ডিসিসিকে শক্তিশালী কাঠামো করার চেষ্টা কেউ করেনি

দল মনোনয়ন দিলে আবার মেয়র পদে প্রার্থী হবেন সাদেক হোসেন খোকা
নগরীর দুঃসহ যানজট, বায়ুদূষণ, শব্দদূষণ, দুর্বল বর্জ্য অপসারণ ব্যবস্থা, পয়ঃনিষ্কাশন, রাস্তাঘাটের বেহাল দশা, নগরীর জলাবদ্ধতাসহ নানা দুর্ভোগ তো আছেই। এসব সমস্যা একদিনের নয়, দীর্ঘদিনের পরিকল্পনার অভাবে এমনটা হচ্ছে। মেগাসিটি ঢাকায় রাস্তা প্রয়োজন ২৫ ভাগ, সেখানে রয়েছে মাত্র ৬ ভাগ। রাস্তায় প্রায় ১৫ লাখ যন্ত্রচালিত যানবাহন চলাচল করে। প্রতিবছর এর সঙ্গে কমপক্ষে ৫০ হাজার নতুন গাড়ি যোগ হচ্ছে। এ অবস্থায় রাস্তার ধারণক্ষমতা ৮০ ভাগও নয়। বছরে দেশের মোট যানবাহনের ৬৫ ভাগ ঢাকায় চলাচল করে। তার মধ্যে শিল্পকারখানা ও গার্মেন্টের পণ্য পরিবহনের জন্য ভারি কার্গো ও লরি চলাচল করে। এত দীর্ঘ ভারি যানবাহন চলাচলে রাস্তা দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়।

ঢাকার মেয়র সাদেক হোসেন খোকা বলেছেন, দল মনোনয়ন দিলে মেয়র নির্বাচনে আবারও প্রার্থিতা করবেন। যেহেতু দল একটি নির্দিষ্ট শৃঙ্খলার মধ্যে চলে, তাই দলের কৌশল অনুসরণ করেই তিনি পথ চলবেন।

দৈনিক আমার দেশ-এর সঙ্গে এক সাক্ষাত্কারে আগামী নির্বাচনে মেয়র প্রার্থিতার বিষয়ে তিনি একথা বলেন। ঢাকা সিটি করপোরেশনের উন্নয়নের ব্যাপারে সরকারের প্রতি সুপারিশ করে তিনি বলেন, বর্তমান সরকারই নয়, যখন যে সরকারই ক্ষমতায় আসুক শুধু সরকারি নিয়ন্ত্রণের মনমানসিকতা পরিহার করে নিরপেক্ষ রেগুলেশন থাকতে হবে। প্রতিটি রেগুলেটরির কাঠামোও শক্তিশালী করতে হবে।

গত ৮ বছরে প্রথমে বিএনপি, সেনাসমর্থিত ড. ফখরুদ্দীন সরকার এবং বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে নগরীর উন্নয়ন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ডিসিসিকে শক্তিশালী কাঠামো করার চেষ্টা কেউ করেনি। তারপরও নানা সমস্যার মধ্যে কাজ করতে হয়েছে। ডিসিসির আয় কম, ব্যয় বেশি। আয় তো বেশি হয় হোল্ডিং ট্যাক্স থেকে। কিন্তু গত ৮ বছরে একবারও ট্যাক্স বাড়ানো হয়নি, কারণ এতে সাধারণ নাগরিক দুর্ভোগের শিকার হবেন।

নগরীর দুঃসহ যানজট, বায়ুদূষণ, শব্দদূষণ, দুর্বল বর্জ্য অপসারণ ব্যবস্থা, পয়ঃনিষ্কাশন, রাস্তাঘাটের বেহাল দশা, নগরীর জলাবদ্ধতাসহ নানা দুর্ভোগের ব্যাপারে সাদেক হোসেন খোকা বলেন, এসব সমস্যা একদিনের নয়, দীর্ঘদিনের পরিকল্পনার অভাবে এমনটা হচ্ছে। মেগাসিটি ঢাকায় রাস্তা প্রয়োজন ২৫ ভাগ, সেখানে রয়েছে মাত্র ৬ ভাগ। রাস্তায় প্রায় ১৫ লাখ যন্ত্রচালিত যানবাহন চলাচল করে। প্রতিবছর এর সঙ্গে কমপক্ষে ৫০ হাজার নতুন গাড়ি যোগ হচ্ছে। এ অবস্থায় রাস্তার ধারণক্ষমতা ৮০ ভাগও নয়। বছরে দেশের মোট যানবাহনের ৬৫ ভাগ ঢাকায় চলাচল করে। তার মধ্যে শিল্পকারখানা ও গার্মেন্টের পণ্য পরিবহনের জন্য ভারি কার্গো ও লরি চলাচল করে।

এত দীর্ঘ ভানি যানবাহন চলাচলে রাস্তা দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়, যা মেরামতের জন্য এবং এসব যানচলাচল উপযোগী রাস্তা নির্মাণ করতে বড় অঙ্কের অর্থ প্রয়োজন। অথচ নগরীতে যানবাহনপ্রতি যে ট্যাক্স আদায় হয় তা সরকার নিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এর সিংহভাগই ডিসিসিকে দেয়া উচিত। মেয়র খোকা সরকারের প্রতি নগর শুল্ক প্রথা চালুর দাবি জানান।

তিন সরকারের আমলে মেয়র হিসেবে কাজের অভিজ্ঞতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ডিসিসির ক্ষেত্রে এ সময়গুলোতে পাল্টাপাল্টি রাজনীতি খুব কমই হয়েছে। বেশিরভাগ সময়ই রাজনৈতিক তর্ক থাকলেও নগরীর স্বার্থসংশ্লিষ্ট কাজের ক্ষেত্রে সবাই একমত হয়েছেন। মেয়র খোকা বলেন, আমি যখন নগর ভবনের গেট দিয়ে প্রবেশ করি তখন থেকেই দলীয় স্বার্থ ঊর্ধ্বে রেখে কাজ করছি। স্থানীয় সরকারের ধারা অব্যাহত রাখার চেষ্টা করছি। বিএনপি সরকারের আমলে বাইরে বিরোধী দলে থাকা আওয়ামী লীগের তীব্র আন্দোলন মোকাবিলা করেছি। কিন্তু ওই আন্দোলনের আঁচ বা প্রভাব সিটি করপোরেশনে লাগেনি। এমনকি আওয়ামী লীগের ওয়ার্ড কমিশনাররাও আমার কোনো কাজে হইচই করেননি বা বিরোধিতা করেননি। তাদের ক্ষেত্রেও রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে কাজ করিনি। তত্ত্বাবধায়ক বা আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে কাজের গতি ওঠানামা করলেও ব্রেক পয়েন্টে যেতে হয়নি। সব সময়ই কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে যতটুকু সম্ভব সম্পর্ক বজায় রেখে কাজ করেছি। এসময়ে ডিসিসিকে ঋণখেলাপির তালিকা থেকে বের করে আনা হয়েছে। ডিসিসির আগের ৬৩১ কোটি টাকার ঋণের মধ্যে ৩৯৩ কোটি টাকার দেনা পরিশোধ করা হয়েছে। এ সময়ে নতুন কোনো ঋণ গ্রহণ করা হয়নি।

তবে নাগরিক স্বাচ্ছন্দ্য বা নগর উন্নয়নের জন্য যেভাবে সরকারি অনুদান প্রয়োজন তা দেয়া হচ্ছে না। গত ৩ বছর ধরে সরকারি অনুদান আরও কমে এসেছে।

ডিসিসির কাজের প্রতিবন্ধকতার ব্যাপারে সাদেক হোসেন খোকা বলেন, ডিসিসির কাজ সঙ্কুচিত। প্রতিনিয়ত বিভিন্ন সংস্থা ও মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কাজ করতে হয়। ডিসিসির মধ্যে ওয়াসা, রাজউক, ডেসা আলাদাভাবে কাজ করছে। এ প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। এসব কারণে নাগরিকরা দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন। ডিসিসির মেয়র যেহেতু নির্বাচিত মেয়র তাই স্বাভাবিকভাবে সবার প্রত্যাশা বেশি থাকে ডিসিসির কাছে। বিশেষ করে ঢাকার পরিবেশ পরিধি ও নাগরিকের স্বাচ্ছন্দ্যবিধানের জন্য রাজউক পরিকল্পনামাফিক কাজ করতে পারেনি। এসব সমস্যা পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। তাছাড়া ওয়াসার হাতে সুয়ারেজ লাইনের কাজ। তারা তাদের ইচ্ছামত কাজ করে। যখন-তখন রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি করে ডিসিসিকে জানানোর প্রয়োজনও মনে করে না। এসব রাস্তা ঠিক করার দায়িত্ব আবার এসে পড়ে ডিসিসির ওপর।

মেয়র খোকা বলেন, ডিসিসির নিজস্ব অথোরিটি নেই। ইচ্ছা করলেই সবকিছু করা যায় না। যেমন ফুটপাত দখলমুক্ত করা, সম্পত্তি রক্ষা এবং উচ্ছেদ অভিযানের আইন আছে, কিন্তু নিজস্ব পুলিশ ফোর্স নেই। এজন্য আবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে যেতে হয়। বিষয়গুলো একাধিকবার সরকারকে বলা হয়েছে। সরকার একজন ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে পুলিশ বাহিনী দিতে পারে। নয়তো ডিসিসিকেই নগর পুলিশ গঠনের ক্ষমতা দিতে হবে। পরিস্থিতি বিবেচনার এখনই সময় এসব পদক্ষেপ নেয়ার।

বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রণ ও ঘরবসতির ইউনিট ঘাটতি সম্পর্কে সিটি মেয়র বলেন, ঢাকা রাজধানী হওয়ায় এবং অর্থনৈতিক কেন্দ্রবিন্দু হওয়ায় সবাই ছুটছে ঢাকার দিকেই। এক্ষেত্রে বর্তমান সরকারের কাছে দাবি, মফস্বল শহর, গ্রামাঞ্চলকে অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ করার জন্য পদক্ষেপ নিতে হবে। কারণ শুধু ঢাকার মানুষই ভালো থাকবে তা হয় না। যদি দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতে অর্থনৈতিকভাবে সব ধরনের উন্নয়নের গতি সঞ্চার করা যায় তাহলে ঢাকামুখী মানুষের চাপ কমবে। এ ব্যাপারে সরকারের এখনই সজাগ দৃষ্টি দেয়া দরকার।

স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়বিষয়ক সংসদীয় কমিটির সঙ্গে কোনো বিরোধ নেই বলে জানান মেয়র খোকা। কারণ হিসাবে তিনি জানান, সংসদীয় কমিটি মন্ত্রণালয়ের জন্য সুপারিশ করবে। আর ডিসিসির কাজ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে। সে ধারা ডিসিসি বজায় রেখেছে। ডিসিসির অনিয়ম ও দুর্নীতি তদন্তের জন্য মন্ত্রণালয় বা দুর্নীতি দমন কমিশন রয়েছে। ডিসিসির প্রতিদিনের এক্সিকিউটিভ কাজ দেখার দায়িত্ব সংসদীয় কমিটির নয় বা এখতিয়ারও নেই। মন্ত্রণালয়ের কাছে দুর্নীতির তদন্তে ডিসিসিতে অফিস চেয়েছেন ঢাকা মেয়র।

সাক্ষাত্কার : মাহমুদা ডলি

[ad#co-1]