মুন্সিগঞ্জের এমপিরা কোণঠাসা…

ছাত্রলীগ-ছাত্রদলের যৌথ সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে প্রশাসন
মুন্সিগঞ্জ জেলা ছিল বিএনপির ঘাঁটি। চারদলীয় জোট সরকারের আমলে জেলা থেকে উপজেলা পর্যন্ত সকল প্রশাসন বিএনপির এমপি, যুবদল ও ছাত্রদল ক্যাডারদের কাছে জিম্মি ছিল। তাদের কথার বাইরে কোন কাজ হতো না। এমনকি তাদের সুপারিশ ব্যতীত থানায় মামলা কিংবা সাধারণ ডাইরি পর্যন্ত পুলিশ গ্রহণ করতো না। প্রতিপক্ষকে এলাকায় থাকতে দিত না। ঐ সময় প্রকাশ্যে আওয়ামী লীগের বেশ কয়েকজন নেতা-কমীকে হত্যা করা হয়।

লুটপাট ও অগি্নসংযোগ চলছে ব্যাপক হারে। এ সব কারণে গত সংসদ নির্বাচনে মুন্সিগঞ্জ জেলার তিনটি আসনে বিএনপির ভরাডুবি হয়েছে। আওয়ামী লীগের তিন এমপি নির্বাচিত হয়েছেন। তবে অবস্থার কোন পরিবর্তন হয়নি। একটু ব্যতিক্রম হলো ছাত্রলীগ ও ছাত্রদল একত্রিত হয়ে সিন্ডিকেট করে জেলা থেকে উপজেলা পর্যন্ত সকল প্রশাসন নিয়ন্ত্রণ করছে।

তারা টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, নিয়োগ ও বদলি বাণিজ্য, দখলসহ প্রায় সকল কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করছে। এই সব কারণে আওয়ামী লীগ তিন ভাগে বিভক্ত। এমপিরা অসহায় সিন্ডিকেটের কাছে। উক্ত সিন্ডিকেটের নেপথ্যে স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও কতিপয় কেন্দ্রীয় নেতা রয়েছে। তারা নিয়মিত ভাগ পাচ্ছেন বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই এলাকার কর্তৃত্ব নিয়ন্ত্রণ নিয়ে এখানে শুরু হয়েছে অন্তর্দ্বন্দ্ব। প্রথম থেকেই ছাত্রলীগ এখানে টেন্ডারবাজি চালিয়ে আসছে। আওয়ামী লীগের কোন সিনিয়র নেতা সরাসরি জড়িত না থাকলেও তাদের নাম ভাঙ্গিয়ে এ টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করে আসছে। এখানে আওয়ামী লীগের একাধিক গ্রুপ রয়েছে। এক আওয়ামী লীগ নেতার ভাই উপজেলা চেয়ারম্যান ঐ আসনের এমপি এবং কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের এক নেতার অন্তর্দ্বন্দ্বের কারণে এখানে অত্যাচারী ও লুটেরারাও সুযোগ নিচ্ছে। নিজ নিজ গ্রুপ শক্তিশালী করতে বিএনপির লোকজনকেও কাছে টানতে এতটুকুও চিন্তা করছে না। এ ক্ষেত্রে অনেক প্রকৃত আওয়ামী লীগ কর্মী বরং বিএনপির দাপটে কোণঠাসা।

বিভিন্ন গ্রুপে বিভক্ত থাকার কারণে এখানে একক আধিপত্য কোন পক্ষের না থাকলেও টেন্ডারবাজির ক্ষেত্রে অধিকাংশ সময়ই দেখা গেছে উভয় পক্ষের ছাত্রলীগের নেতা-কর্মী তথা নব্য আওয়ামী লীগের লোকজন নিয়ন্ত্রণ করে আসছে। কাউকে টেন্ডার পাইয়ে দিতে বা নিজেরা টেন্ডারের কাজ ভাগ করে নেয়ার ক্ষেত্রে প্রায় সময়ই দেখা যায় তারা ঐক্যবদ্ধ হয়ে যায়। বিভিন্ন ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান মুন্সীগঞ্জের বড় ধরনের টেন্ডার কাজ পাওয়ার জন্য ছাত্রলীগের নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে। চুক্তিবদ্ধের পর ছাত্রলীগের নেতারা টেন্ডারের সিডিউল ক্রয়ের স্থানগুলোতে বসে থেকে অন্য

কোন ঠিকাদার টেন্ডার কিনতে গেলে বাধা সৃষ্টি করে। আর টেন্ডার জমা দেয়ার সময়ও তাদের নির্ধারিত ঠিকাদার ছাড়া অন্য কোন ঠিকাদারকে টেন্ডার বাক্সে টেন্ডার ফেলতে বাধা সৃষ্টি করে আসছে। টেন্ডার ড্রপ করার সময় কয়েকবার সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে। এসবের নিয়ন্ত্রণে নাম আসছে এক শীর্ষ নেতার পুত্রের। রবিবার জেলা আইন শৃঙ্খলা কমিটির সভায়ও এক ক্ষমতাধর নেতার ভাই উক্ত বিষয়টি উত্থাপন করেন। এখানে টেন্ডারের সময় পুলিশের উপস্থিতি থাকলেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের জন্য কার্যকরী ভূমিকা পালন করতে দেখা যায় না বলেও অভিযোগ রয়েছে। জেলার এলজিইডি, সড়ক ও জনপথ এবং মুন্সীগঞ্জ পৌরসভার টেন্ডারবাজির সাথে অফিসের লোকজনও জড়িত, নয়তো তারা এব্যাপারে নিরব কেন? সভায় এই প্রশ্নও তোলা হয়।

এখানে আরেক বাণিজ্য হচ্ছে বালু মহাল। এই বালু মহালের নিয়ন্ত্রণে আওয়ামী লীগের উভয় পক্ষের লোকজন অংশিদার থাকলেও কর্তৃত্ব নিয়ে রয়েছে অন্তর্দ্বন্দ্ব। এখানে এখনও কোন বড় ধরনের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেনি। তবে মুন্সীগঞ্জ ও নারায়ণগঞ্জের বালু মহাল পাশাপাশি হওয়ায় সীমানা নিয়ে দ্বন্দ্বের জের ধরে কয়েকমাস আগে সন্ত্রাসী হামলায় মুন্সীগঞ্জ ছাত্রলীগের এক নেতা নিহত হয়েছেন।

এক উপজেলা নিয়ন্ত্রণ করছে দু’গ্রুপেরই আওয়ামী লীগের দু’ পক্ষের নেতারা। এমপি’র পক্ষের উপজেলা চেয়ারম্যান এবং জেলার শীর্ষ নেতার পক্ষে দুই নেতা দুই গ্রুপকে নিয়ন্ত্রণ করছেন বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। এ দু’পক্ষই অপতৎপরতা চালিয়ে টেন্ডারবাজি ভূমি দখলসহ প্রভাব বিস্তার করে আসছে। এছাড়া এলাকার নদীর বালু মহালের কর্তৃত্বও রয়েছে তাদের।

বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর মুন্সীগঞ্জের মাওয়া ঘাট প্রথম দেড় বছর নিয়ন্ত্রণ করেছে এক গ্রুপ। এখন ভাইয়া গ্রুপ নেতৃত্ব দিচ্ছে। এই গ্রুপের লোকজনই মাওয়ার চাঁদাবাজি ও ভূমি দখলসহ বিভিন্ন অপকর্মের সাথে জড়িত। পাশের এলাকার নিয়ন্ত্রণ করছে উপজেলা চেয়ারম্যান। এখানে টেন্ডারবাজি নিয়ে উভয় পক্ষের সাথে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে একাধিকবার। উপজেলার টেন্ডারবাজি ভাইয়া গ্রুপ ও স্থানীয় আওয়ামী লীগ সভাপতি ও এক উপজেলা চেয়ারম্যার নিয়ন্ত্রণ করে আসছে। তারা দু’জনই আওয়ামী লীগের নেতা হলেও দু’জন হচ্ছে দু’গ্রুপে। এই আসনের সংসদ সদস্যের কোন সম্পৃক্ততার খবর পাওয়া যায়নি। এখানে তিনি ক্লিন ইমেজের অধিকারী।

অপর এক এমপির কোন শক্তিশালী দলীয় গ্রুপিং না থাকার কারণে তারই একক কতর্ৃত্ব রয়েছে তার আসনে। এখানে আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতা-কমীরা বিভিন্ন দপ্তরে টেন্ডারবাজি করে আসছে। এখানে ভূমি দখলেরও ঘটনা ঘটেছে। এলাকায় এক শ্রেণীর ভূমি দখলকারী রয়েছে। তারা সব সরকারের আমলেই দলীয় নেতাকর্মীদের ম্যানেজ করে ভূমি দখল করে আসছে। এমপির পক্ষে স্থানীয় এক আওয়ামী লীগের সভাপতি ও উপজেলা চেয়ারম্যান একক কতর্ৃত্বে রয়েছে। এখানে দলীয় নেতাকমর্ীরা টেন্ডারবাজি ও ভূমি দখল করে আসছে। একটি উপজেলা বাজারের পাশের খাল ভরাট করে দখল করে নিয়েছে। এখানে মার্কেট নির্মাণের পরিকল্পনা করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। উপজেলা পরিষদের মোড়ে সরকারি জমি দলীয় নেতাকমর্ীরা বালি ভরাট করে দখল করার অভিযোগসহ তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ভূমি দখলের অভিযোগ রয়েছে। বেশীর ভাগ সময়ই দেখা যায় কোন টেন্ডারের কাজ নিজেরা বসে ভাগ করে নিয়ে নিজেরাই সিডিউল ড্রপ করে। আর অন্য কেউ সিডিউল ক্রয় বা ড্রপ করতে পারছে না। এছাড়া গরুর হাট ইজারা নিয়ে এই জেলায় এখন নানা রকমের ক্ষমতার প্রয়োগও চলছে। কৌশলে সমঝোতা করে কম পয়সায় হাট নিয়ে সরকারের রাজস্ব ফাঁকি দেয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে। টেন্ডার চক্রটি জেলা ও থানা পর্যায়ে গরুর হাটের কতর্ৃত্ব নিয়েও মাঠে নেমেছে। একটি উপজেলার গরুর হাট নিয়ে বৃহস্পতিবার এই গ্রুপের সদস্যদের সাথে স্থানীয় লোকজনের হাতাহাতি হয়েছে।

এসব ব্যাপারে হুইপ সাগুফতা ইয়াসমিন এমিলি এমপি ইত্তেফাককে জানান, স্বচ্ছতার মাধ্যমে এলাকায় উন্নয়নকর্মকান্ডসহ নির্বাচনী ওয়াদা বাস্তবায়নের চেষ্টা করে যাচ্ছি। অন্যায়কে কোনভাবেই প্রশ্রয় না দেয়ায় এলাকার শান্তি-শৃঙ্খলা অন্য যে কোন সময়ের চেয়ে অনেক ভালো। আমার জানামতে টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি বা ভূমি দখলের ঘটনা আমার এখানে নেই। কারণ আমরা কঠোরভাবে এর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছি। বিচ্ছিন্ন কোন ঘটনা ঘটলেও আইনী প্রক্রিয়ায় ব্যবস্থা নেয়া হয়ে থাকে। কৃষি প্রধান এই এলাকায় কৃষকের সার, বীজ ও ঋণ সঠিকভাবে স্বল্পমূল্যে যোগান দেয়ার কারণে ফসলের উৎপাদনও এখানে ভালো। পেছনে ফেরার সুযোগ নেই। জাতিকে এগিয়ে নিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়তে কাজ করে যাচ্ছি। প্রশাসন নিরপেক্ষভাবেই কাজ করছে বলে তিনি জানান।

সুকুমার রঞ্জন ঘোষ এমপি বলেন, আওয়ামী লীগের মধ্যে নতুন কোন ঠিকাদার সৃষ্টি হয়নি। ঠিকাদারী যারা করছেন তারা ১০/১৫ বছর আগে থেকেই করছেন। তারা একটি ব্যবসায়ী শ্রেণীর লোক। তাই আওয়ামী লীগের মধ্যে টেন্ডারবাজির সুযোগ নেই। প্রশাসনের উপরও আওয়ামী লীগ কোন হস্তক্ষেপ করে না বলে তিনি জানান।

জেলা প্রশাসক মোঃ আজিজুল আলম ২/১টি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া মুন্সীগঞ্জের আইন-শৃঙ্খলা ভাল উলেস্নখ করে ইত্তেফাককে বলেন, প্রশাসন নিরপেক্ষভাবেই কাজ করতে পারছে। কোন এমপি বা নেতার হস্তক্ষেপ নেই। গরুর হাটের ইজারা পত্রিকায় টেন্ডারের মাধ্যমে নিরপেক্ষভাবে সর্বোচ্চ মূল্য দাতাদের দেয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে তিনি জানান।

এ ব্যাপারে পুলিশ সুপার মোঃ সফিকুল ইসলাম ইত্তেফাককে বলেন, মুন্সীগঞ্জের পুলিশ প্রশাসন নিরপেক্ষভাবে কাজ করছে। পুলিশের কর্মকান্ডে কোন এমপি বা দলীয় নেতারা হস্তক্ষেপ করছে না বলে তিনি জানান। যে কোন দপ্তরে টেন্ডারের সময় পুলিশ চাইলে দেয়া হয়। টেন্ডারের সময় পুলিশের নীরব ভূমিকা পালনের কথা অস্বীকার করে বলেন, প্রয়োজনে টেন্ডারের সময় ৫০/৬০ জন পুলিশ দেয়া হয়েছে। মুন্সীগঞ্জের আইন শৃঙ্খলা-পরিস্থিতি খুবই ভাল বলে তিনি জানান।

মুন্সীগঞ্জ এলজিইডি’র নবনিযুক্ত নির্বাহী প্রকৌশলী মোলস্না মোহাম্মদ শাহনেওয়াজ ইত্তেফাককে বলেন, এখনও কোন এমপি’ বা দলীয় নেতা হস্তক্ষেপ করেননি। তিনি আসার পর টেন্ডারবাজির কোন ঘটনা ঘটেনি বলে জানান।

আবুল খায়ের ও বাছির উদ্দিন জুয়েল

[ad#co-1]