দিয়ে ঢোকে দু’জনেই। ‘প্রাণ, প্রাণবলস্নভ, বাড়িতে আছো?’ সাড়া-শব্দ নেই। মারম্নফ আবার ডাক দেয়, ‘প্রাণ। প্রাণবলস্নভ…।’ মনে-মনে বলে, কেউ নাই নাকি? ২০-২২ বছরের একটা ছেলে বেরিয়ে আসে, ‘দাদা তো নাই। বউদিরে লইয়্যা ঘিওর গ্যাছে বেড়াইতে।’ ঘিওর গেছে! মারম্নফ অপ্রস্তুত হয়। চেয়ে দ্যাখে নুনাহারের মুখ শুকিয়ে চুন। কী ভাবছে তখন মেয়েটা? এরপর কী আর করা, নতুন বাজারের প্রানত্মে সদ্য গাজিয়ে ওঠা ‘বন্ধু’ রেস্টুরেন্টের কেবিনে মুখোমুখি বসেছে দু’জন। ওয়েটারকে বলেছে, আমরা ঘণ্টাখানেক বসবো। তুমি মিনিট দশেক পর আসো। নুনাহারকে তখন চিনত্মামনস্ক দেখাচ্ছে। একদিন সাইনপুকুর যাওয়ার উদ্দেশ্যে সে বাসস্টপে আসছিল। রাসত্মার মাঝখানে খানিকটা জায়গা খালের ধার দিয়ে আসতে হয়। আচমকা মারম্নফের সঙ্গে দেখা। নুনাহার বলছে, আপনার সঙ্গে কথা নাই। আপনি শুধু ফাঁকি দেন!
তুমি দেখো, এবার সত্যিই আসবো।

‘আ-র আসবেন!’ বলে ঠোঁট বাঁকিয়ে দ্রম্নত হাঁটে, এমনভাবে, যেন মেইন রাসত্মায় উঠে এৰুনি একটা বাস পেলে বেঁচে যায়। পিছনে থেকে মারম্নফের আকুতিময় ডাক, নুনা আসত্মে হাঁটো। কথা আছে। যেন শুনতে পায়নি এমন ভঙ্গিতে দ্রম্নত চলেছে মেয়েটা।

মারম্নফ প্রায় চিৎকার করে ওঠে, নুনা!

এবার চলার গতি কমিয়ে দেয় সে। মারম্নফ বলে, আচ্ছা আমার তো ঝামেলা থাকতে পারে তাই না? আর তুমি ধরে নিয়েছো আমি যাবো না! ছায়ামাখা অভিমানি কণ্ঠে নুনাহার বলে, কতো ব্যসত্ম মানুষ আপনি! আপনার এত সময় কোথায়? আর ওখানে গিয়েই বা কি লাভ?

লাভ! লাভ-ৰতির কথা ভাবিনিতো? আমি যাবো বেড়াতে। তোমার সঙ্গে গল্প করতে। কথা দিচ্ছি। এক সপ্তাহের মধ্যেই আসবো। নুনাহার হঠাৎ অন্যমনস্কতার ভেতর আরও দেখতে পায়, মারম্নফ তাকে বাসে তুলে দিচ্ছে। আপত্তি সত্ত্বেও জোর করে বাসভাড়া গুঁজে দিচ্ছে তার হাতে।

চেয়ারে ইজি হয়ে বসে মারম্নফ বলে, প্রাণ শ্বশুরবাড়ি গেছে। ভালোই হলো, তোমাকে আরও কিছু সময় একা পাওয়া গেল। আলতো গলায় নুনাহার বলে, আমার কেমন জানি লাগে! আমাদের বাড়ির কেউ যদি দ্যাখে?
দেখলেও কোনো অসুবিধা নেই এখন। আমিতো অন্যকেউ নই। তোমাদেরই আত্মীয়। তাছাড়া তুমি স্বাবলম্বী, কাজেই চিনত্মা কি?

একঘণ্টারও বেশি সময় কেবিনটা দখল করে ছিল দু’জনে। তারও তো একটা মূল্য আছে। অতএব মোগলাই, সন্দেশ, চা এসব খেয়ে বিলটা সম্মানজনক করতে হয়েছে মারম্নফকে। অবশ্য যত না কথা হয়েছে তার চেয়ে বেশি নীরবতা নেমে এসেছিল দু’জনের মাঝখানে, একটু পর পরই! আবার কথা শুরম্ন করার গরজে মারম্নফ একসময় বলেছে, চা খাবে, আর এক কাপ?

আপনি খান। আমার আর লাগবে না।

আলাপের মাঝখানে মারম্নফ একবার বলেছিল, তুমি হচ্ছো সেই ছোট নদী; দেখে মনে হবে বেশি পানি নাই, আসলে অনেক পানি। আর হাজার মাইল ভেতরে সমুদ্র যতো গভীর ঢেউও ততো কম। শুনে কুয়াশাগ্রসত্ম গলায় নুনাহার সেই ভাঙ্গা হাসি হেসেছে! বাসস্টপে এসে আবার চা খেয়েছে দু’জনেই। আশ্চর্য, এবার কিন্তু কোনো জড়তা লৰ্য করা গেল না তার মধ্যে! চায়ের বিলটাই সেই দিয়েছে। অদূরে বাসের মাথা দেখা যাচ্ছে। ঘুমঘুম গলায় নুনাহার বলে, আবার কবে আসবেন, ভাইয়া?

এখনি বলতে পারছি না। ধরো এক মাস পর। তুমি এর মধ্যে শ্রীনগর যাবে না, তোমাদের বাড়িতে?
হঁ্যা, যাবো একবার।

দু’জনই বিদায় জানায় দুজনকে।

জানালার পাশের সিটে বসে গাড়ি ছাড়ার পরপরই মারম্নফ দেখলো নুনাহার ফিরে যাচ্ছে। গায়ে চকলেট রঙ শালটা জড়ানো। খুব ধীরে মেয়েটা ফিরে যাচ্ছে। সন্ধ্যা নামছে দ্রম্নত। জলঢুপ স্টেশন আসার আগে সে লৰ্য করলো গাছগাছালি কতো গভীর আলো-ছায়ায় নিমগ্ন। বাস হু-হু করে ছুটছে। ঠা-া বাতাসে মারম্নফের চোখ-মুখ-কান শিরশির করে। জ্যাকেটের বোতাম লাগিয়ে চোখ তুলতেই তার চোখ পড়ে গেল গাঙনি নদীর মরা বাঁকে। ঈশ! সব নদী শুকিয়ে কাঠ হবে; একটাও বাঁচবে না! তার চোখ এখন নিষ্পত্র জিগা গাছের লিকলিকে ডালের ওপর। প্রকা- লাল কাঁসার বাটির মতো চাঁদ উঠে বসে আছে। পিছনে রহস্যের মতো কালচেসবুজ ঝাড়গ্রাম। তার মাথার ভেতর বৃত্তাকারে ঘুরতে থাকে ছোট্ট জলপোকা। ঝিলের ওপর দিয়ে একটা রাতপাখি উড়ে যাচ্ছে লোকালয়ের দিকে। টেবিলের ওপাশে ঝুঁকে পড়েছে নুনাহারের বিষণ্ন কোমল মুখভঙ্গি। … আপনি শুধু মেয়েদের মন বোঝেন না…।
জাহিদের পাশে বসে আত্মমগ্ন মারম্নফ আহমেদ সাতপাঁচ ভাবছিল। জাহিদ বলে, যা-ই বল দোসত্ম, আমার মনে হয না ঐ মেয়ে তোকে বোঝে। ও তোর বন্ধুও হতে পারবে না! ওর ওখানে আর যাস না, তুই ভালো থাকবি। এখন একটা সিগারেট নে তো। আমি আর বেশিৰণ বসতে পারবো না। মেলা কাজ আছে।

[ad#bottom]