এক বছরে ৩২ রিট, অবাধে জাটকা শিকার

মৎস্য রক্ষা ও সংরক্ষণ আইনের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট আবেদন করেছিল মুন্সিগঞ্জের আরাফাত ফিশিং নেট ইন্ডাস্ট্রিজের মালিকপক্ষ। ওই রিটের পরিপ্রেক্ষিতে কারেন্ট জাল তৈরি, আমদানি, বিক্রি, সংরক্ষণ, পরিবহন ও ব্যবহারের ওপর প্রচলিত আইনে যে নিষেধাজ্ঞা ছিল, তা ২০০৯ সালের ৫ জুলাই তিন মাসের জন্য স্থগিত করেন হাইকোর্ট। ওই স্থগিতাদেশের মেয়াদ শেষ হওয়ার এক মাস আগে আরেকটি রিট করেন মুন্সিগঞ্জের সালাম ফিলামেন্ট ইন্ডাস্ট্রিজের মালিক আবদুস সালাম। আদালত এবারও তিন মাসের স্থগিতাদেশ দেন। দ্বিতীয় স্থগিতাদেশের মেয়াদ শেষ হওয়ার এক মাস আগে তৃতীয় রিট আবেদন করে কাজিলন ফিশিং নেট ইন্ডাস্ট্রিজ। স্থগিতাদেশের মেয়াদ বাড়ে আরও তিন মাস। এভাবে এক বছরে একই বিষয় নিয়ে করা হয় ৩২টি রিট আবেদন। প্রতিটি রিটেই আদালত তিন মাসের স্থগিতাদেশ দেন।

সূত্র জানায়, কারেন্ট জাল উৎপাদন ও জাটকা কেনাবেচার সঙ্গে জড়িত একটি সংঘবদ্ধ চক্র পরিকল্পিতভাবে উচ্চ আদালতে এসব রিট আবেদন করছে। উচ্চ আদালত থেকে প্রচলিত আইনের ওপর নিষেধাজ্ঞা নিয়ে কারেন্ট জালের মতো ক্ষতিকর জিনিসের উৎপাদন, আমদানি, বিক্রি ও ব্যবহার অব্যাহত রেখেছে। র্যা ব ও পুলিশ কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন, অবাধে কারেন্ট জাল বিক্রি হওয়ায় ছোট ইলিশ বা জাটকাবিরোধী অভিযান কোনো কাজে আসছে না। কারেন্ট জালে ধরা জাটকাও অবাধে বিক্রি হচ্ছে বাজারে।

জানতে চাইলে পুলিশের মহাপরিদর্শক হাসান মাহমুদ খন্দকার প্রথম আলোকে বলেন, ‘উচ্চ আদালতের নির্দেশ মেনেই পুলিশকে দায়িত্ব পালন করতে হয়। আদালত যেভাবে নির্দেশনা দিয়েছেন, সেভাবেই কাজ হচ্ছে।’

মুন্সিগঞ্জের জেলা প্রশাসক আজিজুল আলম প্রথম আলোকে বলেন, কারেন্ট জাল তৈরির ব্যাপারে উচ্চ আদালতের রায়ের কারণে জাটকাবিরোধী অভিযান সফল হচ্ছে না।

চাঁদপুরের মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের ইলিশ গবেষক মো. আনিসুর রহমান বলেন, গবেষণায় দেখা গেছে, শুধু চাঁদপুরেই মেঘনা নদী থেকে জেলেরা প্রতিবছর ১৫ থেকে ২০ হাজার টন জাটকা শিকার করেন। এই জাটকাগুলো বড় ইলিশে পরিণত হলে এর পরিমাণ দাঁড়াত দেড় লাখ টনের মতো। জাটকা শিকারের কারণে বছরে প্রায় শত কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বছরের নভেম্বর থেকে মে পর্যন্ত জাটকা শিকারের মৌসুম। এ সময় পোনা ইলিশ বড় হতে থাকে। ছোট ইলিশ উপকূলের আশপাশের নদীগুলোতে বিচরণ করে। জাটকা শিকারিরা এ সময়েই কারেন্ট জালের মতো সূক্ষ্ম ফাঁদ পেতে ছোট ইলিশ শিকার করে। উপকূলের জেলাগুলোর প্রশাসন প্রতিবছরই ১ নভেম্বর থেকে ৩১ মে পর্যন্ত সময়ে নয় ইঞ্চির নিচে ইলিশের পোনা বা জাটকা ধরা নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। এ সময় বিভিন্ন স্থানে জেলা প্রশাসন জাটকা শিকারবিরোধী অভিযানও চালায়।

মুন্সিগঞ্জ জেলা মৎস্য কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মর্জিনা বেগম বলেন, ১ নভেম্বর জাটকাবিরোধী অভিযান শুরু হয়েছে। তবে উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞার কারণে জাটকা ধরার মূল ফাঁদ কারেন্ট জাল উৎপাদনকারী কারখানাগুলোতে অভিযান চালানো যাচ্ছে না।

মুন্সিগঞ্জের ব্যবসায়ীরা জানান, জেলার শুধু মুক্তারপুরেই কারেন্ট জাল তৈরির প্রায় ৬০টি কারখানা আছে। এসব কারখানায় উৎপাদিত কারেন্ট জাল সারা দেশে বিক্রি করা হয়। প্রচলিত আইনে কারেন্ট জাল উৎপাদন ও বিক্রি নিষিদ্ধ হলেও এত দিন এসব কারখানা অবাধে তা উৎপাদন ও বাজারজাত করে আসছিল। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় আসার পর কারেন্ট জাল উৎপাদন বন্ধ করে দেয়। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর ব্যবসায়ীরা উচ্চ আদালতে আবেদন করে প্রচলিত আইনের ওপর স্থগিতাদেশ নেন। রিট আবেদনে বলা হয়েছিল, কারেন্ট জাল উৎপাদনকারী কারখানাগুলোতে শত শত মানুষ কাজ করেন। কারখানা বন্ধ হয়ে গেলে এসব মানুষ বেকার হয়ে যাবেন। সব রিটে একই ধরনের আবেদন করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

চাঁদপুরের সুতা ব্যবসায়ী সমিতির সহসভাপতি স্বপন সাহা বলেন, পুরান বাজারের প্রত্যেক সুতা ব্যবসায়ী হাইকোর্টের আদেশ নিয়েই কারেন্ট জাল বিক্রি করছেন।

মৎস্য রক্ষা ও সংরক্ষণ আইন: দেশে প্রচলিত মৎস্য রক্ষা ও সংরক্ষণ আইনটি হয়েছিল ১৯৫০ সালে। ২০০২ সালে আইনটি সংশোধন করা হয়। আইনের ৪ ধারায় বলা হয়েছে, কারেন্ট জাল তৈরি, আমদানি, বিক্রি, সংরক্ষণ, পরিবহন ও ব্যবহার অবৈধ। এসব কাজ দণ্ডনীয় অপরাধ ও আইন ভঙ্গকারীকে বিনা পরোয়ানায় গ্রেপ্তার করা যাবে বলে আইনে বলা হয়েছে। আইন ভঙ্গকারীর বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ তিন বছরের কারাদণ্ড বা অর্থদণ্ডের কথা আইনে বলা হয়েছে।

র্যা বের আইন শাখার কর্মকর্তারা বলেন, ২০০৯ সালের ৫ জুলাই থেকে চলতি বছরের আগস্ট মাস পর্যন্ত কারেন্ট জাল নিয়ে মোট ৩২টি রিট করা হয়েছে। এর মধ্যে মুন্সিগঞ্জের ব্যবসায়ীরা করেছেন ২১টি রিট, চাঁদপুরের ব্যবসায়ীরা পাঁচটি, ঢাকার ব্যবসায়ীরা চারটি এবং পটুয়াখালী ও পাবনার ব্যবসায়ীরা একটি করে রিট করেছেন। প্রতিটি রিটেই তিন মাসের স্থগিতাদেশ দেওয়া হয়েছে। সব রিটেই পুলিশ, র্যা ব, আইন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে পক্ষ করা হয়েছে।

চাঁদপুর জেলা প্রশাসক প্রিয়তোষ সাহা প্রথম আলোকে বলেন, মৎস্য সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী জাটকা ইলিশ রক্ষায় চাঁদপুরের প্রশাসন সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়েও কারেন্ট জাল বিক্রি বন্ধ করতে পারছে না। কয়েক মাস ধরে চাঁদপুরের ৩০-৩৫ জন সুতা ব্যবসায়ী প্রকাশ্যে কারেন্ট জাল বিক্রি অব্যাহত রেখেছেন।

র্যা বের আইন ও জনসংযোগ শাখার পরিচালক এম সোহায়েল প্রথম আলোকে বলেন, উচ্চ আদালতের আদেশের কারণে কারেন্ট জাল আটক করা যাচ্ছে না।

যাঁরা রিট করেছেন: কারেন্ট জাল বিষয়ে উচ্চ আদালতে প্রথম রিট আবেদন করেন মুন্সিগঞ্জের আরাফাত ফিশিং নেট ইন্ডাস্ট্রিজ। এরপর রিট আবেদনগুলো করেন সালাম ফিলামেন্ট ইন্ডাস্ট্রিজ, কাজিলন ফিশিং, নিউ রূপসা ফিশিং, কিংফিশার মালটি নেট, সিটি ফিলামেন্ট, তন্ময় ফিশিং, মেসার্স এন এ ব্যাগ ইন্ডাস্ট্রিজ, মেসার্স আনিতা ফিশিং, আঁচল ফিশিং, শাহাবুদ্দিন ফিশিং, যমুনা ফিশিং, জনি ফিশিং, নিউ সোনালী ফিশিং, ফাতিমা রোপ কলি ফ্যাক্টরি, মনসুর আহমেদ, মৎস্য শিকার উপকরণ ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতি, পুবালী ফাইবার ইন্ডাস্ট্রিজ, স্কাই ফিশিং নেট ইন্ডাস্ট্রিজ, ব্যবসায়ী স্বপন কুমার দাস ও রুনা ফিশিং।

চাঁদপুর থেকে অনিন্দ চন্দ্র সাহা, তিমির চন্দ্র সাহা, কাজল বর্মা, স্বপন চন্দ্র সাহা, সিরাজুল হক সর্দার এবং ঢাকা থেকে মোক্তার হোসেন, ফারুক হোসেন, সামিউল্লাহ সাহেদ ও হাজি মোহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন রিট করেছেন। আর পাবনা ও পটুয়াখালী থেকে রিট করেছেন যথাক্রমে লুৎফর রহমান ও কৃষ্ণকান্ত মল্লিক।

ইলিশ গবেষক মো. আনিসুর রহমান বলেন, দেশে ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে হলে কারেন্ট জালের ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। আর কারেন্ট জালের উৎপাদন বন্ধ করে দিলেই জাটকা শিকারও বন্ধ হয়ে যাবে।

কামরুল হাসান
(এই প্রতিবেদন লেখায় সহায়তা করেছেন মুন্সিগঞ্জ প্রতিনিধি তানভীর হাসান ও চাঁদপুর প্রতিনিধি আলম পলাশ)

[ad#co-1]