গণমাধ্যমের স্বাধীনতা

ফয়েজ আহমদ
আমাদের দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে গণ-মাধ্যমের স্বাধীনতার প্রশ্ন আমাদের কাছে প্রকৃত স্বাধীনতার মতোই মূল্যবান। কোনো দেশের কোনো নাগরিকই গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ব্যতিরেকে পূর্ণ স্বাধীনতা অর্জন করে না। যে কোনো নাগরিকের জীবন তার দেশীয় স্বাধীনতার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। এই স্বাধীনতাকে যদি কোনো স্বৈরাচারী শাসকগোষ্ঠী হরণ করতে চায় বা হরণ করে, তবে সেই দেশের সমগ্র সচেতন মানুষের বিরোধিতার ইতিহাস সৃষ্টি হয়। মানুষের ব্যক্তিগত স্বাধীনতার অন্যতম এই সংবাদপত্রের স্বাধীনতা কোনো দিনই পরিহার করার মতো নয়।

বিশ্বের সর্বত্রই স্বৈরাচারী একচ্ছত্র শাসকরা প্রথমেই সংবাদপত্রের স্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপ করে। আমাদের পূর্বপুরুষ নওয়াবজাদা লিয়াকত আলী খান, জেনারেল আইয়ুব খান ও তাদের সহযোগীরা পাকিস্তানের জনগণের সংবাদপত্রের স্বাধীনতা হরণ করেছিল। শুধু তাই নয়, তারা পরবর্তী সময়ে বেনামে দৈনিক পত্রিকা বের করে স্বাধীন নিরপেক্ষ পত্রিকাগুলোকে আক্রমণ করত এবং স্বৈরাচারী সরকারগুলোকে সমর্থন দিত। আমাদের দেশ স্বাধীন হওয়ার পর এখনও শাসকরা স্বাধীন ও নিরপেক্ষ পত্রিকাকে পরিপূর্ণভাবে গ্রহণ করতে রাজি নয়। সরকার পক্ষ প্রাইভেট স্যাটেলাইট চ্যানেলগুলোর স্বাধীন মতামত স্তব্ধ করার জন্য নানা ফন্দি আবিষ্কার করছে এবং এখন তারা সরকারি চ্যানেলের সংবাদ এসব প্রাইভেট চ্যানেলের ওপর চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টায় রত, এখন অনেক ক্ষেত্রে চ্যানেলগুলো সরকারি চ্যানেলের খবর বাধ্যতামূলকভাবে দিচ্ছে।

বিভিন্ন টকশোতে সরকার চেষ্টা করছে তাদের পরিচালক উপস্থাপকের ভূমিকা যেন পালন করে। তাতে স্বাধীন কথকদের বক্তব্য নিয়ন্ত্রণ করা হয়তো সম্ভব হবে। অথবা সরকারি উপস্থাপক তাদের কাউন্টার করবে। এই পরিস্থিতি। দৈনিক পত্রিকাগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য কোনো সরকারি এডিটর বসাতে হয়নি। বিজ্ঞাপনের নিয়ন্ত্রণ ও জবরদস্তিমূলক আইনের ফাঁক-ফোকর সংবাদপত্রের সম্পাদকদের নিয়ন্ত্রণ করছে।

এমন পরিস্থিতি কোনো সুসভ্য দেশের জন্য নয়। অবশ্যই কোনো পত্রিকা বা চ্যানেল দেশমাতৃকার বিরোধিতা করবে না, তাদের নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন ওঠে কেন?

বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর আমাদের দেশের সংবাদপত্রের ওপর সরকারি হস্তক্ষেপ হয়েছে। আমি ব্যক্তিগতভাবে দু’টি পত্রিকার কথা জানি, যাদের স্তব্ধ করা হয়। একটি হচ্ছে মওলানা ভাসানীর পত্রিকা ‘সাপ্তাহিক হক কথা’। এই পত্রিকাটি অতীব পরিমার্জিত ছিল না সত্য, কিন্তু তার মধ্যে যে তেজি ও স্পষ্ট বক্তব্য জনগণের পক্ষে থাকত, তা তুলনাহীন। পরবর্তীকালে এই পত্রিকার পৃষ্ঠপোষক মওলানা ভাসানীকে তাঁর বাড়িতে অঘোষিতভাবে গৃহবন্দি করে রাখা হয়। সেই সময় আমি একপর্যায়ে গোপনে টাঙ্গাইলের সন্তোষে যাই এবং মওলানা ভাসানীর চালাগৃহে গোপন সাক্ষাত্কার গ্রহণ করি। সেই সময় ‘বঙ্গবার্তা’ বলে একটি দৈনিকের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন মওলানা ভাসানী এবং আমি ছিলাম প্রধান সম্পাদক। সেই বঙ্গবার্তাতেই এই ইন্টারভিয়্যু ছাপা হয়। তাতে শাসক কর্তৃপক্ষ ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন।

কিছুদিনের মধ্যে এই পত্রিকার সব সরকারি বিজ্ঞাপন বন্ধ করা হয় এবং বেসরকারি এই পত্রিকার বিজ্ঞাপনদাতাদের ইনফরমেশন ডিপার্টমেন্ট থেকে বিজ্ঞাপন যেন না দেয়া হয় সেজন্য গোপনে সতর্ক করা হয়। এরপর পত্রিকাটি কর্তৃপক্ষ বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয় ।

১৯৭৫ সালে বাকশাল প্রতিষ্ঠার কালে দেশের সংবাদপত্র শিল্পে আরেক বিপর্যয় নেমে আসে। সেই সময় মাত্র চারটি পত্রিকা রেখে সমগ্র দৈনিক/সাপ্তাহিক পত্রিকা বন্ধ করে দেয়া হয়। এমন ভয়াবহ বিপর্যয় সংবাদপত্র জগতে ইতিপূর্বে আসেনি। যে ক’টি পত্রিকাকে সরকার প্রকাশ করার অনুমতি দিল, তারা সরাসরি সরকারের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। এইভাবে স্বাধীন বাংলাদেশেও সংবাদপত্রের কণ্ঠরোধ হয়েছিল।

এরশাদ আমলে সাংবাদিককে জব্দ করার চেষ্টা চলে এবং অনেক ক্ষেত্রে এরশাদ জায়গাজমি দিয়ে সাংবাদিকদের হাতে নেয়ার চেষ্টা করে। সেই সময় আমি এরশাদের কারাগারে আটক ছিলাম।

[ad#co-1]