দুই যাত্রায় এক যাত্রী

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
এই কাহিনীতে যে দুই যাত্রার বিবরণ আছে সেটি আগেই বলেছি, স্বাধীনতার দিকে যাত্রার। দুটি যাত্রায় পার্থক্য আছে, তবে আকৃতিতে তারা যতটা ভিন্ন প্রকৃতিতে ততটা নয়। দেশের সব মানুষকেই এতে কোনো না কোনোভাবে অংশ নিতে হয়েছে। ছিলাম আমিও। সাতচল্লিশে আমার বয়স এগারো, একাত্তরে পঁয়ত্রিশ। সাতচল্লিশে আমি পিতার সঙ্গে ঢাকার দিকে রওনা দিয়েছি, একাত্তরে আমি ঢাকাতেই আছি। তখন আমি নিজে ও স্বামী এবং পিতা দুটি শিশুকন্যার। অভিজ্ঞতাগুলোর খুঁটিনাটি ভুলে গেছি, এমনকি সব তারিখও সঠিকভাবে মনে নেই কিন্তু অনুভূতিগুলো নিজের ভেতর জমা হয়ে আছে, থাকবেও।

স্বাধীনতার কারণে উত্তেজনা এবং আনন্দ ছিল, ছিল দুঃখও। যাঁরা ছিন্নমূল হয়েছেন, আপনজন হারিয়েছেন তাদের দুঃখ অপরিমেয়। মাটি কামড়ে যাঁরা রয়ে গেছেন তাদের দুর্ভোগও কম ছিল না।

সাতচল্লিশের স্বাধীনতার নিগলিতার্থ ছিল দেশভাগ। যাঁরা ভাগ করেছেন তাঁরা নিজেদের সুবিধা ও নিরাপত্তার কথাটাই ভেবেছেন, সাধারণ মানুষের কী হবে তা নিয়ে তাদের কোনো দুশ্চিন্তা ছিল না। অথচ এই সাধারণ মানুষকেই মূল্য যা দেবার দিতে হয়েছে, মূল্য শোধ করতে হয়েছে। একাত্তরের এখনো যে পরিশোধ শেষ হয়েছে তা নয়।

কেবল সাধারণ মানুষ নয়, মধ্যবিত্তদের ভেতর যারা ঠিক করেছিলেন উদ্বাস্তু হবেন না তাঁদের অনেককেই দুঃসহ যন্ত্রণা সহ্য করতে হয়েছে। মুসলিম লীগ নেতা আবুল হাশিমের কথা উল্লেখ করেছি, কিন্তু কখনোই ভাবেননি যে ছিন্নমূল হয়ে তাঁকে ঢাকায় চলে আসতে হবে। বর্ধমানের মানুষ, কলকাতা ছেড়ে সেখানেই চলে গিয়েছিলেন, ভেবেছিলেন পশ্চিমবঙ্গেই থাকবেন, কিন্তু পারলেন না। পঞ্চাশ সালের দাঙ্গায় দেশত্যাগ করতে হলো। তখন তিনি দৃষ্টিশক্তি স¤পূর্ণরূপে হারিয়েছেন, স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে নিঃসম্বল অবস্থায় ঢাকায় চলে আসতে বাধ্য হলেন। সেই যে উৎপাটিত হলেন, তার পক্ষে যথার্থ অর্থে আর প্রোথিত হওয়া সম্ভব হলো না।

প্রায় সমান্তরাল ঘটনা ঘটতে পারত ড. জ্যোর্তিময় গুহঠাকুরতার জীবনে। তার জন্যও দেশ ছেড়ে চলে যাওয়া স্বাভাবিক ছিল কিন্তু সম্মত হলেন না, মাটি কামড়ে পড়ে রইলেন এবং একাত্তরে প্রাণ দিলেন কয়েকজনের নয় তো বহুজনের ক্ষেত্রেই তেমন ঘটেছে। দেশ ভাগ হলে পূর্ববঙ্গের হিন্দুদের সর্বনাশ হবে, এমন কথা কংগ্রেসের পূর্ববঙ্গস্থ অধিকাংশ নেতাই জানিয়েছিলেন। কংগ্রেসের সর্বভারতীয় নেতারা কর্ণপাত করেননি। হিন্দু মহাসভা তো অস্থির ছিল দেশকে দু’-টুকরো করার জন্য।

পূর্ববঙ্গে যারা মাটি কামড়ে পড়েছিলেন তাদের মধ্যে অধ্যাপক ড. গোবিন্দচন্দ্র দেব এবং অধ্যাপক সন্তোষচন্দ্র ভট্টাচার্যের সঙ্গে নিয়মিত দেখা হতো, সন্তোষ ভট্টাচার্য তো আমাদের প্রতিবেশীই ছিলেন। গোবিন্দ দেব আমেরিকায় গিয়েছিলেন। যাবার আগে কলাভবনে বিদায় নিয়ে গিয়েছিলেন তবে যার সঙ্গে দেখা হয়েছে তাঁদের সবার কাছ থেকেই। মাটি তাঁকে কেমন টানল, পঁচিশে মার্চের দেড় মাস আগে দেশে ফিরে এলেন এবং প্রাণ দিলেন। যুদ্ধের শুরুতে সন্তোষ ভট্টাচার্য গ্রামে চলে গিয়েছিলেন। এক ছাত্র প্রায় জোর করে তাঁর পরিবারের সবাইকেসহ নদীর ওপারে নিয়ে গিয়েছিলেন। চৌদ্দই ডিসেম্বরের আগে কী মনে করে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় এলেন। তারপরে আলবদররা তাঁকে ধরে নিয়ে গেল। এই আলবদররাও ছাত্রই ছিল। মনুষ্যত্বের সর্বোত্তম বিকাশ এবং নিকৃষ্টতম অধঃপত্তন দুটোই আমরা একাত্তরে দেখলাম।

গোবিন্দ দেব এবং জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা দুজনেই আক্রান্ত হন পঁচিশে মার্চে। গোবিন্দ দেব সঙ্গে সঙ্গে প্রাণ হারান, জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা আহত অবস্থায় প্রায় পাঁচ দিন বেঁচেছিলেন, বাঁচতেনও হয়ত শেষ পর্যন্ত যদি চিকিৎসা হতো, কিন্তু চিকিৎসার কোনো ব্যবস্থা তো সেই সময়ে ছিল না।

আমি জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতার কথা বিশেষভাবে স্মরণ করি। একাধিক কারণে এক. তাঁর প্রাণত্যাগের ঘটনায় তাঁর মতো অনেক মানুষের দুর্ভোগ ও মৃত্যুর কাহিনী রয়েছে। দুই. তিনি আমার অত্যন্ত প্রিয় শিক্ষক ছিলেন, আপনজনদেরই একজন এবং তিন. শিক্ষক হিসেবে তিনি ছিলেন দৃষ্টান্তস্বরূপ। কয়েকদিন আগে একটি দৈনিকের ক্যাম্পাস রিপোর্টার জানতে চেয়েছিল ছাত্রজীবনে আমার সবচেয়ে প্রিয় শিক্ষক কে ছিলেন। আমি জ্যোতির্ময় স্যারের নাম করলাম এবং কিছু কথা বলতে হলো। কথাগুলো সামান্য। তা দিয়ে তাঁর সঙ্গে আমার সম্পর্ক, আমার ওপর তাঁর প্রভাব, শিক্ষক হিসেবে তাঁর উচ্চতা ওসব বোঝানো যাবে না।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হয়েছেন তিনি ১৯৪৯-এ। তার আগে কিশোরগঞ্জের গুরুদয়াল কলেজ এবং ঢাকার জগন্নাথ কলেজে শিক্ষকতা করেছেন। শিক্ষকতার বাইরে অন্য কোনো পেশায় তাঁকে ভাবাই যায় না। বিশেষভাবে মনে রাখার মতো ব্যাপার ছিল ছেলেমেয়েদের সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্ব। সেকালে শিক্ষকরা কেউ হতেন কাঠখোট্টা পণ্ডিত, কেউ বা কঠিন আমলা, একালের মতো দোকানদারির ব্যাপারটা অবশ্য তখন কোথাও ছিল না। জ্যোতির্ময় স্যার আমাদেরকে যেটা দিতেন তা হলো আনন্দ। জেএস টার্নার ছিলেন আমাদের বিভাগীয় প্রধান, তার আনন্দদানটা ছিল আবেগপূর্ণ, কথা বলতে বলতে কখনো কখনো চোখ বুজে আসত তাঁর, আবেগের অশিয়তায়। আমাদের ভুল হবার সম্ভাবনা থাকত যে, তিনি মিল্টন পড়াচ্ছেন নাকি ওয়ার্ডসওয়ার্থ, উভয়েই তাঁর প্রিয় কবি ছিলেন। জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতার পড়ানো ছিল অন্য রকমের; কঠিন বিষয়কে সহজ করে দিতেন, মনে হতো গল্প করছেন। সুইনবর্ণের ‘এটানান্টা ইন ক্যালিডন’ আমাদের পাঠ্যসূচিতে ছিল। সেই কবিতায় এ্যাফ্রোডাইটির প্রসঙ্গ ছিল; জ্যোতির্ময় স্যার রবীন্দ্রনাথের ‘ঊর্বশীর সঙ্গে সুইনবর্ণের এ্যাফ্রোডাইটির তুলনা করেছিলেন, রবীন্দ্রনাথের কবিতাটি নিয়ে এসেছিলেন সঙ্গে করে। কোথায় পার্থক্য, কোথায় সাদৃশ্য দেখিয়েছেন এবং তাঁকে বলতে হয়নি আমরা বুঝতে পেরেছি রবীন্দ্রনাথের রচনাটি শুধু স্বতন্ত্র নয়, নান্দনিক উৎকর্ষে উচ্চতরেরও। কাব্যপাঠের ওই অভিজ্ঞতা আমি এখনো ভুলিনি। পরবর্তীকালে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের কিংস কলেজে পিএইচডি’র জন্য যে অভিসন্দর্ভটি তিনি রচনা করেন তাতে যে তিনজন কবি তাঁর বিবেচ্য বিষয় ছিলেন তাঁদের মধ্যে একজন হলেন সুইনবর্ণ।

মাত্র একান্ন বছর বয়স হয়েছিল জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা যখন শহীদ হলেন। তাঁকে মনে হতো বিলাসী শৌখিন। ধুতিপাঞ্জাবি পরতেন। চা খেতেন, সিগারেট পছন্দ করতেন। একাত্তর সালের মার্চের তেইশ তারিখেই সম্ভবত তার সঙ্গে শেষ দেখা। আমরা কলাভবনের লাউঞ্জে বসে কথা বলছিলাম। যেন বন্ধুসভা। স্যার ছিলেন। তিনি সিগারেট খাচ্ছিলেন। পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করা হচ্ছিল। তারপরে যুদ্ধশেষে, আঠারোই ডিসেম্বর হবে, আবার আমরা লাউঞ্জে এসেছি। গুমোট ছিল ঘরটাতে, যে টেবিলটা ঘিরে আমরা যুদ্ধের আগে শেষবার বসেছিলাম সেখানে গিয়ে দেখি এ্যাশট্রেতে ছাই এবং সিগারেটের ভগ্নাংশ। স্যারের রেখে যাওয়া অনেক স্মৃতির একটি।

বুর্জোয়া চেতনার যথার্থ প্রতিনিধিত্ব করতেন তিনি। যেমন শৌখিন ছিলেন, তেমনি ছিলেন কর্তব্যপরায়ণ। ফুল ভালোবাসতেন, বাগানে কাজ করতেন, খাবার ব্যাপারে রুচি ছিল উন্নতমানের। নাজমা ও আমি তাঁর বাসায় নিমন্ত্রণ একাধিকবার খেয়েছি ঢাকাতে এবং লন্ডনেও। গেণ্ডারিয়াতে যখন থাকতেন সে সময়ে বাসায় মাঝেমধ্যে গানের আসর বসাতেন। একবার আমিও উপস্থিত ছিলাম; গান গেয়েছিল কিশোরী নীনা হামিদ, গেণ্ডারিয়া গার্লস স্কুলে সে ছাত্রী ছিল বাসন্তী গুহঠাকুরতার।

জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতার কথা উঠলে বাসন্তী দিদির কথা তো আসবেই। কতজনের যে দিদি ছিলেন তার হিসাব করা অসম্ভব। অসংখ্য ছাত্রী বের হয়ে গেছে তার স্কুল থেকে, তাদের সবার দিদি ছিলেন। দিদি ছিলেন তাদের কারো কারো অভিভাবক অভিভাবিকাদেরও, ছিলেন আমাদেরও, আমরা যাঁরা অন্যভাবে পরিচিত তাঁর সঙ্গে। জাঁদরেল হেডমিস্ট্রেস ছিলেন তো একজন, অত্যন্ত সফল পেশাগত ক্ষেত্রেও কিন্তু ভীষণ নরম মানুষ ছিলেন ভেতরে ভেতরে, যে পরিচয়টা প্রকাশ পেতো এমনকি অল্প পরিচয়েও। বাসন্তী দিদিকে আমি প্রথম দেখি বাংলা একাডেমীতে। ঘটনাটি মনে আছে। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের বিজয়ের পরে বর্ধমান হাউসে বাংলা একাডেমীর উদ্বোধনের অনুষ্ঠানে। স্যার ছিলেন, বাসন্তী দিদি ছিলেন সঙ্গে। দু’জনকেই হাস্যোজ্জ্বল দেখেছিলাম সেদিন। বাসন্তী দিদিকে অবশ্য আমার জানা হয়ে গিয়েছিল এর আগেই তাঁর লেখা একটি ছোট গল্প পড়ে, বিশ্ববিদ্যালয়ের মেয়েদের হলের বার্ষিকীতে। একটি মেয়ের কথা লিখেছিলেন তিনি, যে মেয়েটি ধোলাইখালের ওপরকার কাঠের পুল পার হয়ে আসা যাওয়া করত। কাঠের পুল নাজমাও পার হতো। ওদের বাড়ি ছিল পুলের ঠিক নিচেই, গেণ্ডারিয়াতে। নাজমার সঙ্গে এবং একাও আমিও বহুবার ওই পুল পার হয়েছি। ওটিকে সাঁকোও বলা চলত। তখন কখনো কখনো বাসন্তী দিদির কথা মনে পড়েছে। তিনিও বহু সাঁকো পার হয়েছেন, তাঁর জীবনে। ফতুল্লাতে তাঁদের দোতলা বাড়ি ছিল, হলুদ রঙের। বুড়িগঙ্গা দিয়ে লঞ্চে যখন যেতাম চোখে পড়ত। ফতুল্লাতে যে ট্রেন থামত, ছোট একটা স্টেশন হয়েছিল সেটা বাসন্তী দিদিদের পারিবারিক উদ্যোগের কারণেই। উদ্যোগটির প্রয়োজন দেখা দিয়েছিল ওখানকার মেয়েরা যাতে ঢাকায় এসে পড়াশোনা করতে পারে তার ব্যবস্থা করার আগ্রহ থেকে। ওই পড়–য়াদের মধ্যে সর্বাগ্রে ছিলেন বাসন্তী দিদি। এসব ঘটনার অনেকটাই ব্রিটিশ আমলের।

কিন্তু সাতচল্লিশে যখন দেশ স্বাধীন হয়ে গেল তখন বাসন্তী দিদিদের পরিবার পরিণত হলো নিচ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ে। জ্যোতির্ময় স্যার ঠাট্টা করে বলতেন, ‘তৃতীয় শ্রেণীর নাগরিকে। তোমরা, বাঙালি মুসলমানরা হলে দ্বিতীয় শ্রেণীর, হিন্দুরা হলো তৃতীয় শ্রেণীর, বুঝলে?’ বলে হাসতেন। ১৯৬৫-এর যুদ্ধে অবস্থার আরো এক ধাপ নিম্নগমন ঘটল; বাসন্তী দিদিদের পরিবার চিহ্নিত হলো শত্রুপক্ষ হিসেবে। রটনাটা প্রতিবেশীদেরই কেউ কেউ ঘটাল। তাদের উদ্দেশ্য এরা চলে যাক ভারতে, তাহলে বাড়িঘর বিষয়সম্পত্তি যা আছে সেটা তারা খাতিরজমা দখল করতে পারবে। পরিবারের একাংশ অবশ্য সাতচল্লিশের পরে পর্যায়ক্রমে দেশত্যাগ করেছে, তাঁর এক ভাই পরিবার নিয়ে তখনো রয়ে গিয়েছিলেন, প্রতিবেশীদের, চেষ্টা ছিল এদেরকে বিতাড়িত করবার।

এই ঘটনার বিষয়ে বাসন্তী দিদির ওই ভাইয়ের কাছ থেকেই শুনেছি। স্যার ও দিদি তখন লন্ডনে ১৯৬৫ তে। আমারও যাবার কথা, নাজমাও যাবে সঙ্গে। সে খবর স্যার জানতেন। বিলেতে তিনি নাকি খুব কষ্ট পাচ্ছিলেন পাটুয়াটুলীর দুলালের দোকানের খোলা চা না পেয়ে, সেই চা নিয়ে এসেছিলেন দিদির ভাই; তাঁর কাছেই তাঁদের নতুন বিপদের কথা শুনলাম। সেবার ইংল্যান্ডে গিয়ে আমরা ছিলাম। লিস্টারে, ছুটিতে লন্ডনে যেতাম। গেলে স্যার, দিদিও তাদের একমাত্র সন্তান দোলার সঙ্গে দেখা হতো। কী যে খুশি হতেন তাঁরা। বাসন্তী দিদি তাদের বাসার কাছেই আমাদের জন্য আশ্রয়ের ব্যবস্থা করে দিতেন। নাজমা পরিণত হয়েছিল তাঁর আপন বোনটিতে।

আবেগ ছিল, কিন্তু উচ্ছ্বাস ছিল না। না স্যারের ভেতর, না বাসন্তী দিদির ভেতর। বাসন্তী দিদি বিলেত গেছেন দু’বার। গেণ্ডারিয়া থেকেই। প্রত্যাবর্তন ওই গেণ্ডারিয়াতেই। প্রথমবার গেলেন একলা, স্কুল ছেড়ে এবং স্বামী ও শিশুসন্তানটিকে রেখে। দ্বিতীয়বার গেলেন স্বামী ও সন্তানসহ; স্যার গিয়েছিলেন উচ্চশিক্ষার জন্য আবশ্যক গবেষণার কাজে। বাসন্তী দিদি গিয়েছিলেন সঙ্গে। আগেরবার শিক্ষয়িত্রী হিসেবে প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন। এবার নিজেই শিক্ষিকা হলেন, লন্ডনের একটি স্কুলে।

প্রথমবার আমিও গিয়েছিলাম তার সঙ্গে। ব্রিটিশ কাউন্সিলের একই বৃত্তিতে একই সঙ্গে গেছি। স্বামী ও সন্তান ছেড়ে যাচ্ছেন, স্বামী তাঁর ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল, সন্তানের নির্ভরশীলতা আরো বেশি। এ নিয়ে বিষণœ থাকবার কথা, থাকতেন যে না তাও নয়, কিন্তু কিছুতেই প্রকাশ করতেন না। ফিরে আসার পরে তো ঘটল একাত্তরের ওই আপাত-অবিশ্বাস্য ঘটনা। জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা এবার একা চলে গেলেন, স্ত্রী ও সন্তানকে রেখে। কোথায় রেখে গেলেন সেটা তাঁর জানবার কথা নয়। কিন্তু বাসন্তী দিদি লিখেছেন তাঁর অসাধারণ রকমের সংযত ও বাস্তববিবরণে পুঙ্খানুপুঙ্খ বই ‘একাত্তরের স্মৃতিতে’ যে হাসপাতালে মৃত্যুর মুখোমুখি অবস্থানে থেকেও স্যার তাঁর স্ত্রীকে বলেছেন তাদের নিজেদের জায়গাতে চলে যেতে। নিজেদের জায়গা মানে গেণ্ডারিয়ার সেই স্কুল, যেখানে তাঁদের তিনজনেরই থাকবার কথা ছিল, ছিলেনও কিন্তু সত্তর সালে তাঁর সহপাঠী বন্ধু উপাচার্য আবু সাঈদ চৌধুরীর অনুরোধে জগন্নাথ হলের প্রভোস্টের দায়িত্ব নেয়ার দরুন চলে আসতে হয়েছিল প্রভোস্টের জন্য বরাদ্দ ৩৪ নম্বর দালানের নিচের তলার ফ্ল্যাটটিতে। পাকিস্তানি হানাদারদের আক্রমণ যখন অত্যাসন্ন মনে হচ্ছিল তখন শুভানুধ্যায়ীদের অনেকেই পরামর্শ তাঁদেরকে দিয়েছিলেন গেণ্ডারিয়াতে চলে যেতে। কিন্তু জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা সম্মত হননি। তাঁর ছিল অনড় দায়িত্ববোধ; ছাত্রদেরকে ফেলে তিনি একা চলে যাবেন কী করে। গেলেন না এবং না গিয়ে প্রাণ দিলেন।

দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধের প্রসঙ্গ যদি ওঠে তবে বলতে হবে এঁরা দুজন ছিলেন সমান সমান। পঁচিশে মার্চের রাতেও স্যার এমএ প্রিলিমিনারি ও অনার্সের খাতা দেখেছেন; নম্বর তুলে রেখেছেন। বাংলা উন্নয়ন বোর্ডের অভিধান সম্পাদনা করছিলেন সেটাও দেখেছেন। এবং পঁচিশের পরে সব যখন শেষ হয়ে গেল, বাসার জিনিসপত্র পর্যন্ত লুট হয়ে গেছে চোখে পড়ল, তখন বাসন্তী দিদির প্রধান উদ্বেগ ছিল পরীক্ষার ওই খাতাগুলো এবং অভিধানের পাণ্ডুলিপি নিয়ে। লুণ্ঠনকারীরা ওসব জিনিসকে মূল্যবান জ্ঞান করেনি, ফেলে রেখে গেছে। কিন্তু বাসন্তী গুহঠাকুরতার কাছে ওগুলোর মূল্য ছিল অপরিমেয়, তাই ওই রকম বিপদের মধ্যেও সেগুলো কুড়িয়ে একটি বান্ডিল বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের দপ্তরে, অপর বান্ডিল বাংলা উন্নয়ন বোর্ডের অফিসে পৌঁছে দিয়ে এসেছেন। দিদি আশ্বস্ত হয়েছিলেন আরো একটি মূল্যবান বস্তু পেয়ে। সেটি হলো স্যারে অপ্রকাশিত পিএইচডি থিসিসের কপি। সেটাকে নিয়ে গিয়ে নয় মাস ধরে তিনি পরম যতেœ রক্ষা করেছিলেন। স্বাধীনতার পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সেটি প্রকাশিত হয়। শত দুঃখের মধ্যেও আমার জন্য এটা কিছুটা সান্ত্বনার বিষয় যে, বইটি প্রকাশের ব্যাপারে আমি কিছুটা তৎপর হতে পেরেছিলাম এবং চূড়ান্ত প্রুফটিও আমারই দেখা।

‘একাত্তরের স্মৃতি’ বইয়ের লেখাগুলো তো আমাদের সামনেই লিখলেন বাসন্তী দিদি। আমরা তখন প্রতিবেশী। এ-বাড়ি ও-বাড়ি, রোজ দেখা হয়। ‘সংবাদ’-এ বৃহস্পতিবারের সাময়িকীতে ছাপা হতো লেখা। সেদিন সকালে আসতেন একবার। জিজ্ঞাসা করতেন না, কিন্তু জানতাম আমরা কৌতূহল থাকত তার জানবার, আমরা পড়েছি কিনা। নাজমা পড়ত, আমি পড়তাম এবং দুজনেই জানাতাম পড়েছি। খুশি হতেন, কিন্তু উচ্ছ্বসিত হতেন না। খুঁটিনাটি আলাপ করতেন কখনো, পরের লেখাটির জন্য।

ওই বই যারা পড়েছেন তারা স্মরণ করবেন ভেতরে কেমন আবেগ আছে। পাতায় পাতায় কান্না রয়েছে। কিন্তু কোথাও ভাবাবেগ নেই। বিশদ দিয়ে সংযত রেখেছেন অনুভবগুলোকে। যেন তার সকল সতর্কতা তথ্যের নির্ভুলতার দিকে এবং একই সঙ্গে আবেগকে নিজের কর্তৃত্বের ভেতর রাখার ব্যাপারে। তখনো ক্রন্দনবিধুর মন যখন দেখছেন স্বামী চলে যাচ্ছেন এবং স্বামীর ডেথ সার্টিফিকেট লেখা হয়েছে ঠিকই কিন্তু সই করবার লোক নেই; একমাত্র সন্তানটি চলে যাচ্ছে সহৃদয় এক পরিবারের আশ্রয়ে, তিনি নিজে কোথায় যাবেন ঠিক নেই, লাশ হাসপাতালে রেখে চলে যাচ্ছেন অন্যত্র, সৎকারের কোনো উপায় সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। উচ্ছ্বসিত নন সেই মুহূর্তেও যে মুহূর্তে একজন তরুণ হাসপাতালে তার থাকার জন্য নিজের বিছানাটা ছেড়ে দিয়ে চলে গেল এই কথা বলে যে, সে যুদ্ধে যাচ্ছে, অথবা যখন এক ছাত্র স্যারের পা ছুঁয়ে নিয়ে ‘এ মৃত্যুর বদলা আমরা নেবই।’ একাত্তর জীবন্ত হয়েছিল তার স্মৃতিতে, তিনি নিজেও জীবন্ত আমাদের স্মৃতিতে।

বলছিলাম স্বাধীনতার পর কিছুদিন আমরা প্রতিবেশী ছিলাম সেই পাড়াতে যেখানে জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতাকে হানাদারেরা গুলি করে ফেলে রেখে যায়। আশির দশকের ওই দিনগুলোতে তাঁর শাশুড়ি ছিলেন তার সঙ্গে। এক সময়ে তিনিও প্রাণত্যাগ করলেন। দোলা ও বাসন্তী দিদি রইলেন। দোলাও চলে গেল বিলেতে উচ্চ শিক্ষার জন্য। বাসন্তী দিদি একলা। ওদিকে যে স্কুলের প্রতিটি টিন এবং পরে প্রতিটি ইট তিনি নিজে সংগ্রহ করেছিলেন সেই স্কুলে তার বিরুদ্ধে নানা তৎপরতা চলছে। এ রকমটা যে ঘটবে জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা তা আশঙ্কা করতেন। বলতেন, বাঙালি মুসলমানের বিরোধ বেধেছিল হিন্দুর সঙ্গে, পরে বাধল অবাঙালিদের সঙ্গে। স্বাধীনতা এলে বাধবে নিজেদের মধ্যে। তিনি দেখে যাননি, দেখলে দুঃখ পেতেন তার আশঙ্কা সত্যে পরিণত হয়েছে মনে করে। তবে ঘটনা যেটা ঘটেছে তা অস্পষ্ট নয়। জ্যোতির্ময় স্যার মুক্তির কথা ভাবতেন, ওই নামে স্বল্পায়ু একটি মাসিক পত্রিকাও বের করেছিলেন; কিন্তু মুক্তি যে পুঁজিবাদী পথে আসবে না এটা বলেননি। একাত্তরের পরে মুক্তি এসেছে বৈকি, কিন্তু সেটা জনগণের নয়, শাসক শ্রেণীর। তারা মুক্তি পেয়ে গিয়ে পুঁজিবাদী পথে স্বাধীনভাবে অগ্রসর হবার। আর সেই অগ্রসরমানতাই সমষ্টিগত মুক্তির স্বপ্নটাকে ভেঙে-মুচড়ে পদদলিত করে সেখানে ব্যক্তিগত মুক্তির অসংখ্য স্বপ্ন প্রতিস্থাপন করেছে এবং সেই স্বপ্নগুলো পারস্পরিক ও স্বাভাবিক সংকটে লিপ্ত হয়ে সারা দেশে এক নৈরাজ্য তৈরি করেছে। পুঁজিবাদকে জব্দ করতে না পারলে সামাজিক পরিবর্তন যে অসম্ভব আমাদের চলমান ইতিহাস সেই কথাটাই বলে চলেছে।

বাসন্তী দিদির কথায় ফিরে যাই। স্বামী মরণাপন্ন অবস্থায় পড়ে রয়েছেন। বাড়ির কাছেই, রাস্তার অপর পারে মেডিকেল হাসপাতাল, সেখানে নিলে চিকিৎসার ব্যবস্থা যদি করা সম্ভব হয় তাহলে বাঁচতে পারেন এমন আশা। অথচ ওইটুকু রাস্তা পার হবেন এমন উপায় নেই। বিলেত থেকে আসার সময় ছোট একটি গাড়ি নিয়ে এসেছেন, সেটি আছে এবং পিওন ও ড্রাইভার হিসেবে কাজ করে যে ব্যক্তিটি সে গাড়ি চালাতেও পারে। কিন্তু রাস্তায় চলছে দিবারাত্রির কারফিউ, ঘন ঘন মিলিটারি গাড়ির ছোটাছুটি, এর মধ্য দিয়ে আহত মানুষটাকে হাসপাতালে নিয়ে যাবেন কী করে? এ যেন সেদিনকার বাংলাদেশেরই ছবি, নিহত হয়েছেন অনেকে, আহতরা কাতর অবস্থায় পড়ে রয়েছেন মৃত্যুর অপেক্ষায়, অন্য মানুষেরা সবাই আত্মরক্ষায় ব্যস্ত।

কিন্তু ওই বিপদেও সাহস ও কর্তব্যবুদ্ধি হারাননি আমাদের বাসন্তী দিদি। সাতাশ তারিখ সকাল সাড়ে আটটার দিকে দেখেন শহীদ মিনারের ফুটপাথ দিয়ে একজন মহিলা টিফিন ক্যারিয়ার হাতে আজিমপুরের দিকে যাচ্ছে। তাকে হাততালি দিয়ে ইশারায় কাছে ডেকে আনলেন, দেয়ালের কাছে গিয়ে বললেন, “ভাই, আপনি হাসপাতালে একটু খবর দেন।” মহিলা বলল, “স্লিপ দেন।” বাসন্তী দিদি দৌড়ে গিয়ে কাগজ এনে তাতে লিখে দিলেন, “অধ্যাপক আহত, নিয়ে যান।” মিনিট পনেরোর মধ্যে চারজন লোক একটি স্ক্রুটার নিয়ে এলো। বাসন্তী দিদি তার স্বামীকে তাতে তুলে দিলেন। দেখা গেল অন্য সব ফ্ল্যাট থেকে সবাই বের হয়ে যাচ্ছেন। রাজ্জাক স্যারও ছিলেন, তিনিও বললেন, যাচ্ছেন মেডিকেলে, বাসন্তী দিদিও যেন বাসায় না থাকেন।

হাসপাতাল কাথাটার ভেতর হসপিটালিটির একটা আভাস আছে। হাসপাতাল যে সত্যি সত্যি আশ্রয়স্থল হতে পারে টের পাওয়া গেছে একাত্তরে। সেখানে আহতরা এসেছে। ছাত্ররা ছিল, চিকিৎসকরা ছিলেন। জ্যোতির্ময় স্যারের জন্য স্যালাইন এসেছে, এক্সরে প্লেট কোথাও পাওয়া যাচ্ছিল না। তাও এলো, এক্সরে করা হলো, কিন্তু চারদিন ধরে যে রক্তক্ষরণ হয়েছে তার দরুন তাঁকে বাঁচানো গেল না। বাসন্তী দিদি বাসা থেকে একটি ট্র্যানজিস্টার আনিয়ে নিয়েছিলেন, সেই দুর্বল যন্ত্রে ছেলেরা স্বাধীন বাংলার কথা শুনল। শেষ পর্যন্ত ঐ ট্র্যানজিস্টারটা হারিয়েও গিয়েছিল। কিন্তু আবার ঠিকই পাওয়া গেল, একজন খুঁজে এনে দিল।

অথচ রাস্তার অপর পারে ভিন্ন দৃশ্য। স্যারের বাসায় পর্যায়ক্রমে লুট হয়েছে। প্রথম দিকে দোলা দু’তিন দিন আবদুল গনি হাজারীর বাসায় ছিলেন, ইন্দিরা রোডে। আবদুল গনি হাজারী ছিলেন স্যারের বন্ধু, এক সময় এক বাসাতে থাকতেন। ‘মুক্তি’ নামে যে পত্রিকা বের হয় হাজারী ভাই ছিলেন তার অন্যতম সম্পাদক। হাজারী ভাইয়ের শ্যালিকা জিনুর সঙ্গে আমার এক ভাই ফখরুলের (ডাক নাম ফনু) বিয়ে হয়েছে। ফনু তখন মেডিকেল কলেজে এ্যানাটমি বিভাগে পড়ায়। ওর কথা বাসন্তী দিদির বইয়ে আছে। ২৭ মার্চ সকালে আমি ও নাজমা বিশ্ববিদ্যালয় কোয়ার্টার্স ছেড়ে বেরিয়ে গিয়ে আশ্রয় নেই ধানমণ্ডিতে নাজমার বড় বোনের বাসায়। পরে আমি চলে যাই ফনুর ওখানে। মনে আছে ২৮ তারিখ সকালে হাজারী ভাইয়ের গাড়িতে করে দোলা যাবে হাসপাতালে, ফনুও যাবে সঙ্গে; তার সঙ্গে আমি গিয়েছিলাম দোলাকে দেখতে। কিশোরী দোলার সেই মলিন মুখটি আজো ভুলতে পারিনি। গোটা বাংলাদেশের অসহায় মেয়েদের তখনকার মুখচ্ছবি যেন। হাজারী ভাইয়ের স্ত্রী জেলী আপা ছিলেন বাসন্তী দিদির ঘনিষ্ঠজন; তিনি টিফিন ক্যারিয়ারে করে খাবার দিয়েছিলেন বাসন্তী দিদির জন্য, দোলার হাতে ছিল সেই টিফিন ক্যারিয়ার। দরজা দিয়ে বের হবে এমন সময় তার হাত থেকে ক্যারিয়ারটি পড়ে গেল। খুলে যায়নি তাই রক্ষা; সেটি আবার সে তুলে নিল। দেখলাম তার হাতটা কাঁপছে। বাবার মৃত্যু যে আসন্ন দোলা তো সেটা জানত।

৩০ তারিখ বাবার মৃত্যুর পর দোলা বিভিন্ন জনের বাসায় থেকেছে। গরমে তার শরীরে ভীষণ রকমের এলার্জি দেখা দিলে বাসন্তী দিদি তাকে নিয়ে গিয়েছিলেন বিশ্ববিদ্যালয় পাড়ায় ড. মোর্তজার বাসায়। ড. মোর্তজার কথা তো আগেই বলেছি। ওই বাসায় গিয়ে দিদি পঁচিশে মার্চের সকালে মোর্তজার কী অভিজ্ঞতা হয়েছিল সে কাহিনী শুনলেন। হানাদারেরা বহু মানুষকে হত্যা করেছে। লাশগুলো নানা জায়গায় পড়েছিল। কয়েকজনকে দিয়ে তারা লাশগুলো টেনে বের করে পার্শ্ববর্তী ব্রিটিশ কাউন্সিলের অডিটরিয়ামে জড়ো করেছে। মোর্তজাকেও ওই কাজে বাধ্য করেছে। মোর্তজা নিজ হাতে পরিচিত জনদের লাশ টেনেছেন। লাশের সংখ্যা তেইশটা হতে পারে, ত্রিশটাও হওয়া সম্ভব। কাজ শেষ হবার পর ‘কর্মী’দেরকে ওরা দাঁড় করেছিল, গুলি করবে বলে। শুরু করতে যাবে এমন সময় কোথা থেকে একটা ট্রাক এসে হাজির, সেখান থেকে আওয়াজ এলো ‘হল্ট’। অমনি বীর পাকিস্তানিরা দৌড়ে ট্রাকে উঠে চলে গেল। হয়ত ততক্ষণে তাদের ধারণা হয়েছে যে যা করেছে যথেষ্ট, ‘বিদ্রোহ’ দমনের জন্য এর চেয়ে বেশি না করলেও চলবে। রক্তমাখা চেহারায় মোর্তজা তার স্ত্রীর কাছে মন্তব্য করেছিলেন, ‘একবার কলকাতায় রায়টের মধ্যে পড়ে ঘরে ফিরে এসেছিলাম, এবার দ্বিতীয়বার ধরে নিয়ে গেল মিলিটারি। আবার যদি নেয় তবে আর ফিরে আসব না।’ সে তখন জানত নিজের সম্বন্ধে তার ওই ভবিষ্যদ্বাণী কয়েক মাসের মধ্যেই অক্ষরে অক্ষরে কার্যকর হবে এবং তিনি পাকিস্তান রক্ষাকারী পাঞ্জাবি দস্যুদের অনুচর আল বদরদের হাতে নিহত হবেন।

ড. মোর্তজা বাসন্তী দিদির নিজের জন্য দু’রকমের ওষুধ দিলেন আর দোলার জন্য একটা প্রেসক্রিপশন লিখে দিয়েছিলেন। বাসন্তী দিদি রওনা হলেন চানখাঁরপুলের দিকে ওষুধের সন্ধানে। জগন্নাথ হল পার হয়ে দেখেন একটি রিকশা থামল। তিনি আশান্বিত হলেন। বাসন্তী গুহঠাকুরতা লিখছেন, ‘হায়! পোড়া কপাল! দেখি রিকশাওয়ালা মাথার গামছা খুলে নেংটি পরল, আর লুঙ্গিটা ফুটপাথে বিছিয়ে লোহার খোলা গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকল। তারপর টাল-টাল বই রাখল লুঙ্গির উপরে। হায়রে! হলে ছাত্র নেই, হলের লাইব্রেরি চোরের জন্য খোলাই আছে। তখনো বই নিঃশেষ হয়ে যায়নি। লুঙ্গি দিয়ে বইয়ের গাঁট বেঁধে রিকশায় তুলে নির্বিবাদে চলে গেল।

এ তো গেল গরিব রিকশাওয়ালার কাণ্ড। যুদ্ধ যখন শেষ, বিজয় এসে গেছে তখনকার এক ঘটনার কথা ভুলি কী করে। নিজে দেখিনি, কিন্তু যিনি দেখেছেন তিনি প্রত্যক্ষদর্শী। ষোলোই ডিসেম্বরের সকালের দৃশ্য। আত্মসমর্পণের আগে পাকসেনারা তখনকার স্টেট ব্যাংকের ভল্ট ভেঙে টাকা বের করে পুড়িয়ে দিয়েছে, সবটা পোড়ানো সম্ভব হয়নি। অনেক টাকা স্তূপ স্তূপ হয়ে রাস্তায় পড়েছিল। হৃষ্টপুষ্ট এক যুবক যাচ্ছিল সেদিক দিয়ে। স্তূপ করা এবং ছিটানো টাকার দৃশ্য দেখে সে মাথা ঠিক রাখতে পারেনি। কী করবে ভেবেও পায়নি। তারপর হঠাৎই দেখা গেল সে দ্রুত হস্তে নিজের লুঙ্গি খুলে ফেলে তাতে টাকা ভরে বোঝার মতো করে মাথায় তুলে দৌড়াতে শুরু করেছে। টাকা অন্যরাও নিয়েছে, কিন্তু এমন দক্ষতা অন্য কেউ দেখাতে সক্ষম হয়নি। দস্যুরা যা করবার তা করছিল, কিন্তু স্বাধীনতার পর যে লুণ্ঠন থামবে না তার আভাস তো যুদ্ধের সময়েই পাওয়া যাচ্ছিল। ব্যাংক ও ট্রেজারি ভেঙে, হাটবাজার থেকে চাঁদা সংগ্রহ করে অনেক মুক্তিযোদ্ধাই ওপারে গেছেন, কিন্তু সে টাকার সামান্যই সরকারি তহবিলে জমা দিয়েছেন এটা তো কোনো গুজব নয়, বাস্তব সত্য। সবাই জানে।

ছেচল্লিশ সালে কলকাতায় যে দাঙ্গা হয় তখনো দেখা গেছে হত্যাকাণ্ডের পাশাপাশি ক্ষিপ্র গতিতে লুণ্ঠন চলেছে; কেউ কেউ মন্তব্য করেছেন যে লুণ্ঠনকারীদের দেখে মনে হচ্ছিল যেন উৎসব করছে, জিনিসপত্র নিয়ে যখন বের হয়ে যাচ্ছে তখন কারো কারো ভাবটা এমন ছিল যে বিয়ের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে চলেছে বরযাত্রী। একাত্তরের ষোলো ও সতেরোই ডিসেম্বর তখনকার জিন্নাহ এভিনিউর দোকানগুলো যেভাবে লুণ্ঠিত হয়েছে সেটাও দেখার মতো দৃশ্য ছিল বৈকি! সতেরো তারিখে আমি নিজের চোখেই তো দেখেছি গভর্নরের বাসভবন থেকে যে যা পারছে হাতে করে নিয়ে বের হয়ে যাচ্ছে। এক ভদ্রলোককে দেখলাম হাসি হাসি মুখে একটা ইলেকট্রিক সেলাই মেশিন নিয়ে যাচ্ছেন, বেশ একটা বীরত্বব্যঞ্জক ভঙ্গিও আছে চালচলনে, হতে পারে গাড়িতে করে এসেছেন, সেটাতে উঠে চলে যাবেন।

স্বাধীনতার কয়েক বছর পর বাসন্তী দিদি ফিরে এসেছিলেন শহীদ মিনারের পাড়ায়। সে এলাকা অবশ্য ততদিনে অনেকটা বদলে গেছে, অর্থাৎ উন্নত হয়েছে। পুকুরটা নেই, চারটা নতুন দালান উঠেছে, তারই একটাতে একটি ফ্ল্যাট দেয়া হয়েছিল তাকে। সেই সময়ে আমরাও ওই পাড়াতেই থাকতাম। যে ফ্ল্যাটটিতে জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতাকে গুলি করা হয় তার পাশের ফ্ল্যাটটাই আমরা নিয়েছিলাম। নাজমার সঙ্গে সন্ধ্যার পরে বাসন্তী দিদি হাঁটতেন নিয়মিত। এক সময়ে নাজমা অসুস্থ হয়ে পড়ল, অপারেশনের জন্য পিজি হাসপাতালে ভর্তি হলো। সেই সময়ে দিদি আমাদের দেখাশোনা করতেন। বছর দেড়েক পরে নাজমা আমেরিকায় গেছে দুই ডাক্তার ভাইয়ের কাছে চিকিৎসার জন্য। দিদি তখন রোজ খবর নিতেন আমাদের। নাজমা ফিরে এলো এবং চিরকালের জন্য চলে গেল। নাজমার স্মারকগ্রন্থে বাসন্তী দিদি লিখেছেন, ‘কফিনের ভেতর তার মুখ আমি দেখতে পাইনি চোখের জলে সব একাকার।’ নাজমার অকাল মৃত্যুতে মস্ত বড় আঘাত পেয়েছিলেন বাসন্তী দিদি। বছর চারেক পরে তো দিদি নিজেই চলে গেলেন। শেষ দেখা হাসপাতালে; সেই সিটি নার্সিং হোমেই, একাত্তরে যেখানে তিনি কয়েক দিন ছিলেন আশ্রয়হীনতার কালে।

মা ও মেয়ে কত যে কষ্টে ছিলেন একাত্তরের ওই নয় মাস তা কল্পনা করাও কঠিন। দিদি স্বামী হারিয়েছেন, মেয়ের পিতা নেই; কিন্তু সেটা তো একমাত্র দুঃখ নয়, বাস্তব পরিস্থিতি ছিল এমন যে দুজনের অন্য কোথাও আশ্রয় মিলছিল না। স্যারকে পাকিস্তানি বাহিনী হত্যা করেছে; অনেকের কাছে মনে হতো তার স্ত্রী ও সন্তানকে চেনাটাও পাকিস্তানিদের চোখে অপরাধ বলে গণ্য হবে। দেখা হলে তারা না দেখার ভান করত। আপনজনেরা অবশ্য আশ্রয় দিতেন, কিন্তু তারা নিজেরাও বিপদে ছিলেন এবং এরা দুজন নতুন বিপদ ডেকে আনবেন এমনটা মনে করে ভয় পেতেন। শেষ পর্যন্ত কঠিন ও বাস্তবসম্মত এক সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল। বাসন্তী দিদি দোলাকে আমেরিকান খ্রিস্টান মিশনারিদের এক অনাথ আশ্রমে দিয়ে দিলেন। তার নতুন নাম হলো মল্লিকা রোজারিও; পাছে অন্য মেয়েরা কৌতূহলী হয় তাই বলা হলো বগুড়ার মেয়ে; ওই আশ্রমে বগুড়ার কেউ ছিল না। বাসন্তী দিদি নিজে নাম নিলেন বারবারা গোমেজ এবং সেই পরিচয় নিয়ে মিশনারিদের সহযোগিতায় হলিফ্যামিলি হাসপাতালে রোগী হিসেবে ভর্তি হয়ে গেলেন। ভর্তি হবার সময়ে অসুস্থ ছিলেন না, কিন্তু ভর্তি হবার পর সত্যি সত্যি অসুস্থ হয়ে পড়লেন।

বিবরণ একটু বড়ই হলো। আরো বড় করা যেত, কেননা অনেক ঘটনার ভেতর দিয়েই পরিবারটিকে যেতে হয়েছে। তদুপরি এসব ঘটনা আমাদের জাতীয় ইতিহাসের অংশও বটে। মৃত্যুর আগে জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা তার স্ত্রীকে বলে গিয়েছিলেন ইতিহাস লিখতে। সে ইতিহাসের কিছুটা ‘একাত্তরের স্মৃতি’ বইটিতে আছে। পলাশীর যুদ্ধের পরে বাংলায় ইংরেজের যে কর্তৃত্ব শুরু হয়েছিল, সাতচল্লিশে তার অবসান ঘটে স্বাধীনতা পাওয়া গিয়েছিল বলে ঢাক-ঢোল বিস্তর পেটানো হয়েছে, কিন্তু প্রকৃত বাস্তবতা ছিল এই যে, সাতচল্লিশের চৌদ্দ ও পনেরোই আগস্টে ক্ষমতা হস্তান্তরিত হয়েছিল মাত্র এবং বাংলা ও পাঞ্জাবের জন্য ঘটনাটা ছিল মহাদুর্যোগের সূচনা। বাংলার ইতিহাসের দিকে তাকালে বলতেই হবে দেশ ভাগের ঘটনা ইংরেজের দেশ দখলের তুলনায় কম বিপর্যয় ডেকে আনেনি। সে দুর্যোগের প্রকৃতিটা কী ছিল জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা-বাসন্তী গুহঠাকুরতার জীবনেতিহাসের দিকে তাকালেই টের পাই। তারা দেশপ্রেমিক ছিলেন, দেশ ছেড়ে চলে যাননি। দাঙ্গা হয়েছে, যুদ্ধ বেধেছে। নিরুপায় হয়ে পরিবারের একাংশ চলে গেছে, কিন্তু তারা যাননি। জ্যোতির্ময় স্যারকে পাকিস্তান সরকার পাসপোর্ট পর্যন্ত দিতে চায়নি। যখন বিলেত গেলেন তখন তার সাবেক ছাত্রদের কয়েকজনের তৎপরতায় পাসপোর্ট পেয়েছিলেন বটে কিন্তু সেটির নবায়ন করা সম্ভব হয়নি। পাকিস্তানে এই ছিল তাঁর স্বাধীনতা। তিনি মুক্তির কথা ভাবতেন, ওই নামে পত্রিকা বের করেছিলেন, সেই মুক্তির মূল্যস্বরূপ তাঁকে প্রাণ দিতে হয়েছে এবং তাঁর পরিবারের জন্য আশ্রয়হীনতার কোনো বিকল্প থাকেনি।

পাকিস্তান ছিল একটি অস্বাভাবিক রাষ্ট্র, ছিল একটি বিচিত্র অসুখ। ওই রাষ্ট্র তার নাগরিকদেরকেও কমবেশি অস্বাভাবিক করে ফেলেছিল। ড. কাজী দীন মুহম্মদ ছিলেন গুহঠাকুরতা পরিবারের সঙ্গে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। ১৯৬০ সালে বিলেতে থাকার সময় দীন মুহম্মদ সাহেব একদিন তার ঘরে বাসন্তী দিদি ও আমাকে দাওয়াত করে খাইয়েছিলেন। একাই থাকতেন, চমৎকার রান্না করেছিলেন। একাত্তরে তিনি বাধ্য হয়েছিলেন বিদেশে গিয়ে এ কথা বলতে যে, জগন্নাথ হলে যুদ্ধ হয়েছিল এবং ড. দেব ও ড. গুহঠাকুরতা ক্রসফায়ারিংয়ে মারা গেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকে দিদির সঙ্গে কাজী সাহেবের দেখা। সকলের সামনেই দিদি তাকে চ্যালেঞ্জ করে বলেছিলেন ‘আপনাকে তো ভালো মানুষ বলেই জানতাম সেই আপনি এমন মিথ্যা কথা কেমন করে বললেন।’ কাজী সাহেব দিদির হাত ধরে মাফ চেয়ে বলেছেন, ‘দিদি, আমি আপনার ছোট ভাই। আমাকে তো আপনি অনেক দিন ধরে চেনেন। ভাই-বোনের সম্পর্ক স্বাভাবিক থাকবে, রাষ্ট্র তা চায়নি। এক ভাইকে সে হত্যা করেছে এবং অন্য ভাইকে দিয়ে ঘাড় ধরে সাফাই গাইয়ে নিয়েছে।

ড. দীন মুহম্মদের ওই মাফ চাওয়াটাকে বলা যায় যে, মুসলমান বাঙালি একদা পাকিস্তানের জন্য লড়াই করেছিল। তাদের সকলেই মাফ চাওয়া, যারা শহীদ হয়েছেন তাঁদের কাছে তো বটেই, নিজেদের কাছেও। মাফ চেয়েই যুদ্ধে যেতে হয়েছে। কেবল যে পাকিস্তান রাষ্ট্রের তা নয়, এপারে ওপারে যারা দেশ ভাগের জন্য দায়ী তাদের সকলেরই ক্ষমা চাওয়া দরকার, শহীদদের কাছে তো অবশ্যই, ভুক্তভোগীদের কাছেও বটে। দেশ ভাগওয়ালারা বাঙালি জাতির প্রতি কত বড় অপরাধ যে করেছে তার একটি মাত্র দৃষ্টান্ত দিতে হলেও গুহঠাকুরতা পরিবারের কথা উল্লেখ করা অসঙ্গত নয়। এই বিবরণের পরেও কথা থাকে। গুহঠাকুরতা পরিবার যেভাবে নির্যাতিত হয়েছে অধ্যাপক মনিরুজ্জামানের পরিবারের ক্ষেত্রে তো সেটা ঘটবার কথা নয়। তারা হিন্দু নন, মুসলমান। অধ্যাপক এ এন মনিরুজ্জামান দাঁড়ি রাখতেন, নিয়মিত নামাজ-রোজা করতেন, পঁচিশে মার্চের রাতেও তিনি এশার নামাজ পড়েছেন। তাঁর আপন ভাই অধ্যাপক হাসান জামান ছিলেন পাকিস্তানের ঘোরতর সমর্থক। অথচ তাঁকে একা নয়, তিন আপনজনসহ বাসার দরজার সামনে গুলি করে মৃত অবস্থায় ফেলে রেখে গেছে। সে রাতে তারা হিন্দু-মুসলমান বাছবিচার করেনি। সকল বাঙালিকেই ‘জয় বাংলার’ লোক বলে চিহ্নিত করেছে এবং হত্যা করেছে নির্বিচারে। তবে ক্রোধটা বিশেষভাবে ছিল বিশ্ববিদ্যালয়, ইপিআর, পুলিশ ও বস্তিবাসীর ওপর। কাউকে গ্রেপ্তার করে ‘বোঝা’ বাড়ায়নি, সরাসরি নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছে আর এটা লক্ষ্য করবার বিষয় যে, তাদের চোখ ছিল কেবল পুরুষদের ওপর। মেয়েদের গায়ে তখনো হাত দেয়নি। পুরুষরা থাকলে লড়াই করবে, তাদেরকে সরিয়ে ফেলতে পারলে তারপর দখলদারিত্ব স্থায়ী করে মেয়েদের হিসাব নেয়া যাবে। মেয়েরা তখন থাকবে খাঁচায় আটক পাখির মতোই। হস্তগত করতে কোনো বিঘœ ঘটবে না। মনোভাবটা ছিল এই রকমেরই।

গুহঠাকুরতা এবং মনিরুজ্জামান উভয় পরিবার নিয়েই পূর্ববঙ্গে বাঙালিদের অবস্থার ইতিহাস রচিত। তারা প্রাণ দিয়ে যন্ত্রণার ওই ইতিহাসের প্রমাণ রেখে গেছেন। এ প্রমাণ কিছুতেই মুছবার নয়। কেউ কেউ আছেন যারা মনে করতেন এবং এখনো মনে করেন যে, সাতচল্লিশের স্বাধীনতা না এলে একাত্তরের স্বাধীনতা আসত না। কথাটা মিথ্যা নয় কিন্তু সাধারণ মানুষ তো স্বাধীনতার নামে সর্বনাশা দেশ ভাগ চায়নি; এবং সাতচল্লিশের ধ্বংসকাণ্ডের ধারাবাহিকতাতেই পাকিস্তানের পাঞ্জাবি শাসকরা বাঙালিদের ওপর গণহত্যা চালাবে এটাই বা কার কাম্য ছিল। কিন্তু ইতিহাস তো ওই অনিবার্যতাকেই ধারণ এবং অবধারিত করেছে।
(অসমাপ্ত)

[ad#bottom]