বিদেশে যাচ্ছে সিরাজদিখানের পাতক্ষীর

মোহাম্মদ সেলিম, মুন্সীগঞ্জ
তেঁতুলের কথা শুনলেই যেমন যে কারোরই জিভে পানি এসে যায়। তেমনি মুন্সীগঞ্জ তথা বিক্রমপুরের পাতক্ষীর-এর সাধ যারা নিয়েছেন নিশ্চয়ই তাদেরও তেমন অনুভব হবে। তাই তো শুধু গাভীর দুধ দিয়ে তৈরি এ সুস্বাদু খাবারের চাহিদা সুদূর ইউরোপেও। শতাব্দীর প্রসিদ্ধ এই খাবারের জনপ্রিয়তাও বাড়ছে দেশ-বিদেশে। একমাত্র মুন্সীগঞ্জ জেলার সিরাজদিখান উপজেলার সন্তোষপুর গ্রামেই তৈরি হয় বিশেষ এই মুখরোচক খাবার। ঐতিহ্যবাহী নানা উৎসবে এ ক্ষীরের উপস্থিতি না থাকলে যেন অসম্পূর্ণ থাকে সে উৎসব। প্রতিদিন কয়েক মন দুধ ব্যবহার হচ্ছে এ ক্ষীর তৈরিতে। সব মৌসুমেই এর চাহিদা থাকলেও শীতে চাহিদা অনেক বেশি। বাঙালি ঐতিহ্যের পাটিসাপ্টা পিঠা তৈরিতেও প্রয়োজন হয় পাতক্ষীরের। নতুন জামাইর সামনে পিঠাপুলির সঙ্গে এই এ ক্ষীর ব্যবহার না করা যেন বেমানান।

গ্রাম বাংলায় মুড়ির সঙ্গেও এ ক্ষীর খাওয়ার পুরনো রীতি রয়েছে।সন্তোষ গ্রামের সাতটি পরিবার এখন এই ক্ষীর তৈরির সঙ্গে জড়িত। তবে পুলিনবিহারী দেবই প্রথম স্ত্রীকে নিয়ে ক্ষীর তৈরি করে বিক্রি করতেন বলে তার উত্তরসূরিরা জানান। সেও শত বছর আগের কথা। এছাড়া ইন্দ্র মোহন ঘোষ, লক্ষ্মী রানী ঘোষও তৈরি করতেন এই ক্ষীর। তারা সবাই বর্তমানে প্রয়াত। এখন তাদের বংশধররাই এই পেশা ধরে রেখেছেন। কার্তিক চন্দ্র ঘোষ, ভারতী ঘোষ, সুনীল চন্দ্র ঘোষ, রমেশ শ্যাম ঘোষ, বিনয় ঘোষ, মধুসূদন ঘোষ, সমির ঘোষ ও ধনা ঘোষ এ পেশায় বর্তমানে রয়েছেন। তবে সুনীল ঘোষের ৫ ভাই এ পেশায়।

ক্ষীর তৈরিতে পারদর্শী পারুল ঘোষ বলেন, প্রতিটি পাতক্ষীর তৈরিতে ৩ কেজি দুধ প্রয়োজন হয়। আধা ঘণ্টার বেশি সময় ধরে জাল দিতে হয় এ দুধ। দুধের সঙ্গে সামান্য প্রায় ৫০ গ্রাম চিনি ব্যবহার করা ছাড়া আর কিছুই ব্যবহার হয় না এ ক্ষীর তৈরিতে। তবে ডায়াবেটিক রোগীর জন্য বিশেষ অর্ডার থাকলে চিনি দেয়া হয় না। তারপর যখন দুধ ঘন হয়, তখন মাটির দই-এর পাতিলের মতো বিশেষ পাতিলে রাখা হয় ক্ষীর। ঘণ্টাখানেক পর ঠাণ্ডা হলে তা কলাপাতায় পেঁচিয়ে বিক্রয়যোগ্য করা হয়। তবে হাতের যশ ও কৌশল ক্ষীর তৈরিতে কাজে লাগাতে হয়। ঘন করতে গেলে চুলোয় দুধে পোড়া লেগে যায়। তাই কাঠের বিশেষ লাঠি দিয়ে নাড়তে হয় দুধ অনবরত। আর ‘পাতা’ নিয়েই এর নামকরণ। হ্যাঁ, তৈরি সম্পন্ন হওয়ার পর এ ক্ষীর কলাপাতায় জড়িয়ে থাকে বলেই ক্ষীরের নাম হয়েছে পাতক্ষীর, বললেন ভারত ঘোষ। শুধু সুনীল ঘোষের বাড়িতেই প্রতিদিন এ ক্ষীর তৈরি হয় ৫০টিরও বেশি। প্রতিটি ক্ষীরের ওজন প্রায় আধা কেজি। প্রতি পাতক্ষীরের মূল্য ১০০ থেকে ১২০ টাকা। বাজারে দুধের দাম বেড়ে গেলে বেড়ে যায় ক্ষীরের দামও। ঘরের বউরা এ ক্ষীর তৈরিতে কষ্ট করেন বেশি। হাড়ভাঙা পরিশ্রমের পর তৈরি হয় এই ক্ষীর। তবে প্রতিটিতে কিন্তু সব কিছুকেই টপকিয়ে পাতক্ষীর ঐতিহ্য আর ব্যতিক্রমের দিক থেকে সবচেয়ে বড় একটি জায়গা দখল করে আছে।

বাংলাদেশ প্রতিদিনে প্রকাশিত ১৯ মে, ২০১০

[ad#bottom]

One Response

Write a Comment»
  1. sirajdikhan to onek bar geci kintu ei jinish to kokhono khai nai!!! ja hok jokhon deshe jabo tokhon sirajdikhai gia ei ta kheye asbo.))