মতিন ভাই আমাদের কিংবদন্তির নায়ক

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
আমরা যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তাম, তখন আমাদের কাছে মতিন ভাই ছিলেন কিংবদন্তির নায়ক। মতিন ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে আমি ইতিহাসকে দেখতে পাই। এ দেশের রাজনৈতিক আন্দোলনের একটি বিস্তৃতি ইতিহাস যেটা পাকিস্তান হওয়ার পরপরই শুরু হয়েছে। ’৫২-এর রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের পর আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে আসি। ওই সময় উনি নেতা ছিলেন। তাঁর নেতৃত্বে বিশ্ববিদ্যালয় সংগ্রাম পরিষদ ’৫২-এর ২১ ফেব্রুয়ারিতে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করছিল। এটা একটি ঐতিহাসিক ঘটনা এবং ঐতিহাসিক মুহূর্ত। এটা যে কতটা তাত্পর্যপূর্ণ, সেটা আমরা তখন বুঝিনি। কিন্তু আমরা পরে দেখলাম মতিন ভাই ওই জায়গায় থেমে রইলেন না।

রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে অন্য যারা অংশ নিয়েছিলেন যেমন গাজীউল হক, কাজী গোলাম মাহবুব, তাঁরা একপর্যায়ে সরে গেলেন। এটা ছিল ছাত্রদের ধারা এবং বামপন্থী ধারা। মতিন ভাই এটাকে ধারণ করে কমিউনিস্ট আন্দোলনে চলে গেলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রি নিয়ে তিনি কৃষক আন্দোলনে চলে গেলেন এবং সেখানেই রইলেন। এটা খুব অসাধারণ ঘটনা ছিল। বিশেষ করে মুসলমানদের মধ্যে এটা ঘটেনি। সরদার ফজলুল করিম একবার গিয়েছিলেন, কিন্তু তিনি ফেরত এসেছিলেন। পরবর্তী সময়ে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতাও করেছেন। কিন্তু মতিন ভাই কৃষক আন্দোলনের মধ্যেই রয়ে গেলেন। শ্রেণীচ্যুত হওয়ার যে ঘটনা আমরা কমিউনিস্ট সাহিত্যে পড়ি, তিনি ছিলেন তার একজন মূর্তপ্রতীক। তিনি কৃষকদের সঙ্গে থাকেন, তাদের মতো জীবনযাপন করেন, পুলিশ তাঁকে ধরতেও পারে না, চিহ্নিতও করতে পারে না। এটা হলো মতিন ভাইয়ের সংগ্রামী জীবনের একটি দিক।

মানুষ হিসেবেও মতিন ভাই অসাধারণ। তাঁর মতো ভদ্র, সজ্জন এবং হৃদয়বান ব্যক্তি আমাদের রাজনীতিতে সচরাচর পাওয়া যায় না। তিনি যে কেবল শ্রমজীবী মানুষের সঙ্গে রাজনীতি করেছেন তা নয়—আমি দেখেছি, ঢাকা শহরে যে এলাকায় তিনি থাকতেন, সেখানেও তাঁর একটা প্রভাব পড়ত। যেমন—তিনি একসময় জিগাতলার একটি বাড়িতে থাকতেন। ওখানে আমাদের এক আত্মীয় বাড়ি ছিল। তাদের পরিবারও জানত, এখানে মতিন ভাই আছেন। আমাদের ওই আত্মীয় পরিবারের একজন যখন মারা গেলেন, সেদিন আমি মতিন ভাইকে দেখলাম লুঙ্গি পরা অবস্থায় ওই বাড়িতে এসেছেন এবং তাদের সঙ্গে মিশে আছেন। জনগণের সঙ্গে মেশা কমিউনিস্ট আন্দোলনের জন্য বড় প্রয়োজন এবং এটা না পারাটা একটি বড় দুর্বলতা। এ দুর্বলতা মতিন ভাইয়ের মধ্যে ছিল না। উনি কৃষক, মধ্যবিত্ত, ছাত্র সবার সঙ্গে মিশতে পারতেন। এটা তাঁর চরিত্রের একটি অসাধারণ বিষয়।

ভাষা আন্দোলনের মধ্যে বাম উপাদান তখন বোঝা যায়নি। উপাদান হিসেবে বলছি এই জন্য যে, নেতৃত্বটা বামপন্থীরা দিয়েছেন। শুধু এটাই নয়, উপাদানটা হচ্ছে ধর্ম থেকে ভাষায় চলে যাওয়া। পাকিস্তান আমলে জাতীয়তাবাদের উপাদান হিসেবে ধর্মকে প্রত্যাখ্যান করে ভাষায় চলে যাওয়ার ব্যাপারটি একটি বৈপ্লবিক ঘটনা। এর সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক এবং অর্থনৈতিক তাত্পর্য তখন পরিষ্কারভাবে বোঝা যায়নি। মতিন ভাইদের রাজনীতিতে ধর্মনিরপেক্ষতা, ইহজাগতিকতা এবং গণতান্ত্রিক উপাদান প্রতিফলিত হলো এবং ওই রাজনীতিকে তারা আরও বিকশিত করলেন। সেই রাজনীতিটা এই রকম—ভাষা কোনো শ্রেণীর সম্পত্তি নয়। ভাষা কোনো শ্রেণী মানে না। ধর্ম দিয়ে হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে একটি বিভাজন তৈরি করা যায়। কিন্তু ভাষা দিয়ে এ ধরনের বিভাজন তৈরি করা যায় না।

ভাষা আন্দোলনে সাধারণ মানুষ যে অংশ নিয়েছে, তার একটি কারণ হলো তাদের মনে বিক্ষোভ ছিল এবং ব্যর্থতার বোধ ছিল। এর সঙ্গে এই অনুভূতিও ছিল যে, বাংলা তাদের মাতৃভাষা। সে জন্য এই আন্দোলনের যে স্বতঃস্ফূর্ত ব্যাপকতা, সেটা অন্য কোনো আন্দোলনে দেখা যায়নি। এর আগে পাকিস্তানের পক্ষে ভোট হয়েছে, সেটা ভোটের রাজনীতি। ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য কিন্তু এই অঞ্চলের মানুষ (বাঙালি মুসলমান) ভোট দেয়নি। তারা ভোট দিয়েছিল তাদের মুক্তির জন্য। সেই মুক্তির পথেই ভাষা আন্দোলন আরেকটা ধাপ। অর্থাত্ পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদ প্রত্যাখ্যান করে ভাষাভিত্তিক ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদ প্রতিষ্ঠা। এটাকে আবদুল মতিনরা ধারণ করেছেন। মওলানা ভাসানীও এটাকে ধারণ করেছেন। আওয়ামী লীগের লোকেরা এটা তখনও ধারণ করেনি। কেননা আওয়ামী লীগের নাম তখনও আওয়ামী মুসলিম লীগ। ’৫৪ সালের নির্বাচনের পরে তারা মুসলিম শব্দটা বাদ দিয়েছে। ’৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের বিজয়ের পটভূমি তৈরি করেছিল ভাষা আন্দোলন। এ নির্বাচনে জনগণের রায় যেভাবে বেরিয়ে এল সেটা ভাষা আন্দোলনের যে বিক্ষোভ, যে আকাঙ্ক্ষা এ দুটোই তার মধ্য দিয়ে প্রতিফলিত হলো।

আবদুল মতিন তখন আমাদের কিংবদন্তির নায়ক ছিলেন এবং আমরা আশা করতাম যে এই আন্দোলনটা এগিয়ে যাবে। কিন্তু কমিউনিস্ট আন্দোলনের যে দুর্বলতা, সেটাও মতিন ভাইরা ধারণ করেছেন এ অর্থে যে, তারা ওই সময়ের সমাজ এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ব্যাখ্যা পরিষ্কারভাবে দিতে পারেননি। প্রথমে তারা ওই সময়ের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে পুঁজিবাদী হিসেবে চিহ্নিত করেন। কিন্তু পরে তারা এটাকে প্রত্যাখ্যান করে সামন্তবাদী হিসেবে উল্লেখ করেন। সামন্তবাদের উপাদানগুলো তখন থাকলেও এটা অর্থনীতিতে ছিল না। পুঁজিবাদ তখন ঢুকে পড়েছে। শ্রম এবং পুঁজির মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়েছে। বিষয়টি তখন তারা ধরতে পারলেন না। কেননা চীনে আধা সামন্তবাদী এবং আধা ঔপনিবেশিক যে রাষ্ট্রব্যবস্থা ছিল, সেই কথাটা তারা ধারণ করলেন। যদিও চীনের গোটা অর্থনীতি আধা সামন্তবাদী বা আধা উপনিবেশবাদী ছিল না। তখন অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বিবেচনায় তখন চীনের শহরগুলো ছিল আধা ঔপনিবেশিক এবং গ্রামগুলো ছিল আধা সামন্তবাদী। এ ব্যাপারে তাদের একটি ভুল হলো। তারা বিষয়টি বিশ্লেষণ করতে পারলেন না, দলের মধ্যে একটি বিতর্কের সৃষ্টি হলো এবং বিভক্তি দেখা দিল।

তারপর আরও বড় ঘটনা যেটি ঘটল, তাহলো পাকিস্তান আমলে রাষ্ট্রের ভেতরে মূল দ্বন্দ্ব বিষয়ে। তখন মুখ্য দ্বন্দ্বটা ছিল বাঙালির সঙ্গে পাঞ্জাবি রাষ্ট্র ক্ষমতার। এই দ্বন্দ্বটাকে তারা ধারণ করতে পারলেন না। তারা সারা পাকিস্তানজুড়ে একটা শ্রেণী সংগ্রাম চালানো এবং এর মাধ্যমে মুক্ত হওয়ার কথা ভাবলেন। কিন্তু শ্রেণী-সংগ্রামকে সামনে আনার জন্য জাতিগত সমস্যার মীমাংসা দরকার ছিল । এই জাতির ওপর যে নিপীড়ন চলছিল, পূর্ববঙ্গের মানুষ বাঙালি হিসেবে যে নির্যাতিত হচ্ছিল—এটা বামপন্থীরা বুঝেছিলেন। মওলানা ভাসানী এটা বলেছিলেন। পরবর্তী সময়ে বামপন্থীদের অনেকে জনগণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের কথা বলেছেন। কিন্তু জাতীয়তাবাদী আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে এবং নেতৃত্ব দিয়ে কমিউনিস্ট পার্টি পূর্ববঙ্গকে স্বাধীন করতে পারল না। শেখ মুজিবুর রহমান ওই জাতীয়তাবাদী আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করলেন। যেটা মতিন ভাইরা অনেক কষ্ট, আন্দোলন এবং আত্মত্যাগ করার পরেও ধারণ করতে পারলেন না। ফলে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনটা চলে গেল ওদের হাতে এবং বামপন্থীদের নেতৃত্বে যে পূর্ববঙ্গ স্বাধীন হওয়ার কথা ছিল, তা ঘটল না।

আরও একটি বড় ঘটনা হলো মস্কো এবং পিকিংপন্থীর দ্বন্দ্ব । তখন মওলানা ভাসানীর দুই বাহু শ্রমিক ফ্রন্টের মোহাম্মদ তোয়াহা এবং কৃষক সমিতির প্রধান আবদুল হক পদত্যাগ করলেন। কিন্তু মতিন ভাই পদত্যাগ করলেন না। তবে মতিন-আলাউদ্দিন মিলে একটি শক্তিও গড়ে তুলতে পারলেন না। এটা করতে পারলে তারা মওলানা ভাসানীকে সঙ্গে পেতেন। সেই সঙ্গে আমাদের জাতীয়তাবাদী মুক্তি আন্দোলনকে সমাজতান্ত্রিক মুক্তির দিকে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে মতিন ভাইরা একটি বড় ভূমিকা পালন করতে পারতেন। কিন্তু পারলেন না—এটাই হচ্ছে তাঁর দুর্বলতা। সে কারণে ওই যে কিংবদন্তির নায়ক, ভাষা আন্দোলনে তাঁর ভূমিকা, ভাষা আন্দোলনের মধ্যে যে বামপন্থী উপাদান আছে তাকে বিকশিত করা ইত্যাদি কাজ তাঁরা করলেন, কঠিন আত্মত্যাগ করলেন। এ সত্ত্বেও তাদের নেতৃত্বে দেশ স্বাধীন হলো না। তাদের নেতৃত্বে যদি দেশ স্বাধীন হতো, তাহলে আমরা আরও অনেক দূর এগিয়ে যেতে পারতাম।

আর কমিউনিস্ট আন্দোলনের সফলতার দিক হচ্ছে— আত্মত্যাগ ও শ্রেণীচ্যুতি। ওই সময়ে সমাজে ধর্মান্ধতা বিরাজমান, কমিউনিজমের কথা বললে রাষ্ট্র ঝাঁপিয়ে পড়ত। এমন পরিস্থিতিতে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর বামপন্থীরা যেভাবে আন্দোলন করেছেন এবং মতিন ভাই নেতৃত্ব দিয়েছেন, সেটা একটি অসাধারণ ঘটনা। এটা আমাদের জাতীয় মুক্তির ইতিহাসে একটি গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত থাকবে।

তাঁর নিজের লেখা থেকে
দেশব্যাপী যখন একমাত্র দাবি ‘বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা চাই’, যখন দেশের ছাত্ররা বলছে রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই, যখন কৃষকরা বলছে তারা জমিদার-মহাজনি চায় না; তারা নিজেরা জমির মালিক হতে চায়, অর্থাত্ যখন সবার প্রয়োজন এমন একটা রাষ্ট্রের যে রাষ্ট্রের রাষ্ট্রভাষা হবে তাদের মাতৃভাষা। সে অবস্থায় ভাষা আন্দোলনে যারা আকস্মিকভাবে বা ঘটনাক্রমে জড়িত হলো (যা এখনও আন্দোলনে রূপান্তরিত হয়নি, যা এখনও দাবি মাত্র—তার সংগ্রাম কমিটির বা যার নেতাদের গা থেকে এখনও সাম্প্রদায়িকতার গন্ধ পর্যন্ত যায়নি, ছয় মাসও হয়নি যারা নিজেদের পাকিস্তানের এক-একজন অঘোষিত ‘কায়েদে আজম’ মনে করত, যারা মনে করত ইসলামই সব রাজনৈতিক সমস্যার একমাত্র সমাধান, মুসলমানরা কেবল ধর্মগতভাবে নয় জাতিগতভাবেও সর্বশ্রেষ্ঠ, যাদের মাথার মধ্যে তখনও জাতি অর্থ ধর্ম, অন্য কথায় ধর্ম অর্থ জাতি) তারাও ভাষার মতো সর্বোচ্চ কঠিন ও জটিল। ভাষা যেখানে জাতির প্রধান বহিঃপ্রকাশ তারাই কিনা এ রকম একটা ব্যাপারে নেতৃত্ব দেবে, সেই আন্দোলনকে জয়যুক্ত করবে।

বাস্তবে কী হলো? ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ দেশব্যাপী বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জানিয়ে কয়েকজন (শেখ মুজিবুর রহমান, অলি আহাদ, কাজী গোলাম মাহবুব, যিনি ৩১ জানুয়ারি ১৯৫২ তিন সপ্তাহ মাত্র সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক হয়েছিলেন) প্রমুখরা জেলে আশ্রয় নিলেন, কয়েকজন (কমরুদ্দীন আহমদ, অধ্যাপক আবুল কাশেম প্রমুখ) যাদের সরকার ধরাও প্রয়োজন মনে করেনি। কয়েকজন আন্দোলনের সঙ্গে সম্পর্কহীন থেকে আন্ডারগ্রাউন্ড হলেন তারা যে ভাষা আন্দোলনের তখনও নেতৃত্ব দেয়ার যোগ্য না তার প্রমাণ দিলেন।

ভাষা আন্দোলন যে নবগঠিত রাষ্ট্র পাকিস্তানের জন্য কী প্রচণ্ড চ্যালেঞ্জ তার অস্তিত্বের মামলা যার জন্য অসুস্থ শরীর নিয়ে যার শেরওয়ানির ভাঁজ কোনো দিন ভাঙে না তার ‘যোগ্য’ প্রতিভূ পূর্ব বাংলার উজিরে আজম খাজা নাজিম উদ্দিনের একবার পদধূলি প্রদানের আকুল আবেদনে সাড়া দিয়ে ১০ মার্চ অহরাহ্নে তেজগাঁও বিমানবন্দরে এসে নামলেন ‘কায়েদে আজম’ মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ। যোগ্য উজিরে আজম রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) কায়েদে আজমের গণসংবর্ধনা ও ভাষণের আয়োজন ব্যর্থ হলো। শাসকরা কল্পনা করতে পারেনি যে, যেখানে পাকিস্তানের গভর্ণর জেনারেল শাহেন শাহ পাকিস্তানের আর্কিটেক্ট কায়েদে আজম যখন বজ্রকণ্ঠে বলেন—উর্দু, কেবলমাত্র উর্দুই, অন্য কোনো ভাষা নয়, হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা—তখন করতালি ধ্বনিতে জনতা ফেটে পড়ে না এবং মানুষ সভাস্থল ত্যাগ করতে শুরু করে; তখন আয়োজকদের কলিজা শুকিয়ে ওঠে।

তার চেয়েও নিদারুণ মর্মান্তিক ব্যাপার হয়েছিল কার্জন হলে ২৪ মার্চ, ১৯৪৮ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষ সমাবর্তনের দিনে; যেখানে পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ঢ়ড়ষরংযবফ রাজনীতিবিদ কায়েদে আজমের স্পর্শধন্য ডিগ্রিপত্র গ্রহণকারী ছাত্ররা বিগলিত হবে সেখানে ‘কায়েদে আজম’ যেমন রেসকোর্স ময়দানে যা বলেছিলেন তার পুনরাবৃত্তি করলেন তখন প্রথম দাঁড়িয়ে উঠে নো, নো বলে প্রতিবাদ জানিয়েছিলাম, তখন অন্য ডিগ্রি গ্রহণকারীরা তার সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়েছিল।

রেসকোর্সে জিন্নাহ সাহেবের ভাষণ শুনতে এবং এক নজর তাকে দেখার লোকদের মধ্যে আমিও একজন ছিলাম। জিন্নাহ সাহেব পাকিস্তানে নাগরিকদের করণীয় বলার পর বললেন, ‘… পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে একটিমাত্র ভাষা এবং তা হবে উর্দু।’ প্রতিবাদ করার জন্য উঠে দাঁড়াতেই আমার বন্ধুরা আমাকে জোর করে বসিয়ে মুখ চেপে বললেন, জনতার পায়ের তলে পিষে যাবে নাকি? বিষণ্ন মনে হাজার হাজার লোক সভাস্থল ত্যাগ করল।

হলে ফিরতে বন্ধুরা বলল, ২৪ মার্চ সকাল ১০টায় কার্জন হলে বিশেষ সমাবর্তন সভা। হলে বিশ টাকা জমা দিয়ে সমাবর্তন পোশাক ও কার্ড নিতে হবে। রেসকোর্সের জনসভায় এ রকম স্বৈরাচারী বক্তব্যের কোনো প্রতিবাদ করতে না পেরে মন ভেঙে গিয়েছিল। আমিও সমাবর্তন সভায় একজন আমন্ত্রিত। যদি এখানেও (কার্জন হলে) ওই কথা বলে, কেবলমাত্র উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা, তাহলে প্রতিবাদ করতে হবে। এটা একটা বিরল সুযোগ। যদি ওইদিন ওই সম্পর্কে না বলে?

তবু ভাঙা মন অনেকটা জোড়া লাগল। আমাদের হলের কট্টর মুসলিম লীগ সমর্থক, বিশেষ করে জিন্নাহ ভক্তরা সিদ্ধান্ত নিয়ে পরের দিন জানিয়ে দিল, কোনোভাবে কেউ যদি ‘কায়েদে আজমকে’ অপমান করে, তাহলে তারা জীবিত অবস্থায় হল থেকে বের হতে পারবে না।

মনে মনে ঠিক করলাম, যদি রাষ্ট্রভাষা সম্পর্কে জিন্নাহ সাহেব কিছু বলেন এবং কেবলমাত্র উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার কথা বলেন, তাহলে প্রতিবাদ করব। তাতে যা হয় হবে। আমি আরও ঠিক করলাম, সেখানে যা করব সে কথা কাউকে বলা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। তবে যদি একই কথা বলে, তাহলে আমি একা হলেও দাঁড়িয়ে উঠে প্রতিবাদ করব।

যথাসময়ে কার্জন হলে যথাস্থানে গিয়ে আসন নিয়ে বসে পড়লাম। জিন্নাহ সাহেব অনেক কথা বললেন। কিন্তু ভাষার কথা বলেন না। যাই হোক, অবশেষে সেই কথাটা উচ্চারণ করলেন। আর আমি সঙ্গে সঙ্গে চেয়ারের ওপর উঠে দাঁড়িয়ে তার সে কথার প্রতিবাদ করলাম। মনে মনে ধারণা ছিল, একজন উঠে প্রতিবাদ করলে অন্যরাও উঠে দাঁড়াবে। যা ভেবেছিলাম তাই হলো। অনেক ডিগ্রিধারীও উঠে দাঁড়িয়ে তার ওই স্বৈরাচারী গণতন্ত্রবিরোধী কথার প্রতিবাদ করল।

জিন্নাহ সাহেব বেশ বুদ্ধিমান। তার কথার প্রতিবাদে তিনি দুই সেকেন্ড চুপ করে থেকে অন্য প্রসঙ্গে দু’চার কথা বলে তার ভাষণ সমাপ্ত করলেন। এরপর হট্টগোলের মধ্যে অন্যদের মধ্যে মিলে আমি হল থেকে বেরিয়ে গেলাম। এই কাজটা করে আমি কি আনন্দিত হয়েছিলাম তা বলার নয়। এই কাজটা আমার জীবনের এক অমূল্য সম্পদ। আমি নিজেই নিজেকে ধন্য মনে করলাম। যাই হোক, জিন্নাহ সাহেব তার কাজ তিনি করেছিলেন। শাসকরা মনে করেছিল, একটামাত্র রাষ্ট্রভাষা করতে পারলে জাতিসত্তাগুলোকে, বিশেষ করে বাঙালি জাতির রাষ্ট্র গঠনের, যার অর্থ এমনিতে তো পূর্ব পাকিস্তান বিচ্ছিন্ন, সেটা যেন রাজনৈতিক তথা রাষ্ট্রগতভাবে বিচ্ছিন্ন না হয়।১১ মার্চ, ১৯৪৮ সালের ভাষা আন্দোলন কিন্তু পাকিস্তানের স্ক্রু ঢিলা রাষ্ট্রযন্ত্রের স্ক্রুগুলো আরও ঢিলা করে দিয়েছিল। কিন্তু ১১ মার্চের দেশব্যাপী অভূতপূর্ব আন্দোলন ভাষা আন্দোলনের নেতাদের মাথা খারাপ করে দিয়েছিল। এই নেতারা কেবল পাকিস্তান দেখেনি, তারা পাকিস্তান করেওছিল। পাকিস্তান হওয়ার প্রধান কারণ হিসেবে ইসলামকে দেখেছিল। তারা মনে করেছিল, যারা পাকিস্তান করেছিল তারা এতখানি মুসলমান যে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার আন্দোলন আর কতখানি হবে। কিন্তু এই মুসলমানরা যে নানা শ্রেণীতে বিভক্ত, তা তলিয়ে দেখেনি। দীর্ঘ দেড় দু’শ’ বছরের ব্রিটিশ শাসনের কারণে তারা শ্রেণীবিভক্ত হয়ে যাওয়ার জন্য এবং কৃষকরা এত সূক্ষ্মভাবে শ্রেণীবিভক্ত না হয়ে যাওয়ার কারণে এবং এ দেশে কমিউনিস্ট পার্টি শক্তিশালী না হওয়ার কারণে ১৯৪০ সালে লাহোর প্রস্তাবের সময়ে তারা মনে করেছিল, ধর্মের ভিত্তিতে স্বাধীনতা তথা রাষ্ট্র গঠন করলে তারা জমির মালিক হবে এবং তারা সমৃদ্ধিশালী হতে পারবে। ওই অশিক্ষিত ও দুনিয়ার কোনো খোঁজখবর না রাখা কৃষকরা যে জমির মালিক হবে ও সমৃদ্ধিশালী হবে, তার অন্যতম কারণ যে তারা বাঙালি সেটা তারা বুঝেছিল।

আর বুঝেছিল বলে তারা পাকিস্তান হওয়ার দুই-তিন মাসের মধ্যে ছাত্র ও নিম্ন মধ্যবিত্তরা যখন দাবি তুলেছিল বাংলাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করতে হবে, তখন তারা যে বিভ্রান্ত হয়নি তার প্রমাণ ১৯৪৭ সালের শেষের দিক থেকে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের বিজয় পর্যন্ত রাজনৈতিকভাবে এতটুকু টলেনি। শাসক শ্রেণী বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা না করতে ধর্মের নামে যে ভাঁওতাবাজির আশ্রয় নিয়েছিল, তার খপ্পরেও পড়েনি তারা।

আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনের মূল শক্তি ছিল এই কৃষকরা। কিন্তু আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনের রাজনীতি তাদের রাজনৈতিক শক্তি তথা নেতৃত্বে পরিণত করতে চায়নি এবং করেনি। এর জন্য মাসুল দেয়া শুরু হয়েছে। যেমন সাম্প্রতিককালের ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মৌলবাদীদের লীলাখেলায়। ভবিষ্যতে আরও মাসুল দিতে হবে।

বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি ১১ মার্চ আন্দোলনে পরিণত হতে দেখে অন্তত জিন্নাহ বুঝেছিলেন যে কত গণবিচ্ছিন্ন ও মান্ধাতা আমলের আধা-সামন্তদের তিনি পূর্ব পাকিস্তান পরিচালনার দায়িত্বে বসিয়ে ছিলেন। তাই তিনি অবস্থা নিজে দেখার জন্য ঢাকায় এসেছিলেন।

এর কিছুদিন পরই তিনি মারা যান। অন্তিম অবস্থায় তিনি লিয়াকত আলী খানকে বলেছিলেন, তিনি দুটি ভুল করেছেন — এক তাকে (লিয়াকত আলীকে) পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী করা, দুই বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা না করা।

কেন্দ্র পূর্ব পাকিস্তানের প্রশাসনকে ১২ মার্চের দিকে ইঙ্গিত দিয়েছিল যে, জিন্নাহ সাহেব অতি শিগগিরই পূর্ব পাকিস্তান সফরে যাবেন। যতই কম বুঝুক, এ কথার অর্থ বুঝতে নাজিমউদ্দিনের অসুবিধা হয়নি। খবর পেয়েই নাজিমউদ্দিন হন্তদন্ত হয়ে মন্ত্রিসভার বৈঠক ডাকলেন। সেখানে সিদ্ধান্ত হলো, রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের যেসব নেতা বাইরে অর্থাত্ যাদের ধরা হয়নি অতিসত্বর তাদের সঙ্গে কথা বলতে হবে। দুই মন্ত্রী কমরুদ্দীন আহমেদের সঙ্গে দেখা করে নাজিমউদ্দিনের সঙ্গে দেখার আমন্ত্রণ জানান।

ঁ* আবদুল মতিন রচিত জীবন পথের বাঁকে বাঁকে গ্রন্থ থেকে অধিকাংশ নেতা যেহেতু সে সময় জেলে, তাই কমরুদ্দীন আহমদ দেখা করতে অক্ষমতা জানালেন। এবার নাজিমউদ্দিন জেলের বাইরের ও জেলের ভেতরের নেতাদের সাক্ষাতের ব্যবস্থা করলেন।

সাক্ষাতে নাজিমউদ্দিন বললেন, পাকিস্তানের স্রষ্টা জিন্নাহ সাহেব পূর্ব পাকিস্তানে আগমন করছেন। তারাই তো জিন্নাহ সাহেবের নির্ভরতম সহকর্মী ছিলেন। জিন্নাহ সাহেব পূর্ব পাকিস্তানে যথাযোগ্য মর্যাদা পাবেন না তিনি থাকাকালীন এদেশে ধর্মঘট-আন্দোলন ইত্যাদি হবে তা কি তার মতো নেতার জন্য যথাযথ ও মর্যাদাপূর্ণ ব্যাপার হবে?

জিন্নাহ সাহেবের শ্রেষ্ঠ সহকর্মীরা বলল, তাদের দাবি-দাওয়াগুলো যদি মেনে নেয়া হয় তাহলে জিন্নাহ সাহেবের পূর্ব পাকিস্তানে অবস্থানকালে ধর্মঘট-আন্দোলন হবে না, তারা সে প্রতিশ্রুতি দিতে পারেন। যখন দেশব্যাপী ছাত্র ও জনগণ বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে আন্দোলন শুরু করেছে এবং শাসকরা যখন নিঃশ্বাস ফেলার মতো সময় পাচ্ছে না কিংবা গুছিয়ে উঠতে পারছে না; তখন তাদের সময় দেয়ার অর্থ কি শত্রুর প্রধান শক্তি তাদের রাষ্ট্রের সঙ্গে আপস করা তথা ভাষা আন্দোলনকে কিছু সময়ের জন্য হলেও পিছিয়ে দেয়ার শামিল নয়?

প্রাদেশিক সরকারের সঙ্গে ভাষা আন্দোলনের তথাকথিত নেতাদের অতি মামুলি আট দফা দাবির ভিত্তিতে ১৫ মার্চ চুক্তি হলো। চুক্তিতে ছিল পূর্ব পাকিস্তানে যত কর্মী-নেতা গ্রেফতার হয়েছে তাদের বিনা শর্তে মুক্তি দেয়া হবে, সব ধরনের গ্রেফতারি পরোয়ানা প্রত্যাহার করা হবে, এই আন্দোলন যে রাষ্ট্রদ্রোহিতার দ্বারা পরিচালিত নয় এ কথা সরকার স্বীকার করবে। যারা বিভিন্ন ধারায় অভিযুক্ত তাদের অবিলম্বে মুক্তি দেয়া হবে। কাউকে গ্রেফতার করা হবে না, প্রাদেশিক পরিষদ বাংলাকে পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রস্তাব পাস করবে যেন পূর্ব পাকিস্তান একটি রাষ্ট্র এবং বাংলা সেই পরাধীন রাষ্ট্রের সরকারি ভাষা। এ সময়ে আমার মনে প্রশ্ন জাগল, এ রকম নেতৃত্ব কি বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পারবে? মনে হয় তা সম্ভব নয়।

এরপর —————————————— আমার ভাষা আন্দোলন সম্পর্কিত কর্মকাণ্ডে বিশেষ ভূমিকা পালন করেছিল। ১৯৪৯ সালে আমি এমএ পার্ট ওয়ান উত্তীর্ণ হয়ে পার্ট টুতে ভর্তি হই। আমার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের পরিধিরও বিস্তৃতি ঘটে।

[ad#co-1]