বিষয় জীবনানন্দ : ভূমেন্দ্র গুহর সঙ্গে আলাপ

[গত বছরের এপ্রিলে বরেণ্য জীবনানন্দ-সাধক ভূমেন্দ্র গুহ বাংলাদেশে এসেছিলেন। প্রথমে তিনি বরিশালে যান জীবনানন্দের স্মৃতিরক্ষার এক অনুষ্ঠানে। পরে ২০ এপ্রিল ২০০৯, সন্ধ্যায় ধানমণ্ডির বেঙ্গল শিল্পালয়ে সাহিত্য পত্রিকা ‘কালি ও কলমে’র আয়োজনে জীবনানন্দ-বিষয়ক আলোচনার মূল ব্যক্তি হিসেবে দীর্ঘ আলোচনা চালান তিনি। ওই আলোচনার শেষে, কালি ও কলম সম্পাদক আবুল হাসনাতের সাহায্যে অনেকটা ক্লান্ত ভূমেন্দ্র গুহকে খানিকটা চেপে ধরে একটা আলাপচারিতায় বসাতে পারি। লোকজনের ভিড় ও হাস্যকর নানা প্রশ্নের কারণে উনি ছিলেন বিরক্ত। আসলে কথা বলার মেজাজেও ছিলেন না। নিরূপায় আমি চ্যালেঞ্জ নিয়েই বললাম, খানিকটা জেনেবুঝেই তার সঙ্গে কথা বলতে এসেছি। তিনি কথা বললেন, যদিও দ্রুত লয়ে, উত্তেজনার সঙ্গে। কিন্তু অনেক কিছুই বললেন। সেই আলাপচারিতা একটি বড় অংশ থাকল পাঠকদের জন্য।

একটা কথা বলে রাখা দরকার, ভূমেন্দ্র গুহ হচ্ছেন সেই মানুষ, যিনি জীবনানন্দের দুষ্পাঠ্য-জটিল অনেক লেখা অমানুষিক শ্রম দিয়ে উদ্ধার করেছেন, করে চলেছেন। ফলে আমরা এখনও জীবনানন্দর অনেক অসামান্য লেখার সন্ধান পাচ্ছি। তাঁর এই সাধনা না পেলে বহু লেখা হয়তো আজও সিন্দুকেই তোলা থাকত, পাঠকের হাতে নয়। জীবনানন্দের এই ত্যাগী সাধককে বিনয়ের সঙ্গে কৃতজ্ঞতা জানাই।]

সৈকত হাবিব : বলা হয়ে থাকে জীবনানন্দ লাজুক ছিলেন, মানুষকে এড়িয়ে চলতেন, এক্ষেত্রে আপনারা কীভাবে তাকে ক্যাপচার করলেন?
ভূমেন্দ্র গুহ : অ্যাভয়েড করা মানে কি লাজুক? আমি আপনাকে যদি অ্যাভয়েড করি, তার মানে কি আমি লাজুক?

সৈকত হাবিব : নরমালি উনি নাকি একটু অ্যাভয়েড করতেন…
ভূমেন্দ্র গুহ : অ্যাভয়েড করতেন, উনি আমাদের সবাইকে অ্যাভয়েড করতেন; কারও সাথে খুব একটা কথা বলতেন না। উনি খুব স্বল্পভাষী ছিলেন। ওনাকে কেউ উৎপাত করলে পছন্দ করতেন না। উনি যার সঙ্গে বেড়াতেন তাকে অসাহিত্যিক হতে হতো, কোনও রকমের সাহিত্যিক তর্ক করতেন না। কোনও সভায় যেতেন না। উনি মনে করতেন এগুলোতে কিছু হয় না, শুধু সময় নষ্ট হয়। সেজন্য এতে লাজুকের প্রশ্ন হয় না। ওর স্বভাবেই ছিল নিভৃতি। উনি অহেতুক তর্ক করে ঝগড়া করে সময় নষ্ট করতেন না। উনি কোনও সভায় যেতেন না, কোনও দিন যাননি। উনি নিজেকে কখনও এক্সপোজ করেননি। এক্সপোজার, যাকে বলে নিজেকে দেখানো। এখন আপনাদের কৃপায়, এই মিডিয়াগুলোর কৃপায়, খবরের কাগজের কৃপায়, এখন তো এক্সপোজ ছাড়া কিছু হয় না। আপনাকে সাহিত্যিক হতে হলে এক্সপোজার, ফিল্মস্টার হতে হলে এক্সপোজার, সব কিছুতেই এক্সপোজার চাই। আর এক্সপোজারের জন্য সাংবাদিকরা পিছে পিছে ঘুরে বেড়াচ্ছে।

সৈকত হাবিব : উনি নাকি তরুণদের আপনি করে বলতেন?
ভূমেন্দ্র গুহ : না, উনি আপনি করে সবাইকে বলতেন না। আমাকে তুমি করে বলতেন।

সৈকত হাবিব : ‘ময়ূখ’ প্রথম সংখ্যা করার জন্য তাঁর কাছ থেকে লেখা আনতে গিয়েই কি আপনাদের সম্পর্কটা হয়েছিল?
ভূমেন্দ্র গুহ : গিয়েছিলাম লেখা আনতে, তাঁকে পছন্দ করতাম। কিন্তু প্রথম সংখ্যায় তিনি কোনও লেখা দেননি। লেখা দিয়েছিলেন…সেই ঘুরতে ঘুরতে একটি লেখাই পেয়েছিলাম, সেই লাস্ট…

সৈকত হাবিব : লেখাটি ছাপা হয়েছিল মৃত্যুর পরে…
ভূমেন্দ্র গুহ : না, মৃত্যুর পরে না, মৃত্যুর আগেই।

সৈকত হাবিব : ওই সময় আরও অনেক লেখকই ছিলেন, কিন্তু আপনার বা আপনার বন্ধুদের জীবনানন্দ-অনুরাগের কারণ কী ছিল?
ভূমেন্দ্র গুহ : তার কারণ ওই যে, একদল যারা বুদ্ধদেবের ভক্ত ছিল, তাদের বলা হতো বৌদ্ধ। একদল যারা বিষ্ণু দের ভক্ত ছিল, তাদের বলা হত বৈষ্ণব। আমরা জীবনানন্দের ভক্ত ছিলাম বলে জৈবনিক।

সৈকত হাবিব : কিন্তু এই ভক্তির কারণটা কী ছিল?
ভূমেন্দ্র গুহ : ওই লোকটা দেশ ছেড়ে গিয়েছে, ওই লোকটা ধাক্কা খাচ্ছে রাস্তায় রাস্তায়। আমরাও কতগুলো দেশ-তাড়ানো ছেলে, চাল নেই চুলো নেই, চাকরি নেই বাকরি নেই, পড়াশোনা হবে কিনা জানা নেই। এর মধ্যেই আমরা কাগজ করছি কোনওরকমে টেনেটুনে। এই রকম একটি লোক, ওই কষ্ট তিনিই বুঝতে পারতেন, লেখায়ও তিনি প্রমাণ দিলেন– এদের কষ্ট আমি বুঝি। তিনি ইলিশ মাছ নিয়ে কোনও কবিতা লেখেননি। ওই নান্দনিকতার ধারে ছিলেন না তিনি। বুঝতে পেরেছেন?

সৈকত হাবিব : এক্ষেত্রে কি কোনও বরিশাল ফিলিংস কাজ করেছে? কারণ আপনারা উভয়েই তো বরিশালের…
ভূমেন্দ্র গুহ : না, এই জাতীয় কোনও ফিলিংস কাজ করে নাই। তবে আমি যখন দেখা করেছিলাম, দেখেছি জীবনানন্দের বরিশাল সম্পর্কে অনেক বাতিক ছিল। তিনি অনেক দিন বরিশালে বাস করেছেন। তিনি আমাকে বাজিয়ে নিয়েছিলেন আমি বরিশালের লোক কিনা। তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করেছেন তুমি বগুরা রোড চেনো? কাউনিয়া চেনো?

সৈকত হাবিব : আপনি প্রায়শই বলেন, জীবনানন্দ আপনার একটু সর্বনাশ করেছেন। মজা করেই বলেন। সে সর্বনাশ কতটা করেছেন এটা জানতে চাই। তখন তো আপনি অনেক নামকরা ডাক্তার…
ভূমেন্দ্র গুহ : মজা করে বলি না। সর্বনাশ তো করেছেনই। আমি যখন এমবিএস পাস করলাম ১৯৫৮ সালে, সেদিনই ঠিক করলাম সাহিত্য-ফাহিত্যের ব্যাপারে আমি আর নেই। এরপর আমি আসলে সাহিত্যে ছিলাম না, কপি-টপি করা ছাড়া। মিডিলিসবার্গে যারা ডাক্তারি পড়তেন, তারা না চাইলেই গোল্ডমেডেল পেতেন…২১২টা ছেলে ৪০০টা গোল্ড মেডেল…
জীবনানন্দ তো ক্ষতি করেছেনই। ‘জীবনানন্দ সংখ্যা’ বার করতে গিয়ে আমার বই বেচে দিয়েছি, ঘড়ি বেচে দিয়েছি, আংটি বেচে দিয়েছি…

সৈকত হাবিব : জীবনানন্দের পাণ্ডুলিপি, যেটার কিছু দৃষ্টান্ত আপনার বইয়ে দেখি, তা অনেক জটিল। এই পাণ্ডুলিপি পাঠোদ্ধারের কাজটা করার মধ্যে আপনার আনন্দ বা সুখটা কোথায়..
ভূমেন্দ্র গুহ : কিছু আনন্দ নেই, আপনি একটা অঙ্ক মেলালে যে আনন্দ।

সৈকত হাবিব : এই যে পাণ্ডুলিপি পাঠ, এবং পাঠোদ্ধার, এটা যেমন ধৈর্যের কাজ, সাধনারও কাজ, একটা আবিষ্কারেরও আনন্দও আছে। কিন্তু এই কাজটা করার ব্যাপারে আপনার ডাক্তারিবিদ্যা কি কোনও সাহায্য করেছে? আপনার সার্জারিবিদ্যা কি লেখার সার্জারিতে কোনও কাজ করেছে?
ভূমেন্দ্র গুহ : ওই যে জীবনানন্দের ডাইপোডার ডিজঅর্ডারের রোগ ছিল এটা আবিষ্কার করেছি।

সৈকত হাবিব : আপনি নিজেও কবি এবং গদ্যকার। এই পরিচয় থেকেই আপনাদের ময়ূখ ও জীবনানন্দের সাথে সম্পর্ক। তবে বর্তমানে আপনার কবি-পরিচয়ের চেয়ে আপনি জীবনানন্দ-গবেষক পরিচয়টাই বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটা কি আপনার মৌলিকত্বকে কোনও ধরনের ক্ষতি করেছে?
ভূমেন্দ্র গুহ : কিচ্ছু মৌলিকত্ব-ফৌলিকত্ব নেই। বেঁচে আছি, কবিতাও মৌলিকত্ব নয়, এও মৌলিকত্ব নয়, কিছু একটা করতে হয় করছি। হলে হলো মৌলিক, না হলেও কোনও সমস্যা নয়।

সৈকত হাবিব : আপনি নিজে যে কবি এবং গদ্যকার, সেই জায়গা থেকে এর কোনও প্রভাব, ভালো বা মন্দ?
ভূমেন্দ্র গুহ : ইমপ্যাক্ট কিছু নেই, আগে কিছু সময় পাওয়া যেত। এখন আর পাই না।
সৈকত হাবিব : এতে কি আপনার কোনও গ্লানি কাজ করে, আমার নিজের লেখালেখি হলো না…
ভূমেন্দ্র গুহ : নো, কোনও গ্লানি-ফানি আমার নেই। গ্লানি কাজ করে কাদের, যারা খুব অ্যাম্বিশাস। আমার কোনও অ্যাম্বিশাস নেই আর গ্লানি কী কাজ করবে।

সৈকত হাবিব : জীবনানন্দের রচনার কোনও প্রভাব কি আপনার লেখার মধ্যে পড়েছে?
ভূমেন্দ্র গুহ : সেটা আমি কী করে বলব। সেটা যারা পড়েন তারা বলতে পারবেন। একজন বলেছেন, নাকি নেই।

সৈকত হাবিব : আপনার লেখাতেই পেয়েছি, জীবনানন্দ তাঁর বিশেষ অবসর সময়ে, যখন তাঁর চাকরি-বাকরি ছিল না, জীবনের দুই পর্বে, আট বছর, কথাসাহিত্যের চর্চা করেছেন। আজ আমরা যে জীবনানন্দের কথাসাহিত্যের কথা বলছি, তাকে কেবল অবসরের গান হিসেবেই দেখব, নাকি সেই অবসরের মধ্যে লেখার পরও এখানে কথাসাহিত্যে তাঁর বড় কোনও অবদান আছে বলে মনে করব?
ভূমেন্দ্র গুহ : একজন ব্যস্ত মানুষ কাজ করতে চায়, কর্মী মানুষ। সে কী করবে। আমি অবসরে আছি, রিটায়ার করেছি, আমি পার্কে কার মেয়ে কার সাথে পালিয়ে গেল, কার বাড়িতে কী হলো এই বিষয় আলোচনা করতে পারি। বুড়োরা যা করে। এইগুলি না করে এটা করছি। অবসর যে ভোগ করতে চায় না, জীবনানন্দের কাজ নেই কর্ম নেই– করবেটা কি সে? সে লিখছে, যেহেতু সে এই কাজটা পারে।

সৈকত হাবিব : যখন আপনি পাঠ-উদ্ধার করছেন, তখন আপনার কী মনে হয়, এর সাহিত্যমূল্য সম্পর্কে আপনার নিজের জায়গাটা…
ভূমেন্দ্র গুহ : সাহিত্যমূল্য না থাকলে আমার দায় পড়েছে এই কাজ করার! জীবনানন্দ হচ্ছেন বাংলা সাহিত্যে একমাত্র লোক, যিনি উপন্যাস কী হওয়া উচিত, হোয়াট ইজ কল নভেল– এটা তিনিই কেবল বুঝতে চেয়েছেন। নভেল যে কেবল রূপকথা নয়, গল্প নয়, একটা বড় লোকের ছেলে… একটা গরিবের মেয়ে লাগিয়ে দিলাম, তারপর খুব কান্নাকাটি হলো… পঞ্চাশ সিরিয়াল হলো…ষাট সিরিয়াল হলো…তারপর মরে গেল, কেন মরবে তাই বার করলাম…

সৈকত হাবিব : আপনি যদি নির্বাচন করেন, তাঁর গল্প বা উপন্যাসগুলো থেকে যে, এই উপন্যাস বা গল্পটা বিশেষ…
ভূমেন্দ্র গুহ : প্রত্যেকটা এক ছাঁচেই, জীবনানন্দের উপন্যাস, উইলিয়াম ফকনারের উপন্যাস পড়ে দেখুন…

সৈকত হাবিব : যেমন ধরেন, তাঁর ‘জলপাইহাটি’ উপন্যাস । আমার মনে হয় দেশভাগ নিয়ে এটা একটা মহাকাব্য। এই বিষয়ে আমি কিছু বলতে চাই না, বরং আপনার কাছ থেকে শুনতে চাই। তারপরও থাকে না যে আপনি এতগুলো কাজ করেছেন, কোনও একটা লেখা নিয়ে আপনার ব্যক্তিগত দুর্বলতা…
ভূমেন্দ্র গুহ : ‘আমরা চারজন’ নামে একটা উপন্যাস রয়েছে। ওটা আমার খুব প্রিয়।

সৈকত হাবিব : আপনার বর্ণনা থেকেই পাই, পাঠোদ্ধারের এখনো অনেক কাজ বাকি রয়ে গেছে। আপনার যা বয়স, আপনার যে সামর্থ্যরে জায়গা, চোখের অবস্থা…এসব কাজ শেষ করতে আর কতদিন লাগবে?
ভূমেন্দ্র গুহ : আমার এ জন্মে হবে না, পরের জন্মে হবে।

সৈকত হাবিব : আপনি কি কোনও উত্তরাধিকার তৈরি করে গেছেন, যারা আপনার এই কাজটা শেষ করবেন?
ভূমেন্দ্র গুহ : বাড়ির উত্তরাধিকার হয় না, তার আবার এই কাজের উত্তরাধিকার!

সৈকত হাবিব : তারপরও থাকে না, যেমন গৌতম মিত্র আপনাকে কিছু সাহায্য করেছেন।
ভূমেন্দ্র গুহ : গৌতম মিত্র নামে কেউ ভাই হেল্প-টেল্প করে নাই। আপনাদের প্রজন্ম ভাই খুব ডিফিকাল্ট প্রজন্ম। খারাপ কথা শুনবেন না। এরা খালি ঝগড়া বাজায়, কত কম পরিশ্রমে কত বেশি পাওয়া যায়। গৌতম মিত্র কখনও এসব একটা লাইন লেখেনি। সে কেবল কিছু সংবাদ সংগ্রহ করেছে। তার মানে এসিস্ট করা নয়। তার দাবি হচ্ছে আমি সম্পাদক হব।

সৈকত হাবিব : তার মানে কেউ নেই। আপনার পরে কেউ নেই।
ভূমেন্দ্র গুহ : কেউ থাকুক এটা আমি চাইও না।

সৈকত হাবিব : আচ্ছা চানও না। তাহলে যে কাজ আছে বলে আপনি মনে করেন, আপনি যদি করতে চান জীবনানন্দের ডায়েরি, লিটারেরি নোটস ইত্যাদি বা আরও যে কবিতা, এগুলো শেষ করতে আর কতদিন লাগবে বলে আপনার মনে হয়। আপনি যেভাবে কাজ করছেন?
ভূমেন্দ্র গুহ : আরে বাবা বলছি তো, এখনো যা আছে আমার জন্মে তা কুলোবে না।

সৈকত হাবিব : আপনার যেমন জীবনানন্দের পরিবারের সাথে নিবিড় সম্পর্ক ছিল, তেমন তাঁর রচনার সঙ্গেও নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। এখন জীবনানন্দকে যদি সংক্ষেপে মূল্যায়ন করতে বলা হয় আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
ভূমেন্দ্র গুহ : শোনেন, তিনি একজন সার্থক কবি, বড় কবি, কবি বলতে যা বোঝায় তা তিনি। কবির সংজ্ঞা অনুসারে তাঁকে ফেলা যায়। যে কবিকে ভারতীয় পুরাণ শাস্ত্র বলত, কবি মনীষী। কবি পৃথিবীকে দেখতে পায়। মনীষী তাঁকে বলা যায়, তা অনেককেই বলা যায় ভাই।

সৈকত হাবিব : জীবনানন্দ নিয়ে তো অনেক চর্চা ও গবেষণা হয়েছে দুই বাংলায়। তারপরও কি আপনার মনে হয় এমন কোনও অঞ্চল রয়েছে, যেখানে কাজ করা বাকি?
ভূমেন্দ্র গুহ : জানি না ভাই। যে কাজ করার সে খুজে নেবে, যে কাজ করতে চায় সে খুঁজে নেয়।

সৈকত হাবিব : জীবনানন্দের গল্পের মধ্যে, সুবিনয় মুস্তফী সম্পাদিত, সেটাতে আপনার ভূমিকায় আছে, কথাসাহিত্যিকদের মধ্যে অনেকেই তখন জীবনানন্দের গল্প-উপন্যাস নিয়ে খুব ব্যঙ্গ করেছে…
ভূমেন্দ্র গুহ : কোন সুবিনয় মুস্তফী, আমি তো কোনও ভূমিকা লিখিনি।

সৈকত হাবিব : সুবিনয় মুস্তফীর ওই যে তিনটা গল্প নিয়ে একটা বই (জীবনানন্দ দাশের গল্প), নয়া উদ্যোগ থেকে যেটা বের হয়েছে।
ভূমেন্দ্র গুহ : ও হ্যাঁ, ওটাতে আমিই ভূমিকা লিখেছিলাম।

সৈকত হাবিব : ওইখানে আপনি বলেছেন, তার সমসাময়িকদের মধ্যে অনেকেই খুব মজাটজা করছে– গিন্নি আমার এইগুলি গুছিয়ে-টুছিয়ে রাখো, আমিও একদিন বিখ্যাত হবো। এই যে জীবনানন্দের গল্প-কথাসাহিত্য নিয়ে এত ব্যঙ্গ, আর আজকের যে অবস্থাটা এ সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কী?
ভূমেন্দ্র গুহ : কিচ্ছু মূল্যায়ন নেই, যারা বলেছেন তারা কখনও ভাবেননি জীবনানন্দ গল্প লিখতে পারে, এক নম্বর কথা। তারা কখনও ভাবেনি জীবনানন্দ কবিতা লিখতে পারে, দুই নম্বর কথা। তারা সবাই ভেবেছে জীবনানন্দ গ্রাম্য, গ্রামীণ, লেখাপড়া জানেন না, আবেগের মাথায় কবিতা লেখেন। তারা বলেছেন, বলেছেন। যারা বলেছেন তারা অত্যন্ত পণ্ডিত লোক। যিনি বলেছেন তাঁর প্রথম কবিতার বইয়ের নাম ‘ঊর্বশী ও আর্টেমিস’ (বিষ্ণু দে)। বুঝতে পেরেছেন? এমনি বিদেশি আর্টেমিস ছাড়া যার প্রথম কবিতার বই হয় না, তিনি তো বলবেনই।

সৈকত হাবিব : আপনি পঞ্চাশ বছরের বেশি সময় ধরে জীবনানন্দ চর্চা করছেন, সেক্ষেত্রে আপনার বই হলো মাত্র দুইটা। ‘আলেখ্য জীবনানন্দ’ আর ‘জীবনানন্দ ও সঞ্জয় ভট্টাচার্য’। কিন্তু কোনও পূর্ণাঙ্গ কাজ ওই অর্থে পাইনি, এর কারণটা কী?
ভূমেন্দ্র গুহ : শুনুন, আমি কোনও গদ্যকার নই, আমি বিশ্লেষক নই, আমি বিশেষজ্ঞ নই। আমার কাজ কপি করা। তবু লোকে মঝেমধ্যে উইশ করে, আমাকে লিখতে বলে, বাধ্য হয়ে লিখতে হয়, বাধ্য হয়ে যা লিখি সে কটাই যা লেখা।
আমি মশাই ক্ষেত্র গুপ্ত নই, যে আমাকে প্রবন্ধ লিখে বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠ্য করে বড়লোক হতে হবে।

সৈকত হাবিব : আপনি ভূমেন্দ্র গুহ বলেই তো এ কথা বলছি, যে কেন আপনি আরও কিছু করেননি…
ভূমেন্দ্র গুহ : আমার কী দায় পড়েছে বলুন যে, গণ্ডায় গণ্ডায় বই লিখতে হবে। আমার কথা কটা, সেটা লিখতে কটা পাতা লাগে?

সৈকত হাবিব : মজার ব্যপার হলো, আপনার প্রতিটা বইয়ের ভূমিকাতেই কিন্তু আমরা অনেক নতুন নতুন কথা পেয়েছি।
ভূমেন্দ্র গুহ : পেয়েছেন, সেটা আমার ভাগ্য। আমার ব্যক্তিগতভাবে মনে হয়, আমার কী এমন কথা থাকতে পারে যে মোটা মোটা বই লিখব আর খালি ইউনিভার্সিটির দিকে তাকিয়ে…। আমি গবেষক হবো।

সৈকত হাবিব : মোটা লিখবেন না ঠিক আছে। মোটা বইয়ের পরিকল্পনা নাই কিন্তু চিকন বইয়ের কোনও পরিকল্পনা আছে?
ভূমেন্দ্র গুহ : কোনও পরিকল্পনা নাই। কেবল দায় থেকে আমি লিখি।

সৈকত হাবিব : আপনাকে অনেক অত্যাচার করা হয়ে গেছে, আর দু-একটা প্রশ্ন করে শেষ করব। রবীন্দ্রনাথের পর বাংলা সাহিত্যে জীবনানন্দের যে প্রভাব…এটা এখনো… এত দীর্ঘ প্রভাব কোনও ব্যক্তির ক্ষেত্রে খুবই দুর্লভ ঘটনা।
ভূমেন্দ্র গুহ : কিসের প্রভাব?

সৈকত হাবিব : এখন পর্যন্ত, এখনকার কবিদের মনোজগতেও জীবনানন্দ প্রভাব বিস্তার করে আছেন…
ভূমেন্দ্র গুহ : যেসব কবিতা পড়ি, বোঝা তো যায় না প্রভাবিত করেছে।

সৈকত হাবিব : অনেক ধন্যবাদ আপনাকে।

সাক্ষাৎকার : সৈকত হাবিব
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম.বিডি
বাংলাদেশ স্থানীয় সময় ২১৩৫, অক্টোবর ২১, ২০১০

[ad#co-1]