‘সামান্য শর্তে’ পিছিয়ে গেল পদ্মা সেতুর নির্মাণ কাজ

সংসদীয় কমিটিকে সেতু বিভাগের প্রতিবেদন
নিখিল ভদ্র
মাত্র পাঁচ শতাংশ কাজ নিয়ে আপত্তির কারণে বহুল প্রত্যাশিত পদ্মা সেতুর নির্মাণ কাজ পিছিয়ে গেছে। ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানগুলো সব শর্ত পূরণ করেনিÑ এ অভিযোগ তুলে বিশ্বব্যাংক এই আপত্তি জানায়। বিশ্বব্যাংকের অভিযোগ, পাঁচটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ড্রাইভেন র‌্যাকিং স্টিল পাইল শর্ত পূরণ করতে পারেনি। তাই আবারো প্রাক-যোগ্যতা প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে। যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের সেতু বিভাগ থেকে সংসদীয় কমিটিকে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘোষণা অনুযায়ী চলতি বছরের ডিসেম্বরে পদ্মা সেতুর নির্মাণ কাজ শুরু করার কথা ছিল। কিন্তু ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান নিয়ে বিশ্বব্যাংকের আপত্তির কারণে তা পিছিয়ে আগামী বছরের মার্চে নিতে হয়েছে। এ সিদ্ধান্ত নিয়ে সম্প্রতি যোগাযোগ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে আলোচনা হয়। বৈঠকে এই সেতুর কাজ কেন পিছিয়ে যাচ্ছে, তা বিস্তারিত জানাতে সেতু বিভাগকে বলা হয়। সংসদীয় কমিটির কাছে পাঠানো এ সংক্রান্ত প্রতিবেদনে সেতু বিভাগ অসন্তোষ প্রকাশ করে বলে, বিশ্বব্যাংকের ড্রাইভেন র‌্যাকিং স্টিল পাইল সাব-ক্রাইটেরিয়ার কাজের মূল্য মোট সেতু নির্মাণ কাজের মাত্র পাঁচ ভাগ। এ বিষয়ে তাদের আপত্তি থাকার কথা নয় উল্লেখ করে বলা হয়, বঙ্গবন্ধু সেতু ও পাকশী সেতু নির্মাণে ওই শর্ত বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি।

সেতু বিভাগের উপ-পরিচালক (পিঅ্যান্ডএম) মো. আবুল হোসেন স্বাক্ষরিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ ধরনের সেতু নির্মাণে প্রচলিত নির্মাণ প্রক্রিয়ার সব ক্ষেত্রে সাধারণত বিশেষজ্ঞ সাব-কন্ট্রাক্টর নিয়োগের মাধ্যমে করা হয়। বঙ্গবন্ধু বহুমুখী সেতু ও পাকশী সেতুর ক্ষেত্রে সে উদাহরণ রয়েছে। বঙ্গবন্ধু সেতুতে পাইলিংয়ের কাজে নিয়োজিত ঠিকাদার মেন্সক নামক বিশেষজ্ঞ পাইলিং ঠিকাদার নিয়োগ করে কাজ করে। একইভাবে পাকশী সেতুতেও মূল ঠিকাদার বিশেষজ্ঞ ঠিকাদার দিয়ে কাজ করায়। বিশ্বব্যাংকের প্রকিউরমেন্ট গাইডলাইনেও বিষয়টি রয়েছে। সে অনুযায়ী পাঁচ ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানকে শর্ত সাপেক্ষে প্রাক-যোগ্য করার সুপারিশ করা হয়। এরপর দরপত্র মূল্যায়ন কমিটি পাঁচ ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানকে প্রাক-যোগ্য করার সুপারিশ করে বিশ্বব্যাংকসহ দাতা সংস্থাগুলোর কাছে মূল্যায়ন প্রতিবেদন পাঠায়। এর মধ্যে বিশ্বব্যাংক ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানগুলো ড্রাইভেন র‌্যাকিং স্টিল পাইল শর্ত পূরণ করতে না পারায় তা প্রত্যাখ্যান করে। প্রাক-যোগ্যতা দাখিলের সময়সীমা ৪২ দিন নির্ধারণ করে দিয়ে আবারো প্রাক-যোগ্যতা প্রক্রিয়া শুরুর পরামর্শ দেয়। সেই পরামর্শ অনুযায়ী এরই মধ্যে পত্রিকায় প্রাক-যোগ্যতা বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, ড. জামিলুর রেজা চৌধুরীর নেতৃত্বে গঠিত দরপত্র মূল্যায়ন কমিটি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে মূল্যায়ন প্রতিবেদন অনুমোদনের জন্য গত ১৮ জুলাই বিশ্বব্যাংকের সম্মতির জন্য পাঠায়। এর দুই মাস পর গত ২৩ সেপ্টেম্বর বিশ্বব্যাংক এক চিঠিতে জানায়, শর্তসাপেক্ষে প্রাক-যোগ্যতার বিষয়টি নিষ্পত্তি করতে অনেক সময়ের প্রয়োজন হবে। তাই নতুন করে প্রাক-যোগ্যতা শুরু করা হলে তা দ্রুত করতে বিশ্বব্যাংক সর্বাত্মক সহযোগিতা করবে। সে ক্ষেত্রে যেসব ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে পারেনি, ভবিষ্যতে তারা কোনো আপত্তি উত্থাপন করতে পারবে না। চিঠিতে আরো বলা হয়, পাইলিং পদ্ধতির শর্ত পূরণের বিষয়টি একটি বড় ধরনের পরিবর্তন।

এ বিষয়ে যোগাযোগ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার শেখ মুজিবুর রহমান বলেন, বিশ্বব্যাংক এ ধরনের ‘সামান্য শর্তের’ দোহাই না দিলেও পারত। শর্ত লঙ্ঘনের যে কারণ উল্লেখ করা হয়েছে, তা বড় ধরনের কিছু নয়। এর আগে বঙ্গবন্ধু সেতু ও পাকশী সেতু নির্মাণে ওই শর্ত বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। তবে নির্মাণ কাজ তিন মাস দেরিতে শুরু হলেও পদ্মা সেতু নির্ধারিত ২০১৩ সালের মধ্যেই শেষ করার ওপর কমিটি জোর দিয়েছে। আগামী বৈঠকে এ বিষয়ে সুপারিশ চূড়ান্ত করা হবে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, সেতু নির্মাণে ব্যয় হতে পারে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা (২ দশমিক ৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার)। এর মধ্যে উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলোর কাছ থেকে ২ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি, অর্থাৎ প্রায় ১৫ হাজার ৭৭৬ কোটি টাকা (প্রতি ডলার ৬৯ টাকা হিসাবে) পাওয়া যাবে। বিশ্বব্যাংক উন্নয়ন সহযোগীদের সমন্বয়কারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছে। এছাড়া তারা এ প্রকল্পে সর্বোচ্চ ১ দশমিক ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

২০০৫ সালে পরিচালিত সম্ভাব্যতা সমীক্ষার ভিত্তিতে প্রণীত ৫ দশমিক ৫৮ কিলোমিটার দীর্ঘ ও ১ দশমিক ৪৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয় ধরে পদ্মা সেতু নির্মাণ প্রকল্পের ডিপিপি ২০০৭ সালের ২০ আগস্ট একনেকে অনুমোদন হয়। পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের বিস্তারিত ডিজাইন অনুযায়ী নদীভাঙনের কারণে সেতুর দৈর্ঘ্য বাড়িয়ে ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার করার সিদ্ধান্ত হয়। সেতুর নির্মাণশৈলী পরিবর্তন ও লোডিং ক্যাপাসিটি বৃদ্ধি এবং অ্যাপ্রোচ ও রেল ভায়াডাক্টসহ অন্যান্য আইটেম অন্তর্ভুক্তির ফলে প্রকল্পের সম্ভাব্য ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ২ দশমিক ৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে। গত ১০ এপ্রিল পদ্মা সেতু প্রকল্পের মূল সেতুর ঠিকাদার নিয়োগের প্রাক-যোগ্যতা দরপত্র বিশ্বব্যাংক অনুমোদন করলে ওই দিনই দরপত্র আহ্বান করা হয়। নির্ধারিত সময় চলতি বছরের ৮ জুন পর্যন্ত মোট ১১টি প্রস্তাব পাওয়া যায়। অধ্যাপক ড. জামিলুর রেজা চৌধুরীর নেতৃত্বে গঠিত সাত সদস্যের বিশেষজ্ঞ কমিটির মূল্যায়নে পাঁচটি প্রতিষ্ঠান যোগ্য বিবেচিত হয়েছে। পরামর্শক প্রতিষ্ঠান মাওনসেল-এইকম লিমিটেড মূল্যায়নেও ওই পাঁচটি প্রতিষ্ঠান যোগ্য বিবেচিত হয়। কিন্তু বিশ্বব্যাংক আপত্তি জানানোর কারণে পদ্মা সেতুর কাজ শুরু করতে তিন মাস বিলম্ব হচ্ছে।

[ad#bottom]