কোন পথে যাত্রা আমাদের?

মনজুরুল হক
একটি রাষ্ট্রের বেলায় চার দশক একেবারে কম সময় নয়। চার দশকে কোনো একটি দেশের পক্ষে অনেক কিছুই করা সম্ভব। উল্টোভাবে আবার চার দশকে রাষ্ট্রের পিছু হাঁটার নজিরও বিশ্বজুড়ে একেবারে কম নেই। গত শতকের ষাটের দশকের শুরুতে দক্ষিণ কোরিয়ার মোট জাতীয় উৎপাদনের পরিমাণ ছিল সেই সময়ের পাকিস্তানের চেয়ে কিছুটা কম। পাঁচ দশকের ব্যবধানে সেই হিসাব এখন কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে, তা আমাদের কারোরই অজানা নয়। বাংলাদেশের বেলায় গতি তেমন পশ্চাৎমুখী না হলেও খুব বেশি দূর যে আমরা অগ্রসর হতে পেরেছি, তা তো নয়। তবে তার পরও বলতে হয়, যে প্রতিশ্রুতি নিয়ে আর যে স্বপ্ন জনতাকে দেখিয়ে দেশটির জন্ম, সে রকম আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ অগ্রযাত্রা আমরা অবশ্যই নিশ্চিত করে নিতে পারিনি। আর তা পারিনি বলেই চলার পথে বারবার আমাদের হোঁচট খাওয়া, বারবার আমাদের গতিপথ পাল্টানো, বারবার বাহকের বদল।

বাংলাদেশের মতো প্রতিশ্রুতিময় জন্ম কিন্তু খুব কম দেশের বেলাতেই দেখা যায়। মহান মুক্তিযুদ্ধে কতিপয় বিপথগামী, পথভ্রষ্ট নরপশু ছাড়া সবাই হয়েছিল শামিল—কেউ বা অস্ত্র হাতে তুলে নিয়ে, কেউ মৃত্যুঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি সর্বাত্মক সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়ে, কেউ আবার গাঢ় অন্ধকারে ডুবে থাকার পরও মনের গভীরে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা সযত্নে লালন করে যাওয়ার মধ্য দিয়ে। ফলে আমাদের বিজয়ের সেই দিনটি, ষোলোই ডিসেম্বর সবার জন্যই হয়ে উঠেছিল নতুন এক স্বপ্ন দেখার দিন, নতুন এক প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ হওয়ার দিন।

মনে পড়ে, আমরা তখন ঢাকার নবাবগঞ্জে যাত্রাবিরতিতে ঢাকামুখী হওয়ার আদেশ পাওয়ার জন্য অপেক্ষমাণ। আমাদের দলনেতা, বর্তমানে সিপিবির সাধারণ সম্পাদক মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম আলোচনায় বসেছেন আশপাশের অন্যান্য গেরিলা ইউনিটের প্রধানদের সঙ্গে আশুকরণীয় ঠিক করে নেওয়ার উদ্দেশ্যে। দীর্ঘ পথ পার হয়ে আসা আমাদের সেই গেরিলা দলের জন্য স্থানীয় এক নেতার বাসভবনে আয়োজন করা হয়েছে আহারের। অনেক দিন পর ভরপেট খেতে পারার বার্তা ছড়িয়ে দিয়ে ভেসে আসছে রান্নার সুঘ্রাণ। তবে সেদিকে মন নেই কারোরই। সবাই আমরা ভাবছি, কখন যাত্রা হবে শুরু ঢাকার পথে। ডাক এলে খাবার ফেলে রেখে আবারও সেই খালি পেট নিয়ে পথ হাঁটার মধ্যে থাকবে না কোনো গ্লানিবোধ, থাকবে না ক্লান্তির বিন্দুমাত্র ছোঁয়া।

এটাই তো ছিল বাংলাদেশের সেই প্রসবকালীন সময়ে স্বাধীনতার উপলব্ধি থেকে দেখা দেওয়া চেতনা, যে চেতনা আমাদের প্রজন্মের অনেককে আজও অনুপ্রাণিত করে, উদ্বুদ্ধ করে দেশের জন্য কিছু একটা করায় নিজেদের জড়িত করতে। আমরা যাঁরা সেই মুক্তিযুদ্ধের প্রজন্ম, এদিক থেকে তাঁরা ভাগ্যবান যে দেশপ্রেমের শিক্ষা ঠিক পাঠ্যপুস্তক থেকে পাঠ করে নয় বরং জীবনের অভিজ্ঞতা আর উপলব্ধি থেকে আমরা শিখে নিতে পেরেছিলাম, যে শিক্ষা পরবর্তী সময়ে অন্ধকার সাময়িকভাবে চারদিক গ্রাস করে ফেলা সত্ত্বেও আমাদের চলার পথে ফেলে গেছে আলো।

২.
বাংলাদেশের চার দশকের পথচলার তিন-চতুর্থাংশ আমার কেটেছে বিদেশে। সেই যে মুক্তিযুদ্ধ থেকে ফিরে আসার পর ১৯৭২ সালের গ্রীষ্মে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের জন্য দেশত্যাগ, দেশান্তরি হওয়ার সেই ধারা আমার জীবনে এখনো বহমান। মাঝে অবশ্য এক দশকের জন্য ফিরে গিয়েছিলাম স্বদেশে, দেশটা যখন কার্যত আবারও হয়ে গিয়েছিল সামরিক শাসনের অধীনে ‘পরাধীন’। নব্বইয়ের দশকের সূচনালগ্নে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা আবারও যখন শুরু, আমি তখন দেশের বাইরে এবং সেই থেকে বাংলাদেশের ওপর আমার চোখ মেলে তাকিয়ে দেখা দূর প্রবাস থেকেই।

প্রবাসজীবনে রাজনৈতিক প্রভাববলয়ের বাইরে অবস্থান করে ভালো-মন্দের উপস্থিতি সহজে অনুধাবন করা যায় বলে দেশের ওপর দূরের সেই আলোকপাতে আশা আর বেদনার মিশ্র অনুভূতিতে আমরা প্রায়ই আপ্লুত হই। বিদেশে কীভাবে দেখা হচ্ছে বাংলাদেশকে, আমাদের দেশের সঠিক অবস্থান যাচাই করে নেওয়ার সেটা কিন্তু হচ্ছে যথেষ্ট বিশ্বাসযোগ্য এক মাপকাঠি, যা কিনা অন্যভাবে বলে দিতে সক্ষম, কতটা আমরা এগিয়ে গেছি আমাদের চার দশকের পথপরিক্রমণে।

মনে পড়ে, সত্তরের দশকের শুরুতে অন্তত ইউরোপে বাংলাদেশকে দেখা হতো শ্রদ্ধার এক অবস্থান থেকে। হেনরি কিসিঞ্জার বাংলাদেশকে তলাবিহীন ঝুড়ি আখ্যায়িত করে গেলেও মূলত যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করতে পারার কারণে বাংলাদেশিদের প্রতি এক ধরনের শ্রদ্ধাবোধ পূর্ব ও পশ্চিম ইউরোপের দুই প্রান্তেই সে সময় লক্ষ করা গেছে। আমাদের সবুজ পাসপোর্ট তখনো কলুষিত হয়ে ওঠেনি এবং ইউরোপের অধিকাংশ দেশ ভ্রমণে কোনো রকম ভিসার প্রয়োজন আমাদের হতো না। দুয়ার খোলা থাকার সেই সুযোগ গ্রহণ করে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নে অধ্যয়নরত আমাদের অনেকেই গ্রীষ্মের ছুটিতে পশ্চিম ও উত্তর ইউরোপের বিভিন্ন দেশে কাজের সন্ধানে নিয়মিতভাবে যাতায়াত করতেন এবং সে রকম যাত্রায় বিচিত্র অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হলেও তলাবিহীন ঝুড়ির মতো গালাগাল কোথাও আমাদের শুনতে হয়নি। এও তো হচ্ছে আমাদের প্রজন্মের বিরাট বড় প্রাপ্তি, যার অনেকটাই হয়তো একালের তরুণদের কাছে রূপকথার কাহিনিতুল্য শোনাবে।

দারিদ্র্যের উপস্থিতি সত্ত্বেও বাংলাদেশ সম্পর্কে সে রকম ইতিবাচক ধারণায় পালাবদলের সূচনা নিশ্চিতভাবেই হয়েছিল ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্টের পর থেকে, দেশটা যখন আবারও বাঁক নেয় পাকিস্তানের দেখিয়ে দেওয়া অন্ধকার পথের দিকে। ফলে মূল্যহীন হয়ে পড়ে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের গৌরবগাথা, আমরা হারিয়ে ফেলি বিদেশিদের কাছ থেকে পাওয়ার আগেই সেই শ্রদ্ধাবোধ। অনেকটা সে সময় থেকেই শুরু হয় ইউরোপের বিভিন্ন দেশে চাকরির খোঁজে আমাদের তরুণদের ক্রমাগত পদচারণ, যার অবশ্যম্ভাবী পরিণতিতে একে একে বন্ধ হয়ে যায় ইউরোপের সব রকম খোলা দুয়ার এবং বিদেশে বাংলাদেশের মূল্যায়নেও লক্ষ করা যায় আমূল পরিবর্তন।

বিদেশিদের চোখে দেখা বাংলাদেশের কয়েকটি পর্যায় গত চার দশকে লক্ষ করা গেছে, যার সব কটি পার হয়ে এমন এক অবস্থানে আমরা এখন এসে পৌঁছেছি, দেশটির পরিচিতি যখন কিনা আর আগের সেই অনাহার, অপুষ্টি আর প্রাকৃতিক দুর্যোগের কাছে পরাভূত এক দেশ হিসেবে আটকে নেই। হতে পারে বাংলাদেশ এখনো বিদেশি সাহায্যের ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল একটি দেশ। হতে পারে অগ্রযাত্রার তুলনামূলক ধীরগতিতে হতাশায় আবর্তিত আমাদের যুবসমাজ ব্যর্থতার দুষ্টচক্র থেকে বের হয়ে আসার বেপরোয়া প্রচেষ্টায় ঝুঁকি নিয়ে বিশ্বের দূর-দূরান্তে পদচারণ করতেও এখন আর দ্বিধাগ্রস্ত নয়। তবে তার পরও প্রাপ্তি যে আমাদের একেবারে কিছুই নেই, তা তো নয়। বিদেশে বাংলাদেশের মূল্যায়নের বিভিন্ন পর্যায়ের ওপর আলোকপাত করলে বিষয়টি মনে হয় সহজেই পরিষ্কার হয়ে যাওয়ার কথা।

৩.
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলার সময় বাংলাদেশ অনেক বিদেশির চোখেই হয়ে উঠেছিল অনুপ্রেরণার এক উৎস। যে দেশের মানুষ মুক্তির বাসনা মনে ধরে রেখে অনেকটা খালি হাতে শক্তিশালী এক শত্রুকে রুখে দিতে পারে, সেই দেশের মানুষ তো স্বাভাবিকভাবেই অন্যদের শ্রদ্ধা আদায় করে নিতে সক্ষম। বাংলাদেশের মুক্তিকামী অভুক্ত মানুষের প্রতি সে রকম শ্রদ্ধাবোধ থেকেই মুক্তিযুদ্ধ চলতে থাকার পুরো সময় ধরে আমরা লক্ষ করেছি বিদেশিদের সহানুভূতিশীল মনোভাব, যার সূত্র ধরে পণ্ডিত রবিশঙ্করের প্রত্যক্ষ অনুপ্রেরণায় জর্জ হ্যারিসন উদ্যোগী হয়েছিলেন এমন এক মহান দৃষ্টান্ত স্থাপনে, যা কিনা পশ্চিমের পপসংগীত-জগতের তারকাদের পরবর্তী সময়ে বিভিন্নভাবে অনুপ্রাণিত করেছে অসহায় মানুষের পাশে এসে দাঁড়িয়ে তাদের অবস্থান থেকে দুর্দশা লাঘবের চেষ্টায় কিছু একটা করে যেতে। ফলে ১৯৭১ সালের আগস্ট মাসে নিউইয়র্কে আয়োজিত ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’ শুধু বাংলাদেশের দুর্দশাকবলিত মানুষের জন্য স্বল্প পরিসরে হলেও কিছু একটা করতে পারার উদ্যোগের মধ্যেই সীমিত থাকেনি, একই সঙ্গে তা চালু করে দেয় এমন এক নতুন ধারা, যা কিনা সংগীতজগতের তারকাদের আজও অসহায় মানুষের সেবায় নিয়োজিত হতে উদ্বুদ্ধ করছে।

ফরাসি বুদ্ধিজীবী আন্দ্রে মারলো আমাদের মুক্তিযুদ্ধ চলার সময় শুধু বাংলাদেশের পক্ষে বক্তব্য দিয়েই বসে থাকেননি, সেই সঙ্গে এমনও বলেছিলেন যে নিজ উদ্যোগে ট্যাংক সংগ্রহ করে বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধাদের কাতারে শামিল হয়ে তিনি যুদ্ধে যোগ দেবেন। ফরাসি বুদ্ধিজীবীর সেই ঘোষণায় অনুপ্রাণিত হয়ে তাঁকে বাংলাদেশের মাটিতে যুদ্ধ করতে দেখার বাসনা নিয়ে সেদিনের তরুণ এক জাপানি ফটোসাংবাদিক ক্যামেরা হাতে নিয়ে ছুটে এসেছিলেন কলকাতায়। মারলোর অবশ্য বাংলাদেশে ট্যাংক নিয়ে আসা হয়নি। তবে নাওয়াকি উসুই কলকাতায় অবস্থান করে যুদ্ধের শেষ পর্যায়ে প্রবেশ করেছিলেন বাংলাদেশে এবং মমতাভরা চোখ দিয়ে দেখা পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে ফেলা এক জাতির বিজয়ের ঊষালগ্নের অনেক ছবি তিনি ধরে রেখেছিলেন তাঁর ক্যামেরায়। সেসব ছবিও তো হচ্ছে জাপানি সেই সাংবাদিকের ভালোবাসার চোখ দিয়ে দেখা বাংলাদেশের প্রতিফলন। সেদিনের সেই অনুপ্রেরণা জুগিয়ে যাওয়া বাংলাদেশের এ রকম দৃষ্টান্ত সারা বিশ্বেই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে, যার কিছুটা আমরা জানতে পেরেছি এবং অনেকটাই হারিয়ে গেছে দেশ শত্রুমুক্ত হওয়ার পরবর্তী পর্যায়ে অন্ধকার পথে আমাদের ধাবিত হওয়ার সময় থেকে।

অনেকেই আজকাল এ রকম যুক্তি দাঁড় করিয়ে তৃপ্তির অনুভূতি লাভের চেষ্টা করেন যে স্বাধীন গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ সম্পর্কে দেশের বাইরে লোকজনের ধারণার রদবদলের সূচনা স্বাধীনতা-উত্তর সময়ের খাদ্যঘাটতি দেখা দেওয়া থেকে। তবে বিদেশে কিন্তু খাদ্যঘাটতি ও আকালের সেই সময়কে যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশের স্বাভাবিক পরিণতি হিসেবেই অনেকাংশে গণ্য করা হয়। পাকিস্তানের বিধ্বংসী তৎপরতার কারণে স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের অর্থনীতি যে ভেঙে পড়ার মুখে এসে দাঁড়িয়েছিল, সেই বাস্তবতা সম্পর্কে বিদেশে অনেকেই ছিলেন অবগত। ফলে হেনরি কিসিঞ্জারের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত উদ্ধত মন্তব্য যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে খুব একটা জায়গা করে নিতে পারেনি। নেতিবাচক মূল্যায়নের সূচনা তাই বলা যায় পঁচাত্তরের রক্তপাতের পর থেকে, হানাহানি আর সামরিক নেতৃত্বের ক্ষমতা দখলের পালা এরপর প্রায় দেড় দশক ধরে অব্যাহত থাকার ফলে বাংলাদেশ বিদেশিদের চোখে অনেকটাই হয়ে উঠেছিল হাস্যকর এক দেশ। তবে প্রশ্ন হচ্ছে, প্রায় দুই দশক ধরে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা চালু থাকার মুখে বাংলাদেশ পেরেছে কি আগের সেই নেতিবাচক মূল্যায়নের চক্র থেকে বের হয়ে আসতে? প্রশ্নের সহজ উত্তর খুঁজে না পাওয়া গেলেও ধারণা করা যায় যে বাংলাদেশের নাম শুনে ভ্রু কুঁচকে ওঠার মতো অবস্থা এখন আর তৈরি না হওয়ায় আমরা হয়তো সেই দুষ্টচক্র থেকে বের হয়ে আসার পর্যায়ে রয়েছি। আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাও কিন্তু সে কথাই বলে।

জাপানের বিদেশি সাংবাদিকদের ক্লাব হচ্ছে এশিয়ার বৃহত্তম বিদেশি প্রেসক্লাব এবং বিশ্বের অন্যতম সম্মানজনক একটি সাংবাদিকতা-সংশ্লিষ্ট সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান। গত বছর ক্লাবের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে আমাকে যখন বিভিন্ন দেশের কিছু সাংবাদিক প্রার্থী হওয়ার অনুরোধ করেছিলেন, আমি তখন তাঁদের বলেছিলাম যে আমার পরিচিতি হয়তো আমার জন্য মস্ত বড় বাধা হয়ে দেখা দিতে পারে। আমার সেই বক্তব্য শুনে সবাই প্রায় সমস্বরে বলেছিলেন, যে দেশের প্রতিনিধিত্ব আমি করছি, সেই দেশটি এখনো দরিদ্র অবস্থানে থেকে গেলেও ইতিবাচক অনেক কিছু সেখানে ঘটে চলায় আগের সেই ঢালাও মূল্যায়ন এখন আর কার্যকর নয়। ভোটের ফলাফলে আমি যখন প্রতিদ্বন্দ্বী মার্কিন সাংবাদিকের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ সমর্থন লাভের বাস্তবতা সম্পর্কে অবহিত হই, তখন থেকেই সন্দেহমুক্ত হতে আমাকে আর দ্বিধায় ভুগতে হয়নি। ক্লাবের পয়ষট্টি বছরের ইতিহাসে আমি হলাম যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ আর জাপানের বাইরের কোনো দেশ থেকে সভাপতি নির্বাচিত হওয়া দ্বিতীয় সাংবাদিক। বাংলাদেশের দৈনিক প্রথম আলোর প্রতিনিধি হিসেবেই নির্বাচনে আমি প্রার্থী হয়েছিলাম এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলাম বিশ্বজুড়ে ধনীদের সাময়িকী হিসেবে পরিচিত ফোরবস ম্যাগাজিনের প্রতিনিধির বিরুদ্ধে। ফলে বলা যায়, বাংলাদেশের পরিচিতি নিয়ে সংশয়ে ভোগার দিন এখন গত হয়েছে। তবে প্রশ্ন হলো, ইতিবাচক পথে মোড় নিতে শুরু করা পরিচিতির এই অবস্থানকে আরও সামনে এগিয়ে নিয়ে যেতে হলে আমাদের কী করা দরকার?

৪.
শুরুতেই বলতে হয়, গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রার পথ থেকে বিচ্যুত না হয়ে নানা রকম ত্রুটি সত্ত্বেও এটাকে ধরে রাখার অন্য কোনো বিকল্প যে আর নেই, অতীতের শিক্ষা থেকেই তা আমাদের জেনে নেওয়া উচিত। সামরিক একনায়কতন্ত্র দেশের পরিচিতি কতটা হাস্যকর করে তুলতে সক্ষম, আমাদের একসময়ের শাসক রাষ্ট্র পাকিস্তানে সমরনায়ক জিয়াউল হক কিন্তু সেই দৃষ্টান্ত খুবই দক্ষতার সঙ্গে বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরেছেন। পাকিস্তানের এখনকার বিতিকিচ্ছিরি পরিণতির জন্য যে উদ্ভট সেই সামরিক শাসন দায়ী, খোদ পাকিস্তানেও এখন অনেকেই তা মনে করেন। আমাদের এক সমরনায়কও জিয়াউল হকের দেখিয়ে দেওয়া পথ ধরে একসময় হাঁটতে শুরু করেছিলেন। আমরা অবশ্য ভাগ্যবান যে গণ-অভ্যুত্থানে সেই খলনায়কের পতন পাকিস্তানের মতো ভয়ংকর এক পরিণতির আশঙ্কা থেকে আমাদের উদ্ধার করেছে। তবে তা সত্ত্বেও আত্মতৃপ্তির সুযোগ যে মোটেও নেই, গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার ত্রুটি আর সেই সুযোগ গ্রহণ করে মুখের কথার গণতন্ত্রীদের কার্যত সমরনায়কদের দেখিয়ে দেওয়া পথ ধরে হেঁটে যাওয়া সেই প্রমাণ আমাদের সামনে তুলে ধরে, যার পরিণতিতে আমরা দেখি, জনগণের ভোটে নির্বাচিত সাংসদদের সংবাদমাধ্যমের ওপর চড়াও হতে।

অগ্রসর গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সংবাদমাধ্যমকে দেখা হয় গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থাকে কার্যকর করে তোলার সবচেয়ে জুতসই হাতিয়ার হিসেবে। শাসকগোষ্ঠীর ভুলত্রুটি ধরিয়ে দিয়ে সেই ভুল সংশোধন করে নেওয়ায় তাদের অনুপ্রাণিত করার মধ্যে অন্যায় কিছু নেই। বরং উল্টোভাবে তা হচ্ছে রাজনীতিকে সক্রিয় আর জবাবদিহিমূলক অবস্থানে ধরে রাখার উপকারী এক মাধ্যম। আমাদের রাজনীতিবিদেরা এই বাস্তবতা যত দিন পর্যন্ত না উপলব্ধি করতে পারবেন, গণতন্ত্রের সাবালক হয়ে ওঠা নিয়ে দেখা দেওয়া সন্দেহ তত দিন পর্যন্ত থেকেই যাবে।

টোকিও থেকে
মনজুরুল হক: জাপান প্রবাসী সাংবাদিক

[ad#co-1]