জীবনানন্দ দাশ

পোস্ট মডার্ন প্রফেট
রোখসানা চৌধুরী
জীবনানন্দ দাশ ছিলেন আধুনিক যুগের সর্বশ্রেষ্ঠ কবি। ‘ছিলেন’ বলছি কারণ আধুনিক যুগের সীমায়িত পরিকাঠামোয় তাঁকে আর ব্যাখ্যা করা সম্ভব হচ্ছিল না। সত্তরের দশকে, যখন ‘উত্তর-আধুনিকতা’ বিষয়টি সারা বিশ্বকে আলোড়িত করছে, ঠিক তখনই ইতিহাসের দুরভিসন্ধির মতোই কবির বিপুলতায়তন গদ্য প্রকাশিত হয়ে কবি জীবনানন্দ দাশকে ঘিরে সৃষ্ট অপরিমেয় বিস্ময় কৌতূহল-বিতর্কের অশেষ চক্রটি পুনরুজ্জীবিত হলো।

পোস্ট-মডার্নিজম বা উত্তর-আধুনিকতা স্বয়ং একটি বিতর্কিত বিষয়। যেমন বিতর্কিত ছিল আধুনিকতা। ইয়ং বেঙ্গল গ্র“প আধুনিকতার মন্ত্র প্রচার করতে গিয়ে অপপ্রচারে জড়িয়েছিল, যার সমাপ্তি ঘটেছিল গায়ত্রী মন্ত্র পাঠে। পরাণুকৃত সেই আধুনিকতা আজ এমন একটি শব্দ, এর বিপরীতে যার অবস্থান, অর্থাৎ যে অনাধুনিক, সে সমাজ-রাষ্ট্র দ্বারা পরিত্যক্ত বলে ঘোষিত হয়।

বলে রাখা ভালো, উত্তর-আধুনিকতা ‘আধুনিকে’র পরবর্তী ধাপ নয় এবং এটি দ্বারা কোনো বিশেষ যুগকে নির্দিষ্ট করে না। বরং বলা ভালো, এটি একটি মনোভঙ্গি (অঃঃরঃঁফব), আধুনিকের বিপরীতে যার বিদ্রোহী অবস্থান। সহজ কথায়, ‘আধুনিকতা’ বিষয়টির সমালোচনার সমষ্টিই হলো উত্তর-আধুনিকতা।

জীবনানন্দ দাশ এই কাজটিই করেছেন সচেতনভাবে। তাঁর কবিতায় এবং গদ্যে, অনাবৃতভাবে সমালোচনা করেছেন আধুনিকতার সবগুলো বৈশিষ্ট্যকে। তাঁর গল্প-উপন্যাসের নায়করা সচেতনভাবে স্যুট-কোট-টাই পরা কৃত্রিম ঔপনিবেশিক পুঁজি সমাজের সৃষ্ট মূর্তিটিকে বিদ্রƒপ করে, ঘৃণা করে। ইচ্ছাপূর্বক আধুনিকতার সব ‘ম্যানার্স’কে অবজ্ঞা করে। ‘মাল্যবান’ উপন্যাসের নায়ক এই সজ্জা সম্পর্কে মন্তব্য করছে, ‘দাড়ি যারা সত্যিই চাঁচে, প্রথমে পক্ষের মাগকে শ্মশানে পোড়াতে পোড়াতে গালে হাত বুলিয়ে নেয়।’ (মাল্যবান/পৃ. ৫৫)

পাশাপাশি তাঁর নায়করা হাঁটে ল্যাং-ল্যাং করে, পরে গলাবন্ধ সোয়েটার আর ধুতি, মুখে থাকে খোঁচা খোঁচা দাড়ি। অর্থাৎ পোস্ট কলোনিয়াল মনোভঙ্গির বিপরীতে তাদের অবস্থান। ওই জায়গাটিতে দাঁড়িয়ে তারা অবলোকন করে ভারতবর্ষের বুকে শত শত বছর ধরে জমে ওঠা অবনত মস্তকের গ্লানির অন্ধকার।

জীবনানন্দের নায়ক পার্কে গিয়ে বসেন ঘাসের ওপর, আর তাঁর স্ত্রী ‘ভীষণ কেঠো’ সব কাঠের বেঞ্চিতে বসে। আধুনিকতার এই প্রতীকী দূরত্ব অনতিক্রম্য।

আধুনিকতার শ্রেণীবিন্যাস সম্পূর্ণ পুঁজিনির্ভর। সজ্জা-সচেতনতা পুঁজিতন্ত্রের ‘ওয়ার্ক-কালচারের’ একটা অংশ। এই সংস্কৃতির চক্র এত ভয়াবহ যে মানুষের মনুষ্যত্বকে সম্পূর্ণ অবলুপ্ত হতে বাধ্য করে। জীবনানন্দের উপন্যাসে অধিকাংশ চরিত্র এসব চক্রের একেকটি অংশ। মাল্যবানের বেতন বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ছাদে পিঁড়ি পেতে খাবার বদলে ডাইনিং টেবিলের ব্যবস্থা করতে হয় স্ত্রীর তাগিদে। আয়েশের জন্য নয়, শুধু বৃদ্ধির লক্ষ্যে এবং মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য বক্সে বসে সিনেমা দেখতে চায় উৎপলা। তাঁর গল্প-উপন্যাসে এই পুঁজি-সংস্কৃতির বিবমিষাময় চিত্র অবিরল। পুঁজিবাজারের শ্বাসরুদ্ধকর প্রতিযোগিতার বিপরীতে দাঁড়িয়ে তিনি বলতে থাকেন

সত্য সারাৎসার মূর্তি সোনার বৃষের পরে ছুটে সারাদিন
হয়ে গেছে এখন পাথর;
যে-সব যুবারা সিংহী গর্ভে জšে§ পেয়েছিল কৌটিল্যের সংযম
তারাও মরেছে আপামর।
যেন সব নিশিডাকে চলে গেছে নগরীকে শূন্য করে দিয়ে
সব ক্বাথ বাথরুমে ফেলে;
গভীর নিসর্গ সাড়া দিয়ে শ্র“তি-বিস্তৃতির নিস্তব্ধতা
ভেঙে দিত তবু
একটি মানুষ কাছে পেলে;
(একটি কবিতা/সাতটি তারার তিমির)

২.
‘আধুনিকতা’ অদৃষ্ট অ-শ্র“ত দেবতাকে অস্বীকার করেছে। স্বীকৃতি দিয়েছে মানুষের দেবত্বে। (যেমন : সবার উপরে মানুষ সত্য/তাহার উপরে নাই। ইত্যাদি।) তাই সৃষ্টির সেরা জীব ‘মানুষ’ অবলীলায় ধর্ষণের মতো স্ব-কৃত অপরাধকে পশুর ওপর চাপিয়ে দিয়ে বলে, এটা ‘পাশবিক’ কাজ। মানুষের ‘মানবিকতা’ সর্বোচ্চ মহৎ অনুভূতির নাম। অথচ পশু ধর্ষণ করে না, খিদে না পেলে হত্যা করে না, এটম বোমাও ফেলে না।
এই ‘মানুষ’ সম্পর্কে জীবনানন্দের অকপট অভিব্যক্তি :
১. মানুষের বড় শয়তান কে আছে এই সৃষ্টির ভেতর। শয়তান! শয়তান! (মাল্যবান/পৃ. ৮৭)
২. পাখিদের কিছু বলি না আমি; … খায় আর হাগে, হাগে আর খায়, মানুষের ভেতর দু-চারজনকে ছেড়ে দিলে প্রায় মানুষই এদের চেয়ে ঢের খারাপ কাজ করে। (ঐ/পৃ. ৮০)
৩. মানুষের লালসার শেষ নেই/উত্তেজনা ছাড়া কোনো দিন ঋতুক্ষণ/ অবৈধ সঙ্গম ছাড়া সুখ;/অপরের মুখ ম্লান করে দেয়া ছাড়া প্রিয় সাধ নেই।

৩.
উত্তর-আধুনিকতার অন্যতম প্রবক্তা জাঁ ফ্রাঁসোয়া লিওতার বলেছেন, ‘উত্তর-আধুনিকতাকে এককথায় বলতে চাইলে বলা যায়, মহা-আখ্যান বা মহাসন্দর্ভে অবিশ্বাস।

আধুনিকতা অস্বীকার করেছে আকাশের ওপারের অজানা মহাশক্তিকে। কিন্তু পৃথিবীর বুকে সৃষ্টি করেছে অসংখ্য পরাশক্তি আর মহাপুরুষের। তাঁরা কখনো বিপ্লবী, কখনো বা রাষ্ট্রনায়ক রূপে আবির্ভূত। যে কারণে ‘শ্রেণীহীন’ সমাজের জন্য বিপ্লব করলেও মাও সে তুং বা লেনিন আজ দেবতারূপে পূজিত হচ্ছেন। আবার শক্তিমত্তার জন্য হিটলার কিংবা ওসামা বিন লাদেনও বৃহৎ জনগোষ্ঠীর কাছে পূজনীয়; তাঁরা নিতান্ত নগণ্যও নন।
এসব মহাসন্দর্ভের বিপরীতে দাঁড়িয়ে জীবনানন্দ দাশ বলে চলেছেন

‘ও-সব জিনিসে কিছু হয় না কোনোদিন। বুখারিন, বরোডিন, কামেনেভ, রাইকভ তো মাঝপথে সরে গেল। স্ট্যালিন শেষ পর্যন্ত রইল, কিন্তু আমেরিকা বোমা দিয়ে সমস্ত রাশিয়া শেষ করে ফেলবে না রাশিয়া সমস্ত আমেরিকাটাকে উৎখাত করে দেবে, এতেই এসে দাঁড়াল তো সব বিপ্লব। ওতে নেই, কিছু নেই।’ (জলপাই হাটি/পৃ. ৩৬৬)

কালের দ্রষ্টা জীবনানন্দ বহু আগেই দেখে ফেলেছিলেন এই গ্রহের ভবিষ্যৎ। পূর্বোক্ত উদ্ধৃতি আমাদের স্মরণ করতে বাধ্য করে গত শতাব্দীর আশির দশকব্যাপী চলমান মার্কিন-রুশ øায়ুযুদ্ধকে।
সমাজতন্ত্রের চূড়ান্ত বিজয়ের মুহূর্তেও তাঁর সমালোচনায় কোনো অস্পষ্টতা নেই
‘মার্কসকে নিয়ে যত নাচানাচি করা হয়, সেটা তাঁর প্রাপ্য নয়’ (ঐ/পৃ. ১৪০।
অন্যত্র ‘আমিও পড়েছি বটে। বিশ্বজ্ঞানী মার্কস যা লিখেছেন। দর্শন। আমাদের আদি ভারতীয়দের থেকে শুরু করে কারু কোনো দর্শনই আজ পর্যন্ত গ্রহণ করতে পারলুম না আমি।’ (ঐ/পৃ. ৩১৬)

৪.
বিজ্ঞান আর আধুনিকতা আজ সমার্থক শব্দ। শিল্পবিপ্লবের ফলশ্র“তি আজকের আধুনিক সভ্যতা। এই সভ্যতার সবচাইতে বড় হাতিয়ারের নাম বিজ্ঞান তথা প্রযুক্তি। যার দানবীয় রূপ আজ সর্বত্র প্রতিফলিত। পুঁজিপতিদের স্ফীতদেহ শীতল রাখতে দরিদ্রের নিঃশ্বাস থেকে বায়ু অপহরণ করছে শীতাতপযন্ত্র। তাদেরই সবুজ ঘরের (ৎেববহ-ঐড়ঁংব) সজীবতা বজায় রাখতে ভেঙে দিচ্ছে সূর্য আর পৃথিবীর মিথোজীবিতার সম্পর্ক। গলে যাচ্ছে হিমালয়। ধেয়ে আসছে সমুদ্র। বট-অশ্বত্থ পত্রশূন্য। প্রেতিনীরা নিরাশ্রয় আজ। করাত কলের শব্দে জেগে উঠি øায়ুতে শিরায়/টের পাই বৃক্ষ হত্যা সারা রাত রক্তের ভিতর। (রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ)

জীবনানন্দ দাশের প্রকৃতিপ্রেম নিয়ে সম্ভবত নতুনভাবে কিছু বলার অবকাশ নেই। শুধু সমালোচকের একটি কথার রেশ ধরে বলা যায় ‘মনুষ্যত্বের চেতনা’ দিয়ে তিনি উদ্ভিদের প্রাণকে অনুভব করেছেন। না হলে কবিতায় অত সহজে ঘাস চিবোনোর কথা, ঘাসের শরীর ছানবার কথা বলতে পারতেন না।

বিজ্ঞানকে বরাবরই জীবনানন্দ পূর্ণ সমর্থন দিতে কুণ্ঠা প্রকাশ করেছেন। সেই প্রচ্ছন্ন অবিশ্বাসের সুর তাঁর মস্তিষ্ক-মননজুড়ে বেজে চলছিল। অথচ বিজ্ঞানের তখন জয়জয়কার যুগ। ওই জয়ঢাকের ভেতর দাঁড়িয়ে জীবনানন্দের মতো কবির পক্ষেই সম্ভব আজকের আধুনিকতা, আজকের সভ্যতার দেবতা বিজ্ঞানের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করা। বিজ্ঞানের চূড়ান্ত জয়যাত্রা দেখে ফেলার পর, আজ, এই মুহূর্তে, তাঁর মতো আমাদেরও মাথার ভেতর হানা দেবে না কি এমনি সব ভাবনাপ্রবাহ :

১. … বিজ্ঞান কতদিনে মানুষকে কত বেশি আর দান করতে [পারবে]? দেহের সুবিধা ছাড়া কিছু কি পারছে আর, দান করতে? পারবে কি কোনদিন? (পৃ: ১১/জলপাইহাটি)
২. মনের তপঃশক্তিতে মেশিনকে চালাতে পারত হয়তো মনুষ, কিন্তু মানুষকে ছুটিয়ে চালাল মেশিন, মানুষকেই চালাল সে, যন্ত্রকে ব্যবহার করবার মত সততা ও মনীষা হারিয়ে ফেলেছে মানুষ। (পৃ. ৬৭/ঐ)
৩. বিজ্ঞানকে সত্যিই জ্ঞানে দাঁড় করাবে। বিজ্ঞান তো এখনো আধা সত্য। (পৃ. ১৫০/সুতীর্থ)
৪. সেয়ানা স্বাধীন মেলামেশার অন্ত খুঁজে পাবে কি বিজ্ঞানÑআকাশের তারা, পাতালের বালি যদিও গুণে ঠিক করেছে বিজ্ঞান। সেয়ানা স্বাধীন মেলামেশার কল্যাণের অন্ত খুঁজে পাবে হিতার্থী বিজ্ঞানী রাষ্ট্র? কোনদিনও না। কিন্তু সে-রকম হিতার্থী বিজ্ঞানী রাষ্ট্রই বা আসছে কোথায়? কোনদিকেই না। (পৃ. ১৩/মাল্যবান)
৫. ‘বিজ্ঞান তো সংকলিত জিনিশের ভিড় শুধু বেড়ে যায় শুধু; তবুও কোথাও তার প্রাণ নেই বলে অর্থময়
জ্ঞান নেই আজ এই পৃথিবীতে; জ্ঞানের বিহনে প্রেম নেই।’
(১৯৪৬-৪৭/শ্রেষ্ঠ কবিতা)

কবি এইসব ভবিষ্যৎ বাণী করেছেন গত শতাব্দীতেই। যদিও কবি দেখে যেতে পারেননি বিজ্ঞানের সর্বোচ্চ দানবীয় রূপ। দেখেননি যন্ত্র কীভাবে মানুষের সম্পর্ক ভাঙে; দেখে যাননি একটা নির্বোধ চারকানা বাস (কম্পিউটার) মানুষকে যতটুকু দিচ্ছে তার চাইতে অনেক বেশি দখল করে নিয়েছে মানুষের মনন-সৃজনের জায়গাটি।

৫.
জীবনানন্দ দাশের সমকালীন কোন কাকই আজ আর বেঁচে নেই। বেঁচে নেই পাঠকের মনে, মননে। বেঁচে নেই আমজনতার বিশ্বাসে, দর্শনে। অথচ জীবনানন্দ আজ অব্দি আমাদের ভাষাকে সমৃদ্ধ করে চলেছেন। কারণ, আজো তাঁর কবিতার শব্দ ব্যবহার এবং অধুনা আবিষ্কৃত গদ্যের ভাষা আমাদের ক্রমেই বিস্মিত করে চলেছে। ভাষাবিজ্ঞানের সর্বাধুনিক প্রবক্তা নোয়াম চমস্কি ভাষার যে অনন্ত সম্ভাবনার কথা বলেছেন পাঠক উপলব্ধি করল সেই সম্ভাবনার বিচ্ছুরণকে, যখন মোটর কারের গতিবেগের মধ্যে লুকিয়ে থাকা ধ্বনিকে তিনি ‘গাড়লের কাশি’ দিয়ে শনাক্ত করলেন। আসলে, জীবনানন্দের রচনার ভাষা বিষয়ে এই স্বল্পায়তনে আলোচনার সূত্রপাত করাটাও দুঃসাহসিক কাজ। বেশি উদাহরণে না গিয়ে বলা যায়, তাঁর ব্যবহƒত শব্দের ভেতর থেকে ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য এবং ইন্দ্রিয়াতীত সমস্ত অনুভূতির সন্ধান পাওয়া সম্ভব। সেইসব শব্দ থেকে বিচ্ছুরিত হয় একই সঙ্গে আলো আর অন্ধকার।

(অফুরন্ত রৌদ্রের অনন্ত অন্ধকার।) আমাদের চোখ ধাঁধিয়ে যায়। তাঁর শব্দ ব্যবহারে রমণী উৎফুল্ল হলে নতুন টাকার মতো চনচন আওয়াজ বেঁজে ওঠে।

অপরিচিত শব্দ প্রয়োগের চেয়ে তাঁর মনোযোগ ছিল একাধিক শব্দের সংযোগে নতুন ভাবার্থ সৃষ্টি করতে। (যেমন নারী প্রেমনাগরীপ্রেম, মাতৃগণ গণিকাগণ, অবিচারিত, অভালোবাসিত, অপৃথিবী ইত্যাদি) বাক্যিক সংগঠনে বেশ কিছু স্বতন্ত্র প্রচেষ্টা লক্ষ্য করা যায়। ড্যাশ চিহ্নের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার কবিতার মতো গদ্যেও পরিলক্ষিত হয়। (স্থানাভাবে উদাহরণ দেওয়া সম্ভব হলো না।)

আধুনিক যুগ প্রাতিষ্ঠানিকভাবে একটি নির্দিষ্ট ‘মানভাষা’কে ভাববিনিময়ের মাধ্যমরূপে স্বীকৃতি দেয়। এর বাইরে ভাষার যেসব আঞ্চলিক রূপ থাকে তা শুধু নাটকের ‘বুয়া’ চরিত্রের জন্য সংরক্ষিত। ‘আধুনিকে’র কাছে তা ‘গাঁইয়া’ বা ‘ক্ষ্যাত’ হিসেবে পরিত্যাজ্য বলে বিবেচিত হয়।

কিন্তু জীবনানন্দের গল্প-উপন্যাসে দেশ-কাল-পরিস্থিতি প্রমূর্ত হয়ে উঠেছে ঔপভাষিক সংলাপের সুনির্দিষ্ট বয়ানে। এই বিশিষ্ট ভাষার প্রয়োগ প্রথম পর্বের উপন্যাসের নৈর্ব্যক্তিকতা থেকে তাঁকে উত্তীর্ণ করে দিয়েছে গদ্যের কোলাহল-মুখর জনারণ্যে। জীবনানন্দ দাশ সেই জনারণ্যকে অবলোকন করেন ত্রিকালদর্শী মনীষীর মতো।
দু-একটি উদাহরণ না দিলেই চলছে না।

১. মাসুদ চাচার মাটির উপুর তাল-নাইরকোল গজাইব, হেইয়ার পিডা আর লাড়– খাইব তামাম দ্যাশ, চাচা কোথায় তখন? (পৃ. ৩১/বাসমতীর উপাখ্যান)
২. জবরদস্তির কথা কইমু না। কইলকাতার দিকে দৌড় বজাইতে খুব ফুর্তি হইব অনেকের, কিন্তু এই দেশে না থাকনের কিচ্ছু নাই, ভালোভাবে থাকোন লইয়া কথা। (পৃ. ৩৫/ঐ)
৩. এক্ককবারে তাজজব মাইরা ভাবছিলাম যে আমিত্তির নাহান প্যাঁচে প্যাঁচে রস সেই জিনিসের হেইয়ার নাম ট্যাহা। (পৃ. ৮২/সুতীর্থ)
৪. এ সংসারে এরকম সপলতা পেতে হলে দুটো জিনিসের দরকার এক টাকা, আর এক জুঁকের নাগান লাইগ্যা থাকা’ (পৃ. ৭২/ঐ)

কবিতার মতো, গদ্যেও তিনি কর্তা-কর্ম-ক্রিয়ার কাঠামোবদ্ধ শৃঙ্খলকে প্রায়ই ভেঙে দেন। আকাক্সক্ষা-আসক্তি-যোগ্যতার ছকের বাইরে যেতে যেতে বাংলা ভাষার অপার ক্ষমতার কিছু নমুনাকে তিনি প্রদর্শন করে যান। ভবিষ্যৎ দ্রষ্টা জীবনানন্দ ট্রামের লাইন ধরে হেঁটে যেতে যেতে এক যুগ পুরুষের মৃত্যুর অমোঘ বাণীকে ওহির মতো নাজেল করে যান

অনেক রাত হয়েছে-অনেক গভীর রাত হয়েছে;
কলকাতার ফুটপাথ থেকে ফুটপাথে
ফুটপাথ থেকে ফুটপাথে
কয়েকটি আদিম সর্পিনী সহোদরার মতো
এই যে ট্রামের লাইন ছড়িয়ে আছে
পায়ের তলে, সমস্ত শরীরের রক্তে
এদের বিষাক্ত বিস্বাদ স্পর্শ অনুভব করে
হাঁটছি আমি।
(ফুটপাথে/মহাপৃথিবী)

বিদেশি চ্যানেলে মোবাইল ফোনের অত্যাধুনিক একটি বিজ্ঞাপনে দেখা যায়, ফোনটির কর্মকাণ্ডে আÍহারা মানুষরা নিজের অজান্তে ১০/১২ তলা দালানের ওপর থেকে ভূ-পাতিত হচ্ছে, আর পুঁজিপতির বাহক বিজ্ঞাপনের কর্ণধার আন্তরিকভাবে সমবেদনা জ্ঞাপন করছে এভাবে ‘ডব’ৎব ৎবধষষু ংড়ৎৎু.’

জীবনানন্দ দাশও শেষ পর্যন্ত আÍরক্ষা করতে পেরেছিলেন কি? আধুনিক সভ্যতার ব্রিটিশ কলোনি কলকাতা তাঁকে প্রলুব্ধ করে ডেকে নিয়েছিল আর ট্রামের নিচে ফেলে দিয়ে বলেছিল ‘ডব’ৎব ৎবধষষু ংড়ৎৎু.’ তাই তাঁর মৃত্যুর পর সবচেয়ে ভিড় করেছিলেন তৎকালীন আধুনিক বাংলা সাহিত্যের কর্ণধারেরা; অমিয় চক্রবর্তী, সজনীকান্ত দাস তো বটেই।

আর আজ, আমরাও ট্রামের নিচের সেই ‘ছিঁড়ে যাওয়া ছেড়ে যাওয়া’ কবিকে তুলে নিয়ে নতুনভাবে পোস্টমর্টেমের কাজে নেমেছি, আধুনিক সমালোচনা তত্ত্বের টেবিলেই। কবিকে আন্তরিকভাবে ‘দুঃখিত’ বলা ছাড়া আর উপায় কী?