কার জয়, কার পরাজয়

< ![CDATA[সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
একাত্তরে কার জয় ঘটেছে এবং কার পরাজয় সেটা তো দৃশ্যমানই ছিল। জয় বাংলাদেশের মানুষের, পরাজয় হানাদার পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর। কোনো বিশেষ দল, গোষ্ঠী বা শ্রেণীর নয়, জয় পুরো জনগণের, তাদের ঐক্যের এবং পরাজয়ও কেবল ওই সেনাবাহিনীর নয়, পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদেরও এবং আমাদের ধারণা ছিল তাদের মতাদর্শেরও বটে। কিন্তু সত্যের পেছনেও সত্য থাকে, স্রোতের নিচে থাকে বিপরীত স্রোত, যেটা জয়-পরাজয়ের সঙ্গে সঙ্গে টের পাওয়া যাচ্ছিল, পরে যা আরো স্পষ্ট হয়েছে।

যুদ্ধ শেষে বিজয় দিবসে আমরা উল্লাস দেখেছি। মানুষ পরস্পরকে জড়িয়ে ধরেছে, একে অপরকে অভিনন্দন জানিয়েছে। শত শত মুক্তিযোদ্ধা দেখা গেছে চতুষ্পাশ্র্বে। তারা গাড়িতে করে ঢাকার সব এলাকায় ঘুরেছে, তাদের হাতে অস্ত্র ছিল, সে অস্ত্র তারা আকাশের দিকে উঁচু করে তুলে গুলি ছুড়েছে। উল্লাস তো নয়, কান্নাও ছিল। বহু মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। নিখোঁজ হয়েছে। অসহ্য নির্যাতন সহ্য করেছে। যুদ্ধক্ষেত্রে প্রাণ দিয়েছে, দেশের ভেতরে মৃত্যু এবং জীবন্ত মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েছে। সেই কান্নাটা চাপা পড়ে গিয়েছিল উল্লাসের ভেতরে। কিন্তু সেটা মিথ্যা ছিল না। গুমরে গুমরে কেঁদেছে মানুষ স্বজন হারানোর বেদনায় এবং বহুবিধ যন্ত্রণায়। আরো এক সত্য ছিল। সেটা লুণ্ঠন। পাকিস্তানিরা ৯ মাস ধরে লুট করেছে, তাদের সহযোগীরাও বসে থাকেনি। বিজয়ের পর শুরু হলো বাঙালিদের লুণ্ঠন। সেই সঙ্গে জবরদখল। আজ যখন স্বাধীনতার চলি্লশ বছরে পেঁৗছাতে যাচ্ছি তখন পেছনে ও চারপাশে তাকিয়ে দেখি ওই তিন সত্যই জাজ্বল্যমান_উল্লাস, ক্রন্দন ও লুণ্ঠন। অন্যদিকে পাকিস্তানি হানাদাররা লেজ গুটিয়ে পালিয়েছে ঠিকই, তাদের জাতীয়তাবাদ বাংলাদেশে তো বটেই, এমনকি তাদের নিজেদের দেশেও পরিত্যক্ত হতে চলেছে। কিন্তু তাদের মতাদর্শ? না, সেটা পরাভূত হয়নি। সে প্রসঙ্গে আমরা একটু পর ফিরে আসব।
দেখা যাক চলি্লশ বছরে বাংলাদেশে কী ঘটেছে। উল্লাস কি বৃদ্ধি পেয়েছে?

হ্যাঁ এবং না দুটোই সত্য। কোনো কোনো মহলে বৃদ্ধি পেয়েছে বটে, কিন্তু সেই মহলটা ক্ষুদ্র। এরা মনে করে বিজয় এসেছে তাদের জন্য। বলাটা মিথ্যে হবে না যে জনগণের বিজয়কে এরা আত্মসাৎ করে ফেলেছে। একাত্তরের বিজয়ের দিনে উল্লাসের নিচে চাপা পড়েছিল যে কান্না সেটা কিন্তু দিন দিন আরো ব্যাপক হয়েছে। এভাবে নিরাপত্তাহীনতায়, সামনে কোনো ভবিষ্যৎ না দেখতে পেয়ে মানুষ কাঁদছে। তবে অধিকাংশকেই কাঁদতে হয় নীরবে, কেননা শোনার লোক নেই, সান্ত্বনা দেওয়ার মতো মানুষ পাওয়া যায় না। আর লুণ্ঠন? তার তো কোনো পরিমাপ ও সীমা নেই। লুণ্ঠনই আদর্শ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যার পক্ষে যেভাবে সম্ভব ওই কর্ম সম্পন্ন করছে। একাত্তরের লড়াইয়ের শেষ দিন পর্যন্ত বাংলাদেশকে নিঃশেষ করতে চেয়েছে পাকিস্তানিরা, তারপর শুরু হয়েছে বাঙালিদের নিজস্ব তৎপরতা, সেই সঙ্গে এসেছে বিদেশি বণিকরা, যারা আমাদের তাদের বাজার বানাতে ব্যস্ত এবং অতিশয় উৎসাহী আমাদের খনিজ সম্পদ, সমুদ্র, বিদ্যুৎ উৎপাদন, যাতায়াতের বাহন ও ব্যবসা সব ক্ষেত্রে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে।

কিন্তু বিজয় তো মিথ্যা নয়। আমরা স্বাধীন হয়েছি, নিজস্ব রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছি, যার রাষ্ট্রভাষা বাংলা। তবু বিজয়ের চিহ্নগুলো মলিন হয়ে পড়েছে সুযোগপ্রাপ্তদের উল্লাস ও লুণ্ঠন এবং বিপুলসংখ্যক মানুষের ক্রন্দনসিক্ত দারিদ্র্য ও দুর্ভোগের কারণে। রাষ্ট্রভাষা বাংলার কথাই ধরা যাক। সেটা যে কার্যকর হয়েছে তা নয়। উচ্চশিক্ষা ও উচ্চ আদালতে বাংলা ভাষা চালু হয়নি। ইংরেজি মাধ্যমের ও মাদ্রাসা পদ্ধতির শিক্ষা মূল ধারার শিক্ষার বিপক্ষে দুই বিপরীত দিক থেকে কাজ করে যাচ্ছে। শ্রমজীবী যে মানুষরা লড়াই করেছে তাদের অবস্থার উন্নতি হয়নি। বহু কৃষক উদ্বাস্তু হয়েছে। হিন্দু সম্প্রদায়ের বহু সদস্য দেশ ছেড়ে চলে গেছে। কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পায়নি_না জীবিকার কর্ম, না জীবনের কর্ম। বেড়েছে জনসংখ্যা এবং মাদকাসক্তি। সহিংসতা কমেনি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের কথা পাকিস্তান আমলে শোনা যায়নি, বাংলাদেশ আমলে তা প্রতিনিয়ত ঘটেছে।

বাংলাদেশে আবার সামরিক শাসন আসবে এটা ছিল অকল্পনীয় অথচ সেটা ঘটেছে; তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দরকার হবে সেটাই বা কে কবে ভেবেছিল অথচ তা পাওয়া গেছে। বৈষম্য বেড়েছে, কমেছে দেশপ্রেম। তালিকা দীর্ঘ করা সহজ, যাতে প্রমাণ পাওয়া যাবে, বিজয়ের নিদর্শনগুলো হয় নিষ্প্রভ, নয়তো অনুপস্থিত। যা থেকে বোঝা যাবে, পাকিস্তানিরা হেরে গেছে ঠিকই, কিন্তু বাংলার মানুষ জয়ী হয়নি।

কেন এমনটা ঘটল? ঘটল এই জন্য যে একাত্তরে যে যুদ্ধটা ছিল সমষ্টিগত, বিজয়ের পরমুহূর্ত থেকেই তার বিজটা হয়ে পড়ল ব্যক্তিগত। এই যে উল্লাস, ক্রন্দন ও লুণ্ঠন সে সবই ব্যক্তিগত ব্যাপার বলে দেখা গেল। দলে দলে মুক্তিযোদ্ধা আত্মপ্রকাশ করল। প্রত্যেকেই নিজ নিজ কৃতিত্বের ও বীরত্বের দাবিদার। মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা তৈরি হলো, তাদের বীরত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ উপাধি দেওয়া শুরু হয়ে গেল। একাত্তরে শিক্ষালয়ে ক্লাস হয়নি, কিন্তু সীমিত সিলেবাসে পরীক্ষা নিয়ে প্রমোশন দেওয়া হলো। চাকরিতে উন্নতি ঘটল। ব্যবসা-বাণিজ্যের সুযোগ বাড়ল।

জায়গাজমি, বসতবাড়ি, কলকারখানা, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান দখল করা শুরু হলো, জলাভূমি ও নদী বাদ রইল না। সব কিছুই ব্যক্তিগত হয়ে যাওয়া শুরু হলো। যেন যুদ্ধটা ছিল ব্যক্তির সুবিধার জন্য, সমষ্টির নয়। অথচ সমষ্টিগত মুক্তির স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষাই ছিল মুক্তিযুদ্ধের পেছনে চালিকাশক্তি।

সবার মুক্তির জন্য প্রয়োজন ছিল বৈষম্যহীন সমাজ গঠন অর্থাৎ সমাজ বিপ্লব। অপরিহার্য ছিল রাষ্ট্রক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ। সেসব ঘটেনি। কারণ ব্যক্তিগত মুনাফাকে প্রধান করে তোলা। উপাধি বিতরণের ব্যাপারটা যথেষ্ট ইঙ্গিতবহ। ব্রিটিশ আমলে রাষ্ট্রীয়ভাবে খানবাহাদুর, রায়বাহাদুর_এসব উপাধি দেওয়া হতো, অনুগতদের। পাকিস্তান আমলেও নানা ধরনের তমঘার প্রবর্তন ঘটানো হয়েছিল। কিন্তু বাংলাদেশ তো প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যুদ্ধের ভেতর দিয়ে পুরনো রাষ্ট্রকে ভেঙে ফেলে; যাঁরা মুক্তিযোদ্ধা তাঁরা তো রাষ্ট্রের অনুগত নন, তাঁরা ছিলেন রাষ্ট্রদ্রোহী, নতুন রাষ্ট্র তাঁদের কেন পুরনো প্রথায় সম্মানিত করতে যাবে? তা ছাড়া মুক্তিযুদ্ধে তো কেউ ব্যক্তিগত লাভ-লোকসানের হিসাব কষে যোগ দেয়নি, অথবা কেউ যদি যোগ দিয়ে থাকে তবে যতই সে বীরত্ব প্রদর্শন করুক না কেন তাকে মুক্তিযোদ্ধা বলা যাবে না, কেননা যুদ্ধটা ছিল সমষ্টিগত মুক্তির। সমাজ হবে বৈষম্যহীন এটাই ছিল আশা, কিন্তু সে জায়গায় রাষ্ট্রীয় উদ্যোগেই বৈষম্য তৈরি করা হলো। সুযোগপ্রাপ্ত মরিয়া হয়ে উঠল সুযোগ বৃদ্ধিতে। মুক্তিযুদ্ধের তালিকা তৈরি করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সেই ফাঁকে বহু ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার আত্মপ্রকাশ ঘটেছে। তারা সার্টিফিকেট সংগ্রহ করে নিয়েছে এবং চাকরির ব্যাপারে বিশেষ সুবিধা ও উন্নতি আদায় করতে বিলম্ব করেনি। যেন উৎকোচ প্রদান। উৎকোচ জিনিসটা প্রাচীন; সংস্কৃত ভাষায় এর ব্যবহার রয়েছে, ফার্সি ভাষায় বলা হয় বখশিশ, ইংরেজরা বখশিশের প্রচলন করেছিল, যার সেবাকর্মে খুশি হয়েছে, তাকে সশব্দে পিঠ চাপড়ে দিয়েছে, টাকা প্রদানের মাধ্যমে। কিন্তু স্বাধীন ও অগ্রসর বাংলাদেশে তো বখশিশে কুলাবে না, এখানে উৎকোচ আবশ্যক হয়েছে এবং উৎকোচ প্রদান এমনভাবে চলছে যে ওটি না দিলে এক পা এগোনো যায় না, ট্রাফিক জ্যামের চাইতেও কঠিন অচলায়তন তৈরি হয়। সূত্রপাত মনে হয় মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের বিনিময়ে ওই বহুব্যবহার্য সার্টিফিকেট বিতরণের মধ্য দিয়েই।

এক অর্থে একাত্তরে বাংলাদেশের সবাই তো মুক্তিযোদ্ধা, মুষ্টিমেয় রাজাকার, আলবদর বাদ দিয়ে। তালিকা প্রণয়ন আবশ্যক ছিল দেশদ্রোহীদের, রাজাকার, আলবদরদের, যাতে কেবল আইনগতভাবে নয়, সামাজিক বয়কটের মধ্য দিয়েও তাদের অপরাধের শাস্তির ব্যবস্থা করা যায়। খুবই জরুরি ছিল পাকিস্তানি হানাদারদের ভেতর নিকৃষ্টতম দুষ্কৃতকারী ছিল যারা তাদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর জন্য আন্তর্জাতিক উদ্যোগ নেওয়া। সেটা নেওয়া হয়নি। ফলে হানাদার ও তাদের স্থানীয় দোসররা উভয়েই গা ফুলিয়ে বেড়াবার সুযোগ পেয়েছে। ওদিকে কোটি কোটি মুক্তিযোদ্ধার ভাগ্যে পরিবর্তন ঘটেনি, অনেকেরই বরঞ্চ দুর্দশা বৃদ্ধি পেয়েছে।

উপাধি বিতরণের ক্ষেত্রে সর্বাধিক অদূরদর্শিতার ও বিচক্ষণতার অভাব দেখা গেছে নির্যাতিত মেয়েদের বীরাঙ্গনা উপাধি দেওয়ায়। যাঁরা দিয়েছেন তাঁরা অবশ্য ধারণাই করতে পারেননি যে ওই উপাধি কেমন বিড়ম্বনার কারণ হতে পারে। নির্যাতিতরা তাঁদের নির্যাতনের খবর প্রকাশ করে গৌরবান্বিত হবেন এমনটা ভাবার কোনো কারণই ছিল না। আমরা যারা তাদের নির্যাতন থেকে রক্ষা করতে পারিনি ব্যাপারটা তাদের জন্যও বিশেষভাবে অপমান ও লজ্জার বিষয়। অপমান ও লজ্জাকেই গৌরবজনক বলে মনে করা হয়েছে।

কিন্তু আজ মুক্ত বাংলাদেশে মেয়েদের ওপর যে নির্যাতন চলছে তাতেও তো সমাজকে বিশেষভাবে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত বলে মনে হচ্ছে না। যৌন হয়রানি ঘরে-বাইরে সর্বত্র চলছে। শিক্ষায় ও কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণের দিক দিয়ে মেয়েরা অনেকটাই এগিয়েছে; কিন্তু তাদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তাহীনতা যে কমেনি বরঞ্চ বৃদ্ধি পেয়েছে তাতেই ধরা পড়ছে এই সত্য যে বিজয় আমাদের মুক্তি দেয়নি। লোকে অপরাধকে এখন আর অপরাধ বলে দেখে না, মনে করে দুর্ঘটনা, যে দুর্ঘটনা ঘটবেই, থামানো যাবে না। এ মনোভাবের সূত্রটি প্রোথিত রয়েছে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ব্যাপারে আমাদের ব্যর্থতার ভেতরে। গণহত্যার মতো অত বড় অপরাধের যখন বিচার হলো না, তখন অন্য অপরাধের বিচার হবে এমনটা আশা করা বৃথা_জনগণের মনোভাবটি দাঁড়িয়েছে এ রকমেরই।

ব্যবসা-বাণিজ্য খুবই বেড়েছে। মান-সম্মান, বিচার, নিরাপত্তা চিকিৎসা, শিক্ষা_সব কিছুই পণ্যে পরিণত হয়ে গেছে। কারো ব্যক্তিগত পরিচয়লিপিতে যখন লেখা দেখি তিনি বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা এবং প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী তখন বুঝি মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে ভ্রান্তিটা কেমন গভীর। মুক্তিযুদ্ধ ও ব্যবসা তো একসঙ্গে যায় না, যাওয়ার কথা নয়। আর কেউ যদি উভয় ক্ষেত্রে দক্ষতার পরিচয় দেন তবে তো বুঝতেই পারা যায় তার একটি পরিচয় মিথ্যা। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ এবং ব্যবসায় সাফল্য_এই দুই বিপরীতকে যখন অভিন্ন বলে বিবেচনা করা হয় তখন এটা অস্পষ্ট থাকে না যে যুদ্ধের ব্যাপারে আমাদের সাংস্কৃতিক প্রস্তুতি ছিল খুবই সামান্য। সন্দেহ কী যে সেই অপ্রস্তুতির বিভ্রম এখন সর্বত্র বিস্তার লাভ করেছে। কেবল তা-ই নয়, আত্মত্যাগের ঘটনা নয় ব্যবসায়ের সাফল্যই এখন প্রধান গৌরবের বিষয় হয়ে উঠেছে, যেদিকে তাকাই সেদিকেই।

বলছিলাম পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদ পরাভূত হয়েছে ঠিকই, কিন্তু তাদের মতাদর্শ পরাজিত হয়নি, সেটা রয়ে গেছে, এমনকি বাংলাদেশেও। ব্যবসার সাফল্য নিয়ে বড়াই করাটা তারই নিদর্শন। মতাদর্শটা কী ছিল? সেটা হলো পুঁজিবাদী আদর্শ। ইংরেজ শাসকরা ঘোষিতরূপের পুঁজিবাদী ছিল, পাকিস্তানি শাসকরাও তাই। সাম্রাজ্যবাদী ইংরেজ যা করতে চেয়েছে, উপনিবেশবাদী পাকিস্তানিরাও সেই পথ ধরেই চলেছে। বাংলাকে তারা শোষণ করতে চেয়েছে পুঁজিবাদী পথে। যে লড়াইটা আমরা করলাম সেটা ছিল ওই পুঁজিবাদী মতাদর্শের বিরুদ্ধেই। হানাদার সৈন্যরা হেরে গিয়ে, তাদের দ্বিজাতিতত্ত্বও পরিত্যক্ত হয়েছে; কিন্তু আদর্শটা অপরাজিতই রয়ে গেল। বরঞ্চ সে সাময়িকভাবে পশ্চাদপসরণের পর দ্বিগুণ ত্রিগুণ বহুগুণ শক্তিতে লম্ফ দিয়ে উন্নত হয়ে উঠেছে। এই যে সমাজে অরাজকতা দেখছি, প্রবল দুর্বলকে শোষণ করে চলেছে, মুনাফা ছাড়া লোকে কিছু বোঝে না, সব কিছু ব্যক্তিগত হয়ে যায়, ন্যায়-অন্যায় বোধ অর্থলোভের দাসানুদাসে পরিণত হয়, ভোগ-লালসা সর্বগ্রাসী হয়ে ওঠা, রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার ফিরে আসে_এসবই পুঁজিবাদের অপ্রতিহত অগ্রগতির অনুষঙ্গ। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা আমরা ঘটা করে বলে থাকি, কিন্তু সেই চেতনাটা যে চরিত্রগতভাবেই পুঁজিবাদবিরোধী সেটা বুঝতে চাই না। আসল সত্য এই যে ইংরেজ আমলে যেমন পাকিস্তান আমলেও তেমনি জাতীয়তাবাদী নেতারা পুঁজিবাদবিরোধী তো কখনোই না, বরঞ্চ ওই মতাদর্শেই দীক্ষিত ছিলেন। তাঁরা বিদেশি শাসকদের বিরুদ্ধে লড়েছেন, সে লড়াইতে জনগণকে সঙ্গে নিয়েছেন, জনগণও যোগ দিয়েছে, পুঁজিবাদ প্রতিষ্ঠার জন্য নয়, নিজেদের মুক্তির জন্য, যে মুক্তি পুঁজিবাদকে পরাজিত না করে মুক্তি অর্জন করা সম্ভব নয়। মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বেও জাতীয়তাবাদীরাই ছিলেন, পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদীদের বিতাড়ন করার পর তাঁরা নিজেদের মতাদর্শ প্রতিষ্ঠা করেছেন। তাঁদের চোখে ধর্মকে পুঁজি করে যারা রাজনীতি করে তারা প্রধান শত্রু ছিল না, প্রধান শত্রু ছিল পুঁজিবাদবিরোধী বামপন্থীরা; যে জন্য দেখি রাজাকার-আলবদররা কেবল যে শাস্তি থেকে অব্যাহতি পেয়েছে তা-ই নয়, রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে পুনর্বাসিতও হয়ে গেছে; কিন্তু বামপন্থীদের নির্যাতন ও উৎকোচ প্রদান_উভয় প্রকারের ঐতিহাসিক পদ্ধতিতেই নিরন্তর পর্যুদস্ত করা হয়েছে। একাত্তরে পুঁজিবাদী বিশ্বের কর্তারা একাট্টা হয়ে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল। কারণটা বাঙালিবিদ্বেষ বা পাঞ্জাবিপ্রেম নয়, আসল ঘটনা ওই যুদ্ধে শেষ পর্যন্ত বামপন্থীরাই নেতৃত্ব নিয়ে নেবে এই আশঙ্কা। আমেরিকার হেনরি কিসিঞ্জার ও বাংলাদেশের গোলাম আযমের ভেতর কোনো দিক দিয়েই মিল আছে বলে মনে হবে না, কিন্তু মুক্তিসংগ্রামের বিরোধিতায় তারা যে এক হয়েছিলেন সেই মহব্বতের শক্ত ভিত্তি অবশ্যই ছিল, সেটা হলো পুঁজিবাদে আস্থা। বললে কী অতিরঞ্জন হবে যে একাত্তরের যুদ্ধে আমরা জিতেও জয়ী হতে পারিনি, কেননা পুঁজিবাদকে পরিত্যাগ করে আমরা সামনে এগিয়ে যেতে পারিনি। সংবিধানে সমাজতন্ত্রের কথা ছিল, সেটি তো নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছেই, এমনকি গণতন্ত্রেরও কার্যকারিতা চোখে পড়ছে না। পুরনো ব্যবস্থাই রয়ে গেছে, পুঁজিবাদের একটি দৃষ্টিগ্রাহ্য লক্ষণ হচ্ছে বর্ণবৈষম্য বৃদ্ধি; বাংলাদেশে সেটি উত্তুঙ্গ হয়ে উঠেছে। পুঁজিবাদের জয়ের কারণে মানুষ আজ বড়ই অসহায়। গরিব মানুষ ক্ষুদ্রঋণের জালে ধরা দিয়েছে, যেন অতি-উচ্চহারে সুদ দিয়ে তারা দারিদ্র্য থেকে মুক্তি পাবে। ওই জাল যে সত্যি সত্যি জাল বটে, কাবুলিওয়ালার আলিঙ্গনের তুলনায় মোটেই নরম নয়, তা প্রমাণিত হয়েছে। সম্পদ তো বিক্রি হচ্ছেই, বাংলাদেশের দারিদ্র্যও নানাভাবে বাজারজাত করা হচ্ছে। ওদিকে ক্ষুদ্র সঞ্চয়কারীরাও বিপদে পড়েছে। তারা টাকা রাখত ব্যাংকে, চেষ্টা করত সঞ্চয়পত্র কেনার মধ্য দিয়ে কিছুটা হলেও নিশ্চিত আয়ের ব্যব]]

>