বিজ্ঞানাচার্য জগদীশচন্দ্র বসু

স্মরণ
ফেব্রুয়ারি ৭, ১৯২৪ সাল, বৃহস্পতিবার। বিজ্ঞানী অলিভার লজের আমন্ত্রণে লন্ডনের ইন্ডিয়া হাউসে যন্ত্রসহকারে ভাষণ দিচ্ছেন একজন ভারতবর্ষীয় বিজ্ঞানী। বক্তৃতা কক্ষের জানালার সামনে উঁচু টেবিলের ওপর বসানো আছে বক্তার নিজের হাতে তৈরি স্বয়ংলেখ একটি যন্ত্র। বক্তৃতা শেষ হলো। মঞ্চ থেকে নেমে এলেন বক্তা।

দর্শকমণ্ডলীর প্রথম সারিতে ইংল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী রামজে ম্যাকডোনাল্ড। পাশে বসেছেন জর্জ বার্নার্ডশ, বিজ্ঞানী অলিভার লজ ও ভারতের সাবেক গভর্নর জেনারেল হার্ডিঞ্জ। হঠাৎ বার্নার্ডশ প্রধানমন্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বলে উঠলেন, ‘এই বক্তা শিগগিরই হয়তো এমন একটি যন্ত্র উদ্ভাবন করবেন, যা দিয়ে রাজনীতিবিদ ও অন্যদের কার্যক্ষমতা যন্ত্রলিপির মাধ্যমে এঁকে দেখাবেন এবং বিভিন্ন ধরনের কাজে ওদের দক্ষতাও নিখুঁতভাবে পরীক্ষা করতে সক্ষম হবেন।’

সেদিনের সেই বক্তা ছিলেন আমাদের দেশ গৌরব আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু। আর যন্ত্রটির নাম ছিল ‘ফটোসিনথেটিক বাবলার।’ বলাবাহুল্য, সেইদিন প্রদর্শিত পরীক্ষাগুলো ছিল তার বৃহৎ কর্মকাণ্ডের বিন্দুমাত্র। জগদীশচন্দ্র শতাধিক আশ্চর্যজনক যন্ত্র আবিষ্কার করেছিলেন। যার মধ্যে আছে গ্যালেনা ডিটেকটর, স্পাইরাল স্প্রিং ডিটেকটর, মেটাল কন্ট্যাক্ট ডিটেকটর, অনুতরঙ্গ গ্রাহকযন্ত্র, মাইক্রোওয়েভ, স্পার্ক বেতারপ্রেরক যন্ত্র, ফটোসিনথেটিক বাবলার, রেজোনান্ট রেকর্ডার, ক্রেস্কোগ্রাম, ডিফ্র্যাকশন গ্রেটিং ইত্যাদি। আচার্য জগদীশচন্দ্র বসুই পৃথিবীর প্রথম মাইক্রোওয়েভ আবিষ্কার করেন, যা আজ যোগাযোগ ব্যবস্থায় এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনে দিয়েছে। বাংলায় মূলত রিৎষবংং শব্দ থেকে বেতার শব্দটি এসেছে অর্থাৎ তারবিহীন যোগাযোগ। আর এই আশ্চর্য যন্ত্রটির মূল প্রযুক্তির আবিষ্কারক জগদীশচন্দ্র। আন্তর্জাতিক বেতার বিজ্ঞান সংস্থার (টজঝও) বিজ্ঞানীরা গবেষণা করে দেখিয়েছেন, রেডিওকে বিশ্লেষণ করলে ৯টি বিভিন্ন কমিশনের ৭টি ক্ষেত্রেই জগদীশচন্দ্রের সরাসরি আবিষ্কার রয়েছে।

পদার্থবিজ্ঞানের চমকপ্রদ আবিষ্কার ও জড় জগতের রহস্য উদ্ঘাটনের একক কৃতিত্বগুলো জগদীশচন্দ্রকে বিশ্ব বিজ্ঞানের একজন স্থপতির মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছে। তাই তো ১৯২৭ সালে লন্ডনের জনপ্রিয় পত্রিকা ‘ডেইলি এক্সপ্রেস’ লিখেছিল, ‘জগদীশচন্দ্র গ্যালিলিও এবং নিউটনের সমকক্ষ বিজ্ঞানী।’ আজ ২৩ নভেম্বর এই বিশ্ববরেণ্য বিজ্ঞানীর ৭৩তম মৃত্যুবার্ষিকী। ১৮৫৮ সালের ৩০ নভেম্বর তিনি বাংলাদেশে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তার পৈতৃক বাড়ি মুন্সীগঞ্জ-বিক্রমপুরের রাঢ়ীখাল গ্রামে। বিজ্ঞানীর বাড়িটি এখন স্কুল ও কলেজ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসুর প্রায় দুইশ’ বছরের পুরনো একতলা ভবনের একটি কক্ষ সংস্কার করে তার স্মৃতি জাদুঘরে পরিণত করা হয়েছে। বিজ্ঞানাচার্য জগদীশচন্দ্র বসুর মৃত্যুবার্ষিকীতে তার প্রতি রইল আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি।

[ad#bottom]