অবসরে ঐতিহাসিক স্থান ভ্রমণ

ঢাকা এখন একেবারে বসবাসের অযোগ্য নগর হয়ে গেছে। কিন্তু ঢাকার বাইরে এরকম পুরাকীর্তির পাশাপাশি প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর পরিবেশ রয়েছে। ঢাকার বাইরে বেড়াতে না এলে এই অসাধারণ সুন্দর পরিবেশের স্বাদ পাওয়া সম্ভব হয় না। কিন্তু আমরা চাই ঢাকার বাইরের মতো এরকম সুন্দর ঢাকা নগরী। ভ্রমণপিপাসু তরুণ-তরুণীদের সঙ্গে কথা বলে লিখেছেন শওকত মিথুন ও শিল্পী আহম্মদ

বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া দুই তরুণী অবসরে ঐতিহাসিক স্থান ভ্রমণে বের হয়েছেন

একটি ঐতিহাসিক নিদর্শন দেখছে এক তরুণ


অতীশ দীপঙ্কর লাইব্রেরির সামনে অভিভাবকসহ এক কিশোর ছবি : শওকত মিথুন

খুব সকালে মোবাইল ফোনের শব্দে ঘুমটা ভেঙে গেল। খুবই বিরক্তি নিয়ে ফোনের দিকে তাকিয়ে দেখি বড় ফুপির ফোন, তাড়াহুড়া করে রিসিভ করে শুনি কথা বলছে জাহাঙ্গীর ভাই, কী ব্যাপার মিথুন তুমি এখনো ঘুমাও মুন্সীগঞ্জ যাবে না। জাহাঙ্গীর ভাইয়ের কথা শুনেই বুঝতে পেরেছিলাম ঈদ উপলক্ষে ছোট ফুপির বাসায় যাওয়া না, ঘটনা অন্যকিছু। তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে সানোয়ারকে সঙ্গে নিয়ে রওনা হলাম। নির্দিষ্ট সময়ের তিন মিনিট পর বড় ফুপির বাসায় পৌঁছে দেখি ফুপি আর জাহাঙ্গীর ভাই আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। ওই অবস্থায়ই একটা খালি অটোরিকশা পেয়ে গেলাম। অটোতে উঠেই ভাইয়া বলল তোমার সবকিছু নিয়ে আসছো তো? আমরা মাকে ছোট খালার বাসায় রেখেই বের হয়ে যাব। আমি কোনো প্রশ্ন না করেই বললাম আচ্ছা। কাঠপট্টি ট্রলারঘাট পার হয়েই ভাইয়া ফুপিকে রিকশা করে দিয়ে আমাকে বলল চল, আমি প্রথম প্রশ্ন করলাম কোথায়? সে বলল, অতীশ দীপঙ্করের বাড়ি। এটা আবার কে? ভাইয়া তার স্বভাব মতো রহস্যজনক হাসি দিয়ে বলল, সে জন্যই তো তোমাকে নিয়ে যাচ্ছি বজ্রযোগিনী পর্যন্ত। অতীশ দীপঙ্কর সম্পর্কে পুরো তথ্য তোমাকেই বের করতে হবে। আমি বজ্র্রযোগিনী নামটা শুনেই বললাম খাইছে, এ কি সেই জ্ঞানতাপস অতীশ দীপঙ্কর ভাইয়া বলল দেখ, সেটা তো তোমার কাজ।

মুন্সীগঞ্জ জেলার বজ্রযোগিনী আসলে একটা ইউনিয়ন, প্রায় ৭০০ গ্রাম নিয়ে এ ইউনিয়ন। এখানেই জন্মগ্রহণ করেন ইতিহাসের নতুন অধ্যায় তৈরি করা শ্রী মহাজ্ঞান অতীশ দীপঙ্কর। এ কারণেই এ অঞ্চলটাকে সবাই অতীশের বজ্রযোগিনী হিসেবে চেনে। এ গ্রামে দীপঙ্করের কিংবা তার পরিবারের কোনো চিহ্ন আজ আর নেই, তবুও বজ্রযোগিনীতে তার ভিটা বলতে বাড়িটিকেই বোঝানো হয়। সেই ভিটায় একটি নামফলক স্থাপন করা হয় ১৯৮২ সালে। পরে একটি অডিটোরিয়াম। এ নিয়ে দীপঙ্করের ভিটা, এখানে প্রায় এক হাজার বছর আগে পায়ের চিহ্ন পড়েছিল অতীশ দীপঙ্করের। অতীশ অর্থ মহামানব, এটি তিব্বতীয় ভাষার একটি শব্দ। অতীশ পন্ডিত দীপঙ্করের উপাধি। বাঙালি দীপঙ্কর জ্ঞানের আলো নিয়ে গিয়েছিলেন সুদূর তিব্বতে সেখানকার রাজার সবিনয় আমন্ত্রণে, তিব্বতের রাজা পন্ডিত দীপঙ্করের প্রতি এতটাই শ্রদ্ধাশীল ছিলেন যে, নামটি উচ্চারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তিনি সিংহাসন ছেড়ে উঠে দাঁড়াতেন এবং করজোড়ে প্রণাম নিবেদন করতেন, সে রাজার নাম জে সে হো।

শ্রীজ্ঞান অতীশ দীপঙ্কর ৯৮২ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশের বিক্রমপুরের বক্তাযোগীনি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ পাগ-সায়-জাঙ্গ এর মতে অতীশ দীপঙ্করের জন্মভূমি বিক্রমপুর বজ্রাসনের পূর্বদিকে। দীপঙ্করকে ছোটবেলায় চন্দ্রগর্ভ নামে ডাকা হতো, তার পিতার নাম কল্যাণ শ্রী, আর মাতার নাম প্রভাবতী। বাল্যকালে জেতারি নামে এক শিক্ষকের কাছে দীপঙ্কর প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন, তার প্রখর জ্ঞানের প্রকাশ ঘটে বাল্যকালেই এবং তা তৎকালীন ভারতবর্ষে সর্বত্র প্রচারিত হয়ে যায়। ২৫ বছর বয়সে তিনি সে যুগের অপ্রতিদ্বন্দ্বী পন্ডিত নৈয়ায়িক ব্রাহ্মণকে তর্কযুদ্ধে পরাজিত করেন। এ ঘটনার পরই দীপঙ্কর ওদত্মপুরীর বৌদ্ধচার্য শীলরক্ষিতের কাছ থেকে শ্রীজ্ঞান উপাধি লাভ করে। অতীশ দীপঙ্কর ৩১ বছর বয়সে ব্রহ্মদেশ সফর করেন বৌদ্ধধর্ম প্রচার ও জ্ঞান অর্জনের উদ্দেশে। নৌকাযোগে যাত্রা করে ১৩ মাসে দীপঙ্কর ব্রহ্মদেশে (বার্মা) পৌঁছান। জ্ঞানতাপস অতীশ দীপঙ্কর ভিক্ষু আশ্রমের শ্রেষ্ঠ সম্মান লাভ করেন মাত্র ৩১ বছর বয়সে। নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের অতি নিকটে দীপঙ্কর নামে একটি গ্রাম আছে এখানে, সে গ্রামের নাম রাখা হয়েছিল অতীশ দীপঙ্করের নামানুসারে। দীপঙ্কর ভিক্ষু হওয়ার পর বিক্রমশীল বিহারে আশ্রয় গ্রহণ করেন, দীপঙ্করের জ্ঞান ও পান্ডিত্যে মুগ্ধ হয়ে পালবংশীয় নরপতি মহীপাল (৯৮০-১০৩০) তাকে বিক্রমশীলা বিহারে নিমন্ত্রণ করে নিয়ে যান এবং বিহারের অধ্যক্ষের দায়িত্ব দেন। দীপঙ্কর যুগে মুন্সীগঞ্জে বেশ কয়েকটি বৌদ্ধ শিক্ষা কেন্দ্র গড়ে ওঠে। এর মধ্যে কেওয়ার এলাকায় কহোরী বজ্রাসন, জগদ্দল বিহার প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। এছাড়াও মুন্সীগঞ্জে কেওয়ার দেউল, জোড়ার দেউল, সোনারঙ্গ দেউল, নাটেশ্বর দেউল, পুরাপাড়া দেউল, দেউল বাড়ি, নারায়ণগঞ্জে দেউল পাড়া, দেউল ভেগে ও তারশ্বরে বৌদ্ধ বিদ্যানিকেতন গড়ে ওঠে, তার সুনাম যখন ভারত ছাড়িয়ে চীন, তিব্বত, নেপাল, বার্মা ছড়িয়ে পড়ে তখন তিব্বতের রাজা জে সে তাকে সে দেশে আমন্ত্রণ করেন। সে সময় তিব্বতের সামাজিক অবস্থা ছিল খুবই খারাপ। মানুষ ভুলে গিয়েছিল গৌতম বৌদ্ধের মহান শিক্ষা। এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণের আশায় রাজা দীপঙ্করের সাহায্য প্রার্থনা করেন। দীপঙ্কর তার তিব্বত যাত্রায় ৫ জন সঙ্গী নিয়েছিলেন।

১০৪২ খ্রিস্টাব্দে ৫৯ বছর বয়সে ভূমিসঙ্গ, বীর্যচন্দ্র, নাগছো, গ্যায়্যসোদেবকে নিয়ে তিব্বত পৌঁছান। এ যাত্রাপথে নেপাল রাজা অনত্মকীর্তিকে একটি হাতি উপহার দেন। এবং একটি বিহার নির্মাণের নির্দেশ দেন। পরে নেপাল রাজার ছেলে পদ্মপ্রভ নেপালে থান-বিহার নির্মাণ করেন। পদ্মপ্রভই ভারতের বাইরে তার প্রথম শিষ্য। নেপালে অবস্থানকালে দীপঙ্কর বাংলার রাজা ন্যায়পালকে একটি চিঠি লেখেন, পরে সেটি বিমল রতœলেখ নামে ইতিহাসে পরিচিত, অতীশ দীপঙ্কর অনেক গ্রন্থ রচনা করেছেন এর মধ্যে বোধিপথ প্রদীপ, চর্যা, সংগ্রহ, মধ্যযোপদেশ, মহামান পথ সাধন, বর্ণসংগ্রহ, বর্ণবিভঙ্গ, সপ্তক বিধি উল্লেখযোগ্য। তিব্বতেও অতীশ দীপঙ্করকে নিয়ে অনেক গ্রন্থ লেখা হয়েছে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক লামা দাউসনদুপের নিকট তিব্বতীয় ভাষায় ৬০০ পৃষ্ঠার দীপঙ্কর জীবন রচিত, রক্ষিত ছিল। অতীশ দীপঙ্কর তিব্বতের লামার নিকটবর্তী ন্যামাং নামক স্থানে ১০৫৪ খ্রিস্টাব্দে ৭২ বছর বয়সে মারা যান। তার চিতাভস্ম ছড়িয়ে দেয়া হয় তিব্বতের নানা স্থানে। সেই সূত্রে নানা জায়গায় গড়ে ওঠে দীপঙ্করের স্মৃতিসৌধ যার কোনো কোনোটি এখনো রয়েছে। অতীশ দীপঙ্করের বজ্রযোগিনী গ্রামটার নাম হয়েছে বরজ থেকে। বরজ হচ্ছে শেরশাহের সময় যুদ্ধে পরাজিত এক রাজার কন্যা, সে রাজা যুদ্ধে পরাজিত হয়ে কন্যাকে নিয়ে গ্রামে চলে এসেছিলেন। বরজ পরবর্তীতে বাবার মতো রাজা না হয়ে হয়েছিল সন্ন্যাসিনী। বরজ মাঝে মধ্যে ৭-৮ কিলোমিটার হেঁটে তার সঙ্গীদের নিয়ে মেঘনায় গোসল করতে যেত।

সেখানে বরজ গোসল করত লোকেরা সেটাকে যোগিনীরঘাট বলত, এই নামটাই যুগ যুগ ধরে পরবর্তিত হতে হতে বরজ থেকে বজ্র আর সঙ্গে যোগিনী মিলে হয়ে গেল বজ্রযোগিনী। বরজের সন্ন্যাসিনীর কারণেই হয়তো পরবর্তীতে এ অঞ্চলে জন্ম নিয়েছে অতীশ দীপঙ্কর আর গণিতবিদ সোমেন বোসের মতো আরো অনেক অনেক জ্ঞানীগুণী ব্যক্তি, ২০০৬ সালের ৫ মে চীন এবং বাংলাদেশ এমবাসির যৌথ প্রচেষ্টায় এ স্থানটিকে নতুন করে প্রাচীর দিয়ে ঘিরে ফলকটাকেও একটা ছাউনির নিচে নিয়ে আসা হয় যার প্রবেশমুখেই দুইটা সিংহের মতো প্রাণী বসে আছে। এর কিছু দূরেই একটা বিশাল অডিটোরিয়াম কাম পাঠাগার করা হয়েছে। কিন্তু কোথাও তার সংক্ষিপ্ত জীবনী দেখতে পেলাম না। আর সুখবাসপুরের বিশাল পুকুরটার মতো বিশাল হয়েও ওর আশপাশে কোনো দিক চিহ্নও দেখতে পাওয়া গেল না। সারোয়ার সাহেব ছেলে ত্রিমানকে নিয়ে এসেছে দীপঙ্করের গ্রাম দেখানোর জন্য। ত্রিমান ছায়ানটের নালন্দা বিদ্যালয়ে পড়ে। সেখান থেকে ত্রিমানকে অতীশ দীপঙ্কর বিষয়ে একটা প্রতিবেদন করতে বলা হয়েছে। বাবার সারোয়ার আহমেদ দীপঙ্কর সম্পর্কে ত্রিমানের বহু প্রশ্নের জবাব দিতে পারেনি তাই সপরিবারে দীপঙ্করের গ্রামে চলে এসেছে উত্তর খোঁজার জন্য। কিন্তু কোথাও অতীশ দীপঙ্কর সম্পর্কে কিছুই ছিল না। মুন্সীগঞ্জের ডিসির কাছ থেকে জানা গেল দীপঙ্করের যেসব জমি বেহাত হয়ে গেছে তা খুব শিগগিরই পুনর্দখল নেয়া হচ্ছে যেখানে অতীশ দীপঙ্কর বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশাল ক্যাম্পাস করা হবে।

যদিও অতীশ দীপঙ্করের স্মৃতিবিজড়িত স্থানটি গ্রামের অনেক ভেতরে তবুও একে খুঁজে পেতে কষ্ট হয় না কারণ এখানে রাকিবের মতো প্রত্যেকেই অতীশের বাড়ির দিক চিহ্ন অন্তরে এঁকে নিয়েছে যা মুন্সীগঞ্জে প্রবেশ করে যাকেই বলা হয় সেই দেখিয়ে দেবে। তারপরও যদি কেউ খুঁজে পেতে ক্লান্ত হয়ে পড়েন তারা আমাদের মতো এখানের খাঁটি গরুর দুধের চা খেয়ে আবারো রওনা হবেন। দেখবেন ক্লান্তি একেবারেই নেই।

ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং প্রকৃতির অসীম সৌন্দর্য মিলিয়েই হচ্ছে বজ্রযোগিনী আর প্রাচীন স্থাপত্যের প্রতিনিধিত্ব করা মুন্সীগঞ্জের অতীশ দীপঙ্কর হাজার বছরের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বাঙালি, সেই সুদূর অতীতেই দীপঙ্করই প্রথম বাংলাদেশকে এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। বাংলাদেশের বিভিন্ন স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের কিশোর-কিশোরী তরুণ-তরুণীরা এ ঐতিহাসিক স্থানে আসেন। এ রকম দুই তরুণীর সঙ্গে কথা হলো। তারা নর্দান বিশ্ববিদ্যালয়ে বিবিএতে পড়াশোনা করে। বন্ধুরা মিলে একসঙ্গে ঘুরতে চলে এসেছে এখানে। তাদের একজনের নাম নীলা। নীলা জানালেন, ভ্রমণ একটি পজিটিভ বিনোদন। আজকাল যেসব দিশাহারা তরুণ-তরুণীকে মাদকসহ নানা রকম জটিলতায় মগ্ন থাকতে দেখি তাদের বলব ভ্রমণে উৎসাহী হতে। আজ এখানে মুন্সীগঞ্জে এসে যে ভালো লাগার অনুভূতিতে আমার মন ভরে গেল তা এখানে না আসলে কাউকে ভাষায় প্রকাশ করে বোঝানো যাবে না। দোলা জানালেন, ঢাকা এখন একেবারে বসবাসের অযোগ্য নগর হয়ে গেছে। কিন্তু ঢাকার বাইরে এ রকম পুরাকীর্তির পাশাপাশি প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর পরিবেশ রয়েছে। আমরা ঢাকার বাইরে বেড়াতে না এলে এ অসাধারণ সুন্দর পরিবেশের স্বাদই মনে হয় পেতাম না। আসলে আমরা চাই এ রকম সুন্দর ঢাকা নগরী। মুন্সীগঞ্জের ঐতিহাসিক এ স্থান সম্পর্কে দোলা জানালেন, আসলে এ রকম নিদর্শন থেকে অনেক কিছু শেখার আছে। ইতিহাসের সাক্ষ্য জ্ঞানের অন্যতম আধার হয়ে থাকে।

[ad#bottom]