বর্তমান সরকারের মেয়াদে পদ্দা সেতু নিমাণ অনিশ্চিত !

আরিফুর রহমান
বিশ্ব ব্যাংক পদ্মা সেতুর নির্মাণ কাজের জন্য প্রাক-যোগ্য ঠিকাদার চূড়ান্ত করার বিষয়টি সম্প্রতি নাকচ করে দিয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, যোগাযোগ মন্ত্রণালয় প্রাক-যোগ্য ঠিকাদার নির্মাণে যাদের প্রাধান্য দিয়েছিল তাদের অধিকাংশই বাংলাদেশে একাধিক চীনা কোম্পানির প্রতিনিধিত্বকারী প্রভাবশালী এক মন্ত্রীর প্রতিষ্ঠান। এখন নতুন করে প্রাক-যোগ্য ঠিকাদার চূড়ান্ত করতে হবে। যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের সেতু বিভাগের সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, এ জন্য কমপক্ষে ছয় থেকে নয় মাস সময় লাগবে। এরপর দাতারা প্রাক-যোগ্য ঠিকাদারদের বিষয়ে চূড়ান্ত মত দিলে দরপত্র আহ্বান হবে। আর আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী সব প্রক্রিয়া শেষ করে দরপত্র চূড়ান্ত করতে অন্তত এক বছর লাগবে বলে দাতা সংস্থার প্রতিনিধি ও বিশেষজ্ঞরা আলাপকালে জানিয়েছেন। আর এরপর পরামর্শকরা চূড়ান্ত হওয়া দরপত্র মূল্যায়ন করবেন। যাতে আরও তিন-চার মাস সময় লেগে যাবে বলে সূত্রে জানা যায়। সব মিলিয়ে এসব প্রক্রিয়া শেষ করতে আরও দুই বছর লাগতে পারে।

সূত্রে জানা যায়, পরবর্তী পদক্ষেপে মন্ত্রিসভা সংক্রান্ত ক্রয় কমিটিতে অনুমোদন আর দাতাদের চূড়ান্ত সম্মতি আদায় করতে আরও ছয় মাস লাগবে। এরপর সরকারের সঙ্গে নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের চুক্তি স্বাক্ষর হবে। চুক্তি শেষে কাজ গুছিয়ে নিতে নির্মাতা প্রতিষ্ঠানকে আরও ছয় মাস সময় দেওয়ার নিয়ম আছে আন্তর্জাতিক দরপত্রে। অর্থাৎ আরও এক বছর। এখন যেভাবে চলছে তাতে ঠিকঠাক মতো এগোতে পারলে সব মিলিয়ে নির্মাণ কাজ শুরু করতেই লেগে যাবে তিন বছর। আর বর্তমান সরকারের মেয়াদ আছে তিন বছর এক মাসের মতো। তাহলে এ সরকারের মেয়াদে বহুল প্রত্যাশিত পদ্মা সেতুর নির্মাণ কাজ শুরু করা সম্ভব হবে কি? এ প্রশ্ন এখন খোদ সরকারের অনেক নীতিনির্ধারকেরও। কারণ আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে পদ্মা সেতু নির্মাণের ব্যাপারে সুস্পষ্ট অঙ্গীকার থাকলেও এখন আর হিসাব মিলছে না। ক্ষুব্ধ সরকারি দলের সংসদ সদস্যদের অনেকেই।

গত বছরের ডিসেম্বরে একটি সেতু উদ্বোধন করতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, পদ্মা সেতুর কাজ শুরু হবে ২০১০ সালে। আর শেষ হবে ২০১৩ সালে। কিন্তু কার্যত এটি এখন অসম্ভব।

এদিকে আগামী বছরের নভেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশ সরকারকে অনুদান দেওয়ার জন্য জাপান সরকারের কোনো প্রস্তুতি নেই। অথচ প্রধানমন্ত্রীর আসন্ন জাপান সফরে পদ্মা সেতুর জন্য টাকা চাওয়া হবে বলে সম্প্রতি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনি এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে জানিয়েছেন। প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, সরকারের দুই বছর পার হওয়ার পর এখন কেন জাপান সরকারের কাছে পদ্মা সেতু নির্মাণের জন্য টাকা চাওয়া হচ্ছে? কারণ সরকার বহু আগেই জানিয়েছিল জাপান সরকার পদ্মা সেতুর জন্য টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। তাহলে জাপান কি টাকা দিতে গড়িমসি করছে? এ প্রশ্নও এখন সামনে চলে এসেছে। কারণ সম্প্রতি জাপান দূতাবাস যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের সেতু বিভাগকে দেওয়া এক চিঠিতে উষ্মা প্রকাশ করে লিখেছে সরকার চীনা কোম্পানিকে অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় নানা সুবিধা দিচ্ছে। পদ্মা সেতুর ব্যাপারেও এমন কিছু হচ্ছে কি-না এ ব্যাপারেও জাপান সরকারের উদ্বেগ রয়েছে বলে জানা গেছে। সব মিলিয়ে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় দাতা দেশ জাপান খানিকটা হলেও যে অখুশি এটি এখন আর অপ্রকাশ্য নেই। অথচ পদ্মা সেতু নির্মাণের জন্য জাপান হলো তৃতীয় সর্বোচ্চ দাতা দেশ।

সরকারের ভেতরেও এখন উদ্বেগ হলো জাপান যদি কোনো কারণে বিগড়ে যায় তাহলে পদ্মা সেতুর জন্য অন্য যে দুই বড় সংস্থা অর্থায়ন করবে সেই বিশ্ব ব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) প্রতিক্রিয়া কী হবে?

সরকারের ভেতরের একটি অংশের মধ্যেও এ প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে, সেতুর নির্মাণ কাজ যে হবে সেটি আসলে কিভাবে হবে? সুস্পষ্ট ধারণা পাচ্ছেন না অনেকেই প্রথমত, স্টিল আর কনক্রিটের নির্মাণ কাজের সমন্বয় নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে দ্বিমত রয়েছে। দ্বিতীয়ত, নদীশাসন কিভাবে হবে এ নিয়েও সুনির্দিষ্ট কোনো বক্তব্য পাওয়া যাচ্ছে না। তৃতীয়ত, কোন দিক দিয়ে সংযোগ সড়ক যাবে এটিও ঠিক করা যায়নি। চতুর্থত, আর রেললাইনের সংযোগ কীভাবে সেতুর সঙ্গে যুক্ত হবে এটিও ঠিক করতে পারেনি যোগাযোগ মন্ত্রণালয়। আবার সেতুর যে নকশা চূড়ান্ত করা হয়েছে এ নিয়েও নানা বিতর্ক রয়েছে বিশেষজ্ঞ মহলে।

আরও একটি প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে সরকার সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মহলে। সেটি হলো কেন বারবার সেতু বিভাগের সচিব পরিবর্তন হচ্ছে। ইতোমধ্যে বর্তমান সরকারের মেয়াদে চারবার সেতুর সচিব পরিবর্তন করা হয়েছে। এর ফলে দাতাদের কেউ কেউ সরকারের কমিটমেন্ট নিয়েও সন্দিহান হয়ে পড়ছেন। যদি পদ্মা সেতু নির্মাণ সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার হয় তাহলে এর বাস্তবায়ন করতে যে মন্ত্রণালয় সেখানকার শীর্ষ আমলাকে বারবার কেন পরিবর্তন করা হচ্ছে এই প্রশ্ন সরকারের নীতিনির্ধারকদের মধ্যেও। সেতুর প্রকল্প পরিচালক পদেও বারবার পরিবর্তন আনা হয়েছে। কেন হচ্ছে এসব। এ নিয়ে নানা কথা শোনা যাচ্ছে।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা মির্জা এবি আজিজুল ইসলাম তো মনেই করেন, পদ্মা সেতুর ব্যাপারে বর্তমান সরকার কোনো অবস্থাতেই তাঁর অঙ্গীকার রক্ষা করতে পারবে না। বাংলাদেশ প্রতিদিনকে তিনি বলেন, যদিওবা সরকার কাজ শুরু করতে পারে, শেষ করতে পারবে না কিছুতেই।

সূত্রে জানা যায়, দাতারা এখনো সেতুতে রেল সংযোগের ব্যবস্থা রাখার ব্যাপারে সন্তুষ্ট নয়। তাদের বক্তব্য হলো সেতুর এপার-ওপার কোথাও রেল নেই। তাহলে এর যৌক্তিকতা কী আগে সেটি স্পষ্ট করতে হবে। অন্যদিকে জাইকার পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, যেহেতু সেতুর ওপরে স্টিল এবং নিচে কনক্রিট হবে তাই প্রকল্প দুটি হতে হবে। কিন্তু যোগাযোগ মন্ত্রণালয় এখনো একটি প্রকল্পেই কাজ শুরু ও শেষ করতে চায়। সব মিলিয়ে কথামালা ছাড়া পদ্মা সেতু নির্মাণ কাজ শুরুর প্রক্রিয়াগত বিষয়গুলো থমকে আছে।

অন্যদিকে বিস্ময়কর হলো, সেতু নির্মাণের অনেক মৌলিক সমীক্ষাও বাকি। কিন্তু নির্মাণের সম্ভাব্য খরচ কেবলই বাড়ানো হচ্ছে। ২০০৯ সালে সেতুর প্রাক্কলিত ব্যয় চারবার পরিবর্তন করা হয়। সর্বশেষ বলা হয়, সেতুটি নির্মাণে ২৬০ কোটি ডলার বা ১৭ হাজার ৯৪০ কোটি টাকা ব্যয় হবে। জানা গেছে, ১৭০ কোটি ডলারে চীনারা ৩৬ কিলোমিটার সেতু তৈরি করেছে। কিন্তু ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার পদ্মা সেতুর নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছে ২৬০ কোটি ডলার। আর এই সম্ভাব্য ব্যয় না-কি আরও বাড়তে পারে।

সব মিলিয়ে পদ্মা সেতুর নির্মাণ কাজ শুরু নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটছে না।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আরেক সাবেক উপদেষ্টা ড. আকবর আলিও খুব একটা আশাবাদী নন পদ্মা সেতুর ব্যাপারে। তিনি বলেন, পরিকল্পনা করা আর বাস্তবায়ন করার মধ্যে অনেক ফারাক রয়েছে। যেভাবে কাজের অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে তাতে খুব বেশি সন্তোষজনক নয় বলেই মনে করেন সাবেক এই অর্থসচিব। তবে যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন পদ্মা সেতুর ব্যাপারে খুবই আশাবাদী। প্রায়শই গণমাধ্যমে তিনি বলছেন, ঘোষিত সময়ের মধ্যে সেতু নির্মাণ করেই ছাড়বেন। গতকাল অবশ্য এ ব্যাপারে যোগাযোগ করার চেষ্টা করে মন্ত্রীকে পাওয়া যায়নি। তাঁর সহকারী একান্ত সচিব বাংলাদেশ প্রতিদিনকে গতকাল কয়েক দফায় জানান মন্ত্রী ঘুমোচ্ছেন। তাকে আজ (গতকাল) পাওয়া যাবে না।

যোগাযোগমন্ত্রী ঘুমোতেই পারেন। কিন্তু পদ্মা সেতুর কাজ ঝিমোবে কেন? কেন এই প্রশ্ন সরকারের জ্যেষ্ঠ মন্ত্রীদের মুখেও শোনা যাবে, যোগাযোগ মন্ত্রণালয় উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের ব্যাপারে যতখানি না আগ্রহ দেখায় তার চেয়ে ঢের বেশি আগ্রহ কেনাকাটায়। কেমন? যেমন, রেলওয়ের ইঞ্জিন কিনছেন মন্ত্রী ও তাঁর পারিষদরা। কিন্তু রেল চলবে যার ওপর দিয়ে সেই রেললাইনের উন্নতি হচ্ছে কি? হচ্ছে না। কেন হচ্ছে না? কে দেবে এ প্রশ্নের উত্তর। জানা গেল, যোগাযোগ মন্ত্রণালয় এখন বাস কিনছে। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন (বিআরটিসি) চীন থেকে বাস কিনেছে এবং আরও দুই শতাধিক কেনার প্রক্রিয়া চলছে। আর এ বাস না-কি সরবরাহ করা হবে ঢাকার নামিদামি সব বেসরকারি স্কুলে। যে সব স্কুলের কি-না শত কোটি টাকা এফডিআর আছে। শাবাশ সৈয়দ আবুল হোসেন! তেলে মাথায় তেল দেওয়ার পুরনো প্রবাদটি প্রমাণে যোগাযোগমন্ত্রী কেন এত মরিয়া এর রহস্য উন্মোচনও বোধহয় জরুরি।

বাংলাদেশ প্রতিদিন

[ad#bottom]