প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফর: প্রত্যাশা ও বাস্তবতা

মনজুরুল হক
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২৮ নভেম্বর তিন দিনের এক সরকারি সফরে জাপানে আসছেন। এটা হচ্ছে বঙ্গবন্ধুর কন্যার দ্বিতীয়বারের মতো বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ার পর প্রথম জাপান সফর। এর আগে ১৯৯৬ সালে প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রীর পদে আসীন হওয়ার পর জাপান সফরে এসেছিলেন তিনি। গত পাঁচ বছরে বাংলাদেশের কোনো সরকারপ্রধান জাপানে পদার্পণ না করায় শেখ হাসিনার এই সফর একই সঙ্গে হবে দীর্ঘ বিরতির পর বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফর।

অন্যদিকে, শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণের প্রায় দুই বছর পর সফর বাস্তবায়িত হতে যাওয়ায় এটাকে বিলম্বিত এক প্রত্যাশিত সফর বলা যায়। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ইতিমধ্যে চীন ও দক্ষিণ কোরিয়া সফর শেষ করলেও অগ্রসর বিশ্বের প্রতিনিধি এশিয়ার যে দেশটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আমাদের স্বীকৃতি দেওয়ায় আগে এগিয়ে এসেছিল, সেই দেশ সফরে এতটা বিলম্ব অনেকের কাছেই কাঙ্ক্ষিত মনে হয়নি। বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি দেশে এখন ক্ষমতাসীন হওয়ায় এই বিলম্ব কিছুটা হলেও অস্বাভাবিক মনে হতে পারে, যা কিনা আরও বেশি অবাক করে দেওয়ার মতো শোনায়, যখন আমরা জানতে পারি যে জাপানের প্রতি বঙ্গবন্ধু সব সময় অনুভব করেছিলেন অগাধ ভালোবাসা আর আত্মিক টান, যে ভালোবাসার প্রকাশ দেখাতে স্বাধীনতার অল্প কিছুদিন পর বঙ্গবন্ধু ছুটে এসেছিলেন সূর্যোদয়ের দেশটিতে। অতীতের সেই বাস্তবতার আলোকে আমরা কিন্তু অজান্তেই ধরে নিই যে বঙ্গবন্ধুর আদর্শের অনুসারীরাও জাপানের মূল্যায়ন একইভাবে করবেন। ফলে প্রধানমন্ত্রীর সফর বিলম্বিত হওয়া জাপান সম্পর্কে আমাদের আগের সেই মূল্যায়ন থেকে সরে আসা কি না, সে বিষয়টি হয়তো কারও কাছে অস্বচ্ছ থেকে যেতে পারে।

এ কারণে শুরুতেই বলে নিতে হয় যে প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফর বিলম্বিত হওয়ার পেছনে দ্বিপক্ষীয় কূটনৈতিক হিসাব-নিকাশ কষে দেখার চেষ্টা করা একেবারেই অযৌক্তিক শোনাবে। বিলম্বিত এই সফরের পেছনের সবচেয়ে যুক্তিসংগত ও গ্রহণযোগ্য কারণ হচ্ছে জাপানের রাজনৈতিক অঙ্গনে সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে চলা রদবদল। দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতাসীন জাপানের উদার গণতন্ত্রী দল বাংলাদেশের নির্বাচনের মাস ছয়েক পর অনুুষ্ঠিত জাপানের সাধারণ নির্বাচনে ধরাশায়ী হয়। নতুন যে দল জাপানে এখন ক্ষমতাসীন, তারা আগের অনুসৃত নীতিমালার বেশ কিছু দিক থেকে দূরত্ব টানার চেষ্টা করছে। ফলে ক্ষমতা গ্রহণের শুরুর দিনগুলোতে জাপানের নিকট প্রতিবেশী ও গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অংশীদারের বাইরে নজর দেওয়ার সময় নতুন নীতিনির্ধারকদের খুব একটা হয়নি এবং সেদিক থেকে বাংলাদেশ সংগত কারণেই দৃষ্টির আড়ালে অবস্থান করছিল। এর বাইরে ক্ষমতাসীন দলের নেতৃত্বকে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব মোকাবিলার মতো কঠিন বাধার মুখেও শুরুতে পড়তে হয়, যে বাস্তবতাও পররাষ্ট্রনীতি থেকে রাজনীতিবিদদের দৃষ্টি দেশের ভেতরে অনেক বেশি সীমিত রাখে। ফলে ক্ষমতাসীন গণতান্ত্রিক দল এখন ঘর গোছানোর পালা শেষ করে আনায় এ রকম বলা যায় যে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফর বিলম্বিত হলেও সঠিক সময়েই তা বাস্তবায়িত হচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রী জাপানে অবস্থানকালে সম্রাট আকিহিতোর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতে মিলিত হওয়া ছাড়াও জাপানের প্রধানমন্ত্রী নাওতো কানের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বৈঠক করবেন, দুই দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আরও এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে যে বৈঠকে আলোচনা ও মতৈক্য প্রতিষ্ঠিত হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর বাইরে জাপানের শিল্প ও বণিক সমিতির এক সমাবেশে তিনি ভাষণ দেবেন এবং প্রবাসী বাংলাদেশিদের দেওয়া এক সংবর্ধনায় যোগ দেবেন। অন্যদিকে, টোকিওর বাইরে হিরোশিমায় প্রধানমন্ত্রীর ভ্রমণ কর্মসূচি এ কারণে তাৎপর্যপূর্ণ যে বাংলাদেশের শান্তির কূটনীতির বার্তা তিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ দিকে আণবিক বোমা হামলায় বিধ্বস্ত এবং বর্তমানে বিশ্বজুড়ে শান্তি ও নিরস্ত্রীকরণ আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে যাওয়া শহরে পৌঁছে দেবেন, যার প্রতীকী তাৎপর্যকে অস্বীকার করার উপায় নেই।

তবে, সফরের রাজনৈতিক বিভিন্ন দিক থেকে যাওয়া সত্ত্বেও অর্থনীতির কূটনীতি প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরে যে মুখ্য হয়ে উঠবে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। অর্থনৈতিক দিক থেকে জাপান হচ্ছে বাংলাদেশের উন্নয়ন তৎপরতার গুরুত্বপূর্ণ এক অংশীদার। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইতিমধ্যে উল্লেখ করেছেন যে পদ্মা সেতু নির্মাণ ও অন্যান্য অবকাঠামো প্রকল্পে জাপানের সহযোগিতা বাংলাদেশ প্রত্যাশা করবে। আমাদের অবকাঠামো খাতে জাপানের অবদান হচ্ছে স্বীকৃত এক বাস্তবতা, বাংলাদেশের সব কটি সরকারই রাজনৈতিক প্রশ্নে ভিন্ন অবস্থান গ্রহণ করা সত্ত্বেও সে বিষয়ে কোনো রকম দ্বিমত কখনোই প্রকাশ করেনি। ফলে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যে বাংলাদেশের জনগণের স্বাভাবিক সেই প্রত্যাশার প্রতিফলন লক্ষ করা গেছে। তা সত্ত্বেও বলতে হয়, জাপানের বর্তমান বাস্তব পরিস্থিতির আলোকে সে রকম প্রত্যাশা হয়তো কিছুটা মাত্রাতিরিক্ত শোনাতে পারে।

দুই দশক ধরে জাপানের অর্থনীতি মন্দার অসুখে ভুগছে, যে অবস্থা থেকে সহসা রোগমুক্তির সম্ভাবনা অনেক বিশেষজ্ঞই এখন আর দেখছেন না। জাপানের উন্নয়ন সাহায্য খাতেও দেশের এই সংকট পরিস্থিতি অনেক দিন থেকেই প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে, যার ফলে এক দশক আগের বিশ্বের এক নম্বর দাতাদেশের অবস্থান এখন নেমে এসেছে পাঁচ নম্বরে এবং উন্নয়ন বিশেষজ্ঞদের ধারণা, মন্দাকবলিত অর্থনীতির দুষ্টচক্র থেকে জাপান বের হয়ে আসতে না পারলে উন্নয়ন সাহায্যের অবস্থানগত মাপকাঠিতে জাপান অচিরেই আরও কয়েক ধাপ নেমে যাবে। ক্ষমতাসীন গণতন্ত্রী দলের নীতিনির্ধারকেরাও বিষয়টি নিয়ে চিন্তিত। ফলে জাপানের উন্নয়ন সাহায্যকে কীভাবে আরও বেশি অর্থবহ করে তুলে সাহায্য পাওয়া বিভিন্ন দেশের জনতার কল্যাণে সাহায্যের ধারাকে প্রবাহিত করা যায়, সে বিষয়টি এখন তাঁরা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে দেখছেন। অন্যভাবে বলা যায়, অবকাঠামো উন্নয়নে ঢালাওভাবে সাহায্য না দিয়ে বরং মানুষের সরাসরি কল্যাণে আসা খাতগুলোতে সাহায্যের ধারা প্রবাহিত করে নিতে এখন তাঁরা অনেক বেশি আগ্রহী। সেদিক থেকে পূর্ববর্তী সরকারের অনুসৃত নীতির সরাসরি সমালোচনা করা থেকেও তাঁরা পিছিয়ে নেই। ফলে দাতা তার অনুসৃত নীতি থেকে সরে আসারই ইঙ্গিত দেওয়ায় সাহায্য গ্রহণকারী দেশ হিসেবে বাংলাদেশেরও মনে হয় আগের ধারা অনুসরণ করে একই খাতে বড় অঙ্কের সাহায্য চাওয়ার বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করে দেখা দরকার।

মানবকল্যাণের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত বিভিন্ন খাতে জাপান কীভাবে অবদান রাখতে পারে এবং বাংলাদেশের সংকটের সময় জনগণের দুর্দশা লাঘবে জাপান নতুন কোনো পথ দেখাতে পারে কি না, সেসব বিষয়ে ফলপ্রসূ আলোচনা সফরকে নিশ্চিতভাবেই আরও অনেক বেশি অর্থবহ করে তুলতে পারে। বছরখানেক আগে জাপানের আর্থিক সেবাবিষয়ক মন্ত্রী হঠাৎ করে ঘরোয়া এক আলোচনায় আমাকে ডেকেছিলেন বাংলাদেশের ক্ষুদ্রঋণ বিষয়ে জানার জন্য। ডাকঘর সঞ্চয় ব্যাংকের বিরাষ্ট্রীয়করণ প্রক্রিয়ায় ব্যাংকের অংশবিশেষকে সেবা প্রবর্তনের কাজে লাগানোর ইচ্ছা তাঁর ছিল। ফলে আমাদের উন্নয়ন অভিজ্ঞতাও যে কিছুটা হলেও নতুন পথের দেখা জাপানকে দিতে পারে, সেই বার্তা পৌঁছে দেওয়াও বোধহয় কম গুরুত্বপূর্ণ নয়।

অন্য যে আরেকটি খাতে জাপানের কাছে আমাদের প্রত্যাশা সংগত কারণেই আকাশচুম্বী, তা হচ্ছে বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগ। অর্থনৈতিক অংশীদারি চুক্তি স্বাক্ষরের প্রক্রিয়া শুরু করা গেলে দীর্ঘ বিরতির শেষে হলেও এর সুফল বাংলাদেশ একসময় হয়তো ভোগ করতে পারবে। তবে বলে নিতে হয় যে জাপানের সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারি চুক্তি স্বাক্ষর হচ্ছে দীর্ঘমেয়াদি এক প্রক্রিয়া। ভারত যেমন বেশ কয়েক বছর ধরে আলোচনা চালানোর শেষে মাত্র গত মাসে চুক্তি স্বাক্ষর করতে সক্ষম হয়েছে। ফলে দক্ষিণ এশিয়ার সার্বিক অর্থনৈতিক অগ্রগতির আলোকে বাংলাদেশের সঙ্গে সে রকম কোনো ব্যবস্থায় আসা জাপানের জন্য যে লাভবান হবে, সে বিষয়ে টোকিওকে রাজি করানো গেলে চুক্তি স্বাক্ষর বিষয়ে আলোচনা শুরু করার প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হয়তো সম্ভব হবে।

অন্যদিকে, জাপানি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার বেলায় খুবই জুতসই এক সময়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী জাপান সফরে আসছেন। ফলে ধারণা করা যায় যে জাপানের ব্যবসায়ী নেতৃত্বকে রাজি করানোর চমৎকার এই সুযোগ তিনি পুরোপুরি কাজে লাগাবেন। জাপানের ব্যবসায়ী মহল এখন দুটি কারণে চীন থেকে তাদের কর্মকাণ্ড গুটিয়ে নেওয়ার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে দেখছে। প্রথম কারণ হচ্ছে, চীনে শ্রমের বাজার আগের চেয়ে অনেক বেশি ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশ এই ক্ষেত্রে চীনের একটি বিকল্প হয়ে দেখা দিতে পারে। তবে তা করতে হলে আমাদের প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, বিশেষ করে বিদ্যুৎ ও পরিবহনব্যবস্থা উন্নত করতে কোন পদক্ষেপ সরকার নিয়েছে এবং কবে নাগাদ অগ্রগতি সরকার আশা করছে, সেসব বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা জাপানি বিনিয়োগকারীদের দেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা থেকে বিনিয়োগকে মুক্ত করাও যে আবশ্যকীয়, সে সম্পর্কে সরকারের আন্তরিক দৃষ্টিভঙ্গিও তুলে ধরা দরকার।

জাপানি বিনিয়োগকারীদের চীন থেকে সরে আসার চিন্তাভাবনার পেছনে আরেকটি কারণ হচ্ছে, দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক সাম্প্রতিক সময়ে কিছুটা তিক্ত হয়ে ওঠা। সেদিক থেকেও নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতি ও সবার সঙ্গে বন্ধুত্বের ধারণা সমুন্নত রেখে বিকল্প সুযোগ জাপানের জন্য করে দিতে বাংলাদেশের প্রস্তুত থাকার ইঙ্গিত জাপানকে দেওয়া দরকার। তবে এখানেও অবকাঠামো আর পরিবহন-সুবিধার বিষয়টি এসে যায়। ফলে সমস্যা সমাধানে বিশ্বাসযোগ্য কোন পদক্ষেপ আমরা নিচ্ছি, তার স্বচ্ছ একটি ব্লুপ্রিন্ট তুলে ধরা ছাড়া জাপানের বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা আদৌ সম্ভব হবে না। আমরা তাই আশা করছি, সে রকম সব প্রস্তুতি নিয়েই প্রধানমন্ত্রী দীর্ঘ প্রত্যাশিত জাপান সফরে আসছেন।

মনজুরুল হক: শিক্ষক ও সাংবাদিক।

[ad#bottom]