সূর্য দীঘল বাড়ী : সময়ের জীবন্ত ইতিহাস

আশরাফ উদ্দীন আহমেদ
‘জোঁক’ গল্পের সার্থক গল্পকার আবু ইসহাক (১৯২৬-২০০৩ খ্রি.) উল্লেখযোগ্য কিছু সাহিত্যকর্ম রেখে গেছেন বাংলা সাহিত্যে বলার অপেক্ষা রাখে না। তার প্রথম উপন্যাস ‘সূর্য দীঘল বাড়ী’ (১৯৫৫ খ্রি.) একটি শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি জীবনালেখ্য। তারাশঙ্কর যেমন রাঢ় অঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকা রুক্ষ রক্ত মৃত্তিকার সার্থক কথাকার, তেমনি আবু ইসহাক পূর্ব বাংলার সজলস্নিগ্ধ নরম মৃত্তিকার গল্পকথক, পূর্ব বাংলার বিস্তীর্ণ নদ-নদী জলাভূমি-কৃষি ক্ষেতের পটভূমিকায় সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ, তার মধ্যে রক্তচক্ষু বের করা কতিপয় মানুষ নামের চারপায়া জানোয়ার, কিভাবে দিনের পর দিন বছর শতাব্দী যাবৎ ধর্মীয় ভণ্ডামিতে আবদ্ধ করে রেখেছে আমাদের, তার প্রতিছবি তার সাহিত্যকর্মে তার মেধা মননে আমরা প্রত্যক্ষ করি। উপন্যাসের গতিপ্রকৃতি দেখে বিশ্বাস হবে, আবু ইসহাক খুব কাছ থেকে সমাজের এই পিছিয়ে পড়া অন্ত্যজ এবং অনগ্রসর নিুবৃত্তকে বড় বেশি মমতা মাখিয়ে তার উপন্যাসে স্থান করে দিয়েছেন।

পঞ্চাশের মন্বন্তরে হোঁচট খাওয়া দেশ আবার টলতে-টলতে দাঁড়ায় লাঠি ভর দিয়ে। দুটো ছেলেমেয়ের হাত ধরে জয়গুন আবার গ্রামে ফিরে আসে। বহুদিনের পরিত্যক্ত বাড়ি, সর্বত্র হাঁটু সমান ঘাস-কচুগাছ-মটকা ও ভাঁটশেওড়া জন্মে অরণ্য হয়ে আছে। পূর্ব ও পশ্চিম সূর্যের উদয়াস্তের দিক, পূর্ব-পশ্চিম প্রসারী বাড়ির নাম তাই ‘সূর্য দীঘল বাড়ী’ এ রকম বাড়ি গ্রামে কচিৎ দুই-একটা দেখা যায়। কিন্তু তাতে কেউ বসবাস করে না। কারণ গাঁয়ের লোকের বিশ্বাস ‘সূর্য দীঘল বাড়ী’তে মানুষ টিকতে পারে না। যে বাস করে তার বংশ ধ্বংস হয়। বংশে বাতি দেয়ার লোক থাকে না। গ্রামের সমস্ত বাড়িই উত্তর-দক্ষিণ প্রসারী। কিন্তু অমন বাড়ি দেখলে গ্রামের লোকে বলে ওঠে অকল্যাণের বাড়ি, সেই থেকেই সবারই বিশ্বাস বাড়িটি ভূতের বাড়ি।

সুবিধাভোগী-শাসক সমাজপতিরা যে কেবল আর্থিক উৎপীড়ন করে শুধু তাই নয়, গ্রামের সাধারণ অর্থাৎ অজ্ঞ-অশিক্ষিত মানুষদের কুসংস্কার-অজ্ঞতা-গোঁড়ামি এবং ধর্মান্ধতাকে পুঁজি করে নিজেদের স্বার্থের জাল আরো ব্যাপক আকার বিস্তার করে। মানুষকে দাবিয়ে রাখাও যে একটা কৌশল, একটা মোক্ষম হাতিয়ার, তাই আমরা দেখি সমাজের কতিপয় মানুষের ধান্ধায়, প্রতিদিনের রোজনামচায়।

‘সূর্য দীঘল বাড়ী’র ইতিহাস ভীতিকর, পারিপার্শ্বিক অবস্থা আর কুসংস্কার এই ভীতি সৃষ্টি করেছে। সমাজের ওই ভণ্ডলোকদের কারণে সাধারণ মানুষ প্রতিনিয়ত পিষ্ট হচ্ছে, হয়তো সে সমস্ত বোঝা এদের সম্ভব নয় এবং এখানেই ধর্মব্যবসায়ীদের পোয়াবারো। ইচ্ছে মতো যা করার করতে পারে, কেউ নেই প্রতিবাদ করার। অর্থাৎ ভীতিকর করে রাখো, শাসন করো আরো কঠিনভাবে। জয়গুন ও শফীর মায়ের অজানা থেকেই যাবে সে রহস্য, ওরা কোনোদিন অনুধাবন করতে পারবে না সমাজের মাথাগুলোই আসলে ওই ভীতির কেন্দ্রবিন্দু। ওরা অনেক দূরে গোপনে বসে রিমোট কন্ট্রোল ধরে আছে, ইচ্ছে মতো যা খুশি করছে, কেউই বুঝতে পারছে না, বোঝার প্রয়োজনও মনে করছে না হয়তো। আর বুঝতে হলে যে জ্ঞান-বিবেক আর শিক্ষা জরুরি, তা তো কারো নেই এবং এখানেই ওই সমস্ত ভণ্ডদের লাভে লাভ।

পাঠক জানেন, শফীর মা এবং জয়গুন, এ দুই চরিত্রই উপন্যাসের প্রধান প্রাণ। এরা পরস্পরের খুব কাছের, ভাবি-ননদ সম্পর্ক। এক সময় জয়গুন ও শফীর মা সাত-পাঁচ ভেবে এ বাড়িতে বাস করার আশা ছেড়েই দিয়েছিল কিন্তু নামকরা ফকির জোবেদালী এ সংকট থেকে তাদের উদ্ধার করে। বাড়ির চারপাশে চারটা তাবিজ পুঁতে দেয়, জয়গুন ও শফীর মা খুশি হয় ফকিরের ওপর। ফকির কিন্তু অন্য ধান্ধার লোক, তার চাওয়ার শেষ নেই। সে পিতলের কলসী চায়, জয়গুনের হাতের খিলি বানানো পান খেতে চায় এবং শরীরে হাত দেয়ার মতলব খোঁজে। জয়গুন পিছিয়ে যায়, অপমান করে বাড়ির বাইরে পাঠায়, এরপর জোবেদালী ফকির আর চুনকালির মুখ ‘সূর্য দীঘল বাড়ী’তে দেখায়নি। কিন্তু সে চক্রান্তের জাল বোনে ভিন্নভাবে, ভিন্ন কৌশলে, যা উপন্যাসের গতিকে বেগবান করেছে। তার সত্যিকার রূপ আমরা দেখি তারপর সমগ্র উপন্যাসে। জয়গুনের প্রথম স্বামী হাসুর বাপ জব্বর মুন্সি। স্বামীর মৃত্যুর পর জয়গুন তার মান-ইজ্জতের ভার দিয়েছিল করিম বকসের ওপর, কিন্তু সেও রাখেনি, পঞ্চাশের দুর্ভিক্ষের বছর বিনাদোষে তালাক দেয় জয়গুনকে। তিন বছরের ছেলে কাসু রয়ে যায় করিম বকসের কাছে, শুধুমাত্র মায়মুনকে বুকে জড়িয়ে চলে আসে। এখান থেকেই তার জীবন সংগ্রাম। জীবন-ধারণের ধর্মের বারণ, তার কাছে তুচ্ছ হয়ে যায়, মিথ্যে হয়ে যায়। জব্বর মুন্সি গ্রামদেশে ভালো লোক হিসেবে খ্যাতি ছিল। করিম বকসের প্রথম স্ত্রী মেহেরন, তারপর সে জয়গুনকে বিয়ে করে এবং জয়গুনকে তাড়িয়ে দিয়ে আবার বিয়ে করে আঞ্জুমানকে।

বিংশ শতাব্দীর মধ্য পঞ্চাশে প্রকাশিত সূর্য দীঘল বাড়ীর কুশীলবরা সাধারণ খেটে খাওয়া গ্রামদেশের নিরন্ন প্রান্তিক মানুষ, এরা এতোটাই সাধারণ যে, ওপরতলার প্রাণিকুল কখনো এদের মানুষের মর্যাদা দেয়নি, আর তাই তো এদের ঘাড়ে বোঝার মতো চেপে আছে, কুসংস্কার, অশিক্ষা-কুশিক্ষা, ধর্মান্ধতা, সবই যে অজ্ঞতার কারণে, সে কথা আমাদের সাহিত্যিক আবু ইসহাক চোখে আঙুল দিয়ে অবলীলায় দেখিয়ে দিয়েছেন। উপন্যাসটিকে শিল্পিত করার নানা উপাদান থাকলেও, ধর্মীয় গোঁড়ামি এবং অশিক্ষা প্রধান উপাদান হিসেবে দেখানো হয়েছে। চরিত্রগুলো সাবলীল, দেশভাগের স্বপ্নভঙ্গ-পাকিস্তান আন্দোলন এবং পাকিস্তান নামের একটা স্বাধীন দেশের মানচিত্র এবং মন্বন্তরের ভেতর দিয়ে মানুষের চিরন্তন অস্তিত্ব-সংগ্রাম উপন্যাসের প্রধান উপজীব্য বলার অপেক্ষা রাখে না। ব্যক্তির অস্তিত্ব-সংকটের খোঁজ মেলে এমন একটা সমাজে যে সমাজে বুর্জোয়া বিকাশ চলমান, বুর্জোয়া বিকাশের প্রক্রিয়া মানুষকে তার মূল কেন্দ্র থেকে দূরে সরিয়ে রাখে। ফলে ব্যক্তির সত্তার সৃষ্টি হয় টানাপড়েন। কারণ বুর্জোয়া বিকাশ গ্রাম-জীবনকে ক্রমশ ধ্বংস করার মধ্য দিয়ে চলমান রাখে নগর-জীবনের গঠন প্রক্রিয়াকে।

সাহিত্যিক আবু ইসহাকের প্রথম উপন্যাস সূর্য দীঘল বাড়ী সম্পর্কে অরুণ কুমার মুখোপাধ্যায় বলেছেন, ‘যদি অনুভূতি আবেগের আন্তরিকতা সাহিত্য বিচারের মানদণ্ড হয়, তবে সার্থক উপন্যাসরূপে স্বীকৃতি লাভের যোগ্য ‘সূর্য দীঘল বাড়ী’। গ্রামীণ জীবনাচরণ তীক্ষè কলমের আঁচড়ে ফুটে উঠেছে, মনে রাখতে হবে ‘সূর্য দীঘল বাড়ী’ বাংলাদেশের পটভূমিতে রচিত, যখন সংস্কার মানেই কুসংস্কার সমাজের রন্ধ্রে-রন্ধ্রে; ধর্মের অপব্যবহার, আর চরম দারিদ্র্যের কষাশাত এবং সেই সঙ্গে দুর্বৃত্ত সমাজসেবীদের একচেটিয়া খবরদারি গ্রামীণ নিরীহ মানুষকে পুরোদস্তুর পর্যুদস্ত করে তোলে। প্রথম উপন্যাস ‘সূর্য দীঘল বাড়ী’ প্রকাশিত হবার সঙ্গে সঙ্গে আবু ইসহাক একজন শক্তিশালী কথাসাহিত্যিক হিসেবে ব্যাপক স্বীকৃতি লাভ করেছিলেন। দুসান জাভাবিতেল কর্তৃক চেক ভাষায় অনূদিত হয়ে গ্রন্থটি পাশ্চাত্যের সুধীজনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। তৎকালীন পূর্ব বাংলার হদ্দ গ্রামের সাধারণ মানুষের দৈন্য ও হতাশার পরিপ্রেক্ষিতে লেখক জীবনের অর্থনৈতিক সঙ্কোচ-কুসংস্কার নি®প্রাণ আচার ও সমাজের উৎপীড়ন এ উপন্যাসে নিষ্ঠার সঙ্গে অংকিত হয়েছে। গ্রামবাংলার এক অসহায় মাতা ও দুসন্তানের জীবন কাহিনী হিসেবে ‘সূর্য দীঘল বাড়ী’ অত্যন্ত মর্মস্পর্শী। বর্ণনা-চরিত্র চিত্রণ-সংলাপ সবই জীবনঘনিষ্ঠ, বাস্তবতার উষ্ণ স্পর্শমণ্ডিত। লেখক যে জীবনের ছবি এঁকেছেন তা তিনি ভালোভাবে জেনে নিয়েছেন। যেসব আঞ্চলিক শব্দ ব্যবহার করেছেন তা সুপ্রযুক্ত। রচনাটিকে এক ঋজু বলিষ্ঠতা দান করেছেন। অনাহারক্লিষ্ট মানুষের রুটিনমাফিক জীবনপ্রণালী আবু ইসহাক অত্যন্ত দরদের সঙ্গে সহানুভূতি সহকারে আমাদের সামনে অংকিত করেছেন। সমাজ জীবনে ধর্ম অতি জরুরি বিষয় বটে, কিন্তু এক শ্রেণীর ধর্মব্যবসায়ীরা ধর্মকে নিয়ে জুয়া খেলতে পছন্দ করে, এবং তার বলি হয় সমাজ থেকে নিচু, যাদের কেউই মানুষের মর্যাদায় আনে না, সেই সমস্ত মানুষ নামের পোকামাকড়।’

ব্রিটিশ শাসন এবং শোষণ থেকে বাংলার মানুষ মুক্তি পায় সাতচল্লিশে, তার পূর্বে যে বঞ্চনা এবং অমানবীয় রাজনীতির প্রত্যক্ষ শিকার তো সাধারণ ওইসব খেটে খাওয়া মানুষ। তাদের শরীরে কাপড় নেই, পেটে অন্ন নেই, মাথা গোঁজার সামান্য আশ্রয়টুকুও রক্তচক্ষুর ওই সুবিধাভোগী সমাজপতিরা কেড়ে নিতে চায়। তারপরও সে বাঁচতে চায়, হয়তো মাথা উঁচু করে নয়, তাও তো বাঁচা! সমাজের এই সকল মানুষের জীবনালেখ্য হলো এই উপন্যাস। প্রখ্যাত সাহিত্যিক হাসান আজিজুল হক বলেন, ‘উপন্যাস যে একটি পরিপূর্ণ শিল্প, তা কি সূর্য দীঘল বাড়ীর বেলায় স্বীকার করে নেয়া যায়? উপন্যাসটি পড়বার সময় মনে হয় যেন, একটি ক্যামেরা অতি ধীরে আমাদের গ্রামদেশ সমাজের ভেতরে, গরিব মানুষের উঠোনে, শোবার ওইটুকু ঘরে, গোয়ালে, রান্নাঘরে চালিয়ে নেয়া হচ্ছে। উপন্যাসের সমস্ত উপাদান, জীবনের সমস্ত প্রয়োজনীয় তথ্য ও খবর শিল্পীর কল্পনা ও সৃষ্টিনৈপুণ্য কদাচ জড়িত হয়ে অনন্য হয়ে উঠতে পারছে না, কোনো একটা দৃষ্টি গড়ে উঠতে পারছে না, উপন্যাস একটি জীবন্ত সত্তায় পরিণত হচ্ছে না।’ শিল্প বা আঙ্গিক কতোটুকু উত্তীর্ণ হলো, সে বিচারে না গিয়ে বলতে হয় উপন্যাসটি কালের বিচারে সময়ের বিচারে একশত ভাগই উত্তীর্ণ। বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের এই ছবি যে শিল্পী অংকন করেছেন এবং আমাদের সেই কাহিনী ভাষা চরিত্র এবং সংস্কৃতি নির্মাণের মধ্যে চলমান করেছেন, তা এক শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিকের সার্থকতা।

পঞ্চাশ/ষাট দশকের বাংলাদেশের গ্রাম মানে তো জঙ্গল, সেখানে দাপুটে মানুষ হলো মন্ডল- মাতব্বর- চেয়ারম্যান এবং সুদখোর মহাজন আর ছিল ধর্মের অপব্যাখ্যাকারী এক শ্রেণীর মাতাল ভণ্ড মৌলাভী (মৌলবি), পল্লী জীবনভিত্তিক, জীবন বোধের তীক্ষ্ম ও বাস্তব জীবনের পরিবেশন অকৃত্রিম ও সত্যনিষ্ঠা ঘনিষ্ঠতার উপন্যাসের পটভূমি। শিক্ষা যে একটা জাতিকে সামনে এগিয়ে নেয় এবং সকল বৈরিতা কুসংস্কার থেকে মুক্তি দেয় তাও স্পষ্ট প্রতীয়মান। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর ‘লালসালু’ উপন্যাসে যেভাবে দেখানো হয়েছে ধর্মকে হাতিয়ার করে এক মজিদ শ্রেণীর ধর্মান্ধ কিভাবে শোষণ করে সাধারণ মানুষকে, শস্যের চেয়েও টুপির বিস্তার লক্ষ করা যায়, ধর্মকে পুঁজি করে প্রান্তিক মানুষকে জিম্মি করতে এতোটুকু দ্বিধাবোধ করে না, ধর্মকে ভয়-ভীতির একটা মজবুত অস্ত্র বানায়, সাধারণ মানুষ সেই অস্ত্রের মুখে পড়ে দিকদিশা ভুলে তাকে শুধু কুর্নিশ করে, এইভাবেই ধর্মকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করেছে, যদিও এখানে মজিদকে একটা রূপক চরিত্রে তুলে ধরা হয়েছে, কিন্তু মজিদ আসলে বাংলাদেশের ধর্মান্ধ মহাজনচক্র, ধর্মের নামে দাপুটে ভণ্ড মৌলবি, শোষণ করছে অশিক্ষিত-নিরক্ষর গ্রাম্য সাধারণ মানুষকে, তাদের ভুল বুঝিয়ে তার আখের গোছানোটাই মূল পেশা। সূর্য দীঘল বাড়ীতেও গ্রাম্য ওই নীচ শ্রেণীর মানুষকে কিভাবে দাবিয়ে রাখা যায় তার ছবি দেখানো হয়েছে। এবং তা বেশ শৈল্পিকভাবে ফুটে উঠেছে বলার অপেক্ষা রাখে না, মানুষকে দাবার গুটির মতো খেলছে ওই এক শ্রেণীর মুখোশধারী জানোয়ার তা পরিষ্কারভাবে ইঙ্গিত আছে।

উপন্যাসে দুর্ভিক্ষ মন্বন্তর গ্রামীণ মানুষের বিপর্যস্ত ভাবনা ও দেশ বিভাগের পটভূমিকায় মানুষের আশা-আকাক্সক্ষার ছবি ফুটে উঠেছে, দেশভাগ হলে পাকিস্তান হবে এবং সেখানে দু’মুঠো খেয়ে-পড়ে মাথা গুঁজে থাকার নিশ্চয়তা পাওয়া যাবে, আর খাজনা লাগবে না, চালের মূল্য কমবে, মানুষের চিরন্তন স্বপ্নগুলো কলমের আঁচড়ে ফুটিয়ে তুলেছেন চমৎকারভাবে, ক্ষুধার বিরুদ্ধে যে যুদ্ধ, দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে যে যুদ্ধ তা আরো বেগবান হয়েছে জয়গুনের ভাষায়। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে জয়গুন তার জীবনের তাবৎ সঞ্চয় হারিয়েছে, বাড়িঘর, ভিটেমাটি সমাজ-সংসার স্বামী, তারপরও সে বেঁচে আছে, বেঁচে থাকার বাসনা নিয়ে নয়, ছেলেমেয়ে দুটোকে বাঁচানোর জন্য, আর কাসুর জন্য, আর তাই তো শহরে ছুটতে হয় প্রতিদিন, ভাতের জন্য গ্রাম্য মানুষগুলো শহরমুখো হয়, কেউ বাসাবাড়ির কাজে, কেউ মোট বওয়া কাজ করতে, কেউ ভিন্ন ভিন্ন কাজে, সবাই ছুটে চলে বেঁচে থাকার মিছিলে সামিল হতে। ভাতের লড়াইয়ের এই যুদ্ধ তো আজন্মকালের এবং মানুষ জীবনের জন্য এ যুদ্ধে প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করছে। এখানে তার প্রতিদ্বন্দ্বী কে, যারা তাকে বেঁধে রাখতে চায় ঘরের চৌহদ্দিতে, সে সমস্ত ধর্মান্ধর বিরুদ্ধেই যুদ্ধ, জীবন-জীবিকার বিরুদ্ধে যে সব মানুষ প্রতিদ্বন্দ্বী, তার বিরুদ্ধে সূর্য দীঘল বাড়ি উপন্যাসের যুদ্ধ। বিংশ শতাব্দীর মধ্য পঞ্চাশে প্রকাশিত এই উপন্যাসের কুশীলবদের নায়ক করে সমাজের সামনের কাতারে তুলে এনে, আমাদের বিবেক-মননে নাড়া দিয়েছেন চরমভাবে, জীবন সংগ্রামের এক অসহায় নিঃসঙ্গ মানুষ কিভাবে বেঁচে থাকে, বাঁচতে হয় বলে হয়তো, তারপরও সমাজের কুচক্রী মানুষ নামের কীটপতঙ্গের সঙ্গে সঙ্গে দিবারাত্রি যুদ্ধ, এই যুদ্ধের শেষ নেই, যুদ্ধ চলছে, সমাজের বিরুদ্ধে, মানুষের বিরুদ্ধে, সময়ের বিরুদ্ধে, একজন যোদ্ধা জীবনের প্রায় সবটা সময় শুধুই যুদ্ধ করে বেঁচে থাকে, সে যুদ্ধ তার ভাতের জন্য, বেঁচে থাকার জন্য, একটু আশ্রয় পেতে তার যুদ্ধ চিরন্তন, কিন্তু তারপরও সে মুক্তি পায় না। ভণ্ড মাতাল ধর্মান্ধ তার বেঁচে থাকার সমস্ত সম্ভাবনাকে গলা টিপে হত্যা করে, তার জীবন ধারণের জন্য সামান্য রোজগার বন্ধ করে দেয়, নইলে যে মেয়ে মায়মুনের বিয়ে হবে না, হাসু মোট বয়ে সারাদিনে দশ-বারো আনা রোজগার করে, এ দিয়ে তিন-তিনটে প্রাণীর কি একবেলাও চলে! তাই তো বাধ্য হয়ে জয়গুনকে পথে নামতে হয়েছে, মানুষের বাড়ি ঝি-গিরি করতে, ঘর ছেড়ে একজন মানুষ অনেকদিন আগে থেকেই জীবন সংগ্রামে পা বাড়িয়েছে, কিন্তু সমাজের মানুষগুলো ভালো চোখে দেখে না, তারা নানান দুর্নাম রটনা করে, বেপর্দা হাটে বাজারে বেড়ানো বাজে মহিলা বলতেও তাদের মুখে আটকায় না, কিন্তু অন্ন জোগাবার বেলায় তাদের মুরোদ নেই, গ্রামদেশে সে কারণে একটা সহজ বাক্য আছে, ভাত দেওয়ার মুরোদ নেই কিল মারার গোসাই! ক্ষুধার অন্ন যার ঘরে নেই, তার আবার কিসের পর্দা কিসের কি? সে শুধু বুঝেছে জীবন রক্ষা করাই ধর্মের প্রথম ও শ্রেষ্ঠ মূলমন্ত্র। জীবন রক্ষা করতে ধর্মের যে কোনো অপ-আক্রমণের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে সে সর্বদা প্রস্তুত। উদরের আগুন নেভাতে দোজখের আগুনে অবলীলায় ঝাঁপ দিতেও তার এতোটুকু ভয় নেই। অথচ মেয়ের বিয়ের সময় শপথ করিয়ে বাড়ির বাইরে বার হওয়া নিষেধ করেছে, সমাজের ওই সকল কুলাঙ্গ ভণ্ড, তারাই সমাজের সেবক, হর্তাকর্তা বিধাতা। কিন্তু শ্বশুরবাড়ি থেকে কয়েক দিনের মধ্যেই মায়মুনকে পাঠিয়ে দেওয়া হয় নাবালিকা এবং কাজ করতে না পারার অজুহাতে। সেখানেও দেখা যায় শ্বশুরবাড়িতে মায়মুনকে পেট ভরে না খেতে দেওয়া, অন্ন যে কি অস্ত্র তা হাড়ে-হাড়ে বুঝিয়েছেন আমাদের, মানুষের এই ক্ষুধার জ্বালা কি কঠিন, তা বলিষ্ঠ তুলির টানে অংকন করেছেন সাহিত্যিক এই উপন্যাসে। জীবনবোধের এই মোক্ষম সরল এবং জটিল অংক মেলে না আর দশটা নিয়মের সঙ্গে।

সাহিত্যিক আবু ইসহাকের দর্শন হলো, জীবন ও সমাজে বিবর্তনশীলতাই সত্য হিসেবে উৎকৃষ্ট। গ্রামসমাজ ও জীবনের বিবর্তন চেয়েই তো উপন্যাসটি রচনা করেছেন, যার প্রায় প্রত্যেক কুশীলব একেবারে খেটে খাওয়া প্রান্তিক মানুষ, শুধু কতিপয় স্বার্থান্বেষী জানোয়ার ছাড়া, সেই সমস্ত জানোয়ার, যারা জীবন সংগ্রামের যোদ্ধাদের সমাজের নানান ভয়ভীতি দেখিয়ে কোণঠাসা করে রাখতে চায়, কিন্তু এই উপন্যাসের একেকজন বীর যোদ্ধা, হারতে জানে না, লড়তে জানে জীবন বাজি রেখে। হারা না মানার এক জীবন কথা, এই উপন্যাসটি প্রথম প্রকাশকাল (১৯৫৫ খ্রিঃ) এপ্রিল মাস; নবযুগ প্রকাশনী, সার্কাস মার্কেট প্রেস, কলিকাতা; প্রচ্ছদ শিল্পী ছিলেন শ্রী পূর্ণজ্যোতি ভট্টাচার্য।

উপন্যাসের শেষ দিকে দেখা যায় কাসুর অসুখের সময়, জয়গুন যখন তার দ্বিতীয় স্বামী করিম বকশের বাড়ি কাসুর সেবাযতেœর জন্য রাত্রিবেলা যাওয়া-আসা করতে থাকে, সে সময় একবার করিম বকশ জানায়, তাকে আবার তুলে নেবে, প্রয়োজনে তার বর্তমান স্ত্রীকে তালাক দেবে, কিন্তু জয়গুন তাতে সায় দেয়নি, নতুনভাবে আর সে সমাজের বাঁধনে নিজেকে বাঁধতে চায়নি। কিন্তু তারপরও সূর্য দীঘল বাড়ীর বিরুদ্ধে চক্রান্ত ভয়াবহ আকার ধারণ করতে থাকে। রাত্রি নামতে না নামতেই ঘরের বেড়া ও চালের ওপর ঢিল পড়তে শুরু হয়, সবাই বলে ভূতের কাজ, ভূত আবার ক্ষেপেছে সর্বশেষে দেখি ছায়ামূর্তিগুলো ঢিল ছুড়ছে, করিম বকশ চিনে ফেলে সেই ভূতটাকে, এবং তারপর সূর্য দীঘল বাড়ীর তালগাছের তলায় করিম বকশের মৃতদেহ টানটান হয়ে পড়ে থাকতে দেখা যায়। আশপাশের গাঁ গ্রামের লোকেরা দেখতে আসে, সকলেই একমত হয়, সূর্য দীঘল বাড়ীর ভূতে গলা টিপে মেরে ফেলেছে। অর্থাৎ এ বাড়িতে আর বাস করা যাবে না, যে হিম্মত নিয়ে এতোদিন ছিল, মুহূর্তে তা ভেঙে খানখান হয়ে যায়, ছেলেমেয়ের হাত ধরে বাড়ি ছাড়ে শফীর মা এবং জয়গুন। আবার তারা চলতে থাকে, জীবন সংগ্রামের কঠিন পথে। তাদের এই চলে যাওয়া মানে পরাজয় মেনে নেওয়া, সমাজের ওই সমস্ত মুখোশধারী ভণ্ড ধর্মান্ধ মানুষ নামের কতিপয় জানোয়ারের কাছে আত্মসমর্পণ বৈ তো কি। উপন্যাসের একেবারে শেষদিকে পাঠক দেখে প্রথম স্বামী অর্থাৎ করিম বকশের প্রতি জয়গুনের ভালোবাসা উছলে উঠতে, বেদনায় বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে ওঠে। দরদর ধারায় পানি ঝরে গাল বেয়ে। স্বামীর প্রতি এই ভালোবাসা বাঙালি নারীর শাশ্বত রূপ মানতেই হয়, কিন্তু জয়গুন তো স্বামী পরিত্যক্ত, তারপরও অন্যরকম ভালোবাসা মনের উঠোনে জেগে ওঠে চতুন চর জাগার মতো মনে হয়। উপন্যাসের শ্রেণীবিন্যাস করলে অবশ্যই স্বীকার করতেই হয়, সূর্য দীঘল বাড়ী বাংলাসাহিত্যের এক কালজয়ী উপাখ্যান, তৎকালীন সময়ের ইতিহাস।

[ad#co-1]