‘সুশাসন ছাড়া গণতন্ত্র চলে না’ -ড. মিজানুর রহমান শেলী

ড. মিজানুর রহমান শেলী। বাংলাদেশের অন্যতম সৃজনশীল চিন্তাবিদ, গবেষক, নেতৃস্থানীয় সমাজকর্মী ও সাহিত্যিক। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন স্বতন্ত্র, বেসরকারি গবেষণা ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর ডেভেলপমেন্ট রিসার্চ বাংলাদেশ-এর প্রতিষ্ঠাতা-সভাপতি এবং বর্তমানে এশিয়ান এ্যাফেয়ার্স-এর সম্পাদক পদে দায়িত্বরত আছেন। সাপ্তাহিকের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি কথা বলেছেন দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, প্রশাসনের ওপর সরকারের প্রভাব বিস্তার, দলীয়করণ, যুদ্ধাপরাধের বিচার, বিরোধী দলের আন্দোলনসহ সম্প্রতি উত্থাপন করা বিদুৎ বিষয়ক আইন প্রসঙ্গে। সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছেন বাহরাম খান, ছবি তুলেছেন মাহ্মুদা তুলি

সাপ্তাহিক : প্রশাসনের বর্তমান যে অবস্থা অর্থাৎ পাবনার বিষয়টি এবং সরকারের যে পদক্ষেপ এটা ভবিষ্যতে কী প্রভাব ফেলতে পারে?
ড. মিজানুর রহমান শেলী : প্রশাসন একটি চলমান প্রক্রিয়া। এবং এটা কোনো বিশেষ কাল বা বিশেষ যুগ বা বিশেষ দেশের সঙ্গে যেমন সম্পৃক্ত তেমনি এর একটা সার্বিক ধারাবাহিকতা আছে যেটা বিশ্বজনীন বলা চলে। বাংলাদেশের প্রশাসনও এক দিনের সৃষ্টি নয়। এর পেছনে এক ইতিহাস আছে, বিরাট ঐতিহ্য আছে এবং বহু শতাব্দী ধরে এই প্রশাসনিক কাঠামোটা এই অঞ্চলে গড়ে উঠেছে। সেই প্রাচীন আমল থেকে হিন্দু বৌদ্ধ পরবর্তীকালে মুসলিম শাসনামলে তুর্ক, আফগান এবং মুঘল এবং সর্বশেষ ব্রিটিশ আমলে যেসব ধারা উপধারা এর ওপরেই বর্তমান প্রশাসন গড়ে উঠেছে। সুতরাং এই প্রশাসনকে যদি সেই ধারাবাহিকতায় অক্ষুণœ রাখা না যায় তাহলে সমাজে-দেশে নানা ধরনের অস্থিতিশীলতা এবং শৃঙ্খলাহীনতা দেখা দিতে পারে। গণতন্ত্রের যুগে বলা হয় সুশাসন ছাড়া গণতন্ত্র চলে না। সুশাসনের একটি মূল এবং অবশ্য পালনীয় শর্ত হলো একটি মজবুত প্রশাসন। যে প্রশাসন সরকারের দলীয় সরকারের অধীনে থেকেও নিরপেক্ষ, নৈর্ব্যত্তিক ও সুশৃঙ্খল থাকে। এখন আমাদের দেশে গণতন্ত্রের ফলে নির্বাচনের ফলে, নির্বাচনে যে দল জয়লাভ করে সেই দলই সরকার গঠন করে। কিন্তু এ দল সরকার যদি দলবাজির সরকারে পরিণত হয় তাহলে দেশের জন্য যেমন ক্ষতিকর, জাতির জন্য তো বটেই। দলের জন্যও ক্ষতিকর হয়। সেজন্যই বলা হয় প্রশাসন নির্ভর দল অথবা দল নির্ভর প্রশাসন কোনোটাই যুক্তিযুক্ত নয়। কোনোটাতেই সমাজের মঙ্গল আসে না।

পাবনার ঘটনায় যেটি দেখা গেছে সেটি হলো এই দলের সঙ্গে প্রশাসনের একটি সাংঘর্ষিক বিবদমান সংঘাতময় অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। এর ফলে অবশ্য সরকার একটু দেরিতে হলেও তার অবস্থান নিয়েছে। পদক্ষেপ দিয়েছে, ক্ষমতাসীন দলের অঙ্গসংগঠনের যারা হামলা চালিয়েছে বলে আমরা খবর পেয়েছি, দেখেছি, শুনেছি। তাদেরকে আবার কারাগারে নেয়া হয়েছে। জামিন পেয়েছেন আবার বলছেন যে জামিন নাও হতে পারে। সেটা বড় কথা নয়। অন্যদিকে আবার প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা প্রশাসনের উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা এবং একজন সংশ্লিষ্ট প্রতিমন্ত্রী যিনি নাকি এ এলাকারই তিনি অবশ্য তড়িঘড়ি করে ডেপুটি কমিশনারকে বদলি করে দিলেন। এ বদলিতে হয়ত তাদেরও দুর্বলতা থাকতে পারে। তবে প্রশাসনের নিয়মানুসারে সঙ্গে সঙ্গে না করে তাহলে সম্ভবত প্রশাসনের উদ্যমের জন্য অবস্থানের জন্য এটা ভালো হতো।

এখান যেটা হয়েছে যতই বলা হোক যে এটা একটা রুটিনমাফিক ঘটনা। বদলি তো হতেই পারে, কিন্তু ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সঙ্গে সঙ্গে বদলি করাতে প্রশাসনের ওপর একটা নেতিবাচক প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা আছে বলে আমি মনে করি।

সাপ্তাহিক : দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ ও পদায়ন করা হচ্ছে। এ বিষয়টিকে আপনি কিভাবে দেখছেন?
শেলী : নিয়োগ পদায়নের যে সুশৃঙ্খল ব্যবস্থা এগুলো হয় মেধা, যোগ্যতা আর জ্যেষ্ঠতার ফলে। এখন আমরা দলীয়করণের যে রাজনীতি কয়েক দশক ধরে দেখে আসছি, ১৯৯০-৯১ সালের পরে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনরুজ্জীবনের পর থেকে আমরা দেখে আসছি। আমাদের মাননীয় সাবেক প্রধান উপদেষ্টা বিচারপতি হাবিবুর রহমান বলেছেন দলীয়করণের এই প্রবণতা প্রশাসনকে দুর্বল করে। যে উত্তরাধিকার ছিল সেটা সফল মজবুত প্রশাসনের। যেখানে নিয়োগ লাভ দল বা ব্যক্তিবিশেষের মর্জি অনুসারে নয়। উন্মুক্ত প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে যার যার মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে কারো সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বা আত্মীয়তার সম্পর্কে গৃহীত না হয়েও চাকরিতে নিয়োগ হয়েছে। এ যে বিধিবদ্ধ ব্যবস্থা তাকে যদি পাশ কাটানো হয়, তাহলে প্রশাসনিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার, দুর্বল হয়ে পড়ার, নিস্তেজ হয়ে পড়ার প্রবণতা প্রবল হয়।

সাপ্তাহিক : যুদ্ধাপরাধী ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার, বিরোধী দলের অবস্থান এবং সরকারের যে কার্যক্রম এটা ভবিষ্যতের রাজনীতিতে কি প্রভাব ফেলবে?
শেলী : যুদ্ধাপরাধের বিচার তো অবশ্যই হওয়া উচিত। আজ এটা সর্বজনস্বীকৃত। আমরা দেখেছি যে মহাযুদ্ধের বহু যুগ পরে ইসরাইল সেই হেরম্যানকে দক্ষিণ আমেরিকা থেকে ধরে এনে বৃদ্ধ বয়সে তার বিচার করে তাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিল। আর তা হাল আমলেও আমরা দেখছি সার্বিয়া ও যুগোস্লাভিয়াতে যেসব যুদ্ধাপরাধী বড় বড় নেতা ছিলেন তাদেরও বিচার হয়েছে।

বিচারাধীন অবস্থায় মিলোনবিস মারা গেছেন। আবার এখনো বিচার চলছে এটা তো হতেই পারে। হওয়া উচিত। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে যে বিচারটা যেহেতু এটাকে আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল বলা হচ্ছে আন্তর্জাতিক মানের উৎকর্ষ তাতে থাকতে হবে। বুঝতে হবে এটা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কিনা। রাজনৈতিক বিদ্বেষপ্রসূত কিনা যে যুদ্ধাপরাধের সঙ্গে জড়িত ছিলেন না তাকেও যদি এর আওতায় আনা হয় তখনই নানা ধরনের বিভ্রান্তি ঘটে। এই বিভ্রান্তির ফলে বিরোধী যারা রয়েছেন যারা যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চান না তারাও এ সুযোগে মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারেন। নানা ধরনের সুযোগ সন্ধান করে এটাকে একটা ব্যর্থতার দিকে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ সন্ধান করতে পারে। সেখানে সরকারকে সতর্ক থাকতে হবে। এ ব্যাপারে কোনো রকম বিদ্বেষ, কোনো রকমের দুর্বলতার ভান নেয়া তাদের জন্য ঠিক হবে না।

সরকারের পক্ষে আজ এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যে আজ যেটা নিয়ে কথা হচ্ছে এর সাক্ষ্য-প্রমাণ অত্যন্ত গুরুত্বপূণ, সাক্ষ্য-প্রমাণ অত্যন্ত শক্ত হাতে এগুলোকে জোগাড় করতে হবে। বিচার করতে হবে। সারা দুনিয়ার কাছে যেন গ্রহণযোগ্য হয়। সেটা যদি ঠিকমতো না হয়, বিরোধী দল যেমন বলছে, যদি বিদ্বেষপ্রণোদিত হয় তবে কিন্তু হবে না। বিরোধী দলের কিছু নেতা-কর্মীর নাম উঠছে, এটা নিয়ে তারা অবশ্যই উদ্বিগ্ন। সে জন্যই তারা বলছেন এর ফলে বিভাজন সৃষ্টি হবে। রাজনৈতিক দলের বিভাজন আমরা দেখছি। মানে বর্তমানের এই যে জাতীয় বিভাজন। আমরা বিভিন্ন পেশা ও সমাজের মধ্যে আমরা দেখছি মেরুকরণ হচ্ছে। দুই দলে ভাগ হয়ে যাচ্ছে ডাক্তার প্রশাসন-সাংবাদিক সবাই। সবার মধ্যে ভাগ হয়ে যাচ্ছে।

প্রধান বিরোধী দল যেহেতু বিচারের সরাসরি বিরোধিতা না করে স্বচ্ছতা চায়, নৈতিকভাবে তারা বলেননি যে তারা বিরোধী, তারা বলছেন এটা যেন ভালোভাবে হয়।

এখানে সমঝোতা আমি বলব না, একটা ঐকমত্যের ভিত্তি রচনা করতে হবে। ঐকমত্য তো আছে। নীতিগতভাবে এটাকে যদি একটা প্রায়োরিটির দিকে আনা যায় তাহলে এই বিচারটাকে সুষ্ঠুভাবে, স্বাচ্ছন্দ্যে মান বজায় রেখে করা সম্ভব। বিরোধী দলের মনে যেন এই ধারণার জন্ম না হয় যে এটা তাদেরকে দমন করার জন্যই করা হচ্ছে।

সাপ্তাহিক : বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিষয় নিয়ে প্রস্তাবিত আইনে দায়মুক্তির কথা বলা হচ্ছে। এ বিষয়ে আপনার মতামত কি?
শেলী : বিদ্যুৎ, জ্বালানি বিষয়ে আইনটি সম্পর্কে প্রাক্তন প্রধান উপদেষ্টা বিচারপতি হাবিবুর রহমান স্পষ্টভাবে বলেছেন যে এ ধরনের আইন সংবিধানের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ সেটা দেখতে হবে। সাধারণত যারা সামরিক আইন পুঁজি করে ক্ষমতায় আসেন তারা এ ধরনের ইনডেমনিটি যাকে নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকার এ ধরনের দায়মুক্তি সংবিধানের সঙ্গে মিল রেখে করতে পারেন কিনা এ প্রশ্ন আজ সাবেক প্রধান বিচারপতি করেছেন। আমরা নই। তবু মনে হয় এ ব্যাপারে সরকারের যে অন্তরিকতা, এই বিশাল সমস্যা নিয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি এবং শক্তি সরবরাহের যে আগ্রহ এটা আমাদের নাগরিকদের ও গুরুত্বপূর্ণ চাহিদা। সেটা মিটানোর জন্যই সরকার পদক্ষেপ নিচ্ছে। কিন্তু এখানে যদি সন্দেহের অবকাশ থাকে, সংশয়ের অবকাশ থাকে? যেমন বিরোধী দলের অনেক নেতা উচ্চকণ্ঠে বলছেন এটা আসলে যত না বিদ্যুৎ, জ্বালানি সরবরাহের জন্য, তার চেয়ে বেশি হলো এ সুযোগ সম্পদ কুক্ষিগত করতে পারেন তাদের আপন লোকেরা বা দলের লোকেরা, এটা ঘটছে। এখানে কিছুটা যৌক্তিক হবে। এখানে যে সরকারের আন্তরিকতাটাকে সন্দেহ করা হচ্ছে। যদি ঠিকমতো যুক্তিযুক্ত একটা সময়ের মধ্যে ভালো ফলাফল পাওয়া যায় তাহলে কিন্তু এই সন্দেহ-সংশয় থাকবে না।

অন্যদিকে যদি দেখা যায় দায়মুক্তও হলো ঠিক সময়মতো বিদ্যুতটাও এলো না, তখন কিন্তু মানুষের মনে সন্দেহটা দৃঢ় হবে। তখন কিন্তু দায়মুক্তিটা বিশাল দায় হয়ে দাঁড়াতে পারে। সরকারের জন্যও, সরকারের সঙ্গে যারা কাজ করবে তাদের জন্যও।

সাপ্তাহিক : নির্বাচন কমিশন ও সরকারের মাঝে চাঁদপুরের আসন শূন্য ঘোষণা নিয়ে যে সমস্যার সৃষ্টি হলোÑ এ বিষয়ে আপনি কি মনে করেন?
শেলী : এটা একটা অত্যন্ত জটিল অবস্থা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ নির্বাচন কমিশন আইনগত দিক থেকে সেই অবস্থায় মাননীয় সাংসদের যে আসন বাতিল ঘোষণা করেছেন তখন কিন্তু তারা তাকে নির্বাচনে দাঁড়ানোর অযোগ্য ঘোষণা করেছিলেন। কারণ সেই সময় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে দ্রুত বিচার বা ট্রাইব্যুনালে ওই প্রার্থী জড়িত ছিলেন বলে কমিশন বলল আমরা এ প্রার্থিতাকে অনুমোদন করতে পারি না। কিন্তু প্রার্থী যখন আদালতে গেল তখন চেম্বার জজ নির্বাচন হয়ে গেল, উনি নির্বাচিত হয়ে গেলেন। নির্বাচনের পরে যখন আবার এটি উচ্চতর আদালতে আপিলে গেল তখন তারা বললেন যে না ওটাই ঠিক ছিল। গৃহীত হলো না। ইতোমধ্যে কিন্তু আবার ঘটনা প্রবাহের ফলে দেখা গেছে ঐ যে বিশেষ ট্রাইব্যুনালে বিচারের যে দণ্ড ওটা উচ্চ আদালতে মাপ করে দেয়া হয়েছে। এটাই সমস্যা। নির্বাচন কমিশন এখন বলতে পারে আমরা সেই সময়ে যেটা করেছিলাম তা তখনকার সময়ের জন্য ঠিক ছিল। পরে কি হয়েছে এটা বিচার্য ছিল না। উচ্চ বিচারালয় রায় বহাল রেখেছে সুতরাং সাংসদের পদ বহাল থাকে না।

এখন প্রশ্ন উঠছে এটা নির্বাচন কমিশন করতে পারে কিনা। তাদের যাওয়া উচিত ছিল স্পিকারের কাছে। এটা হয়নি। আবার তা বিচারালয়ে গেছে। যেহেতু এটা বিচারাধীন ব্যাপার, তাই আমাদের দ্বারা মন্তব্য করা সম্ভবও নয়, যুক্তিযুক্তও নয়। দেখা যাক ভবিষ্যতে গিয়ে কি দাঁড়ায়।

সাপ্তাহিক : ধর্মভিত্তিক দল নিষিদ্ধকরণের বিষয়টি ও তো নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে জড়িত।
শেলী : মন্ত্রী মহোদয় বলেছেন এটা নির্বাচন কমিশন করতে পারে। নির্বাচন কমিশন বলেছে এটা সরকারের নীতি এটা দেখে নিতে হবে। ইতোমধ্যে পঞ্চম সংশোধনী বাতিল উচ্চতর আদলত বহাল রেখেছে। এখন যেটা হচ্ছে নবনিযুক্ত প্রধান বিচারপতি বলেছেন যিনি পঞ্চম সংশোধনীর রায়টাও দিয়েছিলেন হাইকোর্টের বিচারক হিসেবে, এটা পুনর্মুদ্রণ করে নিলেই হয় পঞ্চম সংশোধনী বাদে।

পঞ্চম সংশোধনী বাদে যদি সংবিধান পুনর্মুদ্রিত হয় তাহলে সেখানে তো ধর্মভিত্তিক দল নিষিদ্ধ রয়েছেই। তাহলে আর কিছু বলার দরকার পড়ে না, নিষিদ্ধ করার প্রয়োজন পড়ে না।

সেই জন্যই নির্বাচন কমিশনের সদস্যরা রাষ্ট্রপতির সঙ্গে দেখা করে বলেছেন আমাদের ওই পুনর্মুদ্রিত সংবিধানটা দরকার। কিন্তু পুনর্মুদ্রিত সংবিধান এখনো আসেনি বলে আমরা কি করে বুঝব সংবিধান কোনটা। বাদ দিয়ে যেটা থাকবে সেটাই তো সংবিধান। সরকার যদি সংবিধান নিষিদ্ধ ঘোষণা করে তাহলে পরে নির্বাচন কমিশনের পক্ষে তাকে বিদ্ধ করার কোনো উপায় থাকে না।

সাপ্তাহিক : সংবিধান সংশোধনী বিষয়টি একটি জটিল আকার ধারণ করেছে। বিষয়টি সম্পর্কে কিছু বলুন।
শেলী : অনেকেই বলছেন এতে সংসদের ভূমিকা আছে। সরকার আবার সুরঞ্জিত সেনগুপ্তকে দিয়ে কমিটিও গঠন করে দিয়েছে। কাজ করছে তারা। আসলে ঘটনাটা এভাবে দেখা যায় আমি মনে করি যে রায় তো অক্ষুণœ রাখতেই হবে। মানতেও হবে। কিন্তু এটার সঙ্গে অনেক কিছু মেলানোর ব্যাপার আছে। এটা সংবিধানের অন্যান্য ধারা-উপধারাগুলোর সঙ্গে সংযোগ করলে কি দাঁড়ায় এই বিষয়গুলো সংসদেই করতে হবে। কারণ আসলে পরিমার্জন করার ভার আইনগতভাবে যে কোনো দেশের আইন বিভাগের ওপর তথা জাতীয় সংসদের ওপর ন্যস্ত। এ কাজটি তাদেরকেই করতে হবে। এ যে ’৭২-এর সংবিধানে ফিরে যাওয়ার কথা বলা হচ্ছে এখানে কিছু রাজনৈতিক প্রশ্নও আছে।

রাজনৈতিকভাবে কতগুলো স্পর্শকাতর ব্যাপার আছে। ধর্মভিত্তিক দল শুধু নয়, ধর্মের উল্লেখ কোন কোন জায়গায় রয়েছে, ধর্মীয় অনুশাসনের কথা বলা হয়েছে। এগুলোকে যদিও আদালতের রায় অনুযায়ী বাদ দেয়া হয়েছে বলা যায় তার পরেও যে দল ক্ষমতায় থাকে তার ওপর একটা দায়িত্ব থাকে। কারণ নির্বাচকমণ্ডলী রয়েছে তাদেরকে ভোটারদের মুখোমুখি দাঁড়াতে হবে।

যেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ ইসলাম ধর্মানুসারী সেখানে স্পর্শকাতর বিষয়টাকে তারা কিভাবে মেলাবেন এটা কিন্তু যারা ক্ষমতায় আছে তাদের সামনে বিরাট চ্যালেঞ্জ বলেই আমি মনে করি। এই চ্যালেঞ্জকে তারা মোকাবিলা করার মাধ্যমেই তাদের দক্ষতা যোগ্যতা এবং তাদের জনমুখিতার পরিচয় দিতে পারে। খুব সহজ ব্যাপার হবে না। তবে দক্ষ রাজনৈতিক নেতৃত্ব সফলভাবে মোকাবিলা করতে পারবেন বলে আমরা বিশ্বাস করি। অতীতেও আমরা দেখেছি, ভবিষ্যতেও তা সম্ভব হবে।

সাপ্তাহিক : যদি ভোটের রাজনীতির দিকে হিসাব না করে একটা বুনিয়াদি সিদ্ধান্ত নিতে গেলে তখন এটা কোন দৃষ্টিতে দেয়া উচিত।
শেলী : একটি বিখ্যাত কথা আছে ঞযব ঢ়ড়ষরঃরপরধহ রং ড়হব যিড় ঃযরহশং ঃযব হবীঃ বষবপঃরড়হ ঃযব ংঃধঃবংসধহ রং ড়হব যিড় ঃযরহশং হবীঃ মবহবৎধঃরড়হ. এ কথাই আপনার প্রশ্নের মধ্যে রয়েছে। দূর ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করলে শিশুদেরতরুণের প্রজন্মের কথা চিন্তা করলে এ রকম আর ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য কি করব? সেটা নির্ভর করে রাজনৈতিক বিচক্ষণতার ওপর। আদর্শিক ত্যাগ যদি এমন কেউ শিকার করতে রাজি থাকেন যে আমি না হয় নির্বাচনে হেরে যাব, কিন্তু ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সুন্দর সুরক্ষিত বাসভূমি রেখে যাব সেটা অন্য রকম ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়।

এর মধ্যে হয়ত সংঘর্ষ এতটা নেই। এটা এরই মধ্যে এ দণ্ডের নিরসন হতে পারে। কেমন করে হবে সেটা আমার জানা নেই। জানা থাকলে তো বলেই দিতাম বলে দেয়াও হয়ত ঠিক হবে না। কারণ এটা একেবারে সহজ-সরল নয়। এটা একটা রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ। আমি মনে করি জাতীয় ঐকমত্যের একটা বিরাট সুযোগ রয়েছে।

সাপ্তাহিক : আইন আদালতের রায় এবং সংসদের মাধ্যমে করা যায়। এখন ২টি যদি ধরে নেয়া হয়। যদি বিশেষ কমিটি আদালতের রায় মেনে নেয়া হয় এবং সংসদে সংশোধনী করা যায় তাহলে?
শেলী : এ কথাটিই কিছুদিন আগে বেতারের একটি অনুষ্ঠানে বলেছিলাম যে, সংশোধনের যে দায়িত্ব অধিকার, পুনর্লিখনের যে অধিকার এটা তো সংসদের কাজ। এটা মেনে নিয়ে তার পরে যদি করেন, যদি আবার আদালতে যাওয়া যায় তবে আলাদা বিষয়। আর বিচারালয় যেটা করেন সেটা হলো সংবিধানের আলোকে তারা বিভিন্ন আইনের ব্যাখ্যা দেয়। এবং সেই সূত্রে নতুন আইন তৈরি হতে পারে। ঔঁফমব সধফব ষধি বলা হয়ে থাকে। সেটার তো অবকাশ আছেই। কিন্তু অত্যন্ত মৌলিক ব্যাপারে আমরা আজ সমস্যার সম্মুখীন হয়েছি, সেটার পথ বের করাই আজকের প্রয়োজন, আজকের চাহিদা।

সাপ্তাহিক : বর্তমান বোরখা নিয়ে আদালতের যে বক্তব্য, এ বক্তব্য অনেক সময় তো বিরোধ সৃষ্টি করতে পারে।
শেলী : কোনো কোনো সময় সাধারণ মানুষ বা সংক্ষুব্ধ গোষ্ঠীর অধিকার আদায়ের জন্য আদালতে যান। অন্যান্য দেশেও এমনটি হয়, আমাদের দেশেও এমনটি হচ্ছে, হয়ত একটু তৎপর হয়েছেন বেশি। তবে যতক্ষণ পর্যন্ত নিজের আওতার মধ্যে থেকে আদালত পারে করে। তবে আদালত তো নিজে করতে পারে না।

এখন বলা হচ্ছে নদীর ধারের অবৈধ স্থাপনা ভেঙে ফেলতে হবে। ভাঙার কাজটা কিন্তু নির্বাহী বিভাগের। তারা ব্যর্থ হলে আদালত বার বার বলতে পারে। না মানলে আদালত সময় বাড়াতে পারে। বাস্তবতার সঙ্গে তাদেরকে তাল মিলিয়ে চলতে হয়। বোরখা পরা বা ধর্মীয় পোশাক পরার বাধ্যবাধকতার বিষয়ে যেটা বলেছেন সেটা কিন্তু মূলত অন্যায় দেখার কোনো অবকাশ নেই। কারণ এমন তো বলেননি যে, এটা পরা যাবে না কিন্তু যার ইচ্ছা নাই তার ওপর জোর করে চাপানো যাবে না। যার ইচ্ছা পরবে। যার ইচ্ছা নয় তার ওপর জোর করে পরানো যাবে না। এটা তো আমাদের ধর্ম কেন, কোনো ধর্মেই নেই। ধর্মীয় ব্যাপারে জবরদস্তি চলে না, ইসলামে বলাই আছে। নিজের ইচ্ছেমতো শালীন পোশাক পরবে। জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে। যার দরকার নাই তার দরকার নাই। তবে প্রচারণা অন্যভাবে হতে পারে। যে উনারা বলেছেন ধর্মীয় পোশাক পরা যাবে না। এটা তো সরকারের জন্য সমাজের জন্য লজ্জাকর। এটা বার বার না বলে সরকারের বলা উচিত যে তারা এটা বলেনি।

সাপ্তাহিক : আফগানিস্তানে সৈন্য পাঠানোর ব্যাপারটাকে আপনি কিভাবে দেখছেন?
শেলী : এ বিষয়ে আমি সেদিনই এক সাক্ষাৎকারে বলেছি। আমাদের মতো দেশের আফগানিস্তানে সৈন্য পাঠানোর কোনো অবকাশ, কোনো সুযোগ, কোনো যুক্তিযুক্ততা থাকতে পারে না। কারণ আফগানিস্তানে অন্য কোনো মুসলিম দেশের সৈন্য নেই একমাত্র তুরস্ক ছাড়া। তুরস্ক আবার ন্যাটোর সদস্য, আমরা ন্যাটোভুক্ত নই। তাছাড়া এখন সরকার বলেই দিয়েছে কোনো প্রশ্নই আসে না। অনেকেই বলেছেন কোনো অনুরোধই আসেনি। তাহলে খবর কিভাবে হলো জানি না।

আমরা তো ১০০০ মাইল দূরে, এত আগ বাড়িয়ে যাওয়ার দরকার কী। জাতিসংঘ যদি বলে শান্তি রক্ষার জন্য তাহলে হয়ত ঐ ধরনের জোটের অন্তর্ভুক্ত হলে ভাবা যেতে পারে। আমাদের এমনি অনেক সমস্যা আছে আর কোনো সমস্যা বাড়ানোর অবকাশ নেই।

সাপ্তাহিক : বিডিআর বিদ্রোহের বিচারের বিষয়ে আপনার মূল্যায়ন কী?
শেলী : এখানে একটি অদ্ভুত অবস্থা বিডিআরের যে আইনটা তাদের ছিল। যেমন বিদ্রোহ করলে ৫০০ টাকা জরিমানা বড় জোর ৭ (সাত) বছরের জেল হতে পারে। এখন যে নতুন আইন হচ্ছে তা অতীত থেকে প্রয়োগ করা যাবে না। আসামিদেরকে আবার ফৌজদারি আদালতে পাঠানো হচ্ছে। ভূতাপেক্ষ প্রয়োগ এটা যে কোনো আইনের বিরোধী। যদিও ন্যাচারাল জাস্টিজের বিরোধী। সরকার তাই এ পথেই যেতে হচ্ছে। খুন-জখম-নারী নির্যাতনের যে বিচার তা এখন ফৌজদারি আদালতে হচ্ছে কিন্তু বিডিআর আইনে তা করার কোনো সুযোগ ছিল না।
প্রথমে বলা হয়েছিল সেটাকে আর্মি এ্যাক্টে করা যায় কিনা। সেটা হয়ত সম্ভব হয়নি। বিচার প্রক্রিয়ায় শেষ পর্যন্ত কি দাঁড়ায় এটা দেখতে হবে। তবে বলা যায় যথাযথ বিচার না করে যথাযোগ্য শান্তি দিতে না পারলে এর যে সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়বে।

এ ব্যাপারে যারা তদন্ত করছে তাদের অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে যতেœর সঙ্গে মনোযোগের সঙ্গে এ কাজটা করতে হবে। এখানেই কিন্তু শুভংকরের ফাঁকি থেকে যায়। অপরাধ করার পরেও তদন্তের কারণে চার্জশিটের কারণে শাস্তি না হওয়া এটা যেন না হয়।

সাপ্তাহিক : দ্রব্যমূল্য, যানজট, সন্ত্রাস এগুলো সম্পর্কে জনগণের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। এগুলোর ব্যাপারে সরকার কিভাবে পদক্ষেপ নিতে পারে?
শেলী : প্রশাসনের মধ্যে একটা দুর্বলতা আমরা লক্ষ্য করেছি। যাদের মাধ্যমে এ সমস্ত সমস্যার সমাধান আসতে পারে তারা হলেন এই সমস্ত প্রশাসনিক যন্ত্র। বিদ্যুৎ-যানজট নিরসন করা এগুলো সবই প্রশাসনিক যন্ত্রের মাধ্যমে করতে হয়। দুর্বলতার আরেকটি দিক হলো যদি রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যে যদি দুর্বলতা, অক্ষমতা থাকে ঐ প্রশাসনের মধ্যে যারা নাকি তদারকি করে, তাহলেই সিদ্ধান্তহীনতা কাজ করে, নিষ্ক্রিয়তা থাকে, শৈথিল্য থাকে। প্রশাসনে পুরনো কিছু নিয়মকানুন রয়েছে তাই রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যে যদি এগুলোকে দূর করার সক্ষমতা না থাকে তাহলে প্রশাসনে এমনিই তো আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কাজ করে।

উন্নত দেশেও যে এ ব্যবস্থা নেই তা নয়। আমাদের দেশেও তো টেকনোক্র্যাট মন্ত্রী রাখার ব্যবস্থা আছে, উপদেষ্টা রাখার ব্যবস্থা আছে, যেমন আইনমন্ত্রী রয়েছেন। তারা অবশ্যই প্রভাবশালী নিশ্চয়ই। তাদের প্রতি বিশ্বাস, আস্থা আছে বলেই তারা কাছে থাকে। আবার ৎঁষবং ড়ভ নঁংরহবংং অনুসারে তাদের আবার নির্বাহী আদেশ জারি করার ক্ষমতা নেই। সেখানে তাকে মন্ত্রীর কাছে যেতে হচ্ছে। এখানেও আমরা একটি টানাপোড়েন লক্ষ্য করেছি। সেগুলোকে পার হওয়ার একটা দ্রুত বাস্তব ব্যবস্থা করতে হবে। না হলে যানজট সমস্যা সমাধান, দ্রব্যমূল্য, বিদ্যুৎ সমস্যা এগুলো অসুবিধায় পড়ে যাবে।

সাপ্তাহিক : আপনার কি মনে হয় প্রশাসনিক দিক থেকে গতিটা বেশি, না রাজনৈতিক বিচক্ষণতা…
শেলী : উভয় দিকেই। কারণ প্রশাসন তো একটি যন্ত্রের মতো। যন্ত্রীর ওপর নির্ভর করে এই যন্ত্র কিভাবে চলবে। ভালো ড্রাইভারের কাছে পুরনো গাড়িও ভালো চলে আর অনভিজ্ঞ আনাড়ির হাতে নতুন গাড়িও দুর্ঘটনা ঘটাতে পারে বা অসুবিধা সৃষ্টি করতে পারে। নির্বাচনভিত্তিক গণতন্ত্রে আগে যারা ছিল তাদের মধ্যে দুর্বলতা অক্ষমতা ছিল বলেই তো আপনারা এলেন। ভোট দিয়ে তো আর প্রশাসন বদলানো যায় না, ভোট দিয়ে তো আর ডেপুটি কমিশনার হওয়া যায় না। জজ হয় না। আমেরিকায় নাকি আগে ভোট দিয়ে করা হতো।

সাপ্তাহিক : বিরোধী দলের যে রাজনৈতিক ভূমিকা এ সম্পর্কে যদি কিছু বলেন…
শেলী : তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় দু’দলই অর্থাৎ ক্ষমতাসীন ও আজকের বিরোধী দল নানাভাবে নাস্তানাবুদ হয়েছে। তাদের শীর্ষ নেতাকর্মীরা কারাগারে ছিলেন। অন্যান্য নেতাকর্মী নির্যাতিত হয়েছেন। সরকারি দল এখন হয়ত সুযোগ পাচ্ছে। নির্বাচন জেল-জুলুমের পর তারা আবার বিরোধী দলে। আমাদের সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ফলে আমাদের আশা ছিল যে বিরোধী দলের যে সাংবিধানিক ক্ষমতা সেটা এখানে সুনিশ্চিত করা হবে। কিন্তু ’৯১ সালের পর থেকে দেখলাম যিনি যখন ক্ষমতায় যান তিনি বিরোধী দলের ওপর নানা ধরনের বিরূপ আচরণ করে থাকেন এবং ঐ বিরোধী যখন ক্ষমতায় আসে সে আবার নতুন বিরোধী দলের ওপর অত্যাচার শুরু করে। যার ফলে গণতন্ত্রের যে একটা মূল শর্ত বিরোধী দলকে তার যথাযথ ভূমিকা রাখতে দেয়া, ছায়া সরকার হিসেবে যে ভূমিকা থাকার কথা তা আর হয়ে ওঠেনি।

এখনকার বিরোধী দল হতাশ হয়ে বলছেন আমাদের ওপর হামলা চলছে, মামলা চলছে। সরকারি দলের মামলা প্রত্যাহার হলেও আমাদের মামলা প্রত্যাহার হচ্ছে না। তার পরে আবার জনমনে অস্থিরতা দ্রব্যমূল্য-জ্বালানি-তেল-গ্যাসের অভাব, বিদ্যুতের অপ্রতুলতা, আইনশৃঙ্খলার নানারকম অস্থিতিশীলতা এগুলো সম্পর্কে তারা বলছে সংসদে তাদের কথা বলতে দেয়া হয় না। বাইরে বললে তাদের বিরুদ্ধে মামলা দেয়া হয়। তাদের কথা না মানলে তারা হয়ত একটা চরমপন্থা অবলম্বন করতে পারেন, হরতাল করতে পারেন। জনগণের সমর্থন না থাকলেও হরতালে দ্রব্যমূল্যের দাম আবার নাজুক হতে পারে। হরতালের দিন হয়ত যানজট থাকবে না কিন্তু যখন খুলে যাবে তখন হয়ত নড়াচড়ার উপায় থাকবে না।

সরকার ও বিরোধী দলকে মনে রাখতে হবে সংঘর্ষের নয়, সহযোগিতার প্রয়োজন রয়েছে। সেটার দিক থেকে বিবেচনা করলে এটার কিন্তু দায়িত্ব সরকারি দলের। সেটাকে ইংরেজিতে বলে ড্রাইভিং সিট। গাড়ির স্টিয়ারিং যার হাতে, চালকের আসনে যিনি বসে আছেন তার দায়িত্ব একটু বেশিই হয়।

সাপ্তাহিক : দেশের গতিশীলতা ও উন্নয়নে গত ২ বছরের অভিজ্ঞতায় সরকার ও বিরোধী দল তার মধ্যে মার্ক কে বেশি পাবে?
শেলী : এটা একটা চলমান প্রক্রিয়া সম্পর্ক যেটা থাকে মানুষের মনে। আমি একটা প্রবন্ধ লিখেছিলাম যার নাম হলো ‘হ্যায় বুঝি তার খবর পেলে না হিয়ার মাঝে সুধা আছে চাও কি, হ্যায় বুঝি তার খবর পেলে না।’
জনমনের ওপর নির্ভর করে একটা সরকার বা রাজনৈতিক দলের অবস্থান। মানুষের মনেই জয়, মনেই ক্ষয়। সুতরাং এটা একটা চলমান প্রক্রিয়া। আমাদের দেশে তা জরিপ করার নির্ভরযোগ্য কোনো প্রতিষ্ঠান নেই। থাকলে বোঝা যেত। এভাবে বলা চলে না।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ওবামা কোনো সময় ৭৩ আবার কোনো সময় ৫৬তে নেমে যাচ্ছে। চলমান প্রক্রিয়ার মধ্যে যিনি এগিয়ে থাকবেন তারটাই শেষ পর্যন্ত টিকবে। এখানে সরকারের দায়-দায়িত্ব একটু বেশি যেহেতু তিনি ক্ষমতায়। বিরোধী দল ও নাজুক অবস্থায় আছে যেহেতু তারা কোনো বিকল্প দিতে পারছে না। যে এর মাধ্যমে এ সমস্যা সমাধান করা যাবে। অথবা তারা যদি বলত বিদ্যুৎ সমস্যার জন্য আমরা কি করতে পারি। আমরা আছি। তাহলে হয়ত একটা বিকল্প রাজনীতি তৈরি হতো। কোনো কোনো জায়গায় দেখা যায় প্রতিবাদ করে শ্রমিকরা বিনা বেতনে আরো বেশি সময় কেটেছে। এটা কিন্তু খুবই একটা চমৎকার ব্যাপার। এটা হলে বিরোধী দলের রাজনীতিটা অন্যরকম একটা মোড় নিতে পারত। এটা করতে গেলে বড় রকমের প্রজ্ঞার প্রয়োজন। সরকারের দিক থেকেও বলার আছে।

সাপ্তাহিক : আপনি তো তিন বছর শিক্ষকতা করেছেন। আমাদের ছাত্ররাজনীতিরও ঐতিহ্য আছে, তবে বর্তমান ছাত্ররাজনীতিকে আপনি কিভাবে দেখেন?
শেলী : বর্তমান ছাত্ররাজনীতি ছাত্ররাজনীতির একটা বিকৃত দিক। ছাত্ররা এর জন্য দায়ী নয়। ছাত্র সমাজের অতি ক্ষুদ্র অংশের পৃষ্ঠপোষকতা করেন ক্ষমতাসীন বা ক্ষমতার বাইরের গোষ্ঠী বা শক্তি। সেভাবেই ছাত্ররাজনীতির যে ঐতিহ্যবাহী ধারাটা লঙ্ঘিত হয়েছে। ১৯৬০-এর দশকে ৪টি প্রধান ছাত্র সংগঠনের একটির আমি নিজেও সভাপতি ছিলাম। আইয়ুব খান, সামরিক শাসন এবং শিক্ষা কমিশন বিরোধী যে আন্দোলন ১৭ সেপ্টেম্বর। সেই দলটি এখন অবলুপ্ত অর্ধেক বামে অর্ধেক ডানে চলে গেছে আমরা বেরিয়ে আসার পর। ছাত্রনেতা হিসেবে এমএ পাস করার পরেও ইউনিভার্সিটি আগলে থাকি নাই। এখন তো অনেক বয়সী ছাত্রনেতা আছে। ঐ সময় ঐ ট্রেডিশনগুলো ছিল। আগে ভাইস প্রেসিডেন্ট প্রার্থী (হলের) হতে হলে ক্লাসে ফার্স্টক্লাস পেতে হতো। আমি সেটাকে বিশ্বাস করি না। তবে ওটার যে একটা ম্যাসেজ শুধু নেতৃত্ব নয়, লেখাপড়া করে নেতৃত্ব দিতে হবে। সেই জিনিসটা তো নেই। ছাত্ররাজনীতির যে আদর্শিক অংশটা সেটা এখন হালুয়া-রুটির বিষয়ে পরিণত হয়েছে। যার জন্য আমরা দেখি যে দলই ক্ষমতায় যায় তারাই টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজির মধ্যে লিপ্ত হয়ে যায় এটাই প্রধান হয়ে দাঁড়ায়। ছাত্ররাজনীতির মূল দাবি-দাওয়ার বিষয়টি আমরা দেখছি না। আগে যেখানে ভিয়েতনামে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসনবিরোধী আন্দোলন বাংলাদেশে হয়েছে। আজকে তো আমরা সেটা দেখি না। ঐ স্পিরিটটাই নেই। আগে মারামারি হয়নি যে তা নয়। ’৬০-এর দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হয়েছে হাতাহাতি, গাছের ডাল, শেষের দিকে হকিস্টিক, চাকু আমদানি হলোÑ ঘঝঋ-এর মাধ্যমে।

মুক্তিযুদ্ধের ফলে তো অস্ত্র সমর্পণ করা হলো তাহলে তা কোথা থেকে আসছে? ক্ষমতায় যারা থাকেন, বাইরে যারা প্রভাবশালী আছেন তাদের কাজে এরা লাগাচ্ছেন। সরকার ও রাজনৈতিক দল তারা যদি বলে। এখানে একটা উদাহরণ আছে প্রেসিডেন্ট এরশাদ যখন ক্ষমতায় আসেন তখন প্রথম দিকে তিনি একটা ছাত্র সমাজ তৈরি করেছিলেন পরে যে কোনো কারণেই হোক এটাকে প্রত্যাহার করা হয়। প্রত্যাহার করার এক বছরও বোধহয় যায়নি তার পতন ঘটে। ছাত্ররাজনীতি আমি সাপোর্ট করি। ইউনিভার্সিটিতে রাজনৈতিক মতামত থাকবে না তা নয়। তবে টাকার জন্য মারামারি করবার জন্য এটা তো খুবই দুঃখজনক। এর ফলে আমাদের এত অশান্তি ও অস্থিরতা।

সাপ্তাহিক : কয়েকদিন আগে আমাদের জাতীয় সংসদে সংবাদপত্র সম্পর্কে কথাবার্তা বলা হয়েছে এটাকে আপনি কিভাবে দেখেন?
শেলী : আমি বলব যে, সংবাদ মাধ্যমে যে দোষ-ত্রুটির দুর্বলতা নেই তা নয়। আমাদের দেশে সরকারি সংবাদ কমিশন সাংবাদিকরা একটি করেছেন। সাউথ এশিয়ান মিডিয়া কমিশন প্রত্যেক দেশেই একটি করে আছে। আর একটি আছে কেন্দ্রীয় ভাবে। বাংলাদেশে যেটা আছে সেটার বর্তমান সভাপতি আমি, যদিও আমি প্রান্তিক সাংবাদিক।
আমাদের দায়িত্ব হচ্ছে একদিকে যেমন রিপোর্টার্স ইউনিটি সবই আছে, তবে আমাদেরও একই কথা সাংবাদিকের স্বাধীনতা, সাংবাদিকের অধিকার, দায়িত্ব সেটাই আমাদের মিডিয়া কমিশনের শর্তাবলীর মধ্যে রয়েছে। আমাদের সাংবাদিকদের মাঝে ভালো-মন্দ তো সব জায়গায়ই আছে। রাজনীতিবিদরা সরকারে গেলে পরে কোনো একটা সমস্যায় পড়লে গণমাধ্যমের ওপর দোষ চাপাতে চায়। আগের আমলে হয়েছিল যে বাংলা ভাই ইংরেজি ভাই বলে কেউ নেই মিডিয়ার সৃষ্টি। তারাই আবার ধরে দিয়ে গেলেন। ঐ যে মিডিয়ার সৃষ্টি বলে অস্বীকার করা। এটা করে তো যত দোষ নন্দ ঘোষ করলে হবে না। মিডিয়া তো বানাতে পারে না। কোনো ঘটনা ঘটলেই লেখে। সেটাকে সঠিক তথ্য প্রকাশের মাধ্যমেই মোকাবিলা করতে হয় তা না করে শুধু গালাগালি করে হবে না।

সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয়ের সেখানেই তথ্য অধিকার আইনের সুস্পষ্ট প্রকাশ ঘটানোর দরকার। একটা ঢ়ৎড়-ধপঃরাব সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে। ডিফেন্সিভ না। সরকার যা করে তা আত্মরক্ষামূলক। আত্মরক্ষার দরকার তো নেই। লুকিয়ে রাখলে পরে সেটা আরো বেশি প্রকাশিত হয়। তথ্য যদি সত্য হয় তাহলে কোনো সাংবাদিক এটা বিকৃত করবে বলে মনে হয় না।
শ্রুতিলিখন : মোঃ নিজাম উদ্দিন

[ad#co-1]