যুদ্ধকালে অক্টোবরের এক প্রত্যুষ

ফয়েজ আহমদ
কলকাতার বাইরে ‘টাকি’ নদী পার হলেই খুলনা জেলা। আমি তখন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সঙ্গে সংযুক্ত। বিভিন্ন বিষয়ের ওপর লেখার সঙ্গে আমি প্রায়ই মুক্তিযুদ্ধ অঞ্চলের যুদ্ধকাহিনী অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে বর্ণনা করে আসছিলাম। এই ‘টাকি’ নদী মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে সম্পর্কিত খুলনার একটি এলাকা।

আমার সঙ্গে সেদিন আরো দুজন সাংবাদিক এই নদী পার হয়ে মুক্তিযুদ্ধ এলাকায় প্রবেশ করেছিল। আমার পাস দিয়েই তাদের পাস। একজন কলকাতা বিখ্যাত ‘স্টেটমেন্ট’ পত্রিকার নিউজ এডিটর সন্তোষ গুপ্ত ঢাকায় আমার পরম বন্ধু ছিল অপরজন মি. ল্যাগিল্যান্ড। তিনি এসেছেন আমেরিকা থেকে টচও-এর সামরিক প্রতিনিধি হিসেবে। সন্তোষ আমার সঙ্গে দেখা করে আগেই জানিয়েছিল কিন্তু তিনি তার বন্ধু ল্যাগিল্যান্ডকে নিয়ে এসেছিলেন। কারণ তার কোনো পাস ছিল না। আমার পাস দিয়েই যুদ্ধক্ষেত্র অঞ্চলে প্রবেশ করতে হবে।

আমরা যখন সকাল ১১টার দিকে কালীগঞ্জের যুদ্ধক্ষেত্র অঞ্চলে পৌঁছলাম তখন স্থানীয় রেজিমেন্টের হেড ক্যাপ্টেন হুদা আমাদের অভ্যর্থনা জানালো। প্রথমে দেখলাম উক্ত অঞ্চলের থানার চরম বিপর্যয়। এই থানায় তিনদিনব্যপী মুখোমুখি যুদ্ধ হয়েছিল প্রতিটি বাঙ্গাকারে যুদ্ধ, নদীর পাড়ে দীর্ঘ এলাকাব্যাপী এই যুদ্ধক্ষেত্রে শেষ পর্যন্ত দশ দিন আক্রমণের পর পাকিস্তানিরা পরাস্ত হয়। দীর্ঘ নদীর পাশ ঘেঁষে এই যুদ্ধ চলেছিল এবং থানায় আটক প্রতিটি পাকিস্তানিকেই হত্যা করা হয়েছিল, এই দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে বাঙালির মুক্তিযোদ্ধা মিত্র সংখ্যা সঠিক বলা সম্ভব হচ্ছে না। আমরা যখন এই এলাকায় প্রবেশ করি তখন সব শান্ত। কৃষকরা গৃহে ফেরেনি। জেলেরা তখনো জাল ফেলে না। কেবল চারদিকে মুক্তিযোদ্ধাদের ছোট ছোট ঘাঁটি। ক্যাপ্টেন হুদা এক দক্ষ সেনানী। বর্তমানে তার নির্দেশেই উক্ত এলাকার মুক্তিযোদ্ধারা পরিচালিত হচ্ছেন- কিছু নিয়মিত ও কিছু অনিয়মিত গেরিলাবাহিনী তার কমান্ডে রয়েছে। এ অঞ্চলে ট্যাংক ছাড়া কোনো গাড়ি চলাফেরা করে না বললেই চলে।

আমরা তিন সাংবাদিক প্রথমেই স্থানীয় কমান্ডার হুদার সঙ্গে দেখা করি। তিনি সমস্ত বাহিনীকে এলার্ট করে দিয়ে আমাদের পাহারায় কয়েকটি সৈন্যকে রাখলেন। আমরা এই বাহিনীর প্রচারণায় যুদ্ধ ক্ষেত্রের অভ্যন্তরে প্রবেশ করলাম। এখানে প্রথমে আমরা এক মুক্তিযোদ্ধার লাশের মুখোমুখি হই। আমাদের বলা হলো এই মৃত মুক্তিযোদ্ধা ঢাকা ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিভার্সিটির ছাত্র। তার সঙ্গে আরো পাঁচজন বন্ধু ছিলেন। সবাই একটা ইউনিটে যুদ্ধ করতেন। আমরা পৌঁছবার আগের দিন রাতে পরিত্যক্ত একটা বৃহৎ বাঁশবনের মধ্যে এই ছয় যোদ্ধা মুখোমুখি যুদ্ধে পতিত হয়। গতরাতের শেষে বাঙ্কার থেকে মাথা উঠাবার সঙ্গে সঙ্গে ধানক্ষেতে থেকে মুখোমুখি তাকে গুলি করা হয়। ভোর থেকে এই লাশ বেলা ১২টা পর্যন্ত বাঁশবনে পড়ে ছিল। এই লাশ উদ্ধার করা প্রথমে সম্ভব ছিল না। আমরা যখন বেলা ১টায় সেখানে পৌঁছলাম তখন তাকে বাঁশবন থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের গোরস্তানে নিয়ে যাওয়া হয়।
সে সময় আমাদের বড় অসহায় মনে হয়েছে। বীর মুক্তিযোদ্ধা সন্তানের লাশ সামনে নিয়ে আমরা দাঁড়িয়েছিলাম। ক্যাপ্টেন হুদার নির্দেশে এই যোদ্ধার মৃতদেহ কোথাও প্রেরণ করা হলো। যুদ্ধক্ষেত্র পর্যবেক্ষণের সেই দিনটা আমাদের এভাবেই শুরু হয়েছিল।

এই বিশেষ যুদ্ধক্ষেত্রের নেতাদের সঙ্গে গ্রামবাসীর সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। আমরা যখন গিয়েছি তখন উক্ত এলাকার গ্রামবাসীরা (কৃষক, জেলে) রাতে থাকত না, তারা নদী পার হয়ে ভারতের দিকে চলে আসত। এমনকি রাতের বেলা গ্রামবাসীর ঘরবাড়ি উন্মুক্ত থাকত। কেবল আমাদের মিত্র সৈন্যবাহিনী রাতের বেলা উক্ত এলাকায় থাকবার অনুমতি পেয়েছিল।

সাধারণ গ্রামবাসীর ব্যবহারে ভাষারও অনেক পরিবর্তন হয়ে গেছে, যেমন : হালট দিয়ে কেউ গেলে বাঙ্কার থেকে প্রশ্ন করা হতো হুকুমদার! অর্থাৎ (Who comes there)। এভাবে বিকৃত শব্দ কেবলমাত্র গ্রামের ব্যক্তিদের বোধগম্য হয়ে থাকত। এমন অনেক শব্দ ও চরণ বিকৃত হয়েছে। সেই সময় আমাদের এই জাতীয় শব্দ লিখিয়ে দেয়া হয়েছিল।

আমাদের সেদিন ৫টার পূর্বে এলাকা ছেড়ে আসতে বলা হয়েছিল। তার পর কারফিউ শুরু হবে। কিন্তু আমরা গ্রামের রাস্তাতেই আটকা পড়ে যাই। এবং বলা হয় যে নদীর ঘাটে পারাপারের ‘গুদারা’ ৫টায় বন্ধ হয়ে যায়। সুতরাং আপনাদের এ পারে কোথাও আশ্রয় নিতে হবে।

আমাদের কোথাও আশ্রয় নেয়ার সুযোগ ছিল না। প্রতিদিন এই যুদ্ধ এলাকা থেকে সাধারণ নাগরিক ও কৃষকরা বিকালে বাড়িঘর ত্যাগ করে। আমরা কোনো উপায় না দেখে এক অবস্থাবান কৃষকের ঘরে আশ্রয় নেই। ঘরের দরজা খোলা ছিল। আমরা সেই ঘরে ঢুকে পড়ি, রাতে কিছু খাবার মেলেনি কিন্তু ঘুমোবার একটা আশ্রয় সেই ঘরেই পেয়েছিলাম।

আমরা পরদিন সকালে উন্মুক্ত গৃহ রেখে, টাকি নদী পার হয়ে গুদারায় ভারতে যাই। অক্টোবরের এক প্রত্যুষ আমরা ভিন দেশে কলকাতায় উদ্বাস্তু সাংবাদিক হিসেবে প্রত্যাবর্তন করি।

[ad#bottom]