জীবনানন্দ : কবিতার রাজনীতি

মূল : ক্লিন্ট বুথ সিলি ষ অনুবাদ : ফারুক মঈনউদ্দীন
‘সমকালীন সাহিত্যকেন্দ্র’ নামে আরেকটি সাহিত্য সংগঠনের জন্ম হওয়ার কারণ ছিল শিল্পের রাজনীতিকীকরণ। ‘পরিচয়’ পত্রিকার মতো একটা মুখপত্রসহ একটা পরিচিত কমিউনিস্ট সাহিত্যগোষ্ঠীর উপস্থিতিই অ-কমিউনিস্ট লেখকদের এটির বিরুদ্ধবাদী একটা সাহিত্যগোষ্ঠী গঠনে উদ্বুদ্ধ করেছিল। এ রকম একটা অংশ পরিচিত ব্যক্তিত্ব সজনীকান্ত দাসের সঙ্গে একীভূত হয়ে যায়, যা ‘শনি চক্র’ নামে পরিচিত হয়। ফলে সমকালীন সাহিত্যকেন্দ্র নিজেকে পশ্চিমবঙ্গে তৃতীয় একটা শক্তি বলে বিবেচনা করত (প্রগতি লেখক শিল্পী সংঘ এবং শনি চক্র উভয়ের বিপরীতে)।

পশ্চিমবঙ্গের সব ধরনের সাহিত্য আত্মসচেতনভাবে রাজনৈতিক হয়ে যায়নি। ‘কবিতা’ পত্রিকা তখনও শক্তিশালী ছিল, ‘পূর্বাশা’ও ১৯৪৩ সালে আবার বের হওয়া শুরু করে; নিয়মিত বেরুচ্ছিল ‘চতুরঙ্গ’। এই তিনটি সাহিত্য পত্রিকার তিন সম্পাদক_ বুদ্ধদেব বসু, সঞ্জয় ভট্টাচার্য এবং হুমায়ুন কবির; সবারই ছিল নিজস্ব রাজনৈতিক মত, কিন্তু তাদের পত্রিকাগুলোর কোনো সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি ছিল না। এতদসত্ত্বেও ‘মার্ক্সবাদী’ এবং ‘পরিচয়’ পত্রিকায় দৃষ্টান্তমূলকভাবে সাহিত্যের মধ্য দিয়ে সক্রিয় ও মারমুখী রাজনীতিচর্চা কলকাতার লেখকদের উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়, যা শেষ পর্যন্ত ‘সমকালীন সাহিত্য কেন্দ্র’ গঠন পর্যন্ত গড়ায়।

আবু সয়ীদ আইয়ুব আমন্ত্রিত হয়ে ‘পরিচয়’-এর সম্পাদকীয় বোর্ডের সঙ্গে যুক্ত হন চলি্লশের দশকে। ১৯৪৮ সালের দিকে পদত্যাগ করেন বলে স্মরণ করতে পারেন তিনি। এই শুদ্ধ সমালোচক লেখকটিকে তাদের অভীষ্টের দিকে অগ্রসর হওয়ার জন্য দলভুক্ত করা যাবে, নিঃসন্দেহে এই আশায় প্রায় একই সময়ে কমিউনিস্টরা সাহিত্য বিষয়ে তার কাছ থেকে একটা লেখা চান। আইয়ুব এমন একটি বিষয় বেছে নেন যাকে তিনি বলেন সাহিত্যের চূড়ান্ত এবং সহায়ক মূল্যবোধ। তিনি দুই ধরনের সাহিত্যকে চিহ্নিত করেন : একটি নিজের মধ্য থেকেই চূড়ান্ত সর্বোচ্চ বিষয়; আরেকটি সমাজ পরিবর্তনের চালক। খাঁটি এবং প্রায়োগিক_ এই দুই ধরনের সাহিত্য অস্তিত্বশীল, ঠিক যেমন বিজ্ঞানেও আছে এই দুই শাখা, এই যুক্তিবলে তিনি বলেন যে, বিশুদ্ধ শিল্প হিসেবে প্রায়োগিক সাহিত্যের মূল্য সামান্যই। আইয়ুব উপসংহারে বলেন যে, কমিউনিস্টরা প্রায়োগিক সাহিত্য রচনা করে, এ রকম সৃষ্টির কোনো চূড়ান্ত সাহিত্যমূল্য নেই। লেখাটি যেহেতু চেয়ে নেওয়া হয়েছিল, সেটা পরিচয়_ এ ছাপা হয়। তবে আইয়ুব স্মরণ করেন, তার লেখাটির পাশাপাশি দুটো যুক্তিখণ্ডনকারী লেখাও সনি্নবিষ্ট করা হয়েছিল।

এ রকম সময়ে, কমিউনিস্ট পণ্ডিতবর্গ উচ্চকণ্ঠ হয়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে আইয়ুব এই সিদ্ধান্তে পেঁৗছান যে, সাহিত্যে একটা তৃতীয় ধারা থাকা উচিত। আইয়ুবের বক্তব্য অনুযায়ী, এই তৃতীয় শক্তিকে আবশ্যিকভাবে তাদের সামাজিক প্রতিবেশ এবং সমসাময়িক সমস্যাগুলো সম্পর্কে সচেতন হতে হবে; তৎসত্ত্বেও তারা লিখবে স্বাধীন একক ব্যক্তি হিসেবে, কমিউনিস্টবিরোধী হিসেবে নয় এবং তাদের সামাজিক-রাজনৈতিক পারিপাশর্ি্বকতা সম্পর্কে সচেতনতাহীন লেখক হিসেবেও নয়। এই তৃতীয় শক্তির লেখকরা কমিউনিস্ট ধাঁচের ‘প্রায়োগিক’ কিংবা ‘যান্ত্রিক’ সাহিত্য সৃষ্টি করবে না, লিখবে ‘চূড়ান্ত’ সাহিত্যিক মূল্যবাহী লেখা।

১৯৫০ সালের জুন মাসে ‘দ্বন্দ্ব’ নামে একটা মাসিক পত্রিকার চতুর্থ বর্ষ শুরু হয়। এটির সম্পাদক হিসেবে নাম ছিল আবু সয়ীদ আইয়ুব, জীবনানন্দ দাশ এবং নরেন্দ্রনাথ মিত্রের। এ সংখ্যাটির শেষ পৃষ্ঠার আগের পৃষ্ঠায় ছাপা হয় সুহৃদ রুদ্র-প্রকাশিত সমকালীন বাংলা কবিতা সংকলনের একটি বিজ্ঞাপন। তিন বছর আগে ‘দ্বন্দ্ব’ শুরু হয়েছিল বিশ্বনাথ ভট্টাচার্যকে সঙ্গে নিয়ে এই সুহৃদ রুদ্রের হাতে; দু’জনই খাঁটি সমাজতন্ত্রী। সমাজতান্ত্রিক দলের সাংস্কৃতিক কমিটির সেক্রেটারি আনন্দগোপাল সেনগুপ্তের প্রচেষ্টায় ১৯৫৯ সালে ‘দ্বন্দ্ব’ সমকালীন সাহিত্যকেন্দ্রের মুখপত্রে পরিণত হয়।

তবে সমকালীন সাহিত্যকেন্দ্র কিংবা ‘দ্বন্দ্ব’ কোনোটাকেই সমাজতান্ত্রিক দল আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করেনি। এই গোষ্ঠীর বহু সদস্য এমনকি সমাজতান্ত্রিক দলের সঙ্গেই ছিল না। আনন্দগোপালের মতে, বিশেষ করে জীবনানন্দ সম্ভবত কেন্দ্রের একজন সদস্য ছিলেন, সমাজতান্ত্রিক দলের নয়। বলাবাহুল্য যে, কেন্দ্রের সদস্যরা সমাজতান্ত্রিক ধারণার প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন। জীবনানন্দ সমাজতন্ত্রের জন্য কতখানি সংকল্পবদ্ধ ছিলেন সেটা পরিষ্কার নয়। আইয়ুব নিশ্চিতভাবে স্মরণ করতে পারেন যে, জীবনানন্দ সাহিত্যে একটা তৃতীয় শক্তির ধারণার ব্যাপারে আগ্রহী ছিলেন।

১৯৪৯-এর শেষ দিকে জীবনানন্দ সমকালীন বাংলা কবিতার পরিস্থিতি আলোচনা করে ‘বেঙ্গলি পোয়েট্রি টুডে’ শিরোনামে ইংরেজিতে একটা প্রবন্ধ লেখেন। ‘মার্ক্সিস্ট’ শব্দটি যদিও মাত্র একবার ব্যবহার হয় এবং কমিউনিস্ট একবারও নয়, তবুও এটা পরিষ্কার যে কমিউনিস্ট দর্শনের অনমনীয় চরিত্র তাকে বিরক্ত করে। তিনি যুক্তি দেখান_ একজন সত্যিকার কবি হবেন স্বাধীন, কারণ তিনি সৃষ্টি করেন নিজস্ব দর্শন এবং তৈরি করেন নিজস্ব ভুবন। তবে তিনি স্বীকার করেন, সামাজিক এবং রাজনৈতিক বাস্তবতা যুগের দাবি হিসেবে যা বিশ্বাস করে তার প্রাঞ্জল স্বীকারোক্তি চাইতে পারে, যার আবার প্রয়োজন হতে পারে নতুন সাহিত্য এবং সাহিত্যের প্রতি নতুন মনোভাব। এতদসত্ত্বেও কবিরা যখন সামাজিক এবং রাজনৈতিক বাস্তবতায় আবিষ্ট হয়ে দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের কাব্যিক সাফল্য গড়তে চান অথবা সে রকম ভাবেন, তখন তারা স্থায়ী মূল্যবোধসম্পন্ন কিছু সৃষ্টি করতে ব্যর্থ হন।

জীবনানন্দের প্রবন্ধটি প্রকাশের অল্প কিছুদিন পরই ‘সমকালীন সাহিত্য-কেন্দ্র’ আনুষ্ঠানিকভাবে গঠিত হয় : আবু সয়ীদ আইয়ুব সভাপতি, সন্তোষ কুমার ঘোষ সাধারণ সম্পাদক এবং আনন্দগোপাল সেনগুপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদক। ১৯৫০ সালের মাঝনাগাদ সাহিত্য-কেন্দ্র কেবল সভা করত তা নয়, তাদের মাসিক পত্রিকাও বের করে। আইয়ুবের সভাপতিত্বে এমন একটা সভায় ভারতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের প্রধান নরেন্দ্র দেব ভাষণ দেন। খবরটি সমাজতান্ত্রিক কাগজ ‘জনতা’য় নিম্নোক্ত শিরোনামে ছাপা হয় : ‘গণতন্ত্র, আন্তর্জাতিকতাবাদ ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রচার করুন : লেখকদের প্রতি আচার্য নরেন্দ্র দেবের আহ্বান।’ সেখানে নরেন্দ্র দেবের ভাষণের সংক্ষিপ্তসার ছাপা হয়, যেখানে তিনি সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানান এবং বক্তব্য রাখেন সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে। তিনি বলেন, এটা হচ্ছে গণতন্ত্র, আন্তর্জাতিকতাবাদ ও সামাজিক ন্যায়বিচারের যুগ। সাহিত্যের মাধ্যমে আমাদের লেখকরা এইসব নতুন মূল্যবোধ প্রচার করবেন।

জীবনানন্দ সংগঠনের প্রথম সভায় যোগ দিতে সক্ষম হননি। তার পরিবর্তে তিনি রাজনীতির সঙ্গে সাহিত্যের সম্পর্ক বিষয়ে তার কিছু মতামত জানিয়ে আনন্দগোপালের কাছে একখানা চিঠি পাঠান_ যা এরকম :

পৃথিবীর নামকরা সভ্য দেশগুলো সাহিত্য বলতে প্রায়ই অল্পাধিক অতীতের সাহিত্য বোঝে; কিন্তু জীবনের প্রয়োজনে কি তার মূল্য পরিষ্কারভাবে বুঝে দেখবার চেষ্টা নেই; সমসাময়িক সাহিত্য সম্বন্ধে কোনো কথাই বড় একটা ভাবে চায় না; আজকের সাহিত্যিক যা খুশি ভাবুক লিখুক স্টেটের তাতে কিছু এসে যায় না এমনই অকিঞ্চিৎকর মনে করা হয় সাহিত্যকে। এই হল এক দিককার ছবি। অন্য দিকে দু-একটি বড় রাষ্ট্রে সাহিত্য সম্বন্ধে চেতনার সম্পূর্ণ ভিন্ন রকম নিদর্শন পাওয়া যাচ্ছে; সে সব জায়গায় রাষ্ট্র সবই চালাচ্ছে, সাহিত্যকেও, সাহিত্যিকের মনন ও ধ্যানের কিছু মাত্র স্বাধীনতা থাকলেও রাষ্ট্রের প্রভুত্ব খর্ব হয়, এই তাদের ধারণা। অসত্য এবং অন্যায়। সাহিত্যের উচিত স্বাধীনতায় স্টেট বিপদগ্রস্ত হবে, আমার মনে হয়, বাংলাদেশ এভাবে এখনও ভাবতে শুরু করেনি, কিন্তু শিগগিরই করতে পারে। সমকালীন সাহিত্য-কেন্দ্র এক দিকে সমাজ ও জনতার বিমূঢ় উপেক্ষা ও অন্য দিকে রাষ্ট্র ইত্যাদির অন্যায় ও অবৈধ কর্তৃত্বের হাত থেকে সাহিত্যকে যথাসম্ভব মুক্ত রাখবার কাজে ধৈর্য, জ্ঞান ও বিনয়ের সঙ্গে অগ্রসর হচ্ছে অনুভব করে আমি আনন্দিত হয়েছি। সাহিত্যের উন্নতি ও সার্থকতার জন্যে আপনারা মিলিত হয়েছেন; আপনাদের পরিপূর্ণ সাফল্য কামনা করি।
জীবনানন্দ দাশ

কীভাবে প্রগতি এবং সাহিত্যবোধ কার্যকর হবে সমকালীন লেখক-কেন্দ্রের মেনিফেস্টোতে তার খসড়া উপস্থাপন করা হয়। ‘সমকালীন সাহিত্যের পথ’ শীর্ষক আবু সয়ীদ আইয়ুবের একটা প্রবন্ধ প্রকাশিত হয় ১৯৫০ সালের জুন সংখ্যা ‘দ্বন্দ্ব’-এর সম্পাদকীয় ভূমিকা হিসেবে। বহু আগে লেখা এবং ইতিমধ্যে প্রকাশিত (দেশ, ডিসেম্বর ১৯৪৯) প্রবন্ধটির বিষয়বস্তু কেন্দ্রের সদস্যদের কাছে সুপরিচিত ছিল।

আইয়ুব লেখেন, রেনেসাঁ মনকে চার্চ থেকে মুক্ত করেছে। কিন্তু আজ চিন্তাকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য আর একটি নতুন প্রয়াস, ‘মধ্যযুগীয় চিত্তবন্ধনের দ্বিতীয় পালা আরম্ভ হচ্ছে’।

এই রাজনৈতিক ধারার অধিবক্তাদের কাছে শিল্প সাহিত্যের কোনো মূল্য থাকে না যদি সে শিল্প সাহিত্য তাদের রাজনৈতিক সংগ্রামের অস্ত্র হিসাবে মূল্যবান না হয়। এরা ভুলে যান যে, রাজনৈতিক সংগ্রামের উদ্দেশ্যই হল এমন এক শ্রেণীহীন সমাজের প্রতিষ্ঠা যেখানে জনসাধারণের জৈব অভাব মোচন করে তাদের জীবনকে শিল্পে সাহিত্যে সংস্কৃতিতে নব নব রূপে উন্মুক্ত ও বিকশিত করা সম্ভব হবে।

শৈল্পিক সৃষ্টির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে হবে, কমিউনিস্ট পার্টির এই আনুষ্ঠানিক ঘোষণার সমালোচনার পর মার্কসবাদীতে প্রকাশিত প্রবন্ধ থেকে উদ্ধৃত করে আইয়ুব এই ধরনের দর্শনের বহিঃপ্রকাশের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। প্রবন্ধটিতে বলা হয়, রামমোহন থেকে রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত যে সংস্কৃতি ধারা চলে আসছে সেটা ‘বুর্যোয়া ঐতিহ্যের জঞ্জাল। এর যথোপযুক্ত স্থান ইতিহাসের ডাষ্টবিনে।'(মার্ক্সবাদী, সংখ্যা ৪, পৃ ১১৯)।
তাদের ধার করা বক্তব্য সত্ত্বেও আইয়ুব মার্কসবাদীদের তাদের প্রাপ্য ঠিকই দিয়েছেন :

মার্ক্সবাদী সাহিত্যে নীতির সঙ্গে আমাদের অল্প বিস্তর মতভেদ আছে বলে আমরা যেন ভুলে না যাই তাঁরা সাহিত্যে এক নতুন সমাজ চেতনা এনেছেন এবং পূর্বতন সমাজ চেতনাকে দৃঢ় ও প্রশস্ত করেছেন। এই সমাজ চেতনার সাহিত্যিক ও সামাজিক মূল্য স্থায়ী।

আইয়ুবের মতে, সমকালীন সাহিত্য কেন্দ্র ছিল রাজনৈতিক গণতন্ত্র, অর্থনৈতিক পরিকল্পনা এবং চূড়ান্ত শৈল্পিক স্বাধীনতার পক্ষে। এ রকম একটা রক্ষণশীল বিষয়সূচি থাকা সত্ত্বেও কেউ নিশ্চয়ই অবাক হবেন জীবনানন্দ কেন আনন্দগোপালের মাধ্যমে একটা সাবধানী এবং সতর্ক করা চিঠি পাঠিয়েছিলেন সংগঠনের কাছে। স্মরণ করা যেতে পারে, ১৯৪৮ সালের মার্চ মাসে পশ্চিমবঙ্গ কমিউনিস্ট পার্টি নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়, বন্ধ করে দেওয়া হয় এটির মুখপত্র। যখন তিনি লেখেন, ‘সাহিত্যের উচিত স্বাধীনতায় স্টেট বিপদগ্রস্ত হবে, আমার মনে হয়, বাংলাদেশ এভাবে এখনও ভাবতে শুরু করেনি, কিন্তু শিগগিরই করতে পারে’, তখন কি তিনি ভয় পেয়েছিলেন? যখন তিনি নিশ্চয়তার চেয়ে আরও বেশি আশা নিয়ে ঘোষণা করেন, ‘সমকালীন সাহিত্য কেন্দ্র এক দিকে সমাজ ও জনতার বিমূঢ় উপেক্ষা ও অন্য দিকে রাষ্ট্র ইত্যাদির অন্যায় ও অবৈধ কর্তৃত্বের হাত থেকে সাহিত্যকে যথাসম্ভব মুক্ত রাখবার কাজে ধৈর্য, জ্ঞান ও বিনয়ের সঙ্গে অগ্রসর হচ্ছে অনুভব করে আমি আনন্দিত হয়েছি’, তখন কি তিনি উদ্বিগ্ন ছিলেন যে, আইয়ুব এবং অন্যরা আরও বেশি রেডিক্যাল হয়ে যেতে পারেন?

যে পত্রিকাটিতে সম্পাদক হিসেবে তার নাম ছিল, সেটিতে খুব কমই লিখেছেন জীবনানন্দ। প্রথম সংখ্যায় ‘আশা ভরসা’ নামে তার একটা কবিতা ছিল, আর সেপ্টেম্বর ১৯৫০, চতুর্থ সংখ্যায় (পূজা সংখ্যা) ছিল তার প্রবন্ধ ‘আধুনিক কবিতা’। এটিতে তিনি তার বিষয়বস্তুকে চিহ্নিত করেন : ‘মানুষের মনের চিরপদার্থ কবিতায় বা সাহিত্যে মহৎ লেখকদের হাতে যে বিশিষ্টতায় প্রকাশিত হয়ে ওঠে তাকেই আধুনিক সাহিত্য বা আধুনিক কবিতা বলা যেতে পারে।’ জীবনানন্দ যেভাবে বলেন, তার সংজ্ঞা অনুযায়ী, সংস্কৃত এবং গ্রিক সাহিত্য থেকে বর্তমান কাল পর্যন্ত বহু মহৎ লেখাকে আধুনিক হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। তবে তিনি ‘আধুনিক সাহিত্য’ শব্দগুচ্ছটির আরও ব্যাপকভাবে গৃহীত আরেকটি অর্থের কথা বলেন, ‘প্রথম ধরনের’ আধুনিকতা : ‘নিজের যুগের স্থূল সব লক্ষণে অতিরিক্ত সংক্রমিত হয়ে প্রথম ধরনের আধুনিক কবিতা যুগের ভিতরে পর্যবসিত হয়ে, নষ্ট হয়ে যেতে পারে।’ রবীন্দ্রনাথ এবং তার ধরনের সাহিত্যের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ, যা ‘কল্লোল’ প্রজন্মকে প্রজ্বলিত করেছিল, তার ফলে এই ধরনের আধুনিক ক্ষণজীবী কবিতার জন্ম হয়েছিল। গদ্যছন্দ নিয়ে ত্রিশের দশকের কাঠামোগত নিরীক্ষা যুগের অংশে পর্যবসিত হয়, এগুলো উপভোগ্য ছিল কিন্তু সাহিত্যের মূল্যবোধের নিরিখে অবশ্যম্ভাবীভাবে উল্লেখযোগ্য ছিল না। সাময়িক বিষয়ীভূত ধারণাসমূহ সেসব কবিতার বেশিরভাগে ছড়িয়েছিল বিশের দশক থেকে পঞ্চাশ অব্দি, তবে এসব সাময়িক কবিতাই প্রথম ধরনের (নিকৃষ্ট) আধুনিক কবিতার উদাহরণ।

তারপর জীবনানন্দ আধুনিক কবিতার প্রত্যয়ের অভাবের কথা উল্লেখ করেন। ‘মার্ক্সবাদী’র লেখকরা তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় ও মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাসে নৈরাশ্যবাদের কথা উল্লেখ করে তার সমালোচনা করেছিলেন। জীবনানন্দও সেই সাহিত্যের ব্যাপারে সন্দেহ পোষণ করেছেন, যেখানে কবিদের দৃঢ় ইতিবাচক বিশ্বাস নেই :
আশা করা যাক আধুনিক বিজ্ঞানের (ফলিত বিজ্ঞানের কথা বলছি না আমি) ফলাফল কেবলই নিরাশাবাদকে প্রশ্রয় দেবে না। বিজ্ঞানের বা অন্য কোনো অনুভূতি বা সত্যের সিদ্ধান্ত কবির নিকট সৎ মনে হলে যে বিশ্বাসে স্থিত হয়ে কবিতা লেখা সম্ভব তার অভাবেও ভালো এমন কি মহৎ কবিতা রচিত হতে পারে_ অবিশ্বাস বা অনিশ্চয়তার বিষয়ের মাহাত্ম্য রয়েছে বলে নয়_ কিন্তু যে কোনো বিষয় এমন কি অনিশ্চয়তা ও অবিশ্বাসও_ বিশেষ কবির হাতে শিল্পের সিদ্ধি লাভ করতে পারে বলে। কিন্তু এ রকম কবি ও তার এ ধরনের সম্ভাবনা ও সিদ্ধার্থ সাহিত্যের ইতিহাসে বেশি রয়েছে বলে টের পাইনি।

সংগঠনের সভায় প্রদত্ত ভাষণ থেকে সংশোধিত এই প্রবন্ধটি যখন ছাপা হয়, জীবনানন্দ তখন এক মফস্বল কলেজে চাকরি নিয়ে সাময়িকভাবে কলকাতা ছেড়েছেন। সমকালীন লেখক-কেন্দ্র নিজেই স্বল্পজীবী বলে পরিগণিত হয়। ‘দ্বন্দ্ব’-এর তিন কিংবা চারটি সংখ্যা বের হওয়ার পর তিন সম্পাদকের মধ্যে দু’জনই কলকাতা ছাড়েন_ আবু সয়ীদ আইয়ুব যান শান্তিনিকেতনে আর জীবনানন্দ কলকাতা থেকে পঁচাত্তর মাইল দূরে মেদিনীপুর জেলার খড়গপুরে। পত্রিকার উপসম্পাদক প্রবন্ধের দায়িত্বে নিয়োজিত অম্লান দত্তকে জীবনানন্দ তার এই প্রধান লেখাটি সম্পর্কে লেখেন :

১৮৩ ল্যান্স ডাউন রোড কলকাতা – ২৬১৫.৯.৫০
প্রিয়বরেষু অম্নান বাবু,
আপনাদের নির্দ্দেশমত আশ্বিনের দ্বন্দ্বের জন্যে ‘আধুনিক কবিতা’ লেখাটি তৈরি করে এই সঙ্গে পাঠিয়ে দিলাম। এই লেখাটি আপনি আশ্বিনের সংখ্যায় সম্পাদকীয় হিসেবে ব্যবহার করবার কথা বলেছিলেন, কিন্তু প্রথম প্রবন্ধ হিসেবে ব্যবহার করলে ঠিক হবে হয়তো।
ঋরহধষ চৎড়ড়ভ আমি একবার অবশ্যই দেখে দিতে চাই।
আসছে বিবশবহফ-এ আমি কলকাতায় আসব কিনা বলতে পারছি না; কিন্তু তার পরে এলেও চৎড়ড়ভ দেখবার সুযোগ পাব আশা করি। প্রীতিনমস্কার। ইতি জীবনানন্দ দাশ

সমকালীন সাহিত্য-কেন্দ্রে তার সদস্য হওয়ার অর্থ ছিল নির্জনতম একান্তচারী এই কবির কোনো রাজনৈতিক ব্যাপারে ঘনিষ্ঠ হয়ে সক্রিয় ভূমিকা গ্রহণ করা। জীবনানন্দ নিশ্চয়ই ১৯৫০ সালে সমাজতান্ত্রিক পার্টি কিংবা সমাজতন্ত্রের আগ্রহী সমর্থক হয়ে যাননি। তিনি বিভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের পত্রিকায় লিখতেন যেমন, ১৯৫০-এর অক্টোবরে তার কবিতা ‘আজ’ ছাপা হয় ‘নির্ণয়’-এ, এটি ছিল পশ্চিমবঙ্গ কংগ্রেসের সঙ্গে সম্পর্কিত একটা সাংস্কৃতিক প্রকাশনা। কংগ্রেসের প্রতি তার কোনো সহানুভূতি আছে তা নয়, সেখানে লেখার কারণ, সম্পাদক অমিয় কুমার গঙ্গোপাধ্যায়কে তিনি ব্যক্তিগতভাবে চিনতেন।

আজ অন্ধ সাগরের বেগে উৎসারিত রাত্রির মতন
আলোড়নে মানুষের প্রিয়তর দিকনির্ণয়ে
পথ আজ প্রতিহত; তবুও কোথাও
নির্মল সন্ততি দেশ সময়ের নব নব তীর_
পেতে পারে হয়তো বা মানবহৃদয়;
মহাপতনের দিনে আজ অবহিত হয়ে নিতে হয়।
যদিও অধীর লক্ষ্যে অন্ধকারে মানুষ চলেছে
ধ্বংস আশা বেদনায়
বন্য মরালের মতো চেতনার নীল কুয়াশায়_
কুহেলী সরিয়ে তবু মানুষের কাহিনীর পথে
ভাস্বরতা এসে পড়ে মাঝে মাঝে_
স্বচ্ছ ক্রান্তিবলয়ের মতন জগতে।
মনে হয় মহানিশীথের স্তন্যপায়ী
মানুয় তবুও শিশুসূর্যের সন্তান,
স্থিরতর বিষয়ী সে_
যদিও হৃদয়ে রক্তে আজও ভুল অকূলের গান।

যে প্রত্যয়ের কথা তার প্রবন্ধে দেখিয়েছেন তা দেখাতে সংকল্পবব্ধ বলে মনে হয় জীবনানন্দকে। নির্ণয়ের পথ (এটি পত্রিকাটিরও নাম) রুদ্ধ হতে পারে অথবা আজ তেমনই মনে হচ্ছে, কিন্তু মধ্য বিংশ শতাব্দীর সভ্যতার অন্ধ সাগরের দূর তীরভূমিতে এখনও বোধকরি পেঁৗছা যাবে। আপাতদৃষ্টিতে অন্ধকারের এক শিশু, মানবজাতির জন্ম হয়েছে উদীয়মান সূর্য থেকে। এতদসত্ত্বেও নিরাশাবাদ আধিপত্য করে : মানুষ এখনও গায় সেই, ‘ভুল অকূলের গান’। জীবনানন্দের বিশ্বাস আছে নতুন তীর পাওয়া যাবে। তার নিজের জীবনের পথও মনে হয় ১৯৫০-এর শরতে অপেক্ষাকৃত ভালো কিছুর জন্য একটা সাময়িক বাঁক নিয়েছিল, যদিও পূর্ববর্তী কিছু চরম হতাশ সময় গিয়েছে তার।

(জীবনানন্দ দাশের ওপর ক্লিন্ট বি সিলির ‘অ্যা পোয়েট অ্যাপার্ট’ বইটির থেকে নির্বাচিত অংশবিশেষ) কালের খেয়া পাঠকদের পত্রস্থ হলো।