পদ্মা সেতু নির্মাণকাজ তিন মাস পেছাল যে কারণে

নাজনীন আখতার ॥ মাত্র ৫ শতাংশ কাজের ৰেত্রে আপত্তি পিছিয়ে দিয়েছে ব্যয়বহুল পদ্মা সেতু নির্মাণের পুরো কাজ। ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে শর্ত পূরণ না করার অভিযোগ তুলে বিশ্বব্যাংক আপত্তি জানানোর কারণে মাওয়া-জাজিরা স্থানে বহুল আকাঙ্ৰিত পদ্মা সেতু নির্মাণ কাজ তিন মাস পিছিয়েছে। বিশ্বব্যাংকের অভিযোগ, ড্রাইভেন র্যাংকিং স্টিল পাইল শর্ত পূরণ করতে পারেনি পাঁচ ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান। সেক্ষেত্রে দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির সুপারিশ প্রত্যাখ্যান করে আবারও প্রাকযোগ্যতা প্রক্রিয়া শুরুর পরামর্শ দিয়েছে বিশ্বব্যাংক।

সম্প্রতি সংসদীয় কমিটিতে পদ্মা সেতু নির্মাণ কাজ পেছানোর এসব কারণ তুলে ধরে এক প্রতিবেদন পেশ করেছে যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের সেতু বিভাগ। প্রতিবেদনে পদ্মা সেতু নির্মাণে বড় অর্থায়নদাতা বিশ্বব্যাংকের অতি খবরদারির বিষয়টিও স্পষ্ট হয়েছে। সেতু বিভাগ অসনত্মোষ প্রকাশ করে জানিয়েছে, বিশ্বব্যাংকের ড্রাইভেন র্যাকিং স্টিল পাইল সাব ক্রাইটেরিয়া এর কাজের মূল্য মোট সেতু নির্মাণ কাজের মাত্র ৫ ভাগ। বিশ্ববাংকের এমন আপত্তিতে যোগাযোগ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিও ৰুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। কমিটির মতে, বিশ্বব্যাংক এ ধরনের সামান্য শর্তের দোহাই না দিলেও পারত। শর্ত লঙ্ঘনের যে কারণ উলেস্নখ করা হয়েছে তা বড় ধরনের কিছু নয়। এর আগে বঙ্গবন্ধু সেতু ও পাকশী সেতু নির্মাণে ওই শর্ত বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি।

উলেস্নখ্য, চলতি বছরের ডিসেম্বরে পদ্মা সেতু নির্মাণ কাজ শুরম্ন করার কথা থাকলেও ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান নিয়ে বিশ্বব্যাংকের আপত্তির কারণে তা পিছিয়ে আগামী বছরের মার্চে শুরম্ন করার সিদ্ধানত্ম নেয়া হয়েছে।

বিশ্ব ব্যাংকের আপত্তির বিরোধিতা করে সেতু বিভাগের উপ-পরিচালক (পিএ্যান্ডএম) মোঃ আবুল হোসেন স্বাৰরিত প্রতিবেদনে বলা হয়, এ ধরনের সেতু নির্মাণে প্রচলিত নির্মাণ প্রক্রিয়ার সব ৰেত্রে সাধারণত বিশেষজ্ঞ সাব কন্ট্রাক্টর নিয়োগ করা হয়। বঙ্গবন্ধু বহুমুখী সেতু ও পাকশী সেতুর ৰেত্রে সে উদাহরণ রয়েছে। বঙ্গবন্ধু সেতুতে পাইলিংয়ের কাজে নিয়োজিত ঠিকাদার মেন্সক নামক বিশেষজ্ঞ পাইলিং ঠিকাদার নিয়োজিত করে কাজ করে। একইভাবে পাকশী সেতুতেও মূল ঠিকাদার বিশেষজ্ঞ ঠিকাদার দিয়ে করায়। প্রতিবেদনে সেতু বিভাগ আরও জানায়, বিশ্বব্যাংকের প্রকিউরমেন্ট গাইডলাইনেও বিষয়টি রয়েছে। সে অনুযায়ী পাঁচ ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানকে শর্তসাপেৰে প্রাকযোগ্য করার সুপারিশ করা হয়।

দরপত্র মূল্যায়ন কমিটি ৫ ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানকে প্রাকযোগ্য করার সুপারিশ করে বিশ্বব্যাংকসহ দাতা সংস্থাগুলোর কাছে মূল্যায়ন প্রতিবেদন পাঠায়। এর মধ্যে বিশ্বব্যাংক ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানগুলো ড্রাইভেন র্যাকিং স্টিল পাইল শর্ত পূরণ করতে না পারায় তা প্রত্যাখ্যান করে। প্রাকযোগ্যতা দাখিলের সময়সীমা ৪২ দিন নির্ধারণ করে দিয়ে আবারও প্রাকযোগ্যতা প্রক্রিয়া শুরম্নর পরামর্শ দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। সে পরামর্শ অনুযায়ী এরই মধ্যে পত্রিকায় প্রাকযোগ্যতা বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়েছে।

সংশিস্নষ্টরা জানান, ড. জামিলুর রেজা চৌধুরীর নেতৃত্বে গঠিত দরপত্র মূল্যায়ন কমিটি পরীৰা-নিরীৰা করে মূল্যায়ন প্রতিবেদন অনুমোদনের জন্য গত ১৮ জুলাই বিশ্ব ব্যাংকের সম্মতির জন্য পাঠায়। এর দুই মাস পর গত ২৩ সেপ্টেম্বর বিশ্বব্যাংক এক চিঠিতে উলেস্নখ করে, শর্তসাপেৰে প্রাকযোগ্যতার বিষয়টি নিষ্পত্তি করতে অনেক সময়ের প্রয়োজন হবে। বরং নতুন করে প্রাকযোগ্যতা শুরম্ন করা হলে তা দ্রম্নত করতে বিশ্বব্যাংক সর্বাত্মক সহযোগিতা করবে। সেৰেত্রে যেসব ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে পারেনি ভবিষ্যতে তারা কোন আপত্তি উত্থাপন করতে পারবে না। চিঠিতে দাতা সংস্থা আরও উলেস্নখ করে, পাইলিং পদ্ধতির শর্ত পূরণের বিষয়টি একটি বড় ধরনের পরিবর্তন।

সংশিস্নষ্টরা জানান, সেতু নির্মাণে ব্যয় হতে পারে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা (২ দশমিক ৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার)। এর মধ্যে উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলোর কাছ থেকে ২ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি প্রায় ১৫ হাজার ৭৭৬ কোটি টাকা (প্রতি ডলার ৬৯ টাকা হিসাবে) অর্থায়নের আশ্বাস রয়েছে। উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলোর মধ্যে বিশ্বব্যাংক সমন্বয়কারী হিসাবে দায়িত্ব পালন করছে। এছাড়া তারা এ প্রকল্পে সর্বোচ্চ ১ দশমিক ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার দেয়ার প্রতিশ্রম্নতি দিয়েছে।

২০০৫ সালে পরিচালিত সম্ভাব্যতা সমীৰার ভিত্তিতে প্রণীত ৫ দশমিক ৫৮ কিলোমিটার দীর্ঘ ও ১ দশমিক ৪৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয় ধরে পদ্মা সেতু নির্মাণ প্রকল্পের ডিপিপি ২০০৭ সালের ২০ আগস্ট একনেকে অনুমোদন হয়। পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের বিসত্মারিত ডিজাইন অনুযায়ী নদী ভাঙ্গনের কারণে সেতুর দৈর্ঘ্য বাড়িয়ে ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার করার সিদ্ধানত্ম হয়। সেতুর নির্মাণ শৈলী পরিবর্তন ও লোডিং ক্যাপাসিটি বৃদ্ধি এবং এ্যাপ্রোচ ও রেল ভায়াডাক্টসহ অন্যান্য আইটেম অনত্মভর্ুক্তির ফলে প্রকল্পের সম্ভাব্য ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ২ দশমিক ৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে।

গত ১০ এপ্রিল পদ্মা সেতু প্রকল্পের মূল সেতুর ঠিকাদার নিয়োগের প্রাকযোগ্যতা দরপত্র বিশ্বব্যাংক অনুমোদন করলে ওই দিনই দরপত্র আহ্বান করা হয়। নির্ধারিত সময় চলতি বছরের ৮ জুন পর্যনত্ম মোট ১১টি প্রসত্মাব পাওয়া যায়। অধ্যাপক ড. জামিলুর রেজা চৌধুরীর নেতৃত্বে গঠিত ৭ সদস্যবিশিষ্ট বিশেষজ্ঞ কমিটির মূল্যায়নে ৫টি প্রতিষ্ঠান যোগ্য বিবেচিত হয়েছে। পরামর্শক প্রতিষ্ঠান মাওনসেল-এইকম লিমিটেড মূল্যায়নেও ওই ৫টি প্রতিষ্ঠান যোগ্য বিবেচিত হয়।

সেতু প্রসঙ্গে যোগাযোগ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি শেখ মুজিবুর রহমান বলেন, নির্মাণ কাজ তিন মাস দেরিতে শুরম্ন হলেও পদ্মা সেতু নির্ধারিত ২০১৩ সালের মধ্যেই শেষ করার ওপর কমিটি জোর দিয়েছে। মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে কমিটিকে আশ্বাস দিয়েছে। তিনি বলেন, পদ্মা সেতু নির্মিত হলে দৰিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ১৯টি জেলা ঢাকা ও পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত হবে। মাওয়া-জাজিরা স্থানে প্রসত্মাবিত এ সেতু এশিয়ান হাইওয়েতে অবস্থিত হওয়ায় দেশের অভ্যনত্মরীণ যাতায়াত ব্যবস্থাসহ দৰিণ এশীয় অঞ্চলে অবস্থিত দেশগুলোর মধ্যে যাতায়াত ব্যবস্থায় বৈপস্নবিক পরিবর্তনের সুযোগ সৃষ্টি হবে। এ সেতু বাসত্মবায়িত হলে জাতীয় জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ১ দশমিক ২ শতাংশ বাড়ার আশা করা হচ্ছে।

[ad#co-1]