দেশে দেশে নৌকাবাইচ

মীর নাসিরউদ্দিন উজ্জ্বল
সারাবিশ্বেই নৌকাবাইচ খুব জনপ্রিয়। আর নদীমাতৃক বাংলাদেশে তো কথাই নেই! বাঙালির অন্যতম সেরা সামাজিক বিনোদন এটি। বাংলার সব ধর্মের, সব সম্প্রদায়ের মানুষের মনেই নৌকাবাইচ নির্মল আনন্দের খোরাক। এর উৎপত্তি খ্রিস্টপূর্ব ২০০০ বছর আগে। ‘মেসোপটেমিয়ার’ লোকেরা ফোরাত নদীতে এই নৌকাবাইচ শুরু করেন। এর কয়েক শতাব্দী পর মিসরের লোকেরাও নীল নদের জলে নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতা শুরু করেন।

আধুনিককালের প্রথম নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতাটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১৭১৫ সালে, ইংল্যান্ডে। কৌতুক অভিনেতা থমাস ডগেট এ প্রতিযোগিতা পরিচালনা করেন। পরে ধীরে ধীরে এ প্রতিযোগিতা ছড়িয়ে পড়ে গোটা দুনিয়ায়। অঞ্চলভেদে নৌকার দাঁড়ির (যে দাঁড় টানে) সংখ্যা ভিন্ন হয়ে থাকে। বিভিন্ন দেশের নৌকার আকৃতিও বিভিন্ন রকমের।

নৌকাবাইচে ঢোল-কাঁসরের তালে তালে দাঁড়িদের সুশৃঙ্খল দাঁড় টানায় যে আনন্দ-উত্তেজনার সৃষ্টি হয় এক কথায় তা অতুলনীয়। আবেগ আর উচ্ছ্বাসে তুঙ্গস্পর্শী হয় দর্শকের মন। আর তাই আবহমানকাল থেকে বাংলার ঐতিহ্যের অন্যতম অনুষঙ্গ নৌকাবাইচ। তাই এ দেশের খাল-বিল-নদীতে নৌকা শুধু যোগাযোগের মাধ্যমই নয়, হয়ে উঠেছে জলক্রীড়ার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

মাঝিরা একত্রে জয়ধ্বনি দিয়ে নৌকা ছেড়ে দিয়ে একই লয়ে গান গাইতে আরম্ভ করে এবং সেই গানের তালে তালে বৈঠা টানে; ফলে কারো বৈঠা ঠোকাঠুকি না লেগে একসঙ্গে পানিতে অভিঘাত সৃষ্টি করতে থাকে। গায়েন বা পরিচালক কাঁসির শব্দে এই বৈঠার এবং গানের গতি বজায় রাখতে সাহায্য করেন। অন্য সব নৌকাকে পেছনে ফেলে নিজেদের নৌকাকে সবার আগে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টায় কাঁসির শব্দে বৈঠার গতি বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয় এবং সেই সঙ্গে গানের গতিও বেড়ে চলে। এ ছাড়া এই সময় দেহ ও মনের উত্তেজনার বশেই গানের মধ্যে ‘হৈ-হৈয়া’ ধরনের শব্দের ব্যবহার দেখা যায়। এটি সারি গানের এক বিশেষ বৈশিষ্ট্য। মাল্লাদের কণ্ঠে যখন দরাজ সুর ভেসে আসে, তখন বিশাল নদীবই যেন উন্মাতাল হয়ে ওঠে। কালের বিবর্তনে পাশ্চাত্যের ভাবধারায় আধুনিক সুযোগ-সুবিধার শহর গড়ে উঠলেও গ্রামবাংলায় নৌকাবাইচের কদর এখনো ব্যাপক। নৌকাবাইচে আমজনতার স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণই তার প্রমাণ।

উৎপত্তি

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, নৌকাবাইচের উৎপত্তি খ্রিস্টপূর্ব প্রায় ২০০০ বছর আগে। ‘মেসোপটেমিয়ার’ লোকেরা ফোরাত নদীতে তখন এক ধরনের নৌকাবাইচের আয়োজন করতেন। এর কয়েক শতাব্দী পর মিসরের নীল নদের জলে নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতা শুরু হয়। এরপর ছড়িয়ে পড়তে থাকে এর প্রসার।

আধুনিককালের প্রথম নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতাটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল ইংল্যান্ডে, ১৭১৫ সালে। থমাস ডগেট নামের এক কৌতুকাভিনেতা এ প্রতিযোগিতাটি পরিচালনা করেন। তিনি টেমস নদীর মাঝিদের মধ্যে এক দাঁড়ের এ নৌকা প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছিলেন। প্রতিযোগিতাটি খুব জনপ্রিয়তা পায় এবং সেই থেকে তা প্রতিবছরের নিয়মিত অনুষ্ঠানে পরিণত হয়। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে প্রথম প্রতিযোগিতাটি অনুষ্ঠিত হয় অক্সফোর্ড ও ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে। ১৮২৯ সালে টেমস নদীর ‘হেনলি’ নামক স্থানে এ প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। এটি ছিল আট দাঁড়ের নৌকাবাইচ। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে ক্রীড়া হিসাবে নৌকাবাইচ প্রায় অধিকাংশ দেশের কাছেই গ্রহণযোগ্যতা পায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে নৌকাবাইচ এক সম্মানসূচক ক্রীড়ারূপে প্রতিপন্ন হয়। এ প্রতিযোগিতায় নৌকার দাঁড়ির সংখ্যা ভিন্ন হয়। একটি নৌকায় ৮ জন, ৪ জন আবার কখনো ২ জন দাঁড়িও থাকতে পারেন। তবে এশিয়ায়, বিশেষ করে বাংলাদেশ ও ভারতে ১শ থেকে ১শ ৫০ ফুট দৈর্ঘ্যরে ছিপ নৌকায় ৫০ থেকে ৮০ জন দাঁড়ির যে নৌকাবাইচ অনুষ্ঠিত হয় বিশ্বের কোথাও তেমনটি দেখা মেলে না।

নৌকাবাইচ হলো নদীতে নৌকা চালনার প্রতিযোগিতা। ‘বাইচ’ শব্দটিতে দাঁড় টানার কসরত ও নৌকা চালনার কৌশল খাটিয়ে বিজয় লাভের ল্েয আমোদ-প্রমোদমূলক প্রতিযোগিতা বোঝায়।

মেসোপটেমিয়ায় এই খেলার উৎপত্তি হলেও এর আধুনিক ছোঁয়া লাগে ব্রিটিশদের সময়। পরে ছড়িয়ে পড়ে ভারতবর্ষে। সর্বত্র জনপ্রিয় হতে থাকে এ খেলা। সেই ধারাবাহিকতায় এ জনপদে নৌকাবাইচ আমজনতার জনপ্রিয় প্রতিযোগিতা হিসাবে স্থান করে নেয়।

অলিম্পিকে নৌকাবাইচ : ১৯০০ সাল থেকে অলিম্পিক প্রতিযোগিতায় নৌকাবাইচ অন্তর্ভুক্ত হয়। অলিম্পিকে এ পর্যন্ত নৌকাবাইচের েেত্র প্রায় ১শ ৩৫টি ফাইনাল খেলা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর মধ্যে ২৬ বার জিতেছে যুক্তরাষ্ট্র, ২৫ বার পূর্ব জার্মানি এবং ১৪ বার ব্রিটেন। অলিম্পিক প্রতিযোগিতায় অন্য ক্রীড়ার তুলনায় নৌকাবাইচের মুকুট ভিন্ন রকমের তাৎপর্য বহন করে। ওয়ার্ল্ড রোয়িং ফেডারেশনও নৌকাবাইচের প্রসারে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করে চলেছে।

অক্সফোর্ড ও ক্যামব্রিজের নৌকাবাইচ : অক্সফোর্ড ও ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে নিয়মিত অনুষ্ঠিত প্রতিযোগিতাটি এখনো জনপ্রিয়তার শীর্ষে। খ্যাতিমান এই দুই বিদ্যাপীঠের মধ্যে দীর্ঘকাল ধরে চলে আসছে এই প্রতিযোগিতাটি। এই প্রতিযোগিতা দেখতে দেশ-বিদেশের ক্রীড়ামোদীরাও অংশ নিয়ে থাকেন।
নীল নদে নৌকাবাইচ : মিসরের নীল নদে নৌকাবাইচের আয়োজনের ইতিহাস সুপ্রাচীন। নীল নদ নানা কারণে যেমন পৃথিবীর ইতিহাসে একটি সুপরিচিত নাম, ঠিক নৌকাবাইচের েেত্র তাই। উৎপত্তির কয়েক শতাব্দী পরই মিসরে এই প্রতিযোগিতা হতো। মিসরে এখনো নৌকাবাইচ জনপ্রিয়। কালের বিবর্তনে নৌকার আকৃতি পরিবর্তন হলেও প্রতিযোগিতাটি এখনো চলমান।

ভেনিসের ভোগালঙ্গা নৌকাবাইচ : ইতালির ভেনিস নগরীজুরেই খাল আর খাল। সেখানকার ভোগালঙ্গা খালের ম্যারাথন নৌকাবাইচ পৃথিবী-বিখ্যাত। ভেনিসের উত্তরে ৩২ কিলোমিটার দীর্ঘ এ জলাশয়ের নৌকাবাইচে অংশ নেয় বিভিন্ন আকৃতির এক হাজারেরও বেশি নৌকা। সবার জন্য উন্মুক্তএ নৌকাবাইচে অংশ নিতে ইতালির বাইরে থেকেও আসেন অনেকে।

ক্রোয়েশিয়ার লাদজা ম্যারাথন : নামে ম্যারাথন হলেও এটা কোনো দৌড় প্রতিযোগিতা নয়। ক্রোয়েশিয়ার এক ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচ এটি। গত ২৯২ বছর ধরে নেরেতভা উপত্যকার নেরেতভানিয়ান নদীতে প্রতিবছর এ প্রতিযোগিতা আয়োজিত হয়ে আসছে। দেশটির সংস্কৃতির এটি এখন অবিচ্ছেদ্য অংশ। এ নৌকাবাইচে সাড়ে বাইশ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করতে হয়। নেরেতভানিয়ান নদীর সেকেলে পালতোলা নৌকায় পালের বদলে দাঁড় টেনে এ প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। উপজাতীয় ঢোলের ছন্দময় আওয়াজে প্রতিযোগিতাটি শুরু হয়। নৌকাগুলোর নাম লাদজা। ভেনিসে যেমন গন্ডোলা, নেরেতভা অঞ্চলে তেমনি বিখ্যাত এই লাদজা। শক্ত করে বাঁধা ৩০টি লাদজায় ৩শ দাঁড়ি এ প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়। লক্ষ্যস্থলে যারা আগে পৌঁছে তাদের সাধারণত ৩ ঘণ্টা সময় লাগে। আর পিছিয়ে পড়াদের লাগে ৫ ঘণ্টা। সাধারণত আগস্ট মাসে এ নৌকাবাইচ অনুষ্ঠিত হয়। ক্রোয়েশিয়ার প্রেসিডেন্ট এতে উপস্থিত থাকেন।

চীনের ড্রাগন নৌকাবাইচ : চীনের ঐতিহ্যবাহী ড্রাগন নৌকাবাইচ অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে ২০০০ বছর ধরে। চীনা সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ এই নৌকাবাইচ একটি আন্তর্জাতিক জলক্রীড়া হিসাবে স্বীকৃতি পায় ১৯৭৬ সালে হংকংয়ের আয়োজন থেকে। চীনের গ-ি পেরিয়ে এটি এখন ছড়িয়ে পড়েছে এশিয়া, আফ্রিকা ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জে। মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর এবং অন্য যেসব দেশে চীনা বংশোদ্ভূতরা ব্যাপকভাবে বাস করে সেসব দেশে এ নৌকাবাইচ আয়োজিত হয়। ড্রাগনের আকৃতিতে খোদাই করে বানানো হয় এ নৌকাগুলো।

ভারতে নেহরু ট্রফি নৌকাবাইচ : ভারতের বিখ্যাত নেহরু ট্রফি নৌকাবাইচ অনুষ্ঠিত হয় কেরালায়। কেরালার ঐতিহ্যবাহী ‘সাপ-নৌকা’র এ বাইচ প্রথম অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৫২ সালে। ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জওয়াহেরলাল নেহরুর কেরালা সফর উপলক্ষে এ নৌকাবাইচের প্রচলন হয়। এটি আয়োজিত হয় আলাপাঝা হ্রদে। কেরালায় এই ‘সাপ নৌকা’গুলো ‘চন্দনভালাস’ নামে পরিচিত। প্রায় ১০০ ফুট লম্বা এই নৌকাগুলোতে ১৫০ জন পর্যন্ত দাঁড়ি দাঁড় টানতে পারে। এ নৌকাবাইচ উপলক্ষে কেরালার ঐতিহ্যবাহী কথাকলি ও থিয়ায়াম নাচও পরিবেশিত হয়।

বাংলাদেশে ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচ
টুঙ্গিপাড়ার নৌকাবাইচ : টুঙ্গিপাড়ার গোপালপুরে প্রতিবছর সেপ্টেম্বর মাসে দোয়ালখালে অনুষ্ঠিত হয় ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচ। বিশ্বকর্মা পুজো উপলক্ষে দুশ বছর ধরে এ নৌকাবাইচ অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে।

উজিরপুরের সন্ধ্যা নদীর নৌকাবাইচ : বরিশাল জেলার উজিরপুরের হারতায় প্রতিবছর অক্টোবর মাসে ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচ অনুষ্ঠিত হয়। দেড়শ বছর ধরে এ নৌকাবাইচ অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে।

নড়াইলের নৌকাবাইচ : নড়াইলে চিত্রা, নবগঙ্গা ও ভৈরব নদীর মিলনস্থল ত্রি-মোহনায় প্রতিবছর সেপ্টেম্বর মাসে নৌকাবাইচ অনুষ্ঠিত হয়। এবার ছিল এর ৯০তম আয়োজন। জানা যায়, পিরালীর দানবীর ফাজেল মোল্লার জীবদ্দশায় তিনি এ নৌকাবাইচ ও মেলার সূচনা করেছিলেন।

নিকলির নৌকাবাইচ : কিশোরগঞ্জের নিকলি উপজেলায় ব্রিটিশ আমল থেকে অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে নৌকাবাইচ। এ নৌকাবাইচ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। ১৫ বছর বন্ধ থাকার পর এবার সেপ্টেম্বরে আবার এ নৌকাবাইচ অনুষ্ঠিত হয়েছে।

কোম্পানীগঞ্জের নৌকাবাইচ : সিলেটের কোম্পানীগঞ্জে মরমী সাধক শাহ আবদুল করিমের স্মৃতি বিজড়িত ধলাই নদীতে অনুষ্ঠিত হয় নৌকাবাইচ।

বাংলাদেশের প্রায় সব জেলাতেই এ ধরনের নৌকাবাইচ অনুষ্ঠিত হয়।

বৈচিত্র্যপূর্ণ নৌকা
বাইচের জন্য বিভিন্ন ধরনের নৌকা দেখা যায়। বাইচের নৌকার গঠন কিছুটা বৈচিত্র্যপূর্ণ। এই নৌকা হয় সরু ও লম্বাটে। লম্বায় যতই না দীর্ঘ; ঠিক তেমনই চওড়ায় খুবই সরু। কারণ সরু ও লম্বাটে হওয়ার দরুন নদীর পানি কেটে তরতরিয়ে দ্রুত চলতে সম এবং প্রতিযোগিতার উপযোগী। নৌকার সামনের গলুইটাকে খুব সুন্দর করে সাজানো হয়। তাতে কখনো করা হয় ময়ূরের মুখ, কখনো রাজহাঁস বা অন্য কোনো পাখির মুখাবয়ব। নৌকাটিতে উজ্জ্বল রঙের কারুকাজ করে বিভিন্ন নকশা তৈরি করা হয়। সর্বোপরি নৌকাটিকে দর্শকের সামনে যথাসম্ভব আকর্ষণীয় করে তোলার চেষ্টা থাকে। নৌকাবাইচে প্রতিযোগিতার বাইরে ‘ময়ূরপঙ্খী নাও’ দর্শকদের বিপুল বিনোদন দিয়ে থাকে।

একটি নৌকায় ৮ জন, ৪ জন আবার কখনো ২ জন দাঁড়িও (মাল্লা) থাকতে পারেন। তবে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতাগুলোতে ২৫, ৫০, ৭০ ও ৮০ জন মাল্লারও দেখা মেলে। মাল্লা হচ্ছে যত জন দাঁড়ি অর্থাৎ যতজন বৈঠা ধরে।

নৌকাবাইচের সামাজিক ভিত্তি
খেলাধুলা মানুষের জন্য একটি মহৌষধ। এই ওষুধ শুধু মানুষের দৈহিক ও মানসিক রোগই নিরাময় করে না, এটা সামাজিক অবয়ের প্রতিষেধক হিসাবেও ব্যবহৃত হয়। খেলাধুলা শুধু সমাজের মানুষের বিনোদন আর রোগ নিরাময়ই করে না, এটা সমুন্নত করতে পারে একজন ব্যক্তি, সমাজ তথা রাষ্ট্রের পরিচয়। অনুসন্ধানে দেখে গেছে, পৃথিবীতে অনেক জাতি আছে যারা শুধু তাদের ঐতিহ্যগত খেলাধুলা খেলেই আন্তর্জাতিক পরিম-লে পরিচিতি। যেমন ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, ইতালি ফুটবলের জন্য পরিচিত; ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, নিউজিল্যান্ড, পাকিস্তান, ভারত, শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ ক্রিকেটের জন্য পরিচিত, চীন পরিচিত টেবিল টেনিসের জন্য আর জাপান সুমো কুস্তির জন্য।

এক সময়ে বিভিন্ন গঞ্জে দুই-তিন গ্রাম নিয়ে বড় নদীতে-বিলে নৌকাবাইচের আয়োজন করা হতো। আর এ আয়োজনকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন ধরনের মেলা, মানুষের মাঝে এক আনন্দঘন মুহূর্ত সৃষ্টি হতো, বাড়ত এক গ্রামের মনমানসিকতা অন্য গ্রামের সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক। সবাই মিলেমিশে কাজ করত, একে অপরের সহযোগিতায় এগিয়ে আসত, একে অন্যের বিপদে এগিয়ে আসত। ফলে সমাজে সুখ শান্তি বিরাজ করত এবং সেই সময়ের ছেলেমেয়েরা সংস্কৃতি, খেলাধুলা চর্চার মধ্য দিয়ে সামাজিক ব্যাধি থেকে দূরে থাকত। নৌকাবাইচের মতো সামাজিক সংঘবদ্ধ খেলা এই তথাকথিত আধুনিক সমাজ ও যুবসমাজকে রায় এক অগ্রণী ভূমিকা রাখতে পারে, পারে তাদের অবয়ের হাত থেকে রা করতে। যুবসমাজকে এ ধরনের খেলাধুলায় উৎসাহ দিয়ে আন্তর্জাতিক সুনাম অর্জন এবং বর্তমানের মাদকের ভয়াবহ ছোবল থেকে রা করা যায়।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে ঘুরে আসা বিশিষ্ট এক ক্রীড়া সংগঠক জানান, সামাজিক সম্প্রীতি বোধ, ভালবাসা, সঠিক সংস্কৃতির চর্চার মধ্য দিয়ে পশ্চাৎপদ একটি দেশকে মানব সম্পদে তৈরি করার মূলমন্ত্র যে সমাজ বা রাষ্ট্র দীতি হতে পেরেছে তারাই আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারছে এবং পারছে উন্নতির চরম শিখরে পৌঁছতে। তাই আমরা যদি পড়াশোনার পাশাপাশি নৌকাবাইচের মতো অধিকসংখ্যক লোকসমাগমের খেলাধুলায় নিজেদের অভ্যস্ত করতে পারি তাহলে আমরাও পারব একটি আদর্শ সমাজ বা সত্যিকারের সত্য আধুনিক সমাজ গড়তে। তিনি পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে নৌকাবাইচের আমজনতার অংশগ্রহণের পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় উচ্চ পর্যায়ের লোকজনের অংশগ্রহণের কথাও তুলে ধরেন। নদী, নৌকা আর এই বাইচের মধ্যে মানুষের আকর্ষণ নানা কারণেই অনেক বেশি।

কয়েক বছর ধরে ল্য করা যাচ্ছে, দেশের বিভিন্ন স্থানে নৌকাবাইচের আয়োজন কিছুটা বেড়েছে। এই বাড়াটা অব্যাহত থাকলে বিলুপ্তির পথে চলে যাওয়া ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচকে টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবে। এ খেলাকে সারাদেশে আগের অবস্থানে নিয়ে যাওয়ার পথ আমরাই নষ্ট করে ফেলেছি। বিভিন্নভাবে নদী দখল ও কলকারখানার বর্জ্যরে মাধ্যমে নদীকে মেরে ফেলেছি। নষ্ট করে ফেলেছি নদীর পানি। নদী তার স্বাভাবিক গতি হারিয়ে ফেলেছে। পানি শুকিয়ে নদী মরে যাচ্ছে। ফলে এমনিতেই হারিয়ে যাচ্ছে নৌপথের খেলা নৌকাবাইচ। বুড়িগঙ্গা, তুরাগ ও ইছামতি নদীতে তাই এখন আর আগের মতো নৌকাবাইচের আয়োজন দেখা যায় না।
এ বছর বাংলাদেশের অধিকাংশ জেলায়ই নৌকাবাইচের আয়োজন ছিল লণীয়। এ ধারা অব্যাহত থাকলে নতুন প্রজন্মকে আমাদের কৃষ্টি ও সংস্কৃতির সঙ্গে সম্পৃক্ত রাখা সম্ভব।

সাপ্তাহিক ২০০০

[ad#bottom]

One Response

Write a Comment»
  1. Need continuity