কবির কথাশিল্প কথাশিল্পীর কবিতা

সরকার মাসুদ
বিশ শতকের গোড়ার দিকে কবিতা এবং গদ্যের ভাষারীতি পরস্পরের পরিপূরক, সহযোগী ও প্রভাবচিহ্নিত হয়ে উঠতে চেয়েছিল। জেমস জয়েস, ওয়াল্ট হুইটম্যান, হেরমান হেস, চেশোয়াভ মিউশ, স্য ঝন্ পার্সের মতো জগদ্বিখ্যাত কারও কারও বেলায় তা অনেকখানি হতে পেরেও ছিল। আর মহামতি এলিয়ট সম্বন্ধে তো এ কথা নিঃসংশয়ে বলা যায় যে, সৃষ্টিশীল সেরা গদ্যের যেসব গুণ থাকে, সেগুলো তার কবিতাভাষারও গুণ। অন্যদিকে ভাষার প্রভাবচিহ্নিত হওয়ার প্রশ্নে আমরা বোধহয় জীবনানন্দের নামটিও একই পঙ্ক্তিতে উচ্চারণ করতে পারি। তার ‘মাল্যবান’ এবং ‘জলপাইহাটি’ উপন্যাস দুটি মাথায় রেখেই আমি এ কথা বললাম। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে সাহিত্যের ওই লক্ষণ ক্রমশ সুস্পষ্ট ও সর্বব্যাপ্ত হয়ে ওঠে। ফরাসিদের হাত ধরে পৃথিবীর দেশে-দেশে গদ্য এবং পদ্য পরস্পর প্রবিষ্ট, পরস্পর প্রভাবসম্পাতী চেহারা নিতে শুরু করে। কবিতার মধ্যে গদ্যের স্টাইল যেমন ঢুকে পড়ে, তেমনি গদ্য সাহিত্যেও কবিতাশিল্পের নানা রঙ-রশ্মি, অনেক বর্ণচোরা আলো-ইমেজ স্থান পেয়ে যায় অবলীলায়। এক্ষেত্রে জয়েস ও এলিয়ট এমন দু’জন যুগন্ধর শিল্পী, যারা তাদের সাহিত্যবস্তুর প্যাটার্নের গুণে, লিখনভঙ্গির স্বাতন্ত্র্যে সমসময় থেকে কমপক্ষে পঞ্চাশ বছর এগিয়ে ছিলেন। বিশেষ করে জয়েসের চৈতন্যপ্রবাহ রীতিটি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর সারাবিশ্বে যে তুলকালাম কাণ্ড ঘটে গেছে সে সম্বন্ধে অনেকেই বিশদ জানেন। প্রথমদিকে জয়েসও কবিতা লিখেছেন। তার একটা কবিতাবইও আছে। কিন্তু মহাকাব্যিক ‘ইউলিসিস’-এর দর্শন (জীবনের বিশাল অর্থশূন্যতা ও অর্থময়তার মাঝামাঝি এক অশনাক্ত উপলব্ধি), মনস্তত্ত্ব, সঙ্গীতভাবনা, গণিতমনস্কতা প্রভৃতি বহুবিপ্রতীপ আইডিয়ার অন্তরালে যে কাব্য মর্মরিত হয়ে উঠেছে তা আক্ষরিক অর্থেই অভাবিত, অদৃষ্টপূর্ব। আবার জেমস জয়েসের বিপরীতে দাঁড়ানো সবচেয়ে শক্তিমান অপর স্কুলটির অন্যতম পথিকৃৎ ডিএইচ লরেন্সের কথা ভাবা যাক। তার গদ্য জগতের বর্ণাঢ্যতা, তার ‘নষড়ড়ফ কযড়ষিবফমব’, তার সহজগভীর শৈলী এবং মর্মস্পর্শী প্রজ্ঞা আমাদের আজও যে সমানভাবে আপ্লুত করে তার কারণ লেখকের অসামান্য জীবনবাদিতা, সেই সঙ্গে দ্বন্দ্বজর্জরিত কবি মন।

লরেন্সের উপন্যাসে নানা ঋতুর উল্লেখ, নানারকম ফুল ও পাখির ব্যবহার, লম্বা যুবতী মেয়ের ফর্সা ঘাড়, চওড়া কাঁধ ও চোখ-মুখের জীবন্ত বর্ণনা, আপ্লুত রোমান্টিক মুহূর্তের অবর্ণনীয় আবেগ, অর্থময় নীরবতাঃ এসব পড়ে তাকে আমার চিরবসন্তের গীতিকবি আখ্যা দিতে মন চেয়েছিল। এই লরেন্স প্রায়শই একজন বেশ ভালো কবি। বেশকিছু সফল কবিতারও জনক তিনি। ‘Lord of the Flies’ খ্যাত, নোবেল লরিয়েট উইলিয়াম গোল্ডিং (যিনি লেখকদের লেখক, যেমন আমাদের কমলকুমার, অমিয়ভূষণ)-এর বিভীষিকা ও কলুষ চেতনাদীপ্ত কথাসাহিত্যে, জন আপডাইকের গল্পে কুশীলবদের মধ্যকার ব্যক্তিত্ব সংকট ও ব্যক্তিত্ব সংঘাতে (Personality Clash) ঋদ্ধ প্রাত্যহিকতাময় সূক্ষ্ম উপলব্ধির জগতে কিংবা গাব্রিয়েল মার্কেজের ভেলকিবাজিভরা অতিবাস্তবতার ভূমিতে কবিতা গদ্য রান্নায় উৎকৃষ্ট মশলার ভূমিকা পালন করেছে। কথাশিল্পে নতুন যুগ সৃষ্টিকারী কবিতার এই নেপথ্য ভূমিকা আমরা আরও লক্ষ্য করেছি হেরমান হেস, গুন্টার গ্রাস, উইলিয়াম ফকনার, হাসান আজিজুল হক, মার্গারেট অ্যাটউড, শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়, দেবেশ রায়, শহীদুল জহির প্রমুখ লেখকের মধ্যে। হেস তো অভূতপূর্ব কবিও ছিলেন। অন্যদিকে কথাশিল্পী ও কবি গ্রাসের রাজনীতি-সমাজনীতিমনস্ক কবিতাগুলোর প্রতীকী তাৎপর্যকেও খাটো করে দেখা যাবে না। তালিকা বাড়িয়ে লাভ নেই। বরং অন্য কথায় প্রবেশ করা যাক।

এতক্ষণ বিশ শতকী কথাসাহিত্যের একাধিক লক্ষ্যযোগ্য বৈশিষ্ট্যের একটির ওপর যে আলোকপাত করা হল, তা মুখ্যত কবিতার, অন্য অর্থে কবিদের আধিপত্যকে এক যুক্তিগ্রাহী শক্ত-সমর্থ প্লাটফর্মের ওপর দাঁড় করানোর অভিপ্রায় থেকেই। কিন্তু একজন হেমিংওয়েকে আমি কখনোই ইয়েটসের চেয়ে খাটো শিল্পী ভাবতে পারি না। তেমনি একজন সিমাস হিনি কিংবা জন অ্যাশবেরি প্রতিভার বিচারে ফকনার বা ফরস্টারের কাঁধ সমান এ রকম ভাবাও সমীচীন নয়। তবে অন্য একটা ব্যাপার বোধহয় সত্য। সেটা হচ্ছে, প্রধানত গদ্য লেখক কিন্তু উঁচু দরের কবিতাও লিখেছেন এমন লেখকের চেয়ে প্রধানত কবি কিন্তু উচ্চ মানসম্পন্ন গল্প-উপন্যাসও লিখেছেন এমন লেখকের সংখ্যা পৃথিবীতে অনেক বেশি।

সুদূর অতীতের টমাস হার্ডি, এডগার অ্যালান পো, লরেন্স, অস্কার ওয়াইল্ডের মতো সব্যসাচীরা তো আছেনই; গত শতাব্দীর মধ্যভাগে দু’জন কবির লেখা দুটি উপন্যাসের কথা আপাতত আমি বলতে পারি। কবি ফিলিপ লারকিনের উপন্যাস ‘A girl in winter’ এবং কিংবদন্তির নায়িকা কবি সিলভিয়া প্লাথের ‘The Bell Jer’ আÍজৈবনিক উপাদানে সমৃদ্ধ এত অন্যরকম হƒদয়স্পর্শী গদ্যগ্রন্থ যে, এসবের পাঠকে রীতিমতো স্মরণযোগ্য অভিজ্ঞতা বলে মনে হয়। হার্ডি, হেস বা মিউশের মতো লেখকদেরও কবিতা পড়ার পর আমার একই ধরনের অনুভূতি হয়েছিল। এখানে একটা কথা না বলে পারছি না। ‘খুব ভালো’, নিদেনপক্ষে ‘ভালো’ কবিতা যিনি লিখছেন, তার হাত দিয়ে যখন মাঝারি মানের গল্প-উপন্যাস বেরোয় তখন ‘কবি মানুষ এর চেয়ে ভালো কী গদ্য লিখবেন’ এমন মন্তব্য করেন অনেকেই। আবার একজন কথাসাহিত্যিক যদি ‘মোটামুটি মানসম্মত’ বা যথেষ্ট মানসম্পন্ন’ কবিতা লিখে ফেলেন, তখনও ওই একই রকম কথা শোনা যায়। এ এক মহাবিভ্রান্তি। এর পেছনে, আমার ধারণা, কাজ করে দুটো জিনিস। এক. কূপমণ্ডুকরা মনে করেন, কবিরা উঁচু মানের কথাসাহিত্য লিখতে অক্ষম। ফলে তাদের গল্প-উপন্যাস বিচার করতে বসার আগে এসব লোক উক্ত লেখকদের কথাকার সত্তার চেয়ে কবি সত্তাটির কথাই বেশি করে মাথায় রাখেন। দুই. কথাসাহিত্যিকও যে কোনও কোনও ক্ষেত্রে সৃজনশীল কবিতা লিখতে সক্ষম, অনেকেই সেটা প্রমাণও করেছেন, একথা সম্ভবত ছিদ্রান্বেষীদের মনে থাকে না। থাকলে তারা তাদের কাব্য বিচার করে দেখার আগে লেখকের কবি সত্তাটির চেয়ে কথাশিল্পী সত্তাটির কথা বারবার ভাবতেন না। সেজন্য ‘কবিদের লেখা গল্প’ কিংবা ‘গল্পকারদের লেখা কবিতা’ এরকম শিরোনাম আমার কাছে আদৌ সঠিক মনে হয় না। কেননা এর ভেতর একটা অন্যায় প্রশ্রয়ের সুর লুকিয়ে আছে। স্মরণীয় কবিতা লিখতে সক্ষম একজন লেখকের অভিন্ন মগজ থেকে বেরিয়ে আসা গল্প-উপন্যাস যদি নিুমানের হয়, তবে তা-ই। বিপরীত ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। ‘কবির গল্প’ কিংবা ‘কথাসাহিত্যিকের কবিতা’ নামের গ্রেস মার্কস প্রকৃত সৃজনী লেখক কখনোই নেবেন না। একজন কবি-কথাশিল্পী এই চ্যালেঞ্জ নিয়েই গদ্য-পদ্য লিখতে নামেন যদি গদ্যভাষা-পদ্যভাষাটি তার আয়ত্তে থাকে।

কবিরা যে কেবল পাঠযোগ্য আধুনিক কথাসাহিত্য রচনা করেননি, কারও কারও কলম দিয়ে বেরিয়েছে খুবই উৎকৃষ্ট মানের গল্প-উপন্যাস, আমাদের বাংলা সাহিত্যেই তার একাধিক প্রমাণ আছে। আলাউদ্দিন আল আজাদ, সৈয়দ শামসুল হক, সুনীল গাঙ্গোপাধ্যায় সুপ্রতিষ্ঠিত কথাসাহিত্যিক, কিন্তু এঁরা প্রত্যেকেই চমৎকার কবিতাও লিখেছেন; বিশেষত সুনীলের নীরাকেন্দ্রিক রোমান্টিক কাব্যগুচ্ছ এবং সৈয়দ হকের স্বদেশদীপক ও নারীবিষয়ক বেশকিছু কবিতা মনে রাখার মতো। আল মাহমুদ, হাসান হাফিজুর রহমান ও সাইয়ীদ আতিকুল্লাহর প্রাথমিক পরিচিতি কবি। কিন্তু প্রথমজন ‘পানকৌড়ির রক্ত’, দ্বিতীয়জন ‘আরো দু’টি মৃত্যু’ এবং তৃতীয়জন ‘বুধবার রাতে’ নামের গল্পগ্রন্থগুলোর ভেতর দিয়ে প্রমাণ করেছেন তাদের কথাশিল্পীসত্তার বলিষ্ঠতা। প্রসঙ্গত, শক্তি চট্টোপাধ্যায় ও মলয় রায় চৌধুরীর যথাক্রমে ‘কুয়োতলা’ এবং ‘ভেন্ন গল্প’ বই দুটির বিশিষ্ট গদ্যসামর্থ্যরে কথা এখানে বলতে চাই। আহমদ ছফা, আবদুল মান্নান সৈয়দ, আবু কায়সার, মুস্তফা আনোয়ার তাদের নিরবচ্ছিন্ন কব্যচর্চার পাশাপাশি ব্যতিক্রমী ঘরানার সৃজনশীল গল্প-উপন্যাসও লিখেছেন। এ ক্ষেত্রে, মনে হয়, আহমদ ছফা বৈচিত্র্য ও প্রাচুর্য দুয়ে মিলে তার অপরাপর সমকালিক বন্ধুদের চেয়ে এগিয়ে আছেন। কবি কাজল শাহনেওয়াজ এবং আমিতাভ পাল যেমন একাধিক স্মরণযোগ্য গল্প লিখেছেন, তেমনি গল্পকার শাহনাজ মুন্নী, আকমল হোসেন নিপু, রায়হান রাইন প্রমুখ লিখেছেন অভিনিবেশযোগ্য আধুনিক কবিতা। বর্তমান নিবন্ধের লেখকও কবিতা ও প্রবন্ধের পাশাপাশি অন্যূন পঁচিশ বছর যাবৎ ছোটগল্প লিখে আসছেন। ‘দূরবীনের ভেতর দিয়ে’ (২০০২) নামে তার একটি গল্পের বইও আছে। কথাসাহিত্যিক হিসেবে তার অবস্থান কোথায় তা কেবল খুুঁটিয়ে পড়তে অভ্যস্ত পাঠকই ভালো বলতে পারবেন।

সত্তরের প্রজšে§র কবি ইকবাল আজিজ কথাসাহিত্যেও বেশ সক্রিয় বলে মনে হয়। ছোটগল্পেও তিনি গ্রহণযোগ্য সৃষ্টিশীলতার স্বাক্ষর রেখেছেন ‘পানশালার সবুজ ফেরেশতা’ বইয়ের মাধ্যমে। তার উপন্যাস ‘এক অমানুষের ছায়া’ও মনোযোগের দাবিদার। অন্যদিকে একই প্রজšে§র বলিষ্ঠ কথাসাহিত্যিক নকিব ফিরোজ (সাম্প্রতিকতম গল্পগ্রন্থ ‘অপমৃত্যুর উপত্যকায়’) কবিতার ক্ষেত্রেও সৃজনসামর্থ্য দেখাতে পেরেছেন। অল্প কিছু কবিতা লিখেছেন তিনি যেগুলো এখনও অগ্রন্থিত। কবিতাগুলো প্রথানুগ কিন্তু কাব্যভাষা ও ব্যক্তিভাবনার সাবলীলতাগুণে উজ্জ্বল। সত্তরের আরেক কবি আলমগীর রেজা চৌধুরীও একসময় (সম্ভবত ১৯৮৩-১৯৯০-এর মধ্যে) বেশ কয়েকটি ভালো গল্প লিখেছেন।

যারা সাহিত্যের একাধিক মাধ্যমে কাজ করেছেন, করছেন, তাদের সম্বন্ধে বলা হয় যে, তারা একক মাধ্যমে কাজ করা লেখকদের চেয়ে বেশি সংশয়ী। একথা রবীন্দ্রনাথ থেকে শুরু করে আজকের তরুণতম সব্যসাচী লেখক সম্বন্ধে সমানভাবে প্রযোজ্য। এই সংশয়াধিক্যের কারণ কী? কারণ সব্যসাচীর নানামুখী সৃষ্টিশীল কাজের বেলায় দেখা যায়, শিল্পের একটি মাধ্যম বেড়ে ওঠে অন্য একটিকে জখম করে। একটির দ্বারা কম-বেশি বঞ্চিত হয় আরেকটি। তাছাড়া, একাধিক লাইনে সৃজনক্ষমতা থাকলেও সচরাচর কোনও একটি দিকে লেখকের ঝোঁক বেশি থাকে। আবার তার অর্থ এটা নয় যে, অন্য মাধ্যম-মাধ্যমগুলোকে তিনি অবহেলা করছেন। প্রকৃতপক্ষে লেখালেখির নানা দিকে নানাভাবে তিনি সৃষ্টিশীল থাকতে চান। এজন্য তার মধ্যে লেখকসুলভ টেনশন দেখা দেয়। দুই বা ততোধিক মাধ্যমে প্রতিনিয়ত কাজ করার জন্য তার অনেক বেশি সময়, ভাবনামনস্ক অনেক অবসর প্রয়োজন। উপরন্তু বিশ্বসাহিত্য ও জ্ঞানের অপরাপর শাখায় বিচরণের জন্যও চাই পর্যাপ্ত সময়। চাকরি নামক গোলামির খাঁচায় বন্দি, তৃতীয় বিশ্বের সর্বার্থে সুবিধাবঞ্চিত একজন উচ্চাশী লেখকের হাতে সেই সময় কোথায়? প্রতিভার বরপুত্রগণও, তাই, ভীষণ খণ্ডিত হীরকোজ্জ্বল সাফল্য প্রদর্শন করে ততোধিক বিমর্ষ মনে চিরবিদায় নিতে বাধ্য হন। এই বাস্তবতা
যেমন ট্র্যাজিক তেমনি শিল্পকলার অপূরণীয় ক্ষতিরও কারণ।

[ad#co-1]