পুতুলনাচের ইতিকথার গাওদিয়ায়

স্বকৃত নোমান
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাসগুলোর মধ্যে শ্রেষ্ঠ যে তিনটি উপন্যাস আছে তন্মধ্যে পুতুলনাচের ইতিকথা একটি। শ্রেষ্ঠ’র মধ্যেও আবার শ্রেণীভেদ আছে। এটি প্রথম দুই শ্রেষ্ঠ’র একটি। কারণ পদ্মানদীর মাঝি এবং পুতুলনাচের ইতিকথাকে শিল্পের বাটখারায় রাখা হলে দুটির ওজনই হবে সমান সমান।

হেমনত্মের এক সকালে পতুলনাচের ইতিকথার পটভূমি গাওদিয়া গ্রামখানি দেখতে চলে যাই বিক্রমপুরের পদ্মাপারে। এ গ্রামেই মানিকের মাতুলালয়। উপন্যাসের একটি পটভূমি থাকে বটে, কিন্তু কাহিনীর সবই তো আর বাসত্মব হয় না। ছিটেফোঁটা বাসত্মবকে কেন্দ্রে রেখে কাহিনীকার এমন একটা কল্পনার জগত তৈরি করেন, পাঠক কিছুতেই বুঝতে পারে না কোনটি বাসত্মব আর কোনটি কল্পনা। কথাটি জেনেও পুতুলনাচের ইতিকথার হারম্ন ঘোষ, শশী ডাক্তার, গোপাল, যাদব, পাগলদিদি, কুসুম, যামিনী কি সেনদিদি ইত্যাদি চরিত্রগুলোর ঘরবাড়ি, হাটবাজার, চলাচলের পথ ইত্যাদি খুঁজে বেড়ায় চোখ। প্রায় পৌনে এক শতাব্দী আগে রচিত উপন্যাসের চরিত্রগুলো যে বেঁচে নেই তা কি আর বলার অপেৰা রাখে! এমনও তো হতে পারে উপর্যুক্ত নামের কেউ এই গ্রামে কখনোই ছিল না, সবই লেখকের কল্পনাপ্রসূত। তাতে কি, মুগ্ধ পাঠক এত কিছু মানতে নারাজ। সে সবই বাসত্মব বলে ধরে নিতে চায়। সে ধরে নিতে চায় এখানেই, এ গাওদিয়া গ্রামেই উপন্যাসের সব চরিত্রের বসবাস ছিল। বজ্রাহত হারম্ন ঘোষ এ গ্রামের কোনো এক খালের ধারেই প্রকা- বটগাছের গুঁড়িতে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল, এখানাকার কোনো এক বাড়ির গোবর-লেপা ঘরেই ছিল যামিনী কবিরাজ কি সেনদিদির বসতি, এখানকার কোনো পুকুরের ধারেই কুসুম আর শশী দাঁড়িয়ে কথা বলেছিল, গ্রাম সংলগ্ন পদ্মানদীর পারেই ছিল নন্দলালের পাট জমা করার চালা, কিংবা শ্রীনাথের দোকান বুঝি এখনো আছে ছোট্ট বাজারটার কোথাও, তালপুকুর বুঝি এ গ্রামের কোথাও অবস্থিত! তাই সে মনের আশ মিটিয়ে সবকিছু দেখে নিতে চায়। গাওদিয়া গ্রামের অর্ধেক এখন নদীর ওপারে। গ্রাম নেই, আছে শুধু চর। পদ্মা ভাঙতে ভাঙতে গ্রাস করেছে এই গ্রামের অর্ধেক। ওপারে এখন বিশাল চর জেগেছে। মাইলকে মাইল চর। চরের ওপারে আবার পদ্মা। ওটিই মূল নদী, চরের এপার দিয়ে যেটি গেছে এটি আসলে শাখা। কার বাড়ি কোথায় ছিল, কার ধানি জমি, গোয়ালঘর কিংবা কার বেগুন কি মরিচ ৰেত কোথায় ছিল, বিসত্মীর্ণ চরে অনুমান করে দখলে নিচ্ছে এখন। তারপর সেখানে ধান বুনছে, ধইঞ্চা ও নানা জাতের শাকসবজির চাষ করছে।

গাওদিয়া বাজার, যেটি একদা ওপারে ছিল, সেটি এখন এপারে চলে এসেছে। একেবারেই গ্রাম্য হাট। হাট সংলগ্ন একটি সরম্ন খাল দেখিয়ে প্রকাশক রিয়াজ খান বললেন, ‘এটিই সেই খাল, উপন্যাসের শুরম্নতে শশী ডাক্তার যে খাল দিয়ে শহর থেকে ফেরার পথে তীরে বজ্রাহত হারম্ন ঘোষকে দেখতে পেয়েছিল।’ কি জানি, হলেও হতে পারে। বাজার থেকে খানিকটা সামনে এগুলে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মাতুলালয়ের ভিটেমাটি এখনো বর্তমান। অর্ধশত বছরের নির্জনতা সেখানে। দেশ ভাগের সময় বসতভিটা ছেড়ে সবাই চলে গেছে ওপারে, কলকাতায়। তারপর থেকেই বাড়িটি পরিত্যক্ত। ভগ্নপ্রায় একটা দালানঘর ছিল বহুদিন, এক ঝড়ে সেটিও উড়ে যায়। এখন আছে মাত্র আধাভাঙ্গা দালান, দালানের ভেতর গজিয়ে ওঠা আগাছা আর আছে মহাশূন্যতা।

এখানে অধিকাংশ বাড়ী কাঠের। এতদঞ্চলের বাড়িঘরের বৈশিষ্ট্যই এমন, লাখ লাখ টাকা খরচ করে কাঠ-টিন দিয়ে পাটাতনের উপর দোতলা ঘর দিয়ে পাটাতনের উপর দোতলা ঘর তৈরি করা। মানুষের বসতবাড়ির কাঠামোর কিছুটা উন্নতি ছাড়া পুতুলনাচের ইতিকথায় গাওদিয়া গ্রামের যে চিত্র পাওয়া যায় এতদিন পর খুব বেশি বদল হয়েছে বলে মনে হয় না। হয়ত হয়েছে, কিন্তু এখনো আছে সেই এঁদো-ডোবা-জঙ্গল-মশা-মাছি, আছে খাল, কচুরিপানার দঙ্গল, আর আছে মেঠো পথ, বিসত্মীর্ণ পদ্মানদী। গ্রাম মানে যাকে বলে একেবারে অজপাড়া গ্রাম। শহরের কোলাহল নেই, ব্যসত্মতা বা চঞ্চলতা নেই। চারদিকে গভীর নির্জনতা। থেকে থেকে নির্জনতা ভেঙ্গে দিয়ে চলে যায় ট্রলার কি ইঞ্চিন নৌকা।

তখন সন্ধ্যা আসন্ন। তেজহীন লাল সূর্য অসত্মাচলে। নদীর জলে সূর্যের দীর্ঘ প্রতিফলন। ঢেউয়ের তালে তালে হেলছে-দুলছে। তারপর মেঘের আড়ালে ডুবে যায় অর্ধেক সূর্য। বাকি অর্ধেক দেখে মনে হয় ঠিক যেন হাঁপর থেকে ওঠানো টকটকে লাল চাপাতি। প্রকৃতির এই মনোমুগ্ধকর শোভা পদ্মানদীর তীরে না এলে সত্যি বোঝা যায় না। শেষ হেমনত্মের সাঁঝে ঠিক এখানে দাঁড়িয়েই হয়ত প্রকৃতির রূপে মুগ্ধ হয়ে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় পুতুলনাচের ইতিকথায় লিখেছিলেন, “পৌষ-পার্বণ আসিয়া পড়িতে আর দেরি নাই। গ্রামে অবিরত ঢেঁকি পাড় দিবার শব্দ শোনা যায়। আকাশে রবির তেজ কমিয়াছে। মাঠে রবিশস্য সতেজ। মানুষের গা ফাটিতে আরম্ভ করিয়াছে। গায়ে যাহার মাটি বেশি, ঘষা লাগিলেই খড়ি উঠিয়া যায়। লেপ-কাঁথা খোলা হইয়াছে, বেড়ার ফাঁকগুলিতে ন্যাকড়া ও কাগজ গোঁজা হইতেছে।”

নদীর ঢালু তীর ধরে আমরা হাঁটতে হাঁটতে চলে আসি রিয়াজ খান কথিত সেই হারম্ন ঘোষের খালের ধারে। একটা বন্ধ দোকানের পাটাতনে বসে পড়ি। সামনেই মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় স্মৃতি পাঠাগার। গাওদিয়া গ্রামে একটি লাইব্রেরী নাই দেখে ‘ও ভগবান, একটা লাইব্রেরী পর্যনত্ম নাই’ বলে শশীর মন একদা অস্থির হয়ে উঠেছিল। এখন হলে শশীকে আর এই আফসোস করতে হতো না। ডাক্তারির অবসরে শশী এই পাঠাগারে এসে অনত্মত বই পড়ার সুযোগ পেত। প্রতিদিন বিকেলে খোলা হয় লাইব্রেরীটি। নিয়মিত দৈনিক পত্রিকাও আসে। গ্রামের পড়ুয়া তরম্নণ-যুবকরা এসে আড্ডা জমায়। পুতুলনাচের ইতিকথার কল্যাণে লৌহজং তথা বিক্রমপুরের এই অজপাড়া গ্রাম গাওদিয়া যে বাংলা সাহিত্যপ্রেমীদের মুখে মুখে ফেরে, তা হয়ত গ্রামের সবাই জানে না, গুটিকতক সচেতন ব্যক্তি ছাড়া। এখানকার বেশিরভাগ মানুষের মানিক পড়া নেই, বাপ-দাদার মুখে হয়ত শুনেছে এ গ্রামে বিখ্যাত এক লেখকের নানাবাড়ি ছিল। কিন্তু সেই লেখক কতটা বিখ্যাত, তা সবাই যথাযথভাবে অনুধাবন করতে পারে বলে মনে হয় না। একটি মাত্র হিন্দু পরিবারের বসতি গ্রামে। বাকিরা মুসলমান। এ গ্রামে কখনোই মানিকের জন্মদিন কি মৃতু্যদিন পালিত হয় না। গহীন অাঁধারে বসতি যাদের সেইসব মানুষের কাছে সাহিত্য বা সাহিত্যিক কোন ছার! শুধু তারা কেন, আমাদের রাষ্ট্রও এ ব্যাপারে উদাসীন। উদাসীন না হলে গাওদিয়ায় মানিকের স্মৃতি রৰার কোনো না কোনো উদ্যোগ নিশ্চয়ই লৰ্য করা যেত। কিংবা ‘মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় স্মৃতি পাঠাগার’ নামে যে প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে, সেটির উন্নয়নে হলেও কোনো না কোনো ভূমিকা রাখত। রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতা নাই-বা থাকল, আমাদের আশাবাদ গাওদিয়ার তরম্নণ-যুবকরা এ পাঠাগারকে রৰা করবেন। একে কেন্দ্র করেই গাওদিয়া থেকে উঠে আসুক আরেক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়।

[ad#bottom]