’৭১-এর বিতর্কিত ভূমিকার কারণেই তাজউদ্দীনকে মন্ত্রিসভা থেকে বরখাস্ত করেন বঙ্গবন্ধু?

পীর হাবিবুর রহমান: মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, প্রবীণ রাজনীতিবিদ বিএনপি নেতা শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন আমাদের সময়ের সঙ্গে আলাপচারিতায় বলেছেন, বঙ্গবন্ধু ’৭১-এর বিতর্কিত ভূমিকার কারণেই তাজউদ্দীন আহমদকে মন্ত্রিসভা থেকে বরখাস্ত করেছিলেন। অর্থমন্ত্রী থেকে বরখাস্ত করার আগে রাষ্ট্রপতি থেকে প্রধানমন্ত্রী হয়ে তিনি তাজউদ্দীনকে সরানোর দায়িত্ব পালন করেন। শাহ মোয়াজ্জেম বলেন, সবাই জানতো বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানি হানাদারদের হাতে আটক। কোথায় কী অবস্থায়, জীবিত না মৃত তা জানতো না। শোনা যেত আমেরিকার মধ্যস্থতায় একটি চুক্তি হয়েছে বঙ্গবন্ধুকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে যদি সমঝোতা করতে হয় সেজন্য। বাঙালি জাতি তখন বঙ্গবন্ধুর হাতের মুঠোয়। সবাই চাইছিল মুক্তিযুদ্ধের বিজয় ও জীবিত বঙ্গবন্ধুকে ফেরত পেতে। মানুষ নফল নামাজ পড়েছে, রোজা রেখেছে তার জন্য। যুদ্ধ চলাকালে মাঝামাঝি সময়ে একদিন প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ বিদেশি সাংবাদিকদের বললেন, ‘বঙ্গবন্ধু আমাদের সঙ্গে আছেন, দেশের অভ্যন্তরে যুদ্ধ করছেন’। এটা বলা মানে বঙ্গবন্ধুকে শটডেড করে ফেলে দেয়ার সুযোগ করে দেয়া। তার বিতর্কিত ভূমিকায় সবার মাঝে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা গেল। এমনকি শোনা গেছে ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্ধিরা গান্ধী তাজউদ্দীনকে ডেকে তিরস্কার করেছেন। এদিকে এতে বিক্ষুব্ধ ডান প্রতিনিধিরা কলকাতায় এক বৈঠকে সমবেত হয়ে তাজউদ্দীনকে প্রধানমন্ত্রী ও দলের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব থেকে সরানোর সিদ্ধান্ত প্রস্তাব নিতে গেলে সৈয়দ নজরুল ইসলাম অভিভাবক হয়ে দাঁড়ান। আবেগঘন বক্তৃতা এখন এখানে নয়, দেশে বিজয়ীর বেশে ফিরে গিয়ে সমাধানের আশ্বাস দিলে সবাই মেনে নেন। তবে দল দেখাশোনার দায়িত্ব পান কেএম ওবায়দুর রহমান। আর পাকিস্তান প্রকাশ করে বন্দি পাইপ টানা মুজিবের ছবি।

শাহ মোয়াজ্জেম বলেন, পদবি ক্রমানুসারে বঙ্গবন্ধুর পর দলে সৈয়দ নজরুল, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী, কামরুজ্জামান, খোন্দকার মোশতাক আহমদের পর ছিলেন তাজউদ্দীন। সবার কাছে গ্রহণযোগ্য সৈয়দ নজরুলের বদলে তিনি প্রধানমন্ত্রিত্ব নেয়ায় এ নিয়েও কথা উঠেছিল। যাক বঙ্গবন্ধু পাক কারাগার থেকে বের হয়ে লন্ডন হয়ে আসার পথে অনেক কিছুই জেনে যান। বাকিটা দেশে ফিরেই জানেন। এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত নেন। মৃত্যুর সময় তাজউদ্দীন দল বা সরকারে কোনো পদে ছিলেন না।

বোরবার রাতে গুলশানের বাসভবনে কথা হয় শাহ মোয়াজ্জেমের সঙ্গে। গত বছর ৭ জুলাই তিনি তার প্রিয়তমা স্ত্রীকে হারিয়ে শূন্য বাড়িতে এখন বড্ড নিঃসঙ্গ। কর্মী দর্শন, বই পাঠ আর লেখালেখিতে সময় কাটছে। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর আত্মীয়, জমিদার পরিবারের কন্যা সালেহা হোসেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শাহ মোয়াজ্জেমের আগুন ঝরা বক্তৃতা শুনে এতটাই মুগ্ধ হন যে, তার পরিবারকে জানিয়ে দেন বিয়ে হলে এই মানুষের সঙ্গেই হতে হবে। জেল খাটা বাউণ্ডুলে পাত্রের সঙ্গে কন্যার জেদের কাছে হেরে পরিবারকে বিয়ে দিতে হয়। শাহ মোয়াজ্জেম জানান, ষাটের দশকে তিনি যখন হটকেক তখন তাকে বরমাল্য দিতে অনেক তরুণী আগ্রহী হলেও তার স্ত্রীই জীবনের প্রথম ও শেষ নারী। সুন্দরের পূজারি হলেও ছিলেন সংযমী। সালেহা উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা প্রিন্সিপাল ছিলেন। বিয়ে করে বউ আনার সময় দুই শ্যালিকা সঙ্গে আসায় তিনি বলেছিলেন, দোকানে একটি কিনলে দুইটি ফ্রির মতো তিনিও দুজন ফাও গিন্নি পেয়েছেন।

শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন ষাটের দশকে একবার ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদক ও দুবার সভাপতি ছিলেন। সামনে ১০ জানুয়ারি ৭৫ বছরে পা রাখবেন। জীবনে মোট কুড়ি বছর জেল খেটেছেন। বললেন জীবিত রাজনীতিবিদদের মাঝে তাকে জেল খাটায় কেউ ডিঙ্গাতে পারেনি। জেল নিয়ে যেমন আনন্দ-গৌরব, তেমনি হীনমন্যতা ও জীবনের সবচেয়ে বড় দুঃখ লুকিয়ে আছে বলে জানালেন। কখনো হিউমার কখনো বা সোজাসাপ্টা কথা বলে রাজনীতির মঞ্চ মাতানো শাহ মোয়াজ্জেম বলেন, ‘ভাইরে সব সত্য বলা যায় না, সত্য বললে মায় মার খায়, আর সত্য গোপন করলে বাপে হারাম খায়’ আমাদের এখন এ অবস্থা।

ক্লাস নাইনে পড়ার সময়ে ’৫২ সাল থেকে প্রতিবছরই কম বেশি জেল খেটেছেন এই নেতা। বললেন, পাকিস্তান আমলে জেলযাত্রা আনন্দময় ছিল। মনে হতো এত দেশের জন্য অবদান রাখছি। নিজেদের বানানো স্বাধীন দেশে জেল খাটতে গৌরব বোধ করিনি। হীনমন্যতায় ভুগেছি। সর্বশেষ শেখ হাসিনার প্রথম শাসনামলে জেলহত্যার অভিযোগে ৪ বছর জেল খাটা নিদারুণ লজ্জা ও অপমানের। এমন মানসিক যাতনা তিনি আর পাননি। এটা দেখে বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় ৪ নেতার আত্মাও কেঁদেছে। এ সময় তার পিতৃতুল্য বড় ভাইয়ের মৃত্যু হয়। ছোটবেলা মা, বিএ পড়ার সময় বাবাহারা মোয়াজ্জেমের কাছে বড় ভাই ছিলেন সব। কিন্তু সে সময় প্রিয় ভাইটিকে দাফন করতে সরকার তাকে প্যারোলে মুক্তি দেয়নি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মেজর (অব.) রফিকুল ইসলাম বীরউত্তম ছিলেন অসহায়। তিনি বলেন, এটা তার জীবনের সবচেয়ে বেদনাদায়ক ঘটনা। এ সময় শিশুর মতো কাঁদলেন মোয়াজ্জেম।

সময় নিয়ে ফের কথা শুরু। জীবনের আফসোস কী? ঃজবাবে তিনি বলেন, কসম খেয়েও এরশাদ তাকে প্রধানমন্ত্রী করেননি। এ যেন সুনীলের ‘কেউ কথা রাখেনির মতোই অবস্থা। আর একমাত্র কন্যাটির কোলে সন্তান না আসা। জীবনের বড় আনন্দ কী? উত্তর স্ত্রী-সন্তান আর ছাত্রলীগের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক হওয়া। ষাটের দশকের ছাত্রলীগের নেতারা স্বাধীনতা আন্দোলনকে মুক্তিযুদ্ধে নিয়েছেন। মাঠ কাঁপিয়েছেন। বঙ্গবন্ধুর অঙুলি হেলনে কাজ করেছেন।

তিনি বলেন, শাহাদাত বরণের আগ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু ছিলেন নেতা, বড় ভাই, অভিভাবক। তার সান্নিধ্য ভালোলাগতো। গভীর øেহ ভালবাসা পেয়েছি। তার ছিল অমোঘ আকর্ষণীয় শক্তি। বারবার কাছে টানতো। তার কারিশমা তুলনাহীন। ছিলাম অন্ধভক্ত। মুজিব অন্তপ্রাণ। যেখানেই থাকি বঙ্গবন্ধুর জন্য মনটা কাঁদে। শেখ মুজিবকে জাতির পিতা হিসাবে একটি প্রতিষ্ঠানে দাঁড় করাতে অনেকের সঙ্গে এ গরিবেরও অবদান ছিল। কিন্তু আজ বিজয়ের মাসে তার উত্তরাধিকার দাবিদাররা ডাকে না। অবদানের স্বীকৃতি দেয় না। সমাদর, সম্মান দেয় না। দেয় প্রতিহিংসা, মানসিক পীড়ন। কিন্তু স্রোতস্বিনী নদীর মতোই ইতিহাস বলে যায়, এই আমরাই ছিলাম দেশপ্রেমিক স্বাধীনতা সংগ্রামী-বঙ্গবন্ধুর অনুসারী। আজ অপ্রত্যাশিতভাবে রাজনীতি চলে গেছে তাদের হাতে যাদের স্বাধীনতা আন্দোলনে বা বঙ্গবন্ধুর উত্থানে অবদান নেই। মেনন-মতিয়া-সুরঞ্জিতরা মুখ ভেংচিয়ে যেভাবে বঙ্গবন্ধুকে সমালোচনা করতো, বিরোধিতা করতো তা ক্ষমতাবানরা ভুললেও ইতিহাস ভোলেনি। যারা মুজিবের চামড়া দিয়ে ঢোল ও হাড্ডি দিয়ে ডুগডুগি বাজানোর কথা বলতো তাদের যখন বঙ্গবন্ধু কন্যার মন্ত্রিসভায় দেখি অবাক লাগে। বলি হায়! সেলুকাস কী বিচিত্র এই দেশ। আবার যাদের অবদান স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধে গৌরবময়, যারা মুজিব অন্তপ্রাণ নিবেদিত কর্মী তাদের দেশ শাসনে দেখি না তখন বিস্মিত হই!

বলেন, দুই স্কুলের দায়িত্ব পাওয়া মেনন যা করেছেন শুনেছি, দেশ চালানোর দায়িত্ব পেলে না জানি কী করতেন। যাক ওসব তাদের দলীয় ব্যাপার। বলতে পারেন, আমি আবার তাদের ঘরের খবর নিয়ে কথা বলার কে? মোয়াজ্জেমের ভাষায় রাজনীতিতে শালীনরা নেই তাই শালীনতা নেই। পরিশীলিত মন আর বিদ্যাবুদ্ধি জানা নেতারা ঘরে উঠে যাচ্ছেন তাই হিউমার নেই, আছে আক্রোশ আর প্রতিহিংসা। তিনি বলেন, রাজনীতির মঞ্চে হতাশার ছায়া। এভাবে রাজনীতি চললে পরিণতি শুভ হতে পারে না।

শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, আজ তিনি একেবারেই সুখে নেই। স্বাধীনতা সংগ্রাম, যুদ্ধ, দেশ স্বাধীন করেছেন। মুক্তিযুদ্ধে ভারতের সংসদে আড়াই ঘণ্টা বক্তৃতা করেছেন। ’৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ইতিহাসের নৃশংসতম হত্যাকাণ্ডের পর সর্বত্র জনসভা করে ছুটেছেন। তাকে বন্দুকের মুখে মোশতাকের মন্ত্রিসভায় নেয়া হয় ডিমোশন অর্থাৎ চিফ হুইপ থেকে প্রতিমন্ত্রী করে। জেল হত্যা শুনেই তারা পদত্যাগ দেন। তবু জেল হত্যামামলায় তাকে জেল খাটতে হয়েছে। নিু আদালতে মুক্ত হয়েছেন।

তার প্রশ্ন, এ অপমান সইতে দেশ স্বাধীন করেছিলাম? বাড়িঘর হানাদাররা পুড়িয়েছিল?

শাহ মোয়াজ্জেম বলেন, আওয়ামী লীগেই তারা যেতে চেয়েছিলেন। তাদের সম্মেলনে প্রবেশের কার্ড দেয়া হয়নি। মিজানুর রহমান চৌধুরীকে পাঠালেন। তিনি তার কার্ড সংগ্রহ করে এসে বললেন তোমাদের নেবে না। অর্থাৎ মোয়াজ্জেম, ওবায়দুর রহমান সুচতুর ব্যারিস্টার মঈনুল হোসেন না। তিনি বলেন, জেদ তো আছে। গেলাম মোশতাকের বাড়ি। পীরের ছেলে। জানতে চাইলাম বঙ্গবন্ধু হত্যার সঙ্গে জড়িত কিনা। বাবার কবর জিয়ারত করে এসে কোরআন হাতে নিয়ে মোশতাক বলল বঙ্গবন্ধু হত্যার আগে তিনি কিছুই জানতেন না। কিন্তু দল করার পর যখন মোশতাক ১৫ আগস্ট নাজাত দিবস করতে চাইলো তখন মোয়াজ্জেম শোক দিবসের দাবিতে অনড় থাকলে ডিএলএ ভেঙে গেল। সন্দেহ হলো বঙ্গবন্ধু হত্যার সঙ্গে জড়িত।

শাহ মোয়াজ্জেম বলেন, বঙ্গবন্ধু স্বাধীনচেতা, দেশপ্রেমিক, আত্মমর্যাদাশীল নেতা ছিলেন বলেই ভারতীয় সৈন্য দ্রুত চলে যেতে হয়। এমনকি তিনি ওআইসিতে যাওয়ার সময় একদিন পুরনো গণভবনে সন্ধ্যায় কেবিনেট সদস্যদের ডাকলেন। আমি সিঁড়িতে। তিনি ওঠার সময় নিয়ে গেলেন। তাজউদ্দীন, সামাদ আজাদ, ড. কামাল, ব্যারিস্টার আমীর-উল-ইসলামরা যুক্তিতর্ক দিয়েছেন ধর্মনিরপেক্ষ দেশের নেতা যাবেন এটা ঠিক হবে না। বঙ্গবন্ধু বললেন, অসাম্প্রদায়িক হলেও দেশ মুসলমানের দেশ। ৯০ ভাগ মানুষ মুসলমান। বাপের বেটা বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘আমি কারো মাখা তামুক খাই না, কাউকে ট্যাক্স দিয়ে চলি না।’

বর্তমান রাজনীতির চিত্র তুলে ধরে শাহ মোয়াজ্জেম বলেন, বঙ্গবন্ধুই এই জাতিকে প্রতিবাদ, বিক্ষোভ, হরতাল, মিছিল শিখিয়েছেন। আজ মিছিল করলে পুলিশি হামলা। বিএনপি অফিসের দিকে তাকালেই গ্রেপ্তার। এর নাম কি তবে গণতন্ত্র? অসহিষ্ণু সরকার। গণতন্ত্রে পরমতসহিষ্ণু হওয়ার আচরণ নেই।

তার দেখা সেরা সুন্দরী নারীর বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, এরশাদের সঙ্গে সৌদি আরবে রাজকীয় মেহমান হয়ে হজ করতে গিয়েছিলাম। বাদশাহ ফাহাদের প্লেনে মদিনায় মহানবীর (সা.) মাজার জিয়ারতে নেয়া হয়। যে দুজন গ্রিক সুন্দরী এয়ার হোস্টেস ছিল তাদের একজনের তুলনাই হয় না। তিলোত্তমা শব্দ পড়েছি। আজ মনে হলো উর্ব্বশী মেনকা, রম্ভা সবার রূপ যেন একদেহে ধারণ করে সদাহাস্য লাস্যময়ী যুবতীটি এইমাত্র স্বর্গ থেকে নেমে এসেছে। মেয়েটির রূপ-লাবণ্য যেন ঝলমল করে। কামনা জাগে না কিন্তু রূপসীর রূপ বারবার দেখেও তৃষ্ণা মেটে না। তার রূপের স্বর্গীয় বৈশিষ্ট্যই তাকে আরো মোহনীয় এবং লোভনীয় করে তুলেছে। ক্যামেরা দিয়ে তারা ছবি তুলছেন। কিন্তু হƒদয় গভীরে সেদিন যে ছবি উঠেছে তা কোনোদিন মোছেনি। সে-ই তার দেখা পৃথিবীর শ্রেষ্ট সুন্দরী।

শাহ মোয়াজ্জেম বর্তমান টিভি চ্যানেলগুলোকে অ্যাডভিশন বলেন। তার মতে, টাকা কামোনোর বাক্স। মানুষের সুখ-দুঃখ নেই। বোম্বের কিং খানের ঢাকা কনসার্ট নিয়ে বললেন, শাহরুখের গলাই তো ভালো নয়। চ্যাংরা পোলা করে কী এসব। মুসলমান দেশে অর্ধ উলঙ্গ নাচ, মঞ্চে যুবক-যুবতীর কোলাকুলি, প্রকাশ্য চুম্বন খাওয়া দেখে বোকা বনে যেতে হয়।

শাহরুখ তো এ জেনারেশনের প্রিয় তারকা। মোয়াজ্জেমের জবাব এটা একটা স্টার হলো? কই দিলিপ কুমার, নার্গিস, উত্তম, সুচিত্রা। তবে সবার সেরা উত্তমই। এই আমার শেষ কথা। আর ভুলে গেলে চলবে না এ দেশের নিজস্ব সংস্কৃতি আছে। স্বকীয়তা আছে। আছে মৃল্যবোধ। ধর্মীয় অনুশাসন। এসব উপেক্ষা করে চলার নাম বেলেল্লাপনা। এটা কেউ আশা করে না। জেনারেশনের কথা বলছেন। ওরা আমাদের ভবিষ্যৎ। তাদের পথ তো আমাদেরই দেখাতে হবে। শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, যখন যৌবন ছিল তখন রাজপথে কাটিয়েছি। জেল জীবনকে আলিঙ্গন করেছি। কবি হেলাল হাফিজের ‘এখন যৌবন যার মিছিলে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়।’ কবিতার চরণ উদ্ধৃত করে বলেন, বুড়ো হয়ে গেছি তাই রাজপথে নামতে পারি না। কিন্তু দেশ যেভাবে চলছে তাতে তারুণ্যের মিছিলে, প্রতিবাদে এখন রাজপথ কাঁপানোর কথা। কিন্তু কই হচ্ছে না তো। শিক্ষা আন্দোলন ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মুক্তির আন্দোলনের নেতা মোয়াজ্জেম বলেন, এদেশে ছাত্র রাজনীতিও নেই। আছে টেন্ডারনীতি, ধান্ধানীতি আর চাঁদানীতি। ছাত্র রাজনীতির হাল-হকিকত যা দেখি, যা শুনি তাতে কেবল লজ্জাই হয়।

ষাটের দশকের ছাত্রলীগ নেতাদের সম্পর্কে বলতে গিয়ে বলেন, শেখ ফজলুল হক মনিও মেধাবি সংগঠক ছিলেন। ওবায়দুর রহমান ভদ্র বিনয়ী এক জাতীয়তাবাদী ছিলেন। তাদের পরে মেধা বিচক্ষণতা ও সংগাঠনিক দক্ষতায় সিরাজুল আলম খান ছিলেন আন প্যারালাল। আব্দুর রাজ্জাক চমৎকার সংগঠক হলেও কোনো কিছু বিলম্বে বুঝতেন। তোফায়েল আহমেদ বুদ্ধিদীপ্ত স্মার্ট ছাত্রনেতা ছিলেন। আসম আব্দর রবও আকর্ষণীয় ছাত্রনেতা ছিলেন। নুরে আলম সিদ্দিকী আবেগঘন অসাধারণ বক্তৃতা করত। বাকশাল ব্যান্ডে তার বক্তৃতা ইতিহাসে ঠাঁই পাবে। শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, ছাত্রলীগের ইতিহাসে ষাটের দশক ছিল স্বর্ণযুগ। ওই সময়ের নেতারাই বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে দেশকে স্বাধীনতা সংগ্রামের মধ্যদিয়ে মুক্তিযুদ্ধে বিজয় এনে দিয়েছেন। তিনি জানান, ষাটের দশকেই তার কারাগার জীবন নিয়ে নিত্য-কারগার বইটি বাংলা একাডেমী প্রকাশ করে। তার পকেটে আসে ১০ হাজার টাকা। তখন ঢাকায় ৮ হাজার টাকায় এক বিঘা জমি কেনা যেত। ১০ টাকায় শার্ট, ১২ টাকায় প্যান্ট, ৬০ টাকায় সুট হতো। সতীর্থ কর্মীরা যে যেটা চাইলো দিলেন। সিরাজুল আলম খান বললেন, পাহলোয়ানের মোরগ পোলাও খাওয়াতে হবে। ছুটলেন দল বেধে। খেলেন মজা করে। সিরাজুল আলম খান ৫ প্লেট খেলেন। পাহলোয়ান বললো এমন খানেওয়ালা মানুষের বিল তিনি নেবেন না।

তখন ইসলামপুরে পাহলোয়ানের মোরগ পোলাওয়ের যশ ছিল। একসময় দেখলেন পকেটের টাকা ফুরিয়ে গেছে। দীর্ঘশ্বাস ফেলে শাহ মোয়াজ্জেম বললেন, কী আন্তরিকতা, কী দেশপ্রেম, কী লক্ষ্যে পৌঁছানোর দৃঢ়তা, কী মনোবল, ত্যাগ সব যেন কোথায় হারিয়ে গেল। বললেন, সুখে নেই ভাই। ঘুম আসে না। মনে শান্তি পাই না। মেধাবি ছাত্র হয়েও রাজনীতির পথ নিয়েছিলাম। কিন্তু ভাই দেশে আজ রাজনীতি নেই আছে দুর্নীতি আর হিংসানীতি।

[ad#bottom]