সিজুওকা প্রবাসীদের সঙ্গে সম্পাদকের মতবিনিময়

সাপ্তাহিক সম্পাদক গোলাম মোর্তোজার জাপান সফর উপলক্ষে সিজুওকা প্রবাসীরা এক মতবিনিময় সভার আয়োজন করে। গত ২৩ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশি খাদ্যের রেস্তোরাঁ সিজুওকা এ অনুষ্ঠানটি মতবিনিময় সভায় সম্পাদনায় ছিলেন মিডিয়া ব্যক্তিত্ব ব্যবসায়ী এবং সাংস্কৃতিক কর্মী নিয়াজ আহম্মেদ জুয়েল। মুষলধারে দিনব্যাপী বৃষ্টি হওয়া সত্ত্বেও প্রবাসীদের উপস্থিতি এবং আগ্রহের কমতি ছিল না। সাপ্তাহিক টোকিও প্রতিনিধি রাহমান মনি উপস্থিত থেকে মতবিনিময় সভায় সারসংক্ষেপ পাঠিয়েছেন সাপ্তাহিক পাঠকদের জন্য।

নিয়াজ আহম্মেদ জুয়েল : প্রতিকূল আবহাওয়া সত্ত্বেও আমাদের ডাকে সাপ্তাহিক সম্পাদক গোলাম মোর্তোজার সঙ্গে মতবিনিময়ে যারা উপস্থিত হয়েছেন প্রথমেই তাদের প্রতি আমার কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। তার সঙ্গে এ কথা বলতেও কার্পণ্য করব না। যে জাপানের সর্বত্র সাপ্তাহিক-এর পাঠক চক্র রয়েছে, আজকের এই উপস্থিতি তারই স্বাক্ষর বহন করে।

সম্পাদক : সাপ্তাহিক পাঠকদের পত্রিকা। সাপ্তাহিক প্রবাসীদের পত্রিকা আজকের বৃষ্টিভেজা এ সন্ধ্যায় আমি যদি না আসতাম তা হলে বুঝতেই পারতাম না যে সাপ্তাহিককে আপনারা কতটা গ্রহণ করেছেন, কতটা আপন করে নিয়েছেন। সে সঙ্গে আমাদের দায়বদ্ধতা আরো বহুলাংশে বেড়ে গেল। আপনাদের সবাইকে ধন্যবাদ।

নিয়াজ আহম্মেদ জুয়েল : এখানে যারা উপস্থিত রয়েছেন তারা সবাই আমাদের মতামত ব্যক্ত করবেন। সাপ্তাহিক বিষয়ক বাদেও যেকোনো বিষয়াদি নিয়ে আলোচনা, সমস্যা, সমাধানের প্রস্তাব অথবা অন্য কিছু জানার থাকলে জেনে নিতে পারেন।

আতিকুর রহমান সরকার (রাসেল) :
২০০৬ সালে জাপান আসি। টোকিও কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়শোনা শেষ করার পর চাকরির জন্য কিছুটা বৈষম্যের শিকার হই। এখানে ইউরোপ কিংবা অন্যান্য দেশের নাগরিকদের যেভাবে মূল্যায়ন করা হয় আমাদেরকে সেভাবে করা হয় না। অথচ আমাদের ছেলেরা মেধায় কোনো অংশে কম নয়। মিডিয়ার সহযোগিতা থাকলে ভালো হয়।

সম্পাদক :
এ ব্যাপারে আসলে মিডিয়ায় তেমন কিছু করার আছে বলে মনে হয় না। তবে আমাদের দূতাবাস এগিয়ে আসলে হয়ত কিছুটা কাজ হতে পারে। সরকারও কিছু করতে পারবে বলে মনে হয় না। কর্পোরেট কোম্পানিগুলো তাদের নিজস্ব বিবেচনায় নিয়োগ দিয়ে থাকে। প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হবে।

নিয়াজ আহম্মেদ জুয়েল : সিজুওকা থেকে বাংলাদেশের জন্য কিছু একটা করতে চাচ্ছি। আজকের এ পজিশনে আসতে আমাদের অনেক বেগ পেতে হয়েছে। প্রথমে আমরা ৩ জন বাঙালি ছাত্র ভিসায় আসার সুযোগ পাই। অক্টোবর মাসে আমাদের সেশন শুরু হলেও ভিসা পেতে পেতে আমাদের জানুয়ারি মাস পর্যন্ত লেগে যায়, বাংলাদেশে ব্রিটেন কিংবা আমেরিকায় ভিসা প্রদানে পান থেকে চুন খসলেই মিডিয়ায় প্রচার পায়। অথচ জাপানের ভিসা সমস্যা নিয়ে মিডিয়ার কোনো মাথাব্যথা নেই।

রাহমান মনি :
ইন্দোনেশিয়া, থাই, ভিয়েতনাম, নেপাল, ফিলিপিন্সসহ অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশ ভিসাজনিত সমস্যায় ছুটে আসে, দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় সমঝোতায় পৌঁছায়। আর আমাদের মন্ত্রীরা আসেন কেবল ভ্রমণ করতে, শপিং করতে এবং উপঢৌকন নিতে। দেশের জন্য কিংবা প্রবাসীদের জন্য তেমন কিছুই করেন না। ভিসা সমস্যায় সরকারি হস্তক্ষেপের কোনো বিকল্প নেই।

জাকির হোসেন :
দূতাবাসের কাজটা কি? তারা তেমন কোনো উদ্যোগ নিয়েছে বলে আমাদের জানা নেই। যতটুকু করতে পেরেছি তা নিজ উদ্যোগেই।

আহসান হাবিব :
জাপানে প্রচুর নার্স চাহিদা রয়েছে। আমাদের দেশের মেয়েদের নার্সিং ট্রেনিং দিয়ে ন্যূনতম ভাষা শেখানোর পর লেভেল এ পর্যন্ত পারদর্শী করে জাপান আনতে পারলে দেশ লাভবান হতো।

নিয়াজ আহম্মেদ জুয়েল : নার্স আনার ক্ষেত্রে সরকারি ব্যবস্থাপনার প্রয়োজন হয়। কিন্তু ডাক্তারদের বেলায় তা লাগে না।

সম্পাদক : এ ক্ষেত্রে আসলে প্রপার ট্রেনিংয়ের প্রয়োজন রয়েছে। যেটা আমাদের নেই। ভাষা সমস্যা তো রয়েছেই। সরকার কিছু করে দেবে না। রাস্তা তৈরি করে নিতে হবে আপনাদেরই। স্বউদ্যোগেই শুরু করতে হবে। আর ভিসা সমস্যার বিষয়টি মিডিয়ায় আসলে তেমন কোনো লাভ হবে বলে মনে হয় না। দূতাবাসের মাধ্যমে যদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে অবহিত করা যায় এবং তারা যদি উদ্যোগ নেন, তবে কিছু একটা হতে পারে।

আতাউর রহমান : আমরা আসলে নিজ উদ্যোগেই অনেক কিছু করি দেশকে পরিচিত করার জন্য। সিজুওকাতে বিভিন্ন মেলায় (উৎসবে) আমরা অংশগ্রহণ করি। বাংলাদেশি খাবারের স্টল দেই, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প তুলে ধরি। আগে এখানে বাংলাদেশকে কেউ চিনত না। এখন অনেকেই চেনে। আগ্রহ দেখায়।

মারুফ ইবনে রায়য়ান : মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট (গজচ) প্রকল্প দ্রুত শেষ করা উচিত। বর্তমান সরকার ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখে। অথচ বিদেশের মাটিতে যেটি আমাদের পরিচয় বহন করে সেই পাসপোর্টই এখনো পর্যন্ত আন্তর্জাতিক চাহিদা অনুযায়ী করতে পারল না! যানজটের কারণে অনেকেই বাংলাদেশে বিনিয়োগে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে। কোটি কোটি ঘণ্টা শ্রম নষ্ট হচ্ছে। এর থেকে পরিত্রাণের উপায় কি?

সম্পাদক :
এ প্রশ্ন আমারও। যানজটের কথা না হয় বাদই দিলাম। আমি হেঁটে অফিসে যাব। কিন্তু ঢাকা শহরে হাঁটার উপযোগী কোনো রাস্তা অবশিষ্ট আছে কি? গজচ শুরু হয়েছে। আমার জানা মতে প্রতিদিন ২০০০-এর মতো পাসপোর্ট দিতে পারছে। সহসাই বিদেশের মিশনগুলো থেকেও কার্যক্রম শুরু হবে বলে আমি আশাবাদী।

জাহিরুল ইসলাম টিটু : প্রবাসীদের ভোটার করে আজ পর্যন্ত কোনো সরকার আমাদেরকে ভোটাধিকার সুযোগ দিচ্ছে না?

আহসান হাবিব :
আমাদের সরকার জাপান প্রবাসীদের প্রতি উদাসীন। অথচ একজন জাপান প্রবাসী বছরে গড়ে যে পরিমাণ রেমিট্যান্স পাঠায় তা অন্যান্য যে কোনো দেশের তুলনায় বেশি।

নিয়াজ আহম্মেদ জুয়েল : আমাদের দেশের প্রাকৃতিক দুর্যোগে অনেকেই অনেক কিছু করতে চায়। কিন্তু আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় সম্ভব হয় না। এক ব্যবসায়ী কিছু গাড়ির ইঞ্জিন নিয়ে গিয়েছিল। ৫২ লাখ টাকা ট্যাক্স ধরেছে। কমিশনারের সঙ্গে দেখা করেও কোনো লাভ হয়নি। এভাবে পুরনো সাইকেল কিংবা শীতবস্ত্র নেয়ার সুযোগ রয়েছে। এই কাজ করার জন্য সরকারকে আরো নমনীয় হতে হবে।

রাসেল :
অন্যান্য দেশ থেকে নিলে যে পরিমাণ কর ধরা হয় জাপানের বেলায় তা বেড়ে যায়। মেড ইন জাপান হলে তো কথাই নেই। আমার মনে হয় এর পেছনে কোনো সিন্ডিকেট কাজ করছে।

রানা : দেশের স্বার্থে প্রবাসীদেরও উচিত দলাদলি না করে দেশের ভাবমূর্তি বৃদ্ধিতে কাজ করা। কাজ করার জন্য যথেষ্ট ক্ষেত্র আছে। সেগুলোকে চিহ্নিত করে কাজ করতে হবে।

সম্পাদক :
যতদূর দেখেছি বা জানি জাপান প্রবাসীদের মধ্যে একটা একতা আছে। এখানে সবাই সবখানে যায়। আপনারা একতাবদ্ধ হয়ে দূতাবাসের মাধ্যমে সরকারকে অবহিত করেন। নিশ্চয়ই কিছু কাজ হবে।

আতাউর রহমান :
এখানে আমরা বিদেশি। তারপরও ওয়ার্ড অফিস বা যেকোনো সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে এমনকি পুলিশকেও কাজের কথা বলতে পারি। ওরা সব কাজ করে দেয়। অথচ আমাদের দেশে একই কাজ করতে গেলে বিভিন্ন বিড়ম্বনার শিকার হতে হয়।

দূতাবাস আগে প্রবাসীদের মূল্যায়ন করত না, তবে এখন অনেক পরিবর্তন হয়েছে। বিশেষ করে সিরাজুল ইসলাম সাহেবের মেয়াদকাল থেকে এই পরিবর্তন শুরু হয়েছে। এখন মাসের প্রথম রবিবার দূতাবাসের কন্স্যুলার বিভাগ খোলা রাখা হয়। বন্ধের দিন অনেকেই ছোটখাটো কাজগুলো করতে পারেন যারা কাজের দিন যেতে পারে না।

সম্পাদক : এটা অবশ্য একটা ভালো কাজ। ভালো কাজের সুনাম করবেন তা হলে তারা উৎসাহ পাবেন। আমি বিশ্বাস করি বর্তমান রাষ্ট্রদূত একজন যোগ্য মানুষ। তিনি যদি জাপানে তিন বছর থাকতে পারেন তাহলে অনেক সমস্যার সমাধান হবে বলে আমি মনে করি।

গ্রন্থনা এবং শ্রুতিলিখন : রাহমান মনি
ছবি : রাহমান আশিকুর হিরো আকি

[ad#co-1]