লৌহজংয়ে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ঘরবাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নির্মাণ করে আর্থিক ক্ষতিপূরণ আদায়ের চেষ্টা!

পদ্মা সেতু
মোহাম্মদ সেলিম
পদ্মা সেতুর অধিগ্রহনকৃত ভূমির অবকাঠামোর ক্ষতিপূরণের টাকা পেতে লৌহজং উপজেলার কুমারভোগ ও মেদিনীমন্ডলের কাজীরপাড়লা এলাকায় হালকা ধরেন ঘরবাড়ি নির্মাণের ধূম পড়েছে। এলাকাবাসী আপেল খান জানান, অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে-ক্ষতি পূরনের অর্থ আদায়ের অসৎ উদ্দেশ্যে এগুলো লোকদেখানো ঘরবাড়ি। কাজীরপাগলা মৌজা খানবাড়ির দক্ষিণ পশ্চিম কর্ণারে এখন দিনরাত কাজ চলছে অল্প খরচে বড় আকারের স্থাপনা নির্মাণে।

এলাকাঘুরে জানা যায়, এক সপ্তাহ ধরে দিনরাত এখানে কাজ চলছে। এলাকার নিলু মির্জা, বুলু মিয়া, মো.আজিজুল, আব্দুল জলিল, খোকন মেম্বারসহ অনেকের জমি ভাড়া নিয়ে এই স্থাপনাগুলো তৈরীর করা হচ্ছে। এই নির্মাণাধীন এই স্থাপনার মালিক এলাকায় না আসলেও জানাগেছে এর মালিকের নবাড়ি গাজীপুরে। তবে নির্মাণকর্মীরা মালিকের বিত্তান্ত বলতে পারছে, বিস্তারিত বলতে পারছেন না জমি মালিকরাও। সর্বোচ্চ এক বছরের জন্য শতাংশ প্রতি এক হাজার টাকা করে এই জমি ভাড়া নেয়া হয়েছে বলে জমির মালিক বুলু মিয়া জানা। এছাড়া কুমারভোগ ও আশপাশের এলাকায় এসব নির্মাণ কাজ হয়েছে আর আগে।

বিভিন্ন সূত্র জানায়, ভূমি মালিক ও অর্থিকভাবে সচ্ছল ব্যক্তিরা এখানে সিন্ডিকেট করে নিচু কৃষি জমিতে বসতঘর, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানসহ নানান ধরনের অবকাঠামো নির্মাণ করছে। সেতুর জন্য যেসকল জমি এখনও অধিগ্রহন করা হয়নি অথচ করা হতে পারে বা খুব শিঘ্রই রেলের জন্য যে সকল জমি অধিগ্রহন করা হবে এমন সব জমিতে একটি এই সিন্ডিকেট চক্র এসকল অবকাঠামো নির্মাণ করে ক্ষতি পূরণ বাবদ অধিক টাকা উপার্জণের জন্য তরিঘড়ি করে নিচু কৃষি জমিতে এখন অবকাঠামো নির্মাণ করছে। আর এসকল অবকাঠামো নির্মাণে একটি এনজিওর কতিপয় অসাধু কর্মকর্তা ও প্রশাসনের কিছু অসৎ কর্মকর্তা ভূমি মালিকদের সাথে জোগসাজস করে পরামর্শ দিয়ে অবকাঠামো নির্মাণে সহযোগিতা করছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

ঢাকা-মাওয়া মহাসড়কের মাওয়া চৌরাস্তা হতে প্রায় ১ কি.মি. উত্তরে মহাসড়কের পূর্ব প্রান্তের নিচু কৃষি জমিতে বেশ কিছু দিন যাবৎ তৈরী করা হচ্ছে ছোট বড় নিন্ম মানের বিভিন্ন প্রকার টিনের ঘর। ছোট ছোট ঘর তৈরী করা হয়েছে বেশীরভাগ কৃষি জমিতে। আবার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের জন্য টিন কাঠ দিয়ে তৈরী করা হয়েছে পল্টি মুরগীর খামার। এমনকি দোতলা পাকা এলপেটেন্ট আকৃতির স্কুল ঘরের মত করে তৈরী করা হচ্ছে পাকা দালান। পদ্মা সেতুর জন্য ইতিমধ্যেই অধিগ্রহন করা হয়েছে অনেক জমি। কিন্তু যেসকল জমিতে এসকল অবকাঠামো নির্মাণ করা হচ্ছে এসকল জমি এখনও অধিগ্রহন করা হয়নি বা তবে কোন কো জমি মালিককে ৩ ধারার নোটিশ প্রদান করা হয়েছে বলে জানা যায়। পদ্মা সেতুর সঙ্গে রেলসেতু যোগ করায় ওই সকল জমি রেলের জন্য প্রয়োজন হবে বলে জানা গেছে।

এনজির কতিপয় অসাধু ও প্রশাসনের কতিপয় অসাধু কর্মকর্তা ভূমির মালিকদের সাথে যোগসাজস করে তাদেরকে আগাম তথ্য দিয়ে এখানে অবকাঠামো নির্মাণের পরামর্শ দিয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। যাতে করে এসকল অবকাঠামোর কয়েকগুন মূল্য হাতিয়ে নেয়া যায়।নিচু কৃষি জমি যেখানে বর্ষাকালে এক বুক বা ৪/৫ ফুট পানি থাকে সেখানে নির্মান করা হয়েছে পল্টি মুরগীর বিশাল খামার।

সরজমিনে এসকল খামার ঘুরে দেখা যায় , একটি খামারের মুরগী নেই। কিছু দিন পূর্বে এখানে জরিপে আসে সরকারী একটি জরিপ দল। সেসময় ফার্মে মুরগী দেখানোর জন্য পাশ্বপর্তী শ্রীনগর উপজেলার একটি পল্টী খামার হতে মুরগীভাড়া করে এনে এখানে রাখা হয়েছিল। আর জরিপ দলের আসার খবর অসাধু কর্মকর্তার মাধ্যমে আগে জানিয়ে দেওয়ায় মুরগী ভাড়া করে এনে দেখানো হয়েছে সচল পল্টি ফার্ম। আথচ বাইরে থেকে পল্টি খামারের টিনের বেড়ায় তাকালে দেখা যায়। টিনের গায়ে ৩ ফুট উপড়ে পানির দাগ রয়েছে। যেটি দেখে সহজেই অনুমান করা যায়। তরিঘরি করে বর্ষার জমে থাকা পানির মধ্যেই এটি তৈরী করে টিনের বেড়া লাগানো হয়েছে। আর বর্ষার পারিতে এ খামারের কাঠের পাটাতন থাকবে ২/৩ ফুট পানির নীচে।

উপজেলার কুমারভোগ ইউনিয়নের কুমারভোগ মৌজা ও মেদিনী মন্ডল ইউনিয়নের উত্তর মেদিনী মন্ডল মৌজার আক্কাস বেপারী নির্মাণ করেছেন দ্বোতলা পাকা দালান। তিনি এথানে গার্মেন্টস ফ্যাক্টরী তৈরী করবেন বলে জানালেন। মাওলানা কেবাইদুল্লাহ একবার অধিগ্রহনে বাড়ি ছাড়া হয়ে ১০ শতাংশ জমির উপর আবারো নির্মাণ করেছেন বসত বাড়ি। খোকন খান নির্মান করেছেন পল্টি মুরগী খামার , এস এম আজিজুল হক মাওয়া পল্টি ফার্ম নামে একটি খামার তৈরী করে মুরগী ভাড়া করে এনে চলমান ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দেখিয়ে সেতু কর্তৃপকের নিকট থেকে ব্যবসায়িক ক্ষতিসহ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্তের জন্য ক্ষতিপূরণ আদায়ের জন্য তৈরী হয়েছেন। আর্থিকভাবে স্বচ্ছল কিছু ব্যক্তি ভূমি মালিকদের সাথে যোগসাজস করে নিচু কৃষি জমিভাড়া নিয়ে গড়ে তুলেছেন ছোট ছোট টিনের ঘর ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান।

এব্যাপারে অভিযুক্ত এনজিও ‘সিসিডিবি’ মাওয়া অফিসের এরিয়া ম্যানেজার পিটার এস রতেœর নিকট জানতে চাইলে তিনি বলেন, সিসিডিবি ৬ ধার নোটিশ প্রাপ্ত ব্যক্তিদের জেলা প্রশাসক কার্যালয় হতে ক্ষতিপূরণের টাকা পেতে কাগজপত্র তৈরীর ব্যাপারে সহযোগিতা করে থাকে । কোন প্রকার জরিপ কাজে সিসিডিবি কাজ করেনা তাই ভূমি মালিকদের সাথে যোগ সাজসকরে অর্থিক সুযোগসুবিধা নেবার অভিযোগ মোটেও সত্য নয়।

লৌহজং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা গাজী মোঃ আসাদুজ্জামান কবীরের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ভূমি অধিগ্রহন হয়ে থাকে এলএও (ভূমি একিজিশন কর্মকর্তা)। তবে এমন কোন অন্যায় কাজের সঙ্গে স্থানীয় প্রশাসন জড়িত নয়। তিনি বলেন, “আমার জানা মতে এসকল এলাকার চিত্র অনেক পূর্বে ভিডিওতে ধারণ করা হয়েছে তাই নতুন করে যার ঘর দুয়ার তুলেছেন তাদের ক্ষতিপূরণ পাবার তেমন কোন সুযোগ নেই।”

মুন্সিগঞ্জের এলএও আব্দুল লতিফ খান রবিবার সন্ধ্যায় জানান, সর্বশেষ রেল লাইনের জন্য শ্রীনগর উপজেলায় ৪টি ও লৌহজং উপজেলায় ৪টি মৌজায় ৬০ একর ভূমি নতুন করে অধিগ্রহনের কাজ চলছে। এছাড়াও কনস্ট্রাকশন ইয়াযের্ড (নির্মাণ এলাকা) ১৯৮ একর জমি লৌহজং উপজেলার ৭টি মৌজায় অধিগ্রহনের কাজ চলছে। তবে এই জমির ভিডিও ধারণ করা হয়েছে। পরে কোন স্থাপনা হলে আইন অনুযাযী তার ক্ষতিপূরণ দেয়া হবে না। আর যেসব অভিযোগ উঠেছে এর সাথে স্থানীয় প্রশাসন কোনভাইে জড়িত নেই এবং জড়িত থাকার সুযোগও নেই।

[ad#bottom]