বিশ্বব্যাংকের নানা শর্ত, পদ্মা সেতুর কাজ পিছিয়ে গেল

আশরাফ খান: শুধুমাত্র বিশ্বব্যাংকের অনাকাঙ্ক্ষিত হস্তৰেপ ও দীর্ঘসূত্রতার কারণে পদ্মা সেতু প্রকল্প বাস্তবায়ন কাজ পিছিয়ে পড়লো। একের পর এক অবাঞ্ছিত শর্তের বেড়াজালে ফেলে এ প্রকল্পে তাদের অর্থ পাওয়াও অনিশ্চিত করে রেখেছে তারা।

এ অবস্থায় বিশ্বব্যাংক নতুন করে কোন শর্ত আরোপ করলে বা অর্থ ছাড় করতে দীর্ঘসূত্রতার আশ্রয় নিলে সরকার নিজস্ব সম্পদেই সেতুর নির্মাণকাজ শুর্ব করার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

সেতু বিভাগ সূত্রে জানা যায়, তারা যতটা দ্র্বততার সঙ্গে কাজ এগিয়ে নিয়েছেন বিশ্বব্যাংক ততটাই সময়ৰেপণ করছে। সর্বশেষ তারা নতুন করে প্রাক-যোগ্যতা নির্বাচনের শর্ত দেয়ায় কাজ আরও তিন মাস পিছিয়ে গেল। এ ব্যাপারে তারা দ্র্বত সিদ্ধান্ত দিলে চূড়ান্ত ঠিকাদার নির্বাচনের জন্য দরপত্র আহ্বান, ঠিকাদার নির্বাচন, এতে বিশ্বব্যাংকের সম্মতি নেয়া এবং ঠিকাদার কর্তৃক সরঞ্জামাদি এনে বাস্তব নির্মাণ কাজ জুলাই নাগাদ শুর্ব করা সম্ভব হবে। আর বিশ্বব্যাংক সময় নিলে তাদের অর্থায়নে সরকারের মেয়াদকালে নির্মাণকাজ শেষ করা সম্ভব হবে না।

সূত্র জানায়, সেতুর মধ্যভাগে র‌্যাকিং বোরিং-এর জন্য সাব-কন্ট্রাকটর নিয়োগ করা নিয়ে বিশ্বব্যাংক এখন প্রশ্ন তুলেছে। বিশ্বব্যাংকের গাইড লাইনে মূল সেতুর নির্মাণ কাজের জন্য ঠিকাদার নিয়োগ করার আগেই সেতুর মধ্যভাগে র‌্যাকিং বোরিং-এর জন্য সাব-কন্ট্রাক্টর নিয়োগের শর্ত ছিল না। নকশা অনুযায়ী সেতুর দু’প্রান্তেই পাইলিংয়ের জন্য বোরিং করা হবে। মাঝখানটায় হবে র‌্যাকিং বোরিং। সেতু নির্মাণে আন্তর্জাতিক খ্যাতি ও অভিজ্ঞতাসম্পন্ন পাঁচটি নির্মাতা সংস্থা আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে প্রাক-যোগ্য নির্বাচিত হয়। ১১ জন প্রতিযোগীর মধ্যে পাঁচ জনের নাম সুপারিশ করে ‘ম্যানসল’ নামক বিশেষজ্ঞ পরামর্শক। বিশ্বব্যাংকের সুপারিশে ও সম্মতিতেই ‘ম্যানসল’কে পদ্মা সেতুর প্রকল্পের কনসালট্যান্ট নিয়োগ দেয়া হয়। মূল্যায়ন শেষে কনসালট্যান্ট অনুমোদনের জন্য প্রাক-যোগ্য হিসেবে নির্বাচিতদের নাম গত জুনে তাদের ডকুমেন্টসহ বিশ্বব্যাংকসহ সব উন্নয়ন সহযোগীর কাছে পাঠানো হয়। এটাও করা হয় বিশ্বব্যাংকের শর্ত অনুযায়ী। এছাড়াও অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন মন্ত্রণালয়ের বিশেষজ্ঞ কমিটি স্বাধীনভাবে মূল্যায়ন করে। দু’টো মূল্যায়নই যথাযথ থাকার পরও বিশ্বব্যাংক সম্মতি না জানিয়ে চার মাস পর প্রাক-যোগ্যতার শর্তাবলী পরিবর্তন করে নতুন করে দরপত্র আহ্বানের শর্ত দেয়।

ম্যানসল ও মন্ত্রণালয়ের বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়নে সামসং সিঅ্যান্ডটি করপোরেশন, কোরিয়া, চায়না মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং কোং লি., চায়না, ডেলিম-বাম-ভিসি আই (যৌথ উদ্যোগ), কোরিয়া, ভিনচি-এইচসিসি (যৌথ উদ্যোগ) ভারত এবং চায়না কমিউনিকেশন কনস্ট্রাকশন কোম্পানি লি., চায়না- এই পাঁচটি প্রতিষ্ঠান প্রাকযোগ্য বিবেচিত হয়। প্রাক-যোগ্যতা প্রতিযোগিতায় এরা সকলেই দুই প্রান্ত থেকে পাইলিং, বোরিং এবং টেকনিক্যাল বিডিং-এর আগে র‌্যাকিং পাইলিংয়ের জন্য সাব-কন্ট্রাক্টর নিয়োগ করার কথা জানায়। বিশ্বব্যাংক আপত্তি জানিয়েছে, র‌্যাকিং পাইলিংয়ের জন্য সাব-কন্ট্রাক্টর নিয়োগ করা হয়নি বলে প্রাক-যোগ্য ঠিকাদারদের প্রস্তাব গ্রহণযোগ্য নয়। তাদের কথা অনুযায়ী এদের প্রাক-যোগ্যতা নির্বাচন বাতিল করা হয়। অথচ প্রধানত বিশ্বব্যাংকেরই অর্থায়নে বঙ্গবন্ধু যমুনা সেতু নির্মাণের সময়ও সেতুর মধ্যভাগে র‌্যাকিং পাইলিং করা হয়। এ জন্য সাব-কন্ট্রাক্টরও নিয়োগ করা হয় টেকনিক্যাল বিডিংয়ের আগে। উলেৱখ্য, প্রাক-যোগ্য নির্বাচিত পাঁচটি কোম্পানির প্রস্তাব এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক, জাইকা, ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংকের কাছেও পাঠানো যায়। তারা সবাই তা মেনে নেয়। আপত্তি তোলে শুধু বিশ্বব্যাংক।

সরকার বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে বিরোধে না জড়িয়ে তাদের শর্ত অনুযায়ী পুনরায় প্রাক-যোগ্যতা যাচাইয়ের জন্য দরপত্র আহ্বান করে। দ্বিতীয় দফা দরপত্রে প্রথম দফায় অংশগ্রহণকারী ১১টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ছয়টি প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়নি। সূত্র জানায়, প্রথম দরপত্র মূল্যায়নে যে পাঁচটি প্রতিষ্ঠান প্রাক-যোগ্য নির্বাচিত হয় দ্বিতীয় বারেও সেই পাঁচটি এবং নতুন আরও পাঁচটি কোম্পানি অংশ নেয়। প্রথম টেন্ডারে প্রাক-যোগ্য নির্বাচিত পাঁচটি প্রতিষ্ঠানই দ্বিতীয় দফা দরপত্র মূল্যায়নে যোগ্য বিবেচিত হয়েছে। কনসালট্যান্টের সুপারিশসহ মূল্যায়ন প্রতিবেদন অনুমোদনের জন্য ডিসেম্বরের মাঝামাঝি বিশ্বব্যাংক সদর দপ্তরে পাঠানো হবে। সেতু বিভাগ আশঙ্কা করছে, বিশ্বব্যাংক আবারও কোন ছুতা ধরে অনুমোদন প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত করতে পারে। বিশ্বব্যাংকের পদ্মা সেতু প্রকল্পের টাস্ক টিম লিডার হচ্ছেন মাসুদ আহমদ নামক একজন পাকিস্তানি নাগরিক। তার মতামতকে প্রাধান্য দিয়েই বিশ্বব্যাংক সদর দপ্তর বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। এর আগে পদ্মা সেতুতে অর্থায়ন বঙ্গবন্ধু যমুনা সেতুর ওপর চলাচলকারী সব ধরনের যানবাহনে করারোপের শর্তসাপেৰ করা হয়।

পদ্মা সেতু প্রকল্পে ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংক ১৪০ মিলিয়ন ডলার, এডিবি ৬৫০ মিলিয়ন ডলার দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে তা বাংলাদেশ সরকারকে জানিয়েছে। জাইকা দেবে ৩০০ মিলিয়ন ডলার। প্রধানমন্ত্রীর সফরকালে জাপান পদ্মা সেতুতে অতিরিক্ত ১০০ মিলিয়ন ডলার অর্থায়নের ঘোষণা দিয়েছে। দীর্ঘসূত্রতার কারণে প্রকল্প ব্যয় বেড়ে এখন ১৮ হাজার কোটি (২ দশমিক ৯৩ বিলিয়ন ডলার) টাকা দাঁড়িয়েছে। উন্নয়ন সহযোগীরা দেবে মোট ১৪ হাজার কোটি টাকা এবং সরকারিভাবে সংস্থান করা হবে বাকি ৪ হাজার কোটি টাকা। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রথম পদ্মা সেতু প্রকল্পের পরিকল্পনা নিয়েছিলেন। তখন প্রকল্প ব্যয় ধরা হয়েছিল ৮শ’ কোটি টাকা।

যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন বিশ্বব্যাংকের অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণ সম্পর্কে কোন মন্তব্য না করে বলেন, শিগগিরই প্রকল্প বাস্তবায়ন কাজ শুর্ব হবে। দুই প্রান্ত থেকে সমান তালে কাজ করা হবে বলে সরকারের মেয়াদকালেই সেতু চালু করা সম্ভব হবে। তিনি বলেন, বিশ্ব ব্যাংকের প্রতিশ্র্বত ১ দশমিক ২০ মিলিয়ন ডলার এবং অতিরিক্ত আরও ৩০০ মিলিয়ন ডলার ঋণের জন্য এ মাসেই আলোচনা হবে।

সূত্র জানায়, আগামী জানুয়ারি মাসে ঋণ অনুমোদনের প্রস্তাব বিশ্বব্যাংকের বোর্ড সভায় উপস্থাপিত হবে।

[ad#bottom]