হুমায়ুন আজাদ জিতে গেছেন ঠিক এখানেই

বৈপরীত্যে ভরা মানুষের জীবন। হুমায়ুন আজাদের জীবনও তার ব্যতিক্রম ছিলো না। প্রশংসা করে লিখলেন শামসুর রাহমান : নিঃসঙ্গ শেরপা নামের বইটি, সেই শামসুর রাহমানের নামে এখানে ওখানে কুৎসা গেয়েছেন তিনি নিজে। মতামত প্রকাশে কিছুটা চমক সৃষ্টির ঝোঁকও তাঁর ছিলো বলে মনে হয়, যা তাঁর বুদ্ধিবৃত্তির সঙ্গে ঠিক খাপ খায় না।

আমাদের দেশে নির্ভয়ে সত্যউচ্চারণ করার মতো সাহসী বুদ্ধিজীবীরা ভয়াবহ রকমের সংখ্যালঘু। অল্প সময়ের ব্যবধানে আহমদ শরীফ ও আহমদ ছফার মৃত্যুর পর মনে হয়েছিলো, এখন? শাসক, সমাজের মোড়ল ও ধর্মান্ধদের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে সত্যি কথাটি বলার মতো হাতে রইলেন এক হুমায়ুন আজাদ। তাঁকেও যেতে হলো। পূর্বোক্ত দু’জনকে হুমকি-ধামকি প্রচুর দেওয়া হয়েছিলো, প্রাণসংশয় হয় এমন শারীরিক আক্রমণের মুখে তাঁদের পড়তে হয়নি। হুমায়ুন আজাদকে হয়েছিলো। তাঁর মৃত্যুর জন্যে সেই আক্রমণকে হয়তো প্রত্যক্ষভাবে দায়ী করা চলে না, কিন্তু পরোক্ষে তা অস্বীকার করা অসম্ভব বলেই মনে হয়।

আর সব মানুষের মতো তিনিও দোষেগুণে মানুষ ছিলেন। ঔপন্যাসিক হিসেবে তাঁকে তেমন কিছু একটা কখনোই মনে হয়নি। বরং মনে হয়েছে নিজের বক্তব্যটিকে যেনতেন প্রকারে প্রচার করার জন্যে কিছু সম্ভব-অসম্ভব ঘটনা ও দ্বন্দ্বের অবতারণার দিকেই তাঁর ঝোঁক বেশি ছিলো। হুমায়ুন আজাদের ভাষাতত্ত্ব বিষয়ে গবেষণাকর্ম নিয়ে আমি আদার ব্যাপারীও নই। কবি হিসেবে কতোখানি সফল-অসফল তা নিয়েও আমার মতামত দেওয়া সাজে না। তবে আধুনিক বাংলা কবিতা সংকলনে পক্ষপাতমূলক নির্বাচন তাঁর সুনাম বাড়ায়নি, বরং তাঁর বিবেচনাই প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।

প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাসী মানুষ ছিলেন তিনি। সেই আত্মবিশ্বাস, বিশেষ করে নিজের মৌলিক রচনাগুলি সম্পর্কে তাঁর ধারণা অনেকটাই বাস্তবতাবিবর্জিত মনে করা যায়। বাংলা ভাষায় লিখিত একমাত্র তাঁরই রচিত কিছু কবিতা ও গদ্য বিশ্বমানে পৌঁছাতে পেরেছে, এরকম বালখিল্য দাবিও তিনি একাধিকবার করেছেন।

২.

হুমায়ুন আজাদের সঙ্গে ব্যক্তিগত পরিচয় আমার ঘটেনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের করিডরে কয়েকবার ছাড়া তাঁকে চাক্ষুষ দেখিওনি আর কোথাও। যদিও তাঁর লাল নীল দীপাবলী বইটি বিষয়ে আলোচনা লিখেছিলাম ১৯৭৭-এ। আমার ছোটো বোনের সরাসরি শিক্ষক ছিলেন তিনি। সে তাঁর ভক্ত হিসেবে আমাকে ৯২ সালে পাঠিয়েছিলো প্রবচনগুচ্ছ। ২০০৪ সালে বাংলা একাডেমির বইমেলা থেকে আমার অবিশ্বাস তার স্যারকে দিয়ে স্বাক্ষর করিয়ে নিয়েছিলো আমার নামে। সে বই আমার হাতে আসার কয়েকদিন আগেই বইমেলা থেকে বেরিয়ে দুর্বৃত্তদের হাতে আক্রান্ত হয়েছেন খবর পেয়েছি। বইটি পৌঁছালে হুমায়ুন আজাদের স্বাক্ষরের নিচে তারিখ দেখে চমকে উঠতে হয়। ওই তারিখেই তিনি আক্রান্ত হয়েছিলেন।

পরিচিত এক ভদ্রমহিলা আমার অবিশ্বাস পড়তে নিয়েছিলেন। বইটি তাঁকে পড়তে দেওয়া যায় কি না, এই নিয়ে কিছু দ্বিধায় ছিলাম। এই বইয়ে হুমায়ুন আজাদ সকল ধর্মবিশ্বাসের প্রতি প্রবল অনাস্থা জানিয়েছেন, মানুষের ধর্মবিশ্বাসগুলির অযৌক্তিকতা ও অসারত্ব সবিস্তারে বলেছেন তীক্ষ্ণ যুক্তি দিয়ে। আমার দ্বিধা ছিলো সেই কারণেই। ভদ্রমহিলা বড়ো হয়েছেন ধর্মপরায়ণ পরিবারে, ছোটোবেলা থেকে ধর্মবিশ্বাস ও আচরণে নিষ্ঠ। এখন ধর্মাচরণে অনিয়মিত হলেও ভদ্রমহিলার বিশ্বাসটি অক্ষত ও অটুট। তাঁর বিশ্বাস আহত হোক তা আমি চাইনি। একরকম জোর করেই তিনি বইটি নিয়ে গেলেন।

পড়া হয়ে গেলে বইটি ফেরত দিয়ে মহিলা অপ্রত্যাশিতভাবে একটি আশ্চর্য মন্তব্য করলেন। গ্রন্থে উপস্থাপিত তথ্য ও যুক্তি সম্পর্কে তিনি উচ্ছ্বসিত হয়ে বললেন, একমাত্র আমার অন্ধবিশ্বাস ছাড়া আর কিছু দিয়ে তো আমি হুমায়ুন আজাদের যুক্তিগুলি অস্বীকার করতে পারছি না!

হুমায়ুন আজাদ জিতে গেছেন ঠিক এখানেই।

রেডটাইমস বিডি ডটকম

[ad#bottom]