মেয়র খোকাকেই পছন্দ সরকারের

ঢাকা সিটি করপোরেশনের (ডিসিসি) মেয়র হিসেবে সাদেক হোসেন খোকাকেই পছন্দ সরকারের। এ কারণেই নির্বাচন কমিশন বারবার তাগিদ দিলেও সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠানে অনাগ্রহ প্রকাশ করছে। জানা গেছে, পানি, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও যানজট পরিস্থিতির নাজুক অবস্থার কারণে এ মুহূর্তে ঢাকা সিটি নির্বাচন চাইছে না ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের শীর্ষ মহল। কেননা সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় এখন নির্বাচন হলে চট্টগ্রাম সিটির ফলাফলের পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে_এ আশঙ্কা কাজ করছে আওয়ামী লীগে। তাই বর্তমান সরকারের আমলে আদৌ ডিসিসি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে কি না তা নিয়েই দেখা দিয়েছে সংশয়।

নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা যায়, সরকারের সঙ্গে এ ব্যাপারে মেয়র খোকার আলোচনা হয়েছে। আলোচনার ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়েছে, বর্তমান মেয়রই চালাবেন নগর প্রশাসন। নগর ভবনের একাধিক কর্মকর্তাও জানিয়েছেন, মেয়র খোকার জন্য সরকারের তো কোনো সমস্যা হচ্ছে না। নামেই শুধু বিএনপি থেকে নির্বাচিত মেয়র, কার্যত সরকারের সঙ্গে পরামর্শ ছাড়া কোনো কাজ করেন না তিনি। জানা যায়, মহাজোট সরকারের প্রায় দুই বছরের শাসনকালে মেয়র খোকা এমন কোনো পদক্ষেপ নেননি যা সরকারের বিপক্ষে গেছে। সরকারের সঙ্গে সমঝোতা করেই তিনি চালাচ্ছেন নগর ভবন। এসব বিবেচনায় এ মুহূর্তে নির্বাচনের ঝুঁকিতে না গিয়ে মন্দের ভালো হিসেবে বর্তমান ব্যবস্থাকেই অটুট রাখতে চাইছে সরকারের শীর্ষ মহল। যোগাযোগ করলে ডিসিসি মেয়র সাদেক হোসেন খোকা বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, আমিও চাই ডিসিসি নির্বাচন হয়ে যাক। এটা একটা স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হিসেবেই সবকিছু হয়ে যাওয়া উচিত। তবে খোকার ঘনিষ্ঠজনরা বলছেন, তার মেয়াদকাল দীর্ঘতর হওয়ার পেছনে কাজ করছে সরকারের ‘চট্টগ্রামভীতি’। আওয়ামী লীগ সূত্র জানায়, বারবার নির্বাচন পেছানোয় অসন্তুষ্ট দলের সম্ভাব্য প্রার্থীরাও। তারা চাইছেন নির্বাচন। তারা বলছেন, মহাজোট ক্ষমতায় আসার পর থেকেই ডিসিসি নির্বাচন নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। বারবার নির্বাচন পেছানোয় তারা হতাশ। কয়েক দফা নির্বাচন পেছানোর পর সর্বশেষ নির্বাচন কমিশন বলেছিল চলতি বছরের ডিসেম্বরে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এরপর দলগুলো প্রার্থী বাছাইয়ের কাজও শুরু করেছিল। কিন্তু ১৩ অক্টোবর স্থানীয় সরকারমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম এবং প্রধানমন্ত্রীর সংস্থাপনবিষয়ক উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম প্রধান নির্বাচন কমিশনার ড. এ টি এম শামসুল হুদার সঙ্গে বৈঠক করে সরকারের মনোভাব তুলে ধরেন। সৈয়দ আশরাফ বলেছেন, পৌর ও ইউপি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে আগামী বছরের মার্চে। তারপর ডিসিসি নির্বাচন। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, পৌর ও ইউনিয়ন পরিষদের মেয়াদ দুই বছর আগে শেষ হয়ে গেছে। এ ব্যাপারে আওয়ামী লীগ-বিএনপিসহ সব দলের নেতৃত্বই বলছেন সে হিসেবে ডিসিসি নির্বাচনই তো আগে হওয়ার কথা। কারণ ডিসিসির মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে প্রায় সাড়ে তিন বছর আগে। সরকারের এই ভূমিকায় হতাশ হয়ে নির্বাচন কমিশনার এম সাখাওয়াত হোসেন কয়েকদিন আগে সাংবাদিকদের বলেছেন, ডিসিসি নির্বাচন নিয়ে কমিশন আর কোনো কথা বলবে না। কারণ বিষয়টি নিয়ে কথা বললেই পরিস্থিতি আরও জটিল হয়। ডিসিসি নির্বাচন নিয়ে সরকারের কোনো রাজনৈতিক পরিকল্পনা থাকতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। বলেন, এখন থেকে ডিসিসি নির্বাচনের চ্যাপ্টার ক্লোজড। আর কোনো কথা নয়। এদিকে পর্যবেক্ষক মহলের ধারণা, পানি, গ্যাস ও বিদ্যুৎ পরিস্থিতি ঠিক না হওয়া পর্যন্ত ডিসিসি নির্বাচন অনুষ্ঠানের কোনো সম্ভাবনা নেই। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আওয়ামী লীগের এক নগর নেতা ও সম্ভাব্য ওয়ার্ড কাউন্সিলর প্রার্থী বলেন, পানি, গ্যাস, বিদ্যুৎ এবং যানজট পরিস্থিতির যদি কোনো দিনই উন্নতি না হয় তাহলে কি নির্বাচন হবে না? জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, নির্বাচন হবে কি হবে না এটা নিয়ে আগে আশরাফ ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলেন। আমাকে কেন জিজ্ঞেস করছেন? তফসিল ঘোষণা করলে তারপর আমার সঙ্গে যোগাযোগ করুন। এখন কিছু বলতে পারব না।

এ ব্যাপারে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, আওয়ামী লীগ সম্পর্কে মানুষের মোহভঙ্গ হয়েছে। তার প্রতিফলন ঘটেছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে। আওয়ামী লীগ ওয়াদা রক্ষা করতে পারেনি মন্তব্য করে তিনি বলেন, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, টেন্ডারবাজি, সন্ত্রাস ও দুর্নীতির কারণে মানুষ আজ অতিষ্ঠ। এ কারণেই তারা ঢাকা সিটির নির্বাচন দিতে ভয় পাচ্ছে। সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজনের সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, একটি নির্বাচিত সরকার কেন স্থানীয় সরকার নির্বাচন দিচ্ছে না বুঝতে পারছি না। স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠান সাংবিধানিক অঙ্গীকার। ১৯৮২ সালে কুদরত-এ খুদা বনাম বাংলাদেশ সরকার মামলার রায়ে আদালতের নির্দেশ ছিল, মেয়াদ শেষ হওয়ার ছয় মাসের মধ্যে স্থানীয় সরকার নির্বাচন করতে হবে। কাজেই নির্বাচন ঝুলিয়ে দিয়ে সরকার সংবিধান লংঘন এবং আদালত অবমাননা করছে বলে মন্তব্য করেন ড. মজুমদার।

রিয়াজ উদ্দীন
বাংলাদেশ প্রতিদিন

[ad#co-1]