মুন্সিগঞ্জে ‘অঙ্কুরিত যুদ্ধ ১৯৭১’ নামের ভাস্কর্য নিয়ে বির্তক

মোহাম্মদ সেলিম, মুন্সিগঞ্জ: মুন্সিগঞ্জ শহরের সুপার মাকের্ট চত্ত্বরে ‘অঙ্কুরিত যুদ্ধ ১৯৭১’ নামের ভাস্কর্য নির্মাণ এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে। ২/১ সপ্তাহের মধ্যে এটি উদ্বোধন করা হবে বলে পৌর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। স্বাধীনতার ৪০ বছরের মাথায় এই ভাস্কর্য নিয়ে যখন শহরবাসীর মধ্যে উৎসব আমেজ। তখন নির্মাণাধীন ভাস্কর্য নিয়ে দেশ বরণ্যে শিল্পীদের বিবৃতি এখানে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে।

শিল্পী রফিকুন নবী বলেছেন, আমাদের কাছে ভাস্কর্যটির ডিজাইনের যে ছবিটি দেখানো হয়েছে। তা দেখে পছন্দ হয়নি। মনে হয়েছে এটি আরও ভালো হতে পারতো। সবদিক থেকে সৃজনশীল এবং সুনিপুন না হলে, মন ভরবে না। তিনি জানান, মফস্বলে স্থানীয়ভাবে অঢেল ভাস্কর্য হচ্ছে। একটা দিক ভালো যে মুক্তিযুদ্ধের বিষয়ে ফিলিং আছে। কিন্তু মানের উপরও গুরুত্বারোপ করা উচিত। অন্তত জাতীয় পর্যায়ে এই বিষয়ে যাঁরা ভালো বুঝেন, তাদের লেআউটটি দেখিয়ে নিলে ভালো হয়। কারণ খরচ ঠিকই হলো, কিন্তু উদ্দেশ্যটি পরিপূর্ণ হলো না।

মুন্সিগঞ্জের সুপার মার্কেট চত্ত্বরে নির্মাণাধীন ভাস্কর্যের ডিজাইন

রাজশাহীর নিতুন কুন্ডের সাবাস বাংলাদেশ ভাস্কর্য

মুন্সিগঞ্জে ভাস্কর্য নির্মাণ কাজ এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে

এই বিষয়ে ভাস্কর্যটির শিল্পী বিন্দু সরকার দাবী করেছেন, মুক্তিযুদ্ধের প্রতি সম্মান রেখে হৃদয়গ্রাহী মৌলিক কাজটি তিনি করেছেন। তাঁর ডিজাইনটি মোটেও নকল, বিকৃত কিংবা নিন্ম মানেরও নয়। সৃষ্টিশীল একটি কাজ। এটির কাজ সম্পন্ন হলেই তার প্রমাণ মিলবে। বিন্দু সরকার দ্বিমুখী বৃত্তাকার ভাস্কর্যের ডিজাইনটি প্রদর্শন করে বলেন, হয়ত তাঁদের (বিবৃতি দাতা শিল্পী) কাছে সঠিক ডিজাইনটি উপস্থাপন না করার কারণেই ভুল বোঝা বুঝি হয়েছে। যুদ্ধকালীন অভিব্যক্তি সেটিই নান্দনিকভাবে উপস্থাপিত হয়েছে এতে। অঙ্কুরিত যুদ্ধের নাম করণের সাথে ভাস্কর্যটির যথাযথ মিল রয়েছে। মুক্তিযোদ্ধার যে এক্সপ্রেশন বা দেহের ভাষা ছিল তাই ফুটে উঠছে এই ভাস্কর্যে। ডিজাইনে ২০ ফুট বৃত্তাকার ও রাস্তা থেকে ৩২ ফুট উচ্চতা বিশিষ্ট এই ভাস্কর্য। এতে রয়েছে একজন নিরস্ত্র মুষ্ঠি হাতের, একজন সশস্ত্র ও একজন নারী মুক্তিযোদ্ধার সম্পূর্ণ ফিগার। লাল সবুজের পতাকা বর্ণের দু’টি সার্কেল রয়েছে। ৪ ফুট উচ্চতা ও ১২ ফুট বৃত্তের চারিপাশে সিমেন্টের খোদাইয়ে জেলার ঐতিহ্যের নানা দৃশ্য স্থান পেয়েছে। ৩টি রেখার মাধ্যমে বৃটিশ বিরোধী আন্দোলন, ভাষা আন্দোলন এবং ’৭১ এর স্বাধীনতার বিজয়কে ৩টি রেখার মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে।

রফিকুন নবী বলেন, ছবি দেখেই আমরা বিবৃতি দিয়েছি। এখানে গ্যাপ একটি রয়ে গেছে। তবে মুক্তিযুদ্ধের বিষয় নিয়ে হেলা ফেল করা ঠিক নয়। এখানে শ্রদ্ধা ভক্তির ব্যাপার রয়েছে। তিনি বলেন, মুন্সিগঞ্জেরই কিছু লোক বিষয়টি নিয়ে আমাদের কাছে এসেছেন, তবে তাদের আরো আগে, প্রথম দিক থেকেই আসা উচিত ছিল। তাহলে কাজের এই চূড়ান্ত পর্যায়ে সমস্যাটি হতো না। কারণ মুক্তিযুদ্ধের যে কোন কাজই হৃদয়গ্রাহী সুন্দর এবং শোভন হওয়া উচিত। এব্যাপারেও সর্তক থাকা উচিত এটি এন্ট্রি মুক্তিযুদ্ধ বা ব্যাঙাত্মক কিছু হয়ে গেলো কিনা।

শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, এই ভাস্কর্যটি রাজশাহীর নিতুন কুন্ডের ‘সাবাস বাংলাদেশ’র ব্যর্থ অনুকরণ। তিনি বলেন, এখানে নতুন আইডিয়ায় নান্দনিক একটি ডিজাইন আসতে পারতো।

শিল্পী হাসেম খান এই বিষয়ে বলেন, “ভাস্কর্যটি নিয়ে বির্তক যেহেতু এসেই গেছে কর্তৃপক্ষের উচিত হবে গুরুত্ব, ভাস্কর্যের বিষয় ও শিল্প মান নিশ্চিত করা। সে লক্ষ্যে একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি করে দেয়া যেতে পারে।”

দেশের বিশিষ্ট স্ট্রাকচার ইঞ্জিনিয়ার (ফেলো শিপ নং ৮২৭৬) সালাউদ্দিন আহম্মেদ রুমি এই ভাস্কর্যটির স্ট্রাকচার ডিজাইনটি করে দিয়েছেন। তাঁর মতে এটি একটি মান সম্মত ভাস্কর্য। যা সকলের কাছে প্রসংশনীয় হবে বলে তিনি মনে করেন। ভাস্কর্যটির আর্কিটেক্ট কহিনুর রহমান মনে করেন এটি একটি মান সম্মত শিল্প। বিন্দু সরকারের থিম নিয়ে ভাস্কর্যটির প্রকৌশলগত সাপোর্ট দেয়া কলসালটেন্ট প্রতিষ্ঠান রেডিয়াস ডিজাইন এন্ড ডেপলাপমেন্টের প্রকৌশলী আব্দুর রশিদ বিস্তারিত বর্ণনা দিয়ে বলেন, এটি একটি ভালো শিল্পকর্ম বলেই আমি মনে করি।

এই ভাস্কর্যটি বন্ধের দাবী জানিয়ে মুন্সিগঞ্জ চারু শিল্পী গোষ্ঠী সম্প্রতি লিখিত আবেদন করেছে পৌর কর্তৃপক্ষের কাছে। মানববন্ধন ও পৌর মেয়রের কুশপুত্তলিকা দাহ করে সংগঠনটি। এটির আহ্বায়ক আব্দুস ছাত্তার মানিক বলেন, “সচ্ছ প্রক্রিয়ায় পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দিয়ে মডেল আহ্বান করে অভিজ্ঞ শিল্পীদের দ্বারা বাছাই করার পর এটি নির্মাণ করা হউক”

মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সদর উপজেলা কমান্ডার এম এ কাদের মোল্লা বলেন, “এই ভাস্কর্যটি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে জাগ্রত করতে বিরাট অবদান রাখবে। স্থানীয় একটি সংগঠন পরিচয়ে যারা এর বিরোধিতা করছে তারা এত দিন কেন ভাস্কর্য নির্মাণে অবদান রাখেনি। শহরে তো আরও গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট রয়েছে। সেখানে আরও সুন্দর একটি করে বুঝিয়ে দেক তাদের মেধা।”

সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি মতিউল ইসলাম হিরু জানান, মুন্সিগঞ্জে একটি ভাস্কর্য নির্মাণের দাবীতে সাংস্কৃতিক কর্মীরা আন্দোলনও করেছে। পরে পৌরসভা উদ্যোগ গ্রহন করে ডিজাইন আহ্বান করে সকলের উপস্থিতিতে ডিজাইন পছন্দ করে যাবতীয় প্রসিডিউর অনুযায়ী নির্মাণ হচ্ছে। এখন শেষ পর্যায়ে এসে বির্তক সৃষ্টি হওয়ায় মুন্সিগঞ্জবাসী মর্মাহত। তাঁর প্রশ্ন স্থানীয় যে সকল লোকজন এখন এর বিরোধীতা করেছে, এত দিন তারা কোথায় ছিলেন?

প্রকল্পটি গ্রহনের সময়ে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি ছিলেন, শাহিন মো. আমানুল্লাহ। তৎকালীন সভাপতি আমানুল্লাহ জানান, এক দিকে মৌলবাদীরা ভাস্কর্য বন্ধে দাবী তুলে নানাভাবে বাঁধার সৃষ্টি করছে। আরেক দিকে চারু শিল্পী গোষ্ঠী নামের একটি নতুন সংগঠন করে হঠাৎ কিছু লোক বিরোধিতা করছে। এতে দীর্ঘ দিনের স্বপ্ন ভাস্কর্যটি নিয়ে জটিলতার সৃষ্টি হচ্ছে। এটি স্থাপন করার পর সব বির্তকের সমাধান হবে বলে তাঁর বিশ্বাস।

ভাস্কর্যটি বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠান মুন্সিগঞ্জ পৌর সভার মেয়র মুক্তিযোদ্ধা এ্যাডভোকেট মুজিবুর রহমান জানান, পৌরসভার সকল শ্রেনীর প্রতিনিধির উপস্থিতি এবং গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গের মতামত নিয়ে ডিজাইন নির্বাচন করা হয়েছে। এব্যাপারে আর্কিটেক্ট ও বিশেষজ্ঞ প্রতিষ্ঠানের সাথে মতামত নিয়ে প্রকল্পটি গ্রহন করে পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে ঠিকাদার নিয়োগ করা হয়।

মুন্সিগঞ্জ পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী খন্দকার মো. আখতার হায়দার জানান, যথযথ নিয়মনীতি অবলম্বনের মাধ্যমে এই ভাস্কর্যটি নির্মাণ হচ্ছে। অন্যকোন কারণে স্থানীয় কিছু লোকজন বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টির পায়তারা করছে। প্রায় ২০ লাখ টাকা ব্যয়ে মেসার্স কামাল হোসেন ট্রেডার্স নামের একটি প্রতিষ্ঠান এটি বাস্তবায়ন করছে। গতকাল বুধবার পর্যন্ত প্রকল্পটির ৯৫ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে বলে তিনি জানান।

[ad#bottom]

One Response

Write a Comment»
  1. Thanks