গনি মিয়ার হাটে মিরকাদিমের গাই

আলাউদ্দিন আরিফ
ছেলেকে নিয়ে গনি মিয়ার হাটে এসেছেন পুরনো ঢাকার ঠাঁটারি বাজারের বাসিন্দা বিশিষ্ট ব্যবসায়ী আব্দুল হামিদ অ্যান্ড কোংয়ের মালিক আব্দুল হামিদ। তিনি গতকাল সন্ধ্যায় এই হাট থেকে দুটি গাই গরু কিনেছেন। একটি সাদা আরেকটি মরিচা লাল। দাম নিয়েছে এক লাখ পঁয়ষট্টি হাজার টাকা। আব্দুল হামিদ জানান, তার বাবা মো. হোসেন ছিলেন পুরনো ঢাকার বিশিষ্ট ব্যবসায়ী। তিনি মিরকাদিমের সাদা গাই গরু কিনতেন। বাবার সেই পথ ধরে তিনিও আসছেন। ছেলেকেও নিয়ে এসেছেন। এই গরু কেনা তাদের পারিবারিক ঐতিহ্য। এই ঐতিহ্য ধরে রাখতেই স্বাভাবিক দামের চেয়ে প্রায় পঁচিশ-ত্রিশ হাজার টাকা বেশি দামে গরু দু’টি কিনেছেন। মিরকাদিমের গাই গরুর বৈশিষ্ট্যও বর্ণনা করলেন তিনি। আঁশ মিহি, মাংস সুস্বাদু। দেখতেও বেশ আকর্ষণীয়। সে জন্যই এই গরু কেনা। হামিদ সাহেবের মতো পুরনো ঢাকার অনেক বনেদি ব্যক্তিই কোরবানিতে পছন্দের শীর্ষে মিরকাদিমের গাই গরু।

পুরনো ঢাকার রহমতগঞ্জ মুসলিম ফ্রেন্ডস সোসাইটির মাঠে বসেছে এই হাট। যদিও ৫৪ বছর ধরে ফ্রেন্ডস সোসাইটি হাটটির ইজারা নিচ্ছে। তারপরও গনি মিয়ার নামটি এখনো মুছে যায়নি। ঢাকায় কোরবানির পশুর অন্য যেকোন হাট থেকে এই হাটের দৃশ্যটাও ব্যতিক্রম। হাটে প্রবেশ করতেই উটকো গন্ধের পরিবর্তে পাওয়া যায় জাফরান ও সুগন্ধী মসলা মিশ্রিত কাচ্চি বিরিয়ানির সুঘ্রাণ। মো. শাহজাহান বাবুর্চির রান্না করা এই বিরিয়ানি না খেলে যেন হাটে আসার পূর্ণতা হয় না। দামেও বেশ সস্তা। প্লেট মাত্র ৫০ টাকা। গরু কিনে এই বিরিয়ানি খান ক্রেতারা। বসেছে বেশ কিছু অস্থায়ী দোকানও। সবগুলো দোকানেই পিতলের ডেকচিতে রান্না করা হয়েছে ঢাকাইয়্যা পোলাও, গরু ও খাসির ভুনা মাংস।

গনি মিয়ার হাটের চারদিকে নিরাপত্তা বেষ্টনী। হাটে প্রবেশ করতেই চোখে পড়ে সারি সারি সাদা গাই গরু। মোটাতাজা নাদুসনুদুস গরুগুলো দেখলেই চোখ জুড়িয়ে যায়। কিছু গরু রাখা হয়েছে লাল-সাদা কারুকার্যখচিত শামিয়ানার নিচে। একটু পরপরই গরুগুলোর গায়ে মাখা হচ্ছে পাউডার। পানি ছিটিয়ে মোছা হচ্ছে তোয়ালে বা গামছা দিয়ে। স্প্রে করা হচ্ছে দামি বিদেশি সেন্ট। যদিও এবার পশুর অত্যধিক চাপে হাটে কিছুটা বিশৃংখল পরিস্থিতি দেখা গেল। গরু রাখার ঠাঁই না পেয়ে অনেক বেপারি পড়েছেন বেকায়দায়।

বুড়িগঙ্গার তীরে চার শতাব্দীর রহস্য নগরী ঢাকা। পুরনো কিংবদন্তি ঐতিহ্যবাহী ‘গনি মিয়ার হাট।’ শত বছরের প্রাচীন এই হাটের প্রধান আকর্ষণ মুন্সিগঞ্জের মিরকাদিমের বিখ্যাত গাই গরু (গাভী)। ধবধবে সাদা এই গাভীগুলো দেখার জন্য দর্শনার্থীদেরও ভিড় প্রচুর।

রাজধানী ঢাকার আদিবাসিন্দা ও বনেদি ঢাকাইয়াদের কোরবানির হাট হিসেবে বহুল পরিচিত এই ‘গনি মিয়ার হাট।’ মাত্র দু’দিনের জন্য বসে এই হাট। পুরনো ঢাকার বাসিন্দারা বলেন, ‘চান্দ রাতে’র (চাঁদ রাত) আগের দিন এই হাট বসে এবং ঈদের আগের দিন সন্ধ্যার আগেই সবগুলো গাই গরু বিক্রি হয়ে যায়। মিরকাদিমের বেপারিরা তাদের গাই গরু হাটে বিক্রি করে নিজ বাড়িতে ফিরে ঈদ করেন। বেপারিরা জানান, হাটে আনা গাইগুলো সাদার পাশাপাশি বাঁজা (বন্ধ্যা)। পুরনো ঢাকার সৌখিন ক্রেতা ও ঢাকা সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবু হুরায়রা জানান, সাদা হলেই গাই গরু কেনেন না তারা। গরুগুলো অবশ্যই বাঁজা হতে হবে।

গতকাল দুপুর থেকেই মিরকাদিমে ট্রলারে বোঝাই করে বাঁজা গাই গরু নিয়ে আসতে থাকেন বেপারিরা। মিরকাদিমের বিনোদপুরের খলিল মিয়া নিয়ে এসেছেন ১৫টি গাই গরু। আনার সঙ্গে সঙ্গেই দেড় লাখ টাকায় দু’টি বিক্রি হয়ে গেছে। খলিল মিয়া জানান, এই হাটে বেচার জন্য প্রতিবছরই গরু নিয়ে আসেন তিনি। ঈদের আগের দিন দুপুরের মধ্যেই সবগুলো গরু বিক্রি হয়ে যায়। মিরকাদিমের জাগান মুন-মুনা খামারের জিয়াউল হক টিটু নিয়ে এসেছেন ৪০টি গাই গরু। গতকাল সন্ধ্যার আগেই বিক্রি হয়ে গেছে ১৪টি। বাকিগুলো আজ দুপুরের মধ্যে বিক্রি হওয়ার আশা তার। অন্য বেপারিরাও ৪ থেকে ১০/১২টি করে গরু নিয়ে এসেছেন।

মিরকাদিমের গাই গরুর সঙ্গে গনি মিয়ার হাটের আরেক আকর্ষণ ছিল ‘ভুট্টি’ গরু। দেখতে অনেকটা গরুর বাছুরের মতো। কিন্তু দাম স্বর্ণের মতো। মিরকাদিমের নিকি বাজার থেকে ৮টি ভুট্টি গাই নিয়ে এসেছেন অলিউল্লাহ। গরুর সঙ্গে মানানসই রঙের সাদা লুঙ্গি আর পাঞ্জাবি পরেছেন তিনি। বেশ আয়েশি ভঙ্গিতে জানালেন ভুট্টির নানা গুণ। তার দাবি, এই গরুর মাংসে কোনো আঁশ হয় না। চর্বি কম। খাসির মাংসের চাইতেও সুস্বাদু। এই গরুও বনেদি মানুষের খাবার। মিরকাদিমের গাই গরুর সঙ্গে একটি ভুট্টি কেনেন ধনী ব্যক্তিরা। অলিউল্লাহ একটি ভুট্টি গাই বিক্রি করেছেন ৮৫ হাজার টাকায়, যা সত্যিই অবিশ্বাস্য। অন্য গাইগুলোর দাম হাঁকছেন ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকায়। এই আকৃতির অন্য জাতের গরু হলে কেউ ১৫ হাজার টাকায়ও কিনবে না।

গতকাল রহমতগঞ্জের হাটে ভুট্টি এসেছে প্রায় অর্ধশত। আফতাবনগর, নয়াবাজার, পুরনো ঢাকার সাদেক হোসেন খোকা মাঠ ও নিকুঞ্জের হাটেও কিছু ভুট্টি গরু এসেছে। এগুলোর চাহিদাও বেশ।

রহমতগঞ্জ হাটের ইজারাদার ও রহমতগঞ্জ ফ্রেন্ডস সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক টিপু সুলতান জানান, মিরকাদিমের সাদা গাইসহ সব ধরনের গরুই এসেছে হাটে। বিক্রিও ভালো। তিনি বলেন, গনি মিয়ার হাট হিসেবে এই হাটের প্রচার হলেও তারা সেটা বলতে চান না। তাদের ক্লাব ৪৬ বছর থেকে এই হাটের ইজারা নিচ্ছে। একসময় এর ইজারা ছিল ২৫০ টাকা, এখন সেটা বেড়ে ৫ লাখ ৩৫ হাজার টাকা হয়েছে। এই হাট থেকে প্রাপ্ত অর্থ জাতীয় পর্যায়ের খেলাধুলা পরিচালনা ও মুসলিম ফ্রেন্ডস সোসাইটির উন্নয়নে ব্যয় হয় বলে জানালেন ফুটবলার সালাহউদ্দিন কালা। ক্লাবের যুগ্মসম্পাদক সিরাজ উদ্দিন, সমাজকল্যাণ সম্পাদক হাজী আলমগিরসহ প্রত্যেক সদস্য এই হাটটির বিষয়ে সার্বিক সহযোগিতা করেন।

গতকাল সন্ধ্যার আগে গনি মিয়ার হাটে গিয়ে দেখা যায়, ধবধবে সাদা গাই গরু, মিরকাদিমের বেপারি, ঢাকাইয়া ক্রেতা এবং উত্সুক মানুষের ভিড়ের এক ব্যতিক্রমী দৃশ্য। সাদা রঙের গাভী ছাড়াও বাদামি, লাল ও কালো রঙের কিছু গাভীও আছে। এছাড়াও বিপুলসংখ্যক দেশি ও ভারতীয় ষাঁড়, গাভী, বলদ তোলা হয়েছে হাটে। দুপুর থেকেই মিরকাদিমের বেপারিরা গরু নিয়ে হাটে হাজির হয়েছেন। সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হাটে গরুর সংখ্যাও বাড়তে থাকে। গনি মিয়ার হাটে বিক্রির জন্যই মিরকাদিমের বেপারিরা বিশেষ যত্ন নিয়ে গাই গরুগুলো তৈরি করেন। ঢাকার আদি বাসিন্দারা কোরবানির জন্য বেশি পছন্দ করেন গাই গরু। আর গনি মিয়ার হাটের ৯০ শতাংশ ক্রেতাই ঢাকাইয়্যা মানুষ। চকবাজার, মৌলভীবাজার ও ইসলামপুরের বনেদি ব্যবসায়ীরা ছাড়াও উর্দু রোড, রায়সাহেব বাজার, পোস্তা, লালবাগ, বংশাল, সুরিটোলা, কসাইটুলি ইত্যাদি এলাকার আদি ঢাকাইয়্যারা এখানে গরু কেনেন। গত অর্ধশতাব্দী ধরে হাটের ক্রেতা বলা যায় নির্ধারিত। মিরকাদিমের বেপারিদের সঙ্গেও তাদের পরিচয় আছে।

জানা যায়, একসময় মিরকাদিম এলাকায় প্রচুর তেল কল ছিল। সেখানকার বেপারিরা খৈল খাইয়ে গরুগুলোকে উন্নতমানের ও প্রচুর চর্বিযুক্ত করে তোলে। হাটে গরু নিয়ে আসা ফজলুল হক জানান, এখন তেল কলের সংখ্যা কমে গেছে। তাই তারা খুঁদের জাউ খাইয়ে গরুগুলো মোটাতাজা করেন। এসব গরু তারা কোরবানির ঈদের পর দেশের বিভিন্ন প্রান্তের হাট ঘুরে সংগ্রহ করেন। এক বছর ধরে গরুগুলোকে খাইয়ে মোটাতাজা করেন। উন্নত ও ওষুধমুক্ত খাবার পরিবেশনের কারণে গরুগুলোর মাংসও বেশ সুস্বাদু হয়।

সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, গনি মিয়ার হাটে দু’ধরনের ব্যবস্থা বিদ্যমান। শামিয়ানার নিচে এবং শামিয়ানার বাইরে গাই গরু রাখার ব্যবস্থা। হাটের সেরা এবং আকর্ষণীয় সাদা গাই গরুগুলো রাখা হয় শামিয়ানার নিচে, বাকিগুলো বাইরে। আবার সাদাগুলো একদিকে, বাদামিগুলো অন্যদিকে। মিরকাদিম ছাড়াও পার্শ্ববর্তী বিক্রমপুর, মুক্তারপুর এবং মুন্সিগঞ্জ শহর থেকেও গাভী আনা হয়েছে এখানে। শামিয়ানার নিচে সারিবদ্ধভাবে রাখা গাভীগুলোর গায়ে বেপারিরা কিছুক্ষণ পর পর পাউডার ছিটিয়ে দিচ্ছেন। গরুগুলো মল-মূত্র ত্যাগ করার সঙ্গে সঙ্গেই পানি দিয়ে পরিষ্কার করে দেয়া হচ্ছে। গামছা ও তোয়ালে দিয়ে গাভীগুলোর শরীর মুছে চিকচিকে রাখা হচ্ছে। কিছুক্ষণ পর পর এয়ার ফ্রেশনার স্প্রে করতেও দেখা যায়। গরু নিয়ে আসা বেপারিদের কয়েকজনকে সাদা লুঙ্গি, সাদা পাঞ্জাবি পরেও হাটে উপস্থিত হতে দেখা গেছে। আবার কেউ কেউ এসেছেন স্যুট-কোট-টাই পরে।

কিংবদন্তির ঢাকা গ্রন্থের লেখক নাজির হোসেনের বর্ণনা থেকে জানা যায়, ব্রিটিশ আমলে ঢাকার নবাব আবদুল গনি এখানে একটি হাট বসিয়েছিলেন। সে জন্য হাটটি ‘গনি মিয়া’র হাট নামে পরিচিত হয়েছে। হাটটি প্রতিষ্ঠার পর জনসাধারণকে ঢোল বাজিয়ে এ খবর জানানো হয়। হাটের ঢুলিরা ঢোল বাজিয়ে বলতো : ‘ধার করো, কর্জ করো—গনি মিয়ার হাট কর।’ তবে রহমতগঞ্জের মুসলিম ফ্রেন্ডস সোসাইটির প্রতিষ্ঠাকাল থেকে একটানা ৪২ বছর সাধারণ সম্পাদক ছিলেন পুরনো ঢাকার প্রবীণ ব্যক্তিত্ব হাজী আবদুল আউয়াল। তার মতে, গনি মিয়ার হাটটি প্রতিষ্ঠা করেন জিনজিরার হাফেজ সাহেব। তিনি ছিলেন ঢাকার অন্যতম বিশিষ্ট জমিদার। তার পুরো নাম মৌলভী আহমদ আলী। তিনি চকবাজারে থাকতেন। তিনি যে বাজার প্রতিষ্ঠা করেছিলেন সেটিই বিখ্যাত মৌলভীবাজার। তার মতে, জিনজিরার হাফেজ সাহেব বুড়িগঙ্গার পারে বড় কাটরার উল্টোদিকে দেবীদাস লেন ঘাটের খাস জমিতে এই হাটটি বসান। হাফেজ সাহেবের পিতার নাম ছিল গনি মিয়া। সেই জন্য হাটের নাম হয় গনি মিয়ার হাট। ইতিহাস যাই হোক, গনি মিয়ার হাট বসেছে, রহমতগঞ্জ ফ্রেন্ডস সোসাইটির খেলার মাঠে গিয়ে দেখা যায়, এই হাট রাজধানীর অন্য হাটগুলোর চেয়ে একেবারেই ভিন্ন। রঙবেরঙের শামিয়ানা, আলোকসজ্জা, টাওয়ার, মার্কারি লাইট, টিউবলাইটের আলোতে ঝলঝল করছে। গতকাল সকালে বেপারিরা আসার পর থেকে বিক্রি শুরু হয়েছে। গতকাল সারারাত এবং আজ সারাদিন এই হাটে বিক্রি চলবে।

[ad#bottom]