পুঁজি ও বীজ সঙ্কট নিয়ে মুন্সীগঞ্জে আলু রোপণ শুরু

দেশের বৃহত্তম আলু উৎপাদনকারী জেলা মুন্সীগঞ্জে শুরু হয়েছে আলু আবাদ। তবে এ বছর সার ও জমির ভাড়া গত বছরের চেয়ে কম হওয়ার পরও কৃষকের মধ্যে কোনো প্রাণচাঞ্চল্য নেই। গত বছর আলুর বাম্পার ফলনের পরও লোকসান হওয়ায় কৃষকের হাতে এখন পুঁজির যথেষ্ট অভাব দেখা যাচ্ছে।

এর পরও হতাশ আলুচাষিরা ধারদেনা করে আলু চাষ করছেন। মূলধন সংগ্রহে অনেক আলুচাষির স্ত্রীর গয়না বìধক রাখতে হয়েছে। এ দিকে কিছু হিমাগারে সংরক্ষিত আলুবীজে সঠিক মতো তাপ না দেয়ায় বীজের মান খারাপ হয়ে গেছে। কিন্তু পুঁজির অভাবে নতুন বীজ কিনতে না পারায় বাধ্য হয়ে সেই মানহীন আল বীজই ব্যবহার করছেন। ভুক্তভোগী কৃষকরা সেসব হিমাগার মালিকদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্খা গ্রহণের দাবি করেন।

সরেজমিনে মুন্সীগঞ্জ সদরের মহাকালী, রনছ, কেওয়ার এবং টঙ্গীবাড়ি ও সিরাজদীখান উপজেলা ঘুরে দেখা যায়, কৃষকরা জমিতে আলু আবাদ করতে ব্যস্ত। তারা জমিতে আলু কেইল তৈরি, সার দেয়া, বীজ লাগানো ও নাড়া দেয়ার কাজ করছেন। কিন্তু এত ব্যস্ততার মধ্যে দেখা যায় কৃষকের মুখ মলিন হয়ে আছে।

সদর উপজেলার রনছ এলাকার স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত আলুচাষি মীর সিরাজ জানান, সারের দাম গত বছরের চেয়ে কম, জমির ভাড়াও কম। তার পরও পুঁজির অভাবে অনেক চাষি আলু চাষ করতে পারছেন না। গত বছরে আলুতে চাষিদের উৎপাদন খরচ পর্যন্ত ওঠেনি। আমারই সাত লাখ টাকা লোকসান হয়েছে। আমি গতবার ৯ একর জমিতে আলু চাষ করি। কিন্তু তা কমিয়ে চার একর জমিতে আলু চাষ করছি। তিনি আরো জানান, কম চাষ করলেও আলুর জমি কিন্তু খালি থাকবে না। সব জমিতেই চাষ হবে। সেখানে নতুন চাষিরা আলু চাষ করবেন। এমনই একজন নতুন চাষি সানাউল্লাহ জানান, তিনি রনছ চকে দুই গণ্ডা জমিতে আলু আবাদ করেছেন। তার জমির আলু লাগানো প্রায় শেষপর্যায়ে।
স্খানীয় সূত্র জানায়, জমির ভাড়া গত বছর ছিল প্রতি কড়ায় (পৌনে দুই শতাংশে) এক হাজার ১০০ টাকা। এ বছর সেই জমি কমে ৭০০ থেকে ৮০০ টাকায় নেমে এসেছে। ইউরিয়া গতবার ছিল প্রতি বস্তা (৫০ কেজি) ৬০০ টাকা, এবার ৫৭০ টাকা হয়েছে। টিএসপি ও এমওপি/পটাশ গতবার ছিল এক হাজার ৪০০ টাকা, এ বছর টিএসপি এক হাজার ১০০ টাকা এবং এমওপি/ পটাশ ৭৪০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। তবে বেসরকারিভাবে আমদানিকৃত আলুবীজও চড়া দামে বিক্রি করা হচ্ছে। হল্যান্ড থেকে আমদানিকৃত আলুবীজ গত বছর প্রতি বাক্স ছিল সাড়ে ছয় হাজার টাকা। এ বছর তা বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে আট হাজার থেকে সাড়ে আট হাজার টাকা।

আলুচাষী শাহ আলম জানান, তিনি গত বছর আলু থেকে ৭৫ বস্তা বীজ আলু মিরকাদিম এলাকায় প্রিজন হিমাগারে সংরক্ষণ করেছিলেন। কিন্তু তার আলুতে হিমাগার কর্তৃপক্ষ ঠিকমতো তাপ না দেয়ায় ছয় থেকে সাত ইঞ্চি শেকড় গজিয়েছে। বীজের মান খুব খারাপ হয়ে গেছে। কিন্তু তার পরও সেই বীজ লাগাতে হচ্ছে। কারণ নতুন বীজ কেনার সামর্থ্য তার নেই।

সদর উপজেলার বিএডিসি’র সার ও বীজের ডিলার শাহজাহান গাজী জানান, সার ও বীজ দুই-ই এ বছর তারা কম দামে বিক্রি করছেন। কিন্তু বেশি দামে বীজ বিক্রয়ের অভিযোগ তিনি অস্বীকার করেন। কাটাখালী বাজারের বেসরকারি বীজ বিক্রেতা আব্দুর রহমান জানান, বীজ আমদানি কম হওয়ায় এ বছর হল্যান্ডের বীজ সর্বোচ্চ সাড়ে আট হাজার টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে।

সিরাজদীখান উপজেলার মালখানগর এলাকার আলুচাষি মজিবুর রহমান বলেন, গত বছর আলুতে মার খাওয়ায় এবার পুঁজির অভাবে স্ত্রীর গয়না বìধক রেখে আলু চাষ করতে হচ্ছে। এ বছর লোকসান হলে পথে বসা ছাড়া কোনো উপায় নেই।

এ প্রসঙ্গে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা মো: হাবিবুর রহমান বলেন, আলু চাষ নিয়ে এখন মুন্সীগঞ্জের চাষিরা ব্যস্ত দিন কাটাচ্ছেন। আশা করছি গত বছরের লোকসান এ বছর কৃষকরা কাটিয়ে উঠতে পারবেন। এ বছর আলু আবাদের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হবে বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন।

আবু সাঈদ সোহান মুন্সীগঞ্জ
নয়া দিগন্ত

[ad#bottom]