সাপ্তাহিক সম্পাদক গোলাম মোর্তোজার সঙ্গে জাপান প্রবাসীদের মতবিনিময় সভা

টোকিওস্থ কিতা সিটি তাকিনোগাওয়া কাইকানে গত ১৯ সেপ্টেম্বর জাপান প্রবাসীরা সাপ্তাহিক সম্পাদক গোলাম মোর্তোজার সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় মিলিত হয়। সভাটির আয়োজন করেছিল সাপ্তাহিক পাঠক ফোরাম, জাপান। ফোরামের সভাপতি বিশিষ্ট ছড়াকার, লেখক বদরুল বোরহান সভায় সভাপতিত্ব করেন। জাপানস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রথম সচিব এবং দূতালয় প্রধান নাজমুল হুদা, জাপান সরকারের (ক্ষমতাসীন দলের) অত্যন্ত প্রভাবশালী নেতা, সংসদ সদস্য ইশিই আকিরা, জাপান প্রবাসী বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক, ব্যবসায়ী, রাজনৈতিক, আঞ্চলিক নেতৃবৃন্দ, প্রবাসী মিডিয়া কর্মীসহ শতাধিক প্রবাসী বাংলাদেশির উপস্থিতিতে এবং অংশগ্রহণে সভাটি প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে।

মতবিনিময় সভায় সাপ্তাহিক পত্রিকার নানাবিধ বিষয়সহ প্রবাসীদের বিভিন্ন সমস্যা দাবি এবং প্রত্যাশা, দেশে চলমান পরিস্থিতি, দেশের রাজনীতি ও তার ভবিষ্যৎ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।

সভায় স্বাগত ও শুভেচ্ছা বক্তব্য উপস্থাপন করেন সাপ্তাহিক টোকিও প্রতিনিধি রাহমান মনি। জাপান প্রতিনিধি কাজী ইনসানুল হকের সঞ্চালনে আয়োজিত মতবিনিময় সভার সংক্ষিপ্তসার ক্রোড়পত্র হিসেবে টোকিও থেকে লিখে পাঠিয়েছেন রাহমান মনি এবং বদরুল বোরহান।

রাহমান মনি : আজকের আয়োজনে সাপ্তাহিক-এর ডাকে এই মতবিনিময় সভায় যারা উপস্থিত হয়েছেন এ জন্য সাপ্তাহিক আপনাদের কাছে কৃতজ্ঞ। আপনারা আমাদের সালাম ও শুভেচ্ছা গ্রহণ করুন। আপনাদের অংশগ্রহণে আজকের এই সভা প্রাণবন্ত হয়ে উঠবে বলে আমাদের বিশ্বাস। আশা করি আপনারা আপনাদের সুচিন্তিত মতামত ব্যক্ত করবেন।

সাপ্তাহিক আপনাদের সব সমস্যার সমাধান দিতে পারবে না। তবে আপনাদের সব সমস্যার কথাগুলো প্রকাশ করে যথাযথ স্থানে পৌঁছানোর ব্যবস্থা নিয়ে কর্তৃপক্ষ এবং নীতিনির্ধারকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারবে। সাপ্তাহিক আপনাদের পত্রিকা, পাঠকদের পত্রিকা, প্রবাসীদের পত্রিকা। সাপ্তাহিক সব সময় প্রবাসীদের খবর গুরুত্বসহকারে প্রকাশ করে থাকে। প্রবাসীদের যেকোনো সুখ দুঃখে সাপ্তাহিক পাশে আছে এবং থাকবে।

আজকের আয়োজনটি একটু ভিন্ন এবং মর্যাদাপূর্ণ। কারণ যাকে কেন্দ্র করে আজকের এই আয়োজন যিনি আজকের মতবিনিময় সভার মধ্যমণি, তিনি আর কেউ নন, আমাদের প্রিয় সম্পাদক, বিশিষ্ট সাংবাদিক, সম্পাদক গোলাম মোর্তোজা। আজ আমরা তার সঙ্গেই মতবিনিময় করব। আপনারা সাপ্তাহিক সংক্রান্ত ছাড়াও, রাজনীতি, সামাজিকসহ যে কোনো প্রশ্ন তাকে করতে পারবেন। তবে স্বল্প সময়ে সংক্ষিপ্ত পরিসরে কেবলমাত্র মূল কথাটি বলার চেষ্টা করবেন এবং অন্যকেও বলার সুযোগ দেবেন।

আমরা মনে রাখার চেষ্টা করব যে, এখানে কেউ কারো প্রতিদ্বন্দ্বী নই। আমরা নিজেরা যেমন বলব তেমনি অন্যের কথা শুনব, সেই মতের প্রতি শ্রদ্ধা জানাব। কিছু বলতে চাইলে সভাপতির দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলার চেষ্টা করব, তবে কাউকে আঘাত করে নয়। সভার বিঘ্ন ঘটে এমন কোনো আচরণ করব না। আজকের মতবিনিময় সভায় পুরো আলোচনা আপনাদের প্রিয় ম্যাগাজিন সাপ্তাহিক-এ সচিত্র প্রকাশিত হবে। কাজেই আমরা এমন কিছুই করব না, যাতে করে জাপান প্রবাসীদের হেয় হতে হয়।

আমি আজকের মতবিনিময় সভায় সভাপতিত্ব করার জন্য সাপ্তাহিক পাঠক ফোরাম জাপানের সম্মানিত সভাপতি, বিশিষ্ট ছড়াকার, লেখক বদরুল বোরহানকে বিনীত অনুরোধ জানাচ্ছি এবং অনুষ্ঠান পরিচালনার জন্য সাপ্তাহিক জাপান প্রতিনিধি, কাজী ইনসানুল হককে সবিনয় অনুরোধ জানাচ্ছি।

কাজী ইনসান : ধন্যবাদ রাহমান মনি। উপস্থিত সকলকে শুভেচ্ছা। মতবিনিময় সভা পরিচালনার জন্য আমি আপনাদের সকলের সহযোগিতা কামনা করছি। আজকে আমাদের মাঝে সাপ্তাহিক সম্পাদক গোলাম মোর্তোজা উপস্থিত আছেন। প্রথমেই আমি তাকে সাপ্তাহিক সম্পর্কে কিছু বলতে অনুরোধ করব।

গোলাম মোর্তোজা : সাপ্তাহিক সম্পর্কে আমাদের বক্তব্য খুব পরিষ্কার। আমরা সত্যের পক্ষে থেকে কাজ করি। আমরা দেশ, দেশের মানুষের পক্ষে। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের পক্ষে। প্রবাসীদের পক্ষে। আমাদের পরিষ্কার অবস্থানের কারণে অনেক প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয় প্রতিনিয়ত।

বিশেষ করে বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে অনেকবার বিপদের মুখোমুখি হতে হয়েছে। এগুলোকে আমরা জীবনের অংশ হিসেবে ধরে নিয়েছি। তবে কখনো লক্ষ্য থেকে পিছিয়ে আসিনি, আসব না। ধন্যবাদ আপনাদের সবাইকে এ রকম চমৎকার একটি আয়োজন করার জন্য।

সালেহ মোঃ আরিফ :
সাপ্তাহিক সম্পাদক গোলাম মোর্তোজা ভাইয়ের সঙ্গে আমার সখ্য দীর্ঘদিনের। তার প্রগতিশীল চিন্তা-চেতনার সঙ্গে আমি পরিচিত। ‘আমরা নিরপেক্ষ নই, সত্য ও সুন্দরের পক্ষে’ সাপ্তাহিক-এর এই স্লোগানের বাস্তব প্রেক্ষাপট নিয়ে আমি সন্দিহান। কারণ ২০০৯ সালে সাপ্তাহিক টোকিও প্রতিনিধির ১৫ আগস্টের একটি রিপোর্ট সাপ্তাহিক-কে প্রশ্নের সম্মুখীন করেছে তার নিরপেক্ষতা নিয়ে। সেই লেখার প্রতিবাদ পাঠানোর পর সেটা সাপ্তাহিক-এ প্রকাশিত হয়নি।

সম্পাদক : ধন্যবাদ আরিফ ভাই। সাপ্তাহিক-এর স্লোগান নিয়ে সন্দিহান হবার কোনো সুযোগ নেই। এই স্লোগান দিবালোকের মতো পরিষ্কার, স্বচ্ছ। সাপ্তাহিক অতীতে তার প্রমাণ দিয়ে এসেছে। ভবিষ্যতেও তার প্রমাণ দেবে।

আর গত বছর ১৫ আগস্ট বিষয়ক টোকিও প্রতিনিধির রিপোর্টের বিরুদ্ধে আপনার পাঠানো প্রতিবাদে ব্যক্তি আক্রমণ, অন্য প্রসঙ্গের অবতারণা ছিল বহুলাংশে। প্রতিবাদ হয় রিপোর্টের বিষয় খন্ডায়ন করে, যুক্তির মাধ্যমে। কিন্তু তার অনুপস্থিতি ছিল প্রতিবাদে।

প্রকাশিত রিপোর্টের বাইরে অন্য বিষয়ে গুরুত্ব আসার কারণেই প্রতিবাদপত্রটি প্রকাশিত হয়নি।

সালেহ মোঃ আরিফ : জাপানে পর পর দুটি ঘটনা ঘটে গেলেও সাপ্তাহিক প্রতিনিধিরা কোনো নিউজ করেনি। একটি ছিল একজন রেস্টুরেন্ট ব্যবসায়ী টোকিওতে এবং একটি রাজনৈতিক দলের নেতা হিরোশিমাতে। উভয় ক্ষেত্রে অবৈধভাবে বাংলাদেশি শ্রমিক নিয়োগ করা নিয়ে। জাপান মিডিয়ায় নিউজ এলেও বাংলাদেশে কোনো নিউজ হয়নি। এটা কি পক্ষপাতিত্ব নয়?

সম্পাদক : এই বিষয়টা প্রতিনিধিরাই ভালো বলতে পারবেন।

কাজী ইনসান : এই খবরটা বাংলাদেশে প্রকাশ করলে অনেক বাংলাদেশিই পরবর্তীতে বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হতো। উভয় ক্ষেত্রেই আমি নিজেই তাদের সঙ্গে দেখা করেছি। বিস্তারিত জেনেছি। তারা অন্যায় করেছে, তার শাস্তি তারা পেয়েছে। তাদের জন্য অন্যরা যেন কোনো হয়রানির শিকার না হয় এই জন্য রিপোর্ট করা হয়নি।

রাহমান মনি : সাপ্তাহিক কখনোই প্রবাসীদের বিরুদ্ধে যায় না। সাপ্তাহিক মনে করে দশজন অপরাধী বের হোক, তবুও যেন একজন নিরপরাধী সাজা ভোগ না করে। ভিসা জটিলতায় কোনো প্রবাসী পড়ুক এটা কামনা করি না বলে এটি নিউজ করিনি। কারণ বাংলাদেশে এই নিউজ করলে ঐ সময় যারা ভিসাপ্রার্থী ছিলেন তারা জটিলতায় পড়তে পারতেন।

আশরাফ আহম্মেদ : সরকারি ও বিরোধী দলের সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে সাপ্তাহিক কোনো দলকে প্রাধান্য দেয় কি?

সম্পাদক : আলাদা করে গুরুত্ব দেয়ার কাজ আমরা কখনো করি না। আমাদের দৃষ্টিতে যেটা সঠিক সেটা আমরা লিখি। কখনো তা আওয়ামী লীগের পক্ষে যায়, কখনো বিপক্ষে যায়। বিএনপির ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য।

সায়নুল : নিরপেক্ষতার নামে দেশ বা স্বাধীনতাবিরোধী কার্যক্রমে সাপ্তাহিক কতটা নিরপেক্ষ?

সম্পাদক : অপশক্তির পক্ষে আমাদের অবস্থান নয়। তার বিরুদ্ধে আমাদের ভূমিকা পরিষ্কার। দেশের প্রধান দুটি রাজনৈতিক দল তাদের কার্যক্রম সঠিকভাবে পরিচালনা করতে যখনই ব্যর্থ হয়, প্রত্যাশা অনুযায়ী কাজ করতে পারে না, সাপ্তাহিক তার বিরুদ্ধে বরাবরই সোচ্চার। সাপ্তাহিক মনে করে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হওয়া প্রয়োজন এবং তা হতেই হবে। দেশের স্বার্থে।

জাকির হোসেন : যুদ্ধাপরাধীর নামে যেন অযথা কাউকে হয়রানি করা না হয়। এতে করে এতদিনের প্রত্যাশা হালকা হয়ে যাবে। মনে রাখতে হবে বাংলাদেশে অতি উৎসাহী এবং কিছু করিৎকর্মা উচ্চ পদে আসীন আছেন।

সুখেন ব্রহ্ম : প্রবাসীদের ভোটাধিকার, অর্পিত সম্পত্তি আইন এবং পার্বত্য চুক্তির ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার বিষয়ে সাপ্তাহিক সম্পাদকের কাছে জানতে চাই।

সম্পাদক : প্রবাসীদের ভোটাধিকারের বিষয়ে সরকার চেষ্টা করছে। তবে সেই চেষ্টার যোগ্যতা এবং আন্তরিকতায় ঘাটতি আছে। কাজের গতি অত্যন্ত শ্লথ। আগামী জাতীয় নির্বাচনের আগে বিশেষ দু’একটি দেশের প্রবাসীরা ভোটাধিকার হয়ত পেতে পারেন। সব প্রবাসীর ভোটাধিকার পাবার সম্ভাবনা কম। তবে সাপ্তাহিক মনে করে সব প্রবাসীকেই একসঙ্গে ভোটাধিকার দেয়া উচিত।

অর্পিত সম্পত্তি আইন বিষয়ে কিছু সমস্যা আছে। সরকারের একটি পক্ষ আন্তরিকভাবে চায় আইনটি কার্যকর করতে। আর একটি পক্ষ চায় না। এর কারণ সম্ভবত এই যে, অর্পিত সম্পত্তি দখলের সঙ্গে এই পক্ষটি সম্পৃক্ত।

বর্তমান সরকার পার্বত্য শান্তি চুক্তি বাস্তবায়নের বিষয়ে অনেক কথা বলছে। কিছু কিছু উদ্যোগ নেয়ার চেষ্টা করছে। তবে তা মোটেই সন্তোষজনক নয়। অর্পিত সম্পত্তি আইন ও পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বিষয়ে খুব ভালো কিছু হবে বলে মনে হয় না। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির ক্ষেত্রে দুটি পক্ষ সম্পৃক্ত। রাজনৈতিক ও সামরিক দুই পক্ষের মতের মিল এবং কাজের মিল হচ্ছে না। ফলে তার যথাযথ বাস্তবায়ন দুরূহ ব্যাপার।

এমডি এস ইসলাম নান্নু : আমি একজন ব্যবসায়ী। ব্যবসার কাজে আমাকে পৃথিবীর অনেক দেশেই যেতে হয়। আফ্রিকার মতো দেশেও বিমানবন্দরে মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট (গজচ) চায়। কিছুদিন পর গজচ ছাড়া কোনো দেশেই যাওয়া যাবে না। এখনই কিছু দেশ ভিসা দিতে চায় না। আমরা গজচ না পেলে ব্যবসা করব কিভাবে? সরকার কী ভাবছে?

কাজী ইনসান :
বিষয়টির সঙ্গে যেহেতু দূতাবাস জড়িত এবং দূতাবাসের প্রথম সচিব নাজমুল হুদা এখানে উপস্থিত আছেন, তাই জনাব নাজমুল হুদাকে কিছু বলার জন্য বলছি।

মোঃ নাজমুল হুদা (প্রথম সচিব বাংলাদেশ দূতাবাস, টোকিও) : গজচ-এর ব্যাপারে দূতাবাস দেশ থেকে অর্থাৎ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছ থেকে বা সরকার থেকে কোনো দিকনির্দেশনা এখনো পায়নি। সরকারি আদেশক্রমে এখনো হাতে লেখা পাসপোর্ট ইস্যু করার বিধান রয়েছে। সরকারি নির্দেশ এলে আমরা অবশ্যই নির্দেশনা মোতাবেক কাজ করব।

রাহমান মনি :
বাংলাদেশ থেকে গজচ দেয়া শুরু হয়েছে। প্রতিদিন দুই হাজার করে দেয়া সম্ভব হচ্ছে। যদিও প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম। তবুও শুরু হয়েছে। তবে সরকার ইচ্ছা করলে সবগুলো মিশনে একযোগে শুরু করতে পারে। কারণ মিশনগুলোতে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করা সহজ।

সম্পাদক : গজচ-এর প্রক্রিয়া গতিশীল নয়। আরো দ্রুত এবং যোগ্যতার সঙ্গে এই কাজ হওয়া দরকার। গজচ দেয়ার ক্ষেত্রে অবশ্যই প্রবাসীদের গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন। প্রবাসীদের প্রতি আমার অনুরোধ আপনার দূতাবাসকে চাপ প্রয়োগ করুন। দূতাবাস দেশে জানাক। প্রধানমন্ত্রী জাপানে আসছেন। তার কাছে আপনারা বিষয়টি তুলে ধরেন। চাপ প্রয়োগ অব্যাহত রাখলে কাজ হলেও হতে পারে।

মোঃ সানাউল হক : প্রবাসে এসে দেশের নেতা-নেত্রীরা পল্টন ময়দানের মতো কথা বলেন। প্রবাসীরা এটা প্রত্যাশা করে না। আন্তর্জালে প্রবাসীরা দেশের সব খবরই রাখেন। কাজেই প্রবাসীরা নেতাদের কাছ থেকে আরো মার্জিত, গঠনমূলক এবং দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য আশা করেন। আক্রমণাত্মক নয়।

সম্পাদক : জনাব সানাউল হক আপনি একেবারে সঠিক কথা বলেছেন। আপনার বক্তব্যের সঙ্গে আমি পুরোপুরি একমত।

আমজাদ হোসেন : এই জন্যই তো তারা নেতা হতে পেরেছে। বাংলাদেশে অনেক নেতাই আছেন যারা একের অধিক লোক দেখলেই বক্তৃতা দেয়ার জন্য উদগ্রীব হয়ে ওঠে।

সম্পাদক : এটা রাজনৈতিক নেতাদের স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য। চাইলেই এর পরিবর্তন সম্ভব নয়। তবে দেশে অনেক ত্যাগী, যোগ্য নেতাও আছেন। সবাইকে একভাবে মূল্যায়ন করা ঠিক হবে না।

আবুসিনা মোঃ জালাল (সৌরভ) : ওয়ান ইলেভেন প্রসঙ্গ আমাদের দেশের মিডিয়ায় সঠিকভাবে আসেনি। মিডিয়ার কার্যক্রম প্রশ্নের সম্মুখীন। মন্তব্য করুন প্লিজ।

সম্পাদক : কোনো অপরাধ না করে ওয়ান ইলেভেনের সময় সবচেয়ে নির্যাতিত হতে হয়েছে সাংবাদিকদের। আমিসহ অনেক সম্পাদক, সাংবাদিকদের অহেতুক হয়রানি করা হয়েছে। মিডিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে কঠিনভাবে। পত্রিকায় কী লেখা হবে, কোন টক শো-তে কে যাবেন, কে যাবেন না, নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে। সবকিছু যে আমরা মেনে নিয়েছি, তা নয়। তবে অনেক কিছু মানতে বাধ্য হয়েছি। বাধ্য হয়েছি টিকে থাকার জন্য। আপনারা জানেন যে, গোয়েন্দা সংস্থা মৌলবাদীদের রাস্তায় নামিয়ে আমাদের সেই সময়ের পত্রিকার ঈদসংখ্যা নিষিদ্ধ করিয়েছে। আমাদেরকে নানাভাবে নাজেহাল করেছে। আমার টেলিভিশনের টক শো বন্ধ করে দেয়া হয়েছে বার বার। আরো অনেক সাংবাদিকের ক্ষেত্রে এমনটা করা হয়েছে।

তার পরও আমরা সবকিছু মেনে নেইনি। সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সমালোচনা করেছি সেই সময়ও। তবে এ কথা সত্য যে, পাঠকের প্রত্যাশা অনুযায়ী কাজ হয়ত মিডিয়া কাজ করতে পারেনি।

আবার দু’-একটি পত্রিকা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কার্যক্রমের সঙ্গে নিজেদের সম্পৃক্ত করে ফেলেছিল। এটা অবশ্যই মিডিয়ার একটি সমালোচনার জায়গা।

নুরুল ইসলাম সর্দার : প্রবাসীদের সমস্যা প্রচুর। অথচ সরকারের সেই দিকে কোনো খেয়াল নেই। প্রবাসীদের প্রেরিত অর্থে দেশের অর্থনীতির চাকা সচল থাকে। অথচ প্রবাসীরা অবহেলিত। ডাক বিভাগের দুর্নীতি অপরিসীম। কোনো কিছুই সিস্টেমের মধ্যে নেই। কিভাবে এই সমস্যা থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যাবে? এই সম্পর্কে সম্পাদক কিছু বলুন।

সম্পাদক : আমাদের সমস্যা আমাদেরই সমাধান করতে হবে। আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় সরকারের বিধি-নিষেধ স্থবির হয়ে যায়। এটা থেকে মুক্তি সুদূরপরাহত। ডাক বিভাগের দুর্নীতি মহীরুহ আকার ধারণ করেছে নিঃসন্দেহে। সরকারের হস্তক্ষেপ ছাড়া এর সমাধান সম্ভব নয়। আপনারা প্রবাস থেকে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করুন। চোখে আঙ্গুল দিয়ে সিস্টেম দেখিয়ে দিন।

দুলাল খান : আপনি (সম্পাদক) কি কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জড়িত?

সম্পাদক : না, আমি কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জড়িত নই। তবে আমার রাজনৈতিক অবস্থান মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে এবং মৌলবাদের বিপক্ষে।

মজিবুর রহমান : জাপানে একজন লোক ইসলাম ধর্মকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করছে তার নিজস্ব ওয়েবসাইটে। বাংলাদেশকে পাকিস্তান এবং আফগানিস্তানের সমপর্যায়ে নেয়ার চেষ্টা করছে।

সম্পাদক : জাপান প্রবাসীদের ব্যবহার করে কেউ যদি ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের চেষ্টা করে, অবশ্যই তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হওয়া উচিত। বাংলাদেশকে পাকিস্তান, আফগানিস্তানের সঙ্গে এক করে দেখানোর চেষ্টা খুব বড় মাপের অপরাধ। আপনার কথার সত্যতা আছে। তবে এই ব্যাপারে আপনাদেরই পদক্ষেপ নিতে হবে। কারণ জাপান পুলিশ আপনাদের প্রতিটি বিষয়ে খোঁজ রাখে। দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট হয় এমন কাজ থেকে তাকে বিরত রাখতে হবে।

নুর-এ-আলম : সম্পাদক সাহেবরাও অনেক সময় ক্ষমতার অপব্যবহার করেন। রাজনৈতিক নেতাদের তোষামোদ করেন। রাজনৈতিক নেতাদের যেমন কেনা যায়, তেমনি সম্পাদক সাহেবদেরও রাজনৈতিক নেতারা ব্যবহার করেন। আপনার মন্তব্য জানতে চাই।

সম্পাদক : আমি তো সব সম্পাদকের কথা বলতে পারব না। তবে ঢালাওভাবে মন্তব্য করা ঠিক নয়। আমি ক্ষমতার অপব্যবহার করি না। রাজনৈতিক নেতাদের প্রতি আমি শ্রদ্ধাশীল। অনেক ত্যাগী নেতাও বাংলাদেশে রয়েছেন।

মোঃ আহসান হাবীব : জাপান এবং জাপানিদের সঙ্গে আমাদের সুসম্পর্ক এবং অনেক মিল রয়েছে। অথচ আমরা জাপানের কাছ থেকে আর্থিক অনুদান ছাড়া আর কিছু পাচ্ছি না। চেষ্টা করলে জাপানি বিনিয়োগ বাড়ানো সম্ভব। কিন্তু সে বিষয়ে আন্তরিক উদ্যোগ দেখি না। আর আমাদের পুরো সমাজ ব্যবস্থায় অবক্ষয় এসেছে। ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, সাংবাদিক, রাজনীতিক, ব্যবসায়ী কেউই এর বাইরে নয়। এই অবক্ষয় সংক্রমিত হচ্ছে।

এমডি এস ইসলাম নান্নু : আমি অনেক দেশের সঙ্গে ব্যবসা করি। আফ্রিকার সঙ্গে আমার ব্যবসা বেশি। কিন্তু আমি একজন বিদেশি হয়ে আফ্রিকাতে ব্যবসা করতে গিয়ে যে ধরনের সহযোগিতা পাই অথচ বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে গিয়ে নানান প্রতিকূলতার সম্মুখীন হই। আফ্রিকার অনেক দেশে ১ ঘণ্টায় যে কাজ করানো যায় বাংলাদেশে তা মাসের পর মাস লেগে যায়। একজন বাংলাদেশি হয়ে নিজের দেশে বিনিয়োগ করতে পারি না দীর্ঘসূত্রতার কারণে এর চেয়ে আর বড় দুঃখ কী হতে পারে? অথচ সরকার ঢাকঢোল পিটিয়ে বিনিয়োগ বাড়ানোর আহ্বান জানায়।

সম্পাদক : এই ব্যাপারে দূতাবাস (জাপানস্থ) যথেষ্ট ভূমিকা রাখতে পারে। আহসান হাবীব ভাই এবং নান্নু ভাইয়ের কথাগুলোর সঙ্গে দূতাবাসের কাজের পরিধির মিল আছে। এই কাজগুলো করে দেয়া বা করতে সহযোগিতা করা দূতাবাসের নিয়মিত কাজের মধ্যে পড়ে। প্রবাসীরা একত্রিত হয়ে দূতাবাসের ওপর চাপ সৃষ্টি করা প্রয়োজন।

সজল বড়–য়া : সাপ্তাহিক-এর প্রবাসীদের পাতা সুসম্পাদিত নয়। সাপ্তাহিক-এ সাহিত্য পাতা অর্থাৎ গল্প-কবিতা নিয়মিত প্রকাশের অনুরোধ জানাচ্ছি।

সম্পাদক : সাপ্তাহিক-এর প্রবাসের পাতার প্রতি আমরা আরো বেশি যত্নশীল হব। আর প্রতি বছর বিশেষ সংখ্যাগুলোতে (ঈদ সংখ্যাসহ) সাহিত্য বিষয়ক লেখা থাকছে নিয়মিত। তাই প্রতি সংখ্যায় সাহিত্য পাতা রাখার কোনো পরিকল্পনা আপাতত নেই।

অজিত বড়–য়া : বঙ্গভবন, সচিবালয়, সেনানিবাস রাজধানী ঢাকা থেকে সরিয়ে নেয়া উচিত। এতে করে ঢাকার ওপর চাপ কমবে এবং শহর বড় হবে। যানজট নিরসনে আপনার পরামর্শ কি?

সম্পাদক : এটি সরকারের এখতিয়ারভুক্ত ব্যাপার। সরিয়ে নেয়ার পরিকল্পনা নিতে পারলে ভালো। যানজট নিরসনে নীতিমালা তৈরি এবং তার প্রয়োগ প্রয়োজন। পরিকল্পনাহীন কাজে যা হবার তাই হচ্ছে। ট্রাফিক সিস্টেম, চালকদের দায়িত্ববোধ এবং পথচারীদের সতর্কতা প্রয়োজন। সমন্বয়হীনতার অভাব রয়েছে।

দুলাল খান : বাংলাদেশ বিমানের বর্তমান অবস্থা কি? ঢাকা-নারিতা রুটটি কি পুনরায় চালু হবার সম্ভাবনা আছে?

আনোয়ার হোসেন : বিমান যখন টোকিও আসত তখন আমাদের বৃদ্ধ পিতামাতাকে জাপান আনা সহজ হতো। সরাসরি রুট থাকায় ঢাকা থেকে তুলে দিলেই আমরা নারিতায় রিসিভ করতাম। এখন সরাসরি কোনো ফ্লাইট না থাকায় ট্রানজিট হয়ে গ্রামের সহজ-সরল নিরক্ষর/ স্বল্প শিক্ষিত মুরব্বিদের পক্ষে একা আসা সম্ভব নয়। সাপ্তাহিক-এর মাধ্যমে আমি কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই।

সম্পাদক : বাংলাদেশের বিমানের সার্বিক ব্যবস্থাপনার উন্নতি এবং নতুন এয়ারক্রাফট না কেনা পর্যন্ত জাপানে বিমানের রুট পুনরায় চালু করার কোনো সম্ভাবনা দেখি না। বর্তমানে অব্যবস্থাপনা আরো প্রকট আকার ধারণ করছে। মন্ত্রী, সচিব এবং চেয়ারম্যানের বিবাদ প্রকাশ্যে চলছে।

গোলাম ফারুক মেনন : জাপানে প্রবাস প্রজন্মের জন্য একটি বাংলা কারিকুলামের স্কুল প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। কিভাবে এটা সম্ভব করা যেতে পারে?

সম্পাদক : এ জন্য সমস্ত প্রবাসী, দূতাবাস এবং বাংলাদেশ সরকারের সম্মিলিত প্রচেষ্টা থাকা প্রয়োজন। বিশেষ করে প্রবাসী ব্যবসায়ীদের এগিয়ে আসতে হবে। বেশ কিছু দেশে এই ধরনের স্কুল আছে। ছেলেমেয়েরা ভালো রেজাল্টও করছে।

জসীম উদ্দিন : বাংলাদেশে সাম্প্রতিককালে বেশ কিছু হত্যাকা- সংঘটিত হয়েছে। কিন্তু সুষ্ঠু বিচার হচ্ছে না। যাওবা একটি হচ্ছে তা আবার কোনো এক পর্যায়ে বিচার প্রক্রিয়া থেমে যাচ্ছে। ইব্রাহীম হত্যাকান্ডের কথাই বলি। ইব্রাহীমকে হত্যা করা হয়েছে তাতে কারোর কোনো সন্দেহ নেই এবং ব্যবহৃত আগ্নেয়াস্ত্রটি এমপি শাওনের তাও সন্দেহাতীত প্রমাণিত। তাহলে এই বিচার প্রক্রিয়া এগুচ্ছে না কেন? একজন পুলিশ কমিশনার কিভাবে প্রকাশ্যে সাফাই গায়?

সম্পাদক : হত্যার তদন্ত চলছে। এই মুহূর্তে কোনো মন্তব্য করা সমীচীন নয়। তবে সঠিক বিচার হওয়া উচিত। এমপি শাওনের সম্পৃক্ততা থাকলে তদন্তে তা প্রকাশিত হবে বলে বিশ্বাস রাখতে চাই। দেখা যাক কী হয়!

আঃ রাজ্জাক : প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ভূমিকাটি কি? প্রবাসীদের কল্যাণে যদি প্রতিষ্ঠা করা হয়ে থাকে তাহলে প্রবাসীরা কোনো সুবিধা পাচ্ছে না কেন? কিভাবে এটাকে গতিশীল করা সম্ভব?

সম্পাদক : একজন সম্পাদক হিসেবে আমি মন্ত্রণালয়ের তেমন কোনো ভূমিকা দেখি না। কল্যাণ তো অনেক পরের কথা। বাংলাদেশে এমন অনেক অথর্ব প্রতিষ্ঠান আছে।

এ ছাড়াও বাকের মাহমুদ, নারমিন হক, হারুন অর রশীদ, মোফাজ্জল হোসেন, সামিউল হক, গোলাম মাসুম, মাসুদুর রহমান, চন্দন সাপ্তাহিক সম্পাদক গোলাম মোর্তোজাকে ধন্যবাদ জানিয়ে এবং সাপ্তাহিক-এর সাফল্য কামনা করে বক্তব্য রাখেন। সাপ্তাহিক-এর সাফল্য কামনা করে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য রাখেন, আব্দুর রহমান মোহন, আমিন শরীফ লিটন, খন্দকার আনিসুর রহমান, ওয়াদুদ আহমেদ, শ্রীনন্দ কুমার ম-ল ও তানভীর শহীদ প্রমুখ। সময়ের অভাবে অনেকেই কিছু বলতে পারেননি।

জাপানের ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী সংসদ সদস্য, জাপান-বাংলাদেশ পার্লামেন্টিয়ার গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক অকওজঅ ওঝঐওও (আকিরা ইশিই) সাপ্তাহিক সম্পাদক গোলাম মোর্তোজাসহ উপস্থিত সকলকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, আমি বাংলা বুঝি না। তবে এইটুকু বুঝতে পেরেছি যে, প্রবাসীরা সম্পাদকের কাছে সমস্যা ও সমাধানের পথ জানতে এবং জানাতে চাচ্ছেন। তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশ জাপানের খুব ভালো একটি বন্ধু রাষ্ট্র। জাপানে বাংলাদেশিরা খুব ভালো, সৎ এবং পরিশ্রমী। তারা জাপানের আইন মেনে জীবনযাপন করছেন। শিগগিরই তিনি বাংলাদেশ সফরের আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

সবশেষে সাপ্তাহিক পাঠক ফোরাম জাপান-এর সভাপতি, ছড়াকার, লেখক এবং শিশুসাহিত্যিক বদরুল বোরহান সমাপনী বক্তব্যে বলেন, সাপ্তাহিক সম্পাদক গোলাম মোর্তোজার সঙ্গে মতবিনিময় সভায় অংশগ্রহণকারী সকল প্রবাসী বাঙালিকে জানাই আন্তরিক ধন্যবাদ। সাপ্তাহিক-এর সঙ্গে প্রবাসীদের সেতুবন্ধন রচনায় পাঠক ফোরাম আরো সক্রিয় ভূমিকা পালন করবে। এই ব্যাপারে সকলের সহযোগিতা প্রত্যাশা করছি। সকলকে অসংখ্য ধন্যবাদ।

শ্রুতিলিখন : বদরুল বোরহান
ছবি : ওয়াদুদ আহম্মেদ ও মোঃ আশিকুর রহমান হিরো আকি (আশিক)

[ad#co-1]