আয়রে ছোটন ফিরে আয়

সুপা সাদিয়া
‘জন্মিলে মরিতে হইবে, জানে তো সবাই, তবু মরণে মরণে ফারাক আছে ভাইরে, সব মরণ তো নয় সমান’_ লক্ষ্মী পূর্ণিমার রাতে এ কোন লক্ষ্মীছাড়া কাজ তোর ছোটন। কোন নেশায় ডুবলি তুই! তোর বুক-প্রাণ তখন কেবল কারও জন্য কেঁদেছিল? একটিবারও কি কাঁদে নাই এই পৃথিবীর জন্য, তবে কী করে ছেড়ে যেতে পাড়লি, এই পৃথিবী। ছোটন নামটা যেন মায়াভরা আর আদুরে। কেমন করে ছেড়ে গেলি তুই মায়ের কোল। তুই তো জন্মিছিলি এক তুখোড় সাংবাদিক হওয়ার নেশায়। ১৯৮৩ সালের ২৩ জুলাই এসেছিলি মায়ের কোল আলো করে। প্রতি বছর অক্টোবরের এ সময়টা লালনের গানের আসর বসে মুন্সীগঞ্জের সিরাজদীখান উপজেলার দোসরপাড়ায়। ২২ অক্টোবর ছোটন কয়েকজনের সঙ্গে যাচ্ছিল লালনের দর্শন জানতে, শুনতে। ট্রলারে উঠেছিল বেশ কয়েকজনের সঙ্গে আসরে যাবে বলে। এরই মধ্যে একটি বালুভর্তি জাহাজের সঙ্গে মুখোমুখি হয় ছোটনদের অর্ধশতাধিক যাত্রী নিয়ে ট্রলারটি। এরপর চারদিকে কেবল বাঁচাও বাঁচাও আর তারপর স্বজনদের আহাজারি।

ছোটনের বাড়ির সবাই অপেক্ষায়। নাহ ফিরল না তো ছোটন, তাদের উৎকণ্ঠা বাড়তে শুরু করল। ছোটনের তো এতক্ষণে অফিস থেকে ফেরার কথা। কোথায় আমাদের ছোটন। বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন কেউ জানে না ছোটন কোথায়। নির্ঘুম রাত আর প্রলাপ ‘আয়রে ছোটন ঘরে আয়’। ছোটনের কর্মক্ষেত্রের পরিবার জেনে গেছে ট্রলারডুবি আর ছোটনের নিখোঁজ হওয়ার কথা। ছোটনের যাত্রাপথের সঙ্গী ছিল তার আরেক সহকর্মী। তিনিই জানালেন। ওই আসরে পেঁৗছে যাওয়া ছোটনের অন্যান্য সহকর্মী সবাই ইছামতি নদীর তীরে, অপেক্ষা ছোটনের জন্য। কেউ ছুটে গেল ছোটনের বাড়িতে খবর দিতে। অনেকে এলাকা চেনে, তবে জানা নেই ওর বাড়ি। রাত ঘুরে ফিরে এলো, ছোটনের বাড়ি পাওয়া গেল না। সূর্য আকাশে উঠতে না উঠতেই ছোটনের সিভি থেকে সংগ্রহ করা হলো বাড়ির ঠিকানা। যাওয়া হলো ছোটনের প্রিয় বাড়িতে। তারপর দিগ্গি্বদিক, আকাশ-বাতাস বিদীর্ণ কেবল_ ‘ছোটন আয়, ফিরে আয়_ ফিরে আয়।’ ছোটনের কর্মস্থল চলছে নিজস্ব নিয়মে। তবে কারও মুখে হাসি নেই, এমনকি কথাও যেন কেড়ে নিয়েছে ছোটন। তবু চলছে পত্রিকা অফিসের প্রাত্যহিক কাজ।

প্রতিদিনের মতো সকালের সভা শেষে সংবাদ সংগ্রহে ব্যস্ত হয়ে গেল একদল কর্মী। কেবল সে দলে নেই ছোটন। সংবাদ সংগ্রহ করতে করতে আজ নিজেই সংবাদ হয়ে গেল আমাদের ছোটন। বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে ব্রেকিং নিউজ, রেডিওর খবর_ ‘মুন্সীগঞ্জে ট্রলারডুবিতে দৈনিক বাংলাদেশ সময়-এর স্টাফ রিপোর্টার মহিউদ্দিন ছোটনসহ ৪ জন নিখোঁজ।’ অবশেষে ১২টার দিকে ছোটনকে পাওয়া গেল। ট্রলারের একদম নিচে ছোটন আর কনক। ‘ফিরে আয়, ফিরে আয় ছোটন_ সবার ডাকে ফিরে এলো ছোটন। ভেজা কাপড় আর পেটে একটা কালো দাগ, আর সবই তো ঠিক ছিল। কিন্তু কেবল ফিরে এলো না ছোটনের প্রাণ। ছোটনের বাড়িতে বাড়তে শুরু করল লোকসমাগম। ছোটনের কর্মস্থলে সবার চোখে যেন কাকে খুঁজে ফেরার আকুতি, কারও মুখে ভাষা নেই। পরনে কালো ব্যাচ। ছোটন ২০০৯ সালে এই কর্মক্ষেত্রে যোগদান করে, তার সহকর্মীরা অন্য অনেক প্রতিষ্ঠানে কর্মরত। তারা একের পর এক জমায়েত হচ্ছে ছোটনের বর্তমান কর্মস্থলে। কোনো সমবেদনা জানাতে নয়, সহমর্মিতাকে ছুঁয়ে দিতে। ছোটনকে আনা হতে পারে কর্মস্থলে_ অনেকের মধ্যে এমন একটা আকুতি থেকে বসে থাকা অফিসে। কিন্তু অবশেষে সবার একটাই কথা_ কী দরকার ওর এই মুখটা দেখে। মনে গেঁথে থাক ওর হাস্যোজ্জ্বল মুখখানি। ও বাঁচুক সবার হৃদয়ে যুগ থেকে যুগান্তরে।

[ad#co-1]