শ্রীনগর সরকারি কলেজে অনিয়মই নিয়ম

মাজেদুল নয়ন এবং শাহাদাৎ হোসেন : মুন্সিগঞ্জের শ্রীনগর উপজেলার শ্রীনগর সরকারি কলেজে অনিয়মই নিয়ম। কলেজটির অধ্যক্ষসহ বেশ কয়েকজন শিক্ষক এবং কলেজ প্রশাসনের অনিয়মের প্রভাব পড়ছে কলেজের পড়াশোনার মানে। সম্প্রতি বিজ্ঞানাগারের সরঞ্জাম ক্রয়ের দরপত্র আহ্বানের ঘটনায় অনিয়ম হওয়াতে আলোচনায় আসে কলেজটি। গত সোমবার সরজমিন ভোরের কাগজের অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে কলেজের দুর্নীতির আরো চাঞ্চল্যকর তথ্য।

জানা যায়, হিসাববিজ্ঞানের প্রভাষক মানজুমান আরা আট মাস ধরে কলেজে অনুপস্থিত থাকলেও ৪ মাস তিনি বেতন তুলেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। কলেজ কর্তৃপক্ষের কাছে ঐ প্রভাষকের ব্যাপারে জানতে চাইলে কোনো তথ্যের ফাইল নম্বর পাওয়া যায়নি।

এছাড়াও সমাজবিজ্ঞানের শিক্ষক নেই, কম্পিউটার বিষয়ে শিক্ষক নেই। কম্পিউটার শিক্ষক রোজানা আলম চাকরি ছেড়ে দিলে সার্টিফিকেটের ফটোকপি টেম্পারিং করে রেশমা আলম নামে অজ্ঞাত কেউ দুমাসে ৪ হাজার ৮০০ টাকা করে নিয়েছেন। এ দুর্নীতির কথা স্টাফ কাউন্সিলেও আলোচিত হলে বন্ধ হয়।

কলেজের এক শিক্ষার্থী এই প্রতিবেদকের কাছে অভিযোগ করে বলেন, উপাধ্যক্ষ গোলাম কিবরিয়া কোনো ধরনের অনুমোদন ছাড়া অছাত্র এবং অনিয়মিত ছাত্রদের ছাত্রাবাসে থাকতে দিয়েছেন। ছাত্রাবাসটিতে কলেজ কর্তৃপক্ষের কোনো তদারকি নেই।

সরজমিন দেখা যায়, ১০ থেকে ১৫টি ছাগল কলেজের মাঠে ঘোরাঘুরি করছে। এগুলো কলেজের উপাধ্যক্ষ গোলাম কিবরিয়ার। এগুলোর তদারকি করেন কলেজের পিওন সিরাজ। কয়েকজন শিক্ষার্থী জানান, ছাগলগুলো শ্রেণীকক্ষ, টিচার্সরুমেও ঢুকে পড়ে এবং মলমূত্র ত্যাগ করে। এছাড়াও কলেজের বিভিন্ন চারাগাছ নষ্ট করে।

কম্পিউটার, পদার্থ, রসায়ন এবং জীববিজ্ঞান ল্যাব থাকলেও শিক্ষার্থীরা খুব কম সময়ই এগুলো খোলা দেখে এবং ব্যবহার করতে পারে। কারণ কলেজের শিক্ষার্থীদের ব্যবহারিক ক্লাসই নেয়া হয় না।

কলেজটিতে রয়েছে শিক্ষক সংকট। ২ হাজার ৪০০ জন শিক্ষার্থীর বিপরীতে রয়েছেন মাত্র ১৩ জন শিক্ষক। অথচ শিক্ষকদের ডে-অফ নামে সপ্তাহে তিনদিন অনুপস্থিত থাকার মৌখিক অনুমতি দেন স্বয়ং অধ্যক্ষ এবং উপাধ্যক্ষ। তাই অনেক সময় শিক্ষার্থীরা দেখে তাদের নির্ধারিত ক্লাস হচ্ছে না।

মাঝে মাঝে ছুটি নয় বরং মাঝে মাঝে কলেজে আসেন অধ্যক্ষ আখতার নাহার। বাড়ি নারায়ণগঞ্জ হওয়াতে তিনি সেখানেই থাকেন কিন্তু নিয়মিত অফিসে আসেন না। সরজমিন দেখা যায় কলেজের প্রশাসনে লোকবল নেই। কলেজের উপাধ্যক্ষ কোচিং করাতে ব্যস্ত থাকায় নিয়মিত তিনিও অফিসে আসতে পারেন না। তাই প্রশাসনিক কাজকর্ম বেশিরভাগ সময়ই বন্ধ থাকে। শিক্ষকরা সকালে কলেজে আসলেও অফিস খোলে সকাল ১০টার পরে।

সূত্র জানায়, অধ্যক্ষ এবং উপাধ্যক্ষ কলেজের শিক্ষকদের চাইতে অফিসের লোকদের বেশি পছন্দ করেন এবং সুযোগ সুবিধার ভাগ বাটোয়ারাও তাদের সঙ্গে হয়।

গত সোমবার সরকারি শ্রীনগর কলেজে গেলে উপাধ্যক্ষ গোলাম কিবরিয়া এই কলেজের বেশ কয়েকটি দুর্নীতির কথা জানান। তিনি বলেন, কলেজের প্রশাসন থেকে প্রায়ই শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে টাকা তোলা হয়। যেমন প্রশংসাপত্রের নামে টাকা তোলা হয়। যার কোনো ভিত্তি নেই। এসব টাকা অধ্যক্ষ, কতিপয় শিক্ষক এবং অফিস স্টাফ ভাগাভাগি করে নেন বলে জানান তিনি।

কলেজের টেন্ডারের অনিয়মের ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ ব্যাপারে তিনি কিছুই জানেন না। তিনি নামকাওয়াস্তে কমিটিতে ছিলেন। সব কাজ করেছেন কলেজের অধ্যক্ষ আখতার নাহার এবং তার কাছের কয়েকজন শিক্ষক এবং কলেজের ছাত্র সংগঠন। কোন পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেয়া হয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলতে পারেননি।

গোলাম কিবরিয়া বলেন, কলেজের অধ্যক্ষ নিজের মতো করেই সব কিছু করেন। এখানে কারো কিছু করার থাকে না। তিনি কমিটিতে নামকাওয়াস্তে ছিলেন বলে জানান।

গুডলাক নামে একটি প্রতিষ্ঠানকে এ কাজের অর্ডার দেয়া হয়েছে বলে জানান তিনি। এ ধরনের কাজে কলেজে সবসময়ই দুর্নীতি হয়ে আসছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এবার কয়েকজন শিক্ষক ভাগ না পাওয়াতেই বেশি আলোচনা হচ্ছে। এসব অনিয়মের টাকা ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনের নেতৃবৃন্দকেও দিতে হয় বলে জানান তিনি।

প্রশাসনিক তদারকি না থাকার কারণে কলেজটিতে বিভিন্ন ধরনের অসামাজিক কাজ চলে বলে অভিযোগ রয়েছে।

কলেজের অভ্যন্তরীণ পরীক্ষার সম্মানী বণ্টন এবং কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে সার্কুলার লঙ্ঘনও করা হয়। অধ্যক্ষ তার পছন্দের শিক্ষকদেরই বারবার কমিটিতে রাখছেন বলে জানা যায়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মুন্সিগঞ্জের শ্রীনগর উপজেলার শ্রীনগর সরকারি কলেজের এক শিক্ষক জানান, প্রতি বছরই শিক্ষার্থীদের কলেজ উন্নয়নের নামে রশিদ ছাড়াই টাকা নেয়া হয়। পরে সে টাকা কলেজের ছাত্র সংগঠনের নেতৃবৃন্দ এবং কলেজ শিক্ষকদের মধ্যে ভাগাভাগি হয়ে যায়। কলেজের এক শিক্ষার্থী জানান, কলেজের ছাত্রনেতারা কলেজের সকল কাজেই হস্তক্ষেপ করে। অধ্যক্ষের প্রশ্রয়ের কারণে তাদের বাড়াবাড়ি চরম আকারে পৌঁছেছে।

সম্প্রতি কলেজের বিজ্ঞানাগারের যন্ত্রপাতি ক্রয়ের দরপত্র আহ্বানের প্রক্রিয়ায় অনিয়মের কারণে কলেজটির প্রশাসন এবং শিক্ষকবৃন্দ আবারো সমালোচনায় পড়ে। সূত্র জানায়, কলেজের সহকারী অধ্যক্ষ গোলাম কিবরিয়াকে প্রধান করে ৫ জন শিক্ষকের সমন্বয়ে দরপত্র সংক্রান্ত কমিটি গঠন করা হয়। কিন্তু দরপত্র আহ্বানের প্রক্রিয়া সম্পর্কে কমিটির সঙ্গে কোনো ধরনের আলোচনা করেননি কলেজের অধ্যক্ষ আখতার নাহার। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কমিটির এক শিক্ষক জানান, উপাধ্যক্ষ এবং অধ্যক্ষ নিজেরাই সব করেছেন। শুধু তাদেরকে স্বাক্ষর দেয়ার কাজটিই করতে হয়েছে।

পিপিআর-এর নিয়ম অনুযায়ী জাতীয় এবং স্থানীয় কমপক্ষে দুটি জাতীয় দৈনিকে দরপত্র আহ্বানের বিজ্ঞপ্তি দিতে হবে। কিন্তু জানা যায় শুধু একটি অখ্যাত পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়েছে কলেজটি। আখতার নাহারের সঙ্গে দেখা করলে তিনি প্রতিবেদকের কাছে বলেন, এ ব্যাপারে তিনি কিছুই জানেন না। সবকিছু উপাধ্যক্ষ জানেন। তার একটু আগে উপাধ্যক্ষের সঙ্গে কথা হলেও প্রতিবেদক এবং উপাধ্যক্ষ ব্যপারটি গোপন রাখেন।

আগের কথা উপাধ্যক্ষ অস্বীকার করে বলেন, কলেজের টেন্ডার প্রক্রিয়া স্বচ্ছ হয়েছে। প্রতিবেদকের সামনে তখন কলেজের অধ্যক্ষ, উপাধ্যক্ষ এবং হেড এসিসটেন্ট আমির হোসেন উপস্থিত ছিলেন। দরপত্রের বিজ্ঞপ্তি কোন সংবাদপত্রে প্রকাশ করা হয়েছে জানতে চাইলে তারা কেউই জানেন না বলে জানান। এ ব্যাপারে প্রতিবেদক বিস্ময় প্রকাশ করলে অধ্যক্ষ হেড এসিসটেন্টকে জিজ্ঞাসা করেন। অনেক ভেবেচিন্তে তিনি জানান, দৈনিক সোনালী বার্তায় বিজ্ঞাপন দেয়া হয়েছে। প্রতি বছরই নাকি এ পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেয়া হয় বলে তিনি জানান।

কলেজের দরপত্রের অনিয়মের কথা উল্লেখ করে দর জানতে চাইলে অধ্যক্ষ বলেন, জানা যাবে না। ভিন্ন কায়দায় জানতে চাওয়া হলে তিনি উপাধ্যক্ষকে জানাতে বলেন। উপাধ্যক্ষ জানান, বিজ্ঞানাগারের রাসায়নিক দ্রব্যাদি ক্রয়ে ১ লাখ, যন্ত্রপাতি ক্রয়ে ৩ লাখ, শিক্ষা উপকরণ ক্রয়ে ৫০ হাজার এবং আনুষঙ্গিক ৬০ হাজার টাকা দরে কাজ দেয়া হয়েছে।

কলেজের মাত্র ৭০ জন বিজ্ঞান শিক্ষার্থীদের জন্য এতো টাকার যন্ত্রপাতি এবং খরচ করার কারণ এবং বিজ্ঞানাগার বন্ধ থাকার কারণ জানতে চাইলে তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যান এবং অস্বীকার করেন।

সূত্র থেকে জানা যায়, অর্ডারে সাবান বা টাওয়ালের দামও অনেক ধরা হয়েছে। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে আমির হোসেন জানান, সাবানের দাম ধরা হয়েছে ৩৫ টাকা এবং টাওয়ালের দাম ১৬০ টাকা।

দরপত্রের ব্যাপারে কমিটির সঙ্গে বৈঠক করা হয়নি কেনÑ জানতে চাইলে অধ্যক্ষ বলেন, বেশ কয়েকবার বৈঠক করা হয়েছে। তবে উপাধ্যক্ষ আগেই প্রতিবেদকদের কাছে বলেছিলেন যে কমিটির সঙ্গে বৈঠক করা হয়নি।

কলেজের এসব দুর্নীতির ব্যাপারে শিক্ষা সচিব ড. কামাল আব্দুল নাসের চৌধুরীর সঙ্গে কথা বললে তিনি জানান, এ ধরনের দুর্নীতি প্রকাশিত হলে অবশ্যই তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

[ad#co-1]