জীবনানন্দের বনলতা সেন

ক্লি ন ট ন বি সি লি
অনুবাদ :ফারুক মঈনউদ্দীন
‘কবিতা’ পত্রিকার ডিসেম্বর ১৯৩৫ সংখ্যায় প্রকাশিত জীবনানন্দ দাশের চারটি কবিতার একটি ‘বনলতা সেন’, যেটা পরিণত হয় তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত কবিতায়। বেশ কজনের হাতে এটার শিল্পসম্মত ইংরেজি তর্জমা হয়েছে। মূলত জীবনানন্দ নিজেই এটা অনুবাদ করেছিলেন; তুলনার জন্য আমার নিজের অনুবাদটা করি তার পর (যদিও দুটো অনুবাদ লক্ষণীয় রকম ভিন্ন ছিল, দুটোই করা হয় মূল কবিতা থেকে_জীবনানন্দ তাঁর কাব্যিক স্বাধীনতা প্রয়োগ করেছিলেন)।

সিংহল (বর্তমানে শ্রীলঙ্কা) এবং মালয়ের পরিচিতি নিষ্প্রয়োজন। বিম্বিসার ও অশোক একদা প্রাচীন ভারতের শাসক ছিলেন। বিদর্ভ, বিদিশা, শ্রাবস্তীর মতোই নগর, যেখানকার কারিগরদের ছিল চমৎকার দক্ষতা। এদিকে নাটোর বাংলাদেশের একটা সাধারণ ছোট মফস্বল শহর; আর বনলতা সেন, শুধু একজন রমণীর নাম। ওর প্রকৃত পরিচয় অনুমান করা সাহিত্যরসিকদের একটা প্রিয় বিষয়ে পরিণত হয়েছে। যা হোক, সবার জানা মতে বনলতা সেন কোনো বাস্তব চরিত্র নয়। এর গুরুত্ব নিহিত নামটির সাধারণত্বে; সেন বলতে বৈদ্য গোত্র বোঝায়, যেটি জীবনানন্দেরও গোত্র। অন্য বাংলা নামের মতো বনলতারও রয়েছে একটা আক্ষরিক অর্থ। নামটির অর্থ বনের লতা, যা রূপসী বাংলার নৈসর্গিক পরিবেশের প্রতি জীবনানন্দের প্রবণতার কারণে তাঁকে প্রলুব্ধ করতে পারে।

জীবনানন্দ তাঁর সবচেয়ে নিশ্ছিদ্রভাবে রচিত কবিতাগুলোর একটি উপস্থাপন করেছিলেন ‘বনলতা সেন’-এ। বাংলা ছন্দের প্রাচীনতম এবং সবচেয়ে সাধারণ পর্যায়ের ওপরই নির্ভর করেছেন তিনি। তিন পঙ্ক্তির স্তবকেরঃপ্রতিটি স্তবক পাঠকের মনোযোগকে বিশাল থেকে ক্ষুদ্রতে সংকীর্ণ করে আনে। একইভাবে তিনটি স্তবকই তুলনামূলকভাবে বড় থেকে ছোটর দিকে চালিত মনে হয়। প্রথম স্তবকে বিশ্ব থেকে সমুদ্র, রাজ্য, নগর হয়ে আমরা যাই মূল লক্ষ্যবিন্দু এক রমণীর কাছে। দ্বিতীয় স্তবকে আবার রাজ্য থেকে এক ব্যস্ত বাণিজ্যিক নগরী, এক দ্বীপ হয়ে আমরা আবার সেই রমণীর কাছে পেঁৗছাই। তৃতীয় স্তবকে আমরা আরো একবার একটা সম্পূর্ণ দিন থেকে সন্ধ্যার প্রারম্ভ, তারপর সেই দিনের শেষ এবং তার সমস্ত আয়োজন হয়ে বিশ্রাম নিতে পেঁৗছে যাই সেই রমণীর কাছে। প্রথম স্তবক বিস্তৃত প্রাচীন রাজ্যের ভুবনে। দ্বিতীয় স্তবক সেই রমণীর ওপর আলো ফেলতে শুরু করে, তবে তাকে বিস্তৃত পৃথিবীর সাথে যুক্ত করে_তার চুলকে বিদিশা, মুখমণ্ডলকে শ্রাবস্তির সাথে:বিশাল থেকে ক্ষুদ্রত্বে পেঁৗছানোর সংশ্নেষণ। তৃতীয় স্তবক কেন্দ ীভূত হয় ক্ষুদ্রের ওপর: চিল, জোনাকী এবং সবশেষে আবারো একজন। শুধু স্থানিক নয়, কালিক ভাবেও পুরো কবিতাসহ স্তবকগুলো রাজত্বগুলোকে মুহূর্ত হিসেবে উপস্থাপন করে এগিয়ে নিয়ে যায় মুহূর্তের শান্তিকে অনন্তের দিকে।

‘বনলতা সেন’ সম্পর্কে দীপ্তি ত্রিপাঠী লেখেন, ‘দেশকালে সীমাবদ্ধ নাটোরের বনলতা সেনের পশ্চাতে রয়েছে ভূগোলের বিস্তৃতি ও ইতিহাসের বেধ (ফবঢ়ঃয)। এই দুই আয়তনের যোগে একটি ক্ষুদ্র লিরিক কবিতা মহাকাব্যের ব্যাপ্তি পেয়েছে।’

‘ধূসর পান্ডুলিপি’ এবং ‘রূপসী বাংলার’ ‘তুমি’ এ কবিতায় একটা যথাযথ নাম খুঁজে পায়:বনলতা সেন, এক স্বস্তিদাত্রী নারী, যে মানবসংসারের আর সবার চেয়ে আলাদা। সে অন্তত এই কবিতায় কবিকে উপলব্ধি করতে পারে। পক্ষান্তরে কবিও বিম্বিসার যুগ থেকে অদ্যাবধি সদ্য ক্লান্তিকর মানবসমাজকে যেরকম পরিহার করে এসেছেন, তাঁকে সেভাবে পরিহার করেননি। ঐতিহাসিক মাত্রা তাঁর সংক্ষিপ্ত জীবনের আবেগকে আরো জোরালো করে তোলে। তাঁর কুশীলবরা যে মঞ্চে পদচারণা করে, সেটাকে তিনি ঐতিহাসিক এবং ভৌগোলিক উপমা-উৎপ্রেক্ষা ব্যবহারের মাধ্যমে আরো বিস্তৃত করেন, আর এভাবে ঘটনাস্থলকে প্রসারিত করে তিনি তাঁর বক্তব্যে দান করেন গতি।

কবি সরাসরি বলেন, জীবনের চার দিকের ফেনিল জলরাশি থেকে বনলতা সেন তাঁকে দু-দণ্ড শান্তি দিয়েছে। কবিতার শেষ দু-চরণে সিদ্ধান্তহীন অস্পষ্টতা রয়ে যায় যে, বনলতা সেন আরাম ও ক্লান্তিকর জীবন থেকে বিশ্রাম অর্থাৎ মৃতু্যকে প্রতীকায়িত করে কি-না। অবশ্যই বনলতা সেন সান্ত্বনার প্রতীক, আর জীবনানন্দ ওর এই গুণটির কথা ব্যক্ত করেন দ্বিতীয় স্তবকের শেষ চরণের বিখ্যাত চিত্রকল্পটির মাধ্যমে :পাখির নীড়ের মতো চোখ। কল্পিত কর্ম (নিরাপত্তা ও শান্তি) এবং কারণ (নীড়)_এই সংশেস্নষের মতো বাংলাভাষার কোনো শব্দ বা গতানুগতিক উপমা তখন শুধু নয়; আজ পর্যন্ত ‘পাখির নীড়ের মতো চোখ’-এর মতো পাঠককে চ্যালেঞ্জ করেনি।

জীবনানন্দ অন্যত্রও একই চিত্রকল্প ব্যবহার করেছেন। ১৯২৯-৩০ সালে দিলস্নীর রামযশ কলেজে শিক্ষকতা করার সময় বরিশালে তাঁর সতীর্থ ব্রাহ্ম এবং বছরখানেকের ছোট সুধীরকুমার দত্ত তাঁকে কিছুটা সাহচর্য দিয়েছিলেন। জীবনানন্দ যখন দিলস্নী আসেন তখন সুধীর কুমার তাঁর সঙ্গে রেল স্টেশনে দেখা করেন। পাঁচবছরেরও বেশি সময় পর জীবনানন্দ সেই উপলক্ষে সুধীর কুমার সন্বন্ধে লেখেন ‘ঃমুখে তার পাখির নীড়ের মতো আশ্বাস ও আশ্রয়ের হাসি।’ বনলতা সেন কবিতার ক্লান্ত পথচারীর দিকে চোখ তুলে সেই একই আশ্রয়ের স্বস্তি ও আশ্বাস প্রদান করেছে। এটা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না, কোনটা আগে, সুধীর কুমার সম্পর্কে (মৃতু্য :জুন ১৯৩৫) বক্তব্য, নাকি বনলতা সেন (১৯৩৫ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত)।

নয় মাস পর আরেকটি কবিতায় বনলতা সেনের দেখা পাওয়া যায়, এটিও ছাপা হয় কবিতায়। ছয় পঙক্তির ‘হাজার বছর শুধু খেলা করে’ কবিতাটি স্তবকবিন্যাসে ‘বনলতা সেন’-এর মতো। উভয় কবিতাতেই প্রাথমিকভাবে হাজার বছরের কালিক বিস্তারের অস্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যায়, উপান্তের চরণগুলো জীবনের লেনদেনের সমাপ্তির কথা বলে, সর্বোপরি দুটো কবিতাতেই মূর্ত বনলতা সেন।

‘হাজার বছর শুধু খেলা করে’ কবিতাটির দুটো প্রকাশিত ভাষ্য পাওয়া গেছে। দুটোর পটভূমি ছিল আলাদা।

হাজার বছর শুধু খেলা করে অন্ধকারে জোনাকির মতো;
চারিদিকে পিরামিড_কাফনের ঘ্রাণ; (চিরদিন রাত্রির নিধান;)
বালির ওপরে জ্যোৎস্না_খেজুর ছায়ারা (দেবদারু ছায়া) ইতস্তত
বিচূর্ণ থামের মতো :এশিরিয় (দ্বারকার)_দাঁড়ায়ে রয়েছে মৃত, মস্ন্নান।
শরীরে মমির (ঘুমের) ঘ্রাণ আমাদের_ঘুচে গেছে জীবনের সব লেনদেন;
‘মনে আছে?’ শুধালো সে_শুধালাম আমি শুধু, ‘বনলতা সেন?’

(দ্বিতীয় কবিতাটিতে কেবল বন্ধনীর ভেতরের শব্দগুলো প্রতিস্থাপিত_অনুবাদক)

একটি কবিতায় ব্যবহূত হয় মধ্যপ্রাচ্যের চিত্রকল্প, অন্যটিতে ভারতীয়। জীবনানন্দের প্রথম গ্রন্থ ‘ঝরা পালক’-এ মধ্যপ্রাচ্যের চিত্রকল্পের বহুল ব্যবহার রয়েছে। এ গ্রন্থে এসবের ব্যবহার ছিল মূলত আক্ষরিক, কোনো ক্রিয়ার প্রাসঙ্গিকতা প্রতিষ্ঠা করার জন্য ব্যবহূত। ‘বনলতা সেন’ কবিতায় উৎকীর্ণ ইতিহাস ও ভূগোলের ভূমিকার সমার্থক স্থান সময়ের দূরত্বের ভেতর যেরকম দ্যোতনা পাওয়া যায়, পরবর্তীকালে তাঁর মধ্যপ্রাচ্যের চিত্রকল্পগুলো আক্ষরিকভাবে তেমন বেশি কিছু প্রতীকায়িত করে না। ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক চিত্রকল্পসমূহ ব্যবহারের মাধ্যমে সৃষ্ট দূরত্বকে আরো দূরবর্তী করার জন্য মধ্যপ্রাচ্যের চিত্রকল্পগুলো যোগ করে অ-ভারতীয় বিচিত্র চমকপ্রদ উপাদান।

সাধারণভাবে ঐতিহাসিক ভৌগোলিক চিত্রকল্প এবং নির্দিষ্টভাবে মধ্যপ্রাচ্যের চিত্রকল্পসমূহের ব্যবহারিক সাদৃশ্যের কারণে জীবনানন্দ উপলব্ধি করেন যে, কবিতাটিকে ক্ষতিগ্রস্ত না করেও মধ্যপ্রাচ্যের চিত্রকল্পের বিকল্প হিসেবে ভারতীয় চিত্রকল্প ব্যবহার করা যায়। বস্তুত ‘হাজার বছর শুধু খেলা করে’ কবিতায় ‘এশিরিয়’-র পরিবর্তে ‘দ্বারকা’ (ভগবান কৃষ্ণের প্রাচীন রাজধানী), খেজুরগাছের (এই গাছ ভারতেও জন্মে, তবে কবিতায় যেগুলোর কথা বলা হয়েছে, সেগুলো নিশ্চিতভাবে মিশরীয় কিংবা এশিরীয়) পরিবর্তে ভারতীয় দেবদারুর ব্যবহার যথার্থ। কবিতাটির জন্য পিরামিড কিংবা মমি আক্ষরিক অর্থে তত গুরুত্বপূর্ণ নয়; কিন্তু প্রথম পঙ্ক্তির ‘হাজার বছর’-এর ভেতর অনির্দিষ্ট মহাকালের ধারণাকে আরো বেগবান করে। একই উদ্দেশ্য সাধন করে এশিরীয় এবং দ্বারকার উলেস্নখও।

এই ছয় পঙ্ক্তির কবিতাটা তিন স্তবকবিশিষ্ট ‘বনলতা সেন’কে পুনর্দখল করে। ‘হাজার বছর শুধু খেলা করে’ কবিতাটি বোঝার জন্য পাঠককে ‘বনলতা সেন’ এবং সে যা উপস্থাপন করে, তার সাথে পরিচিত হতে হবে। দীর্ঘ কবিতাটা যত দূর করে ছোটটিও তা-ই করতে চেয়েছিল, কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে সেটা খুম কমই কার্যকর হয়। ছয়টি পঙ্ক্তি বিশাল নৈর্ব্যক্তিকতা থেকে বনলতা সেনের সাথে ঘনিষ্ঠতার দিকে এগিয়ে যায়। পথরোধকারী লাইনগুলো মাঝপথে এসে পড়ে। কোনো সত্যিকার গতি নেই সেখানে। প্রথম এবং শেষ পঙ্ক্তির মধ্যে নেই তেমন কোনো বন্ধন। যে পরিবেশে কথক এবং বনলতা সেনের দেখা হয়, তা পরিবর্ধিত হয়, ইতিহাসের পরোক্ষ উলেস্নখের কারণে ধারণ করে বিচিত্র সুবাস, কিন্তু ‘বনলতা সেন’-এ রয়েছে সত্যিকার গতিময়তা_প্রাচীন থেকে অব্যবহিত বর্তমান পর্যন্ত উত্থান। প্রাচীনকালের উলেস্নখ্য কবিতার মধ্যকার চরিত্র যেসব জায়গাগুলোতে ভ্রমণ করছিল, সেসব স্থানের প্রতি বিশেষত্ব আরোপ করে। সে তুলনায় ‘হাজার বছর শুধু খেলা করে’ উপস্থাপন করে একটা স্থিরচিত্র।

‘বনলতা সেন’ কবিতায় জীবনের সব লেনদেন সাঙ্গ হওয়া-বিষয়ক বক্তব্য (সব পাখি ঘরে আসে/সব নদী ফুরায় এ জীবনের সব লেনদেন) কর্মতৎপরতার প্রস্তাবনা বহন করে। এই অংশের পূর্ববর্তী কবিতার সম্পূর্ণ অংশে আলোকপাত করা হয় জীবনের সক্রিয়তার ওপর (‘হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে’)। একই রকম একটা বক্তব্য যখন ‘হাজার বছর শুধু খেলা করে’তে আসে (‘ঘুচে গেছে জীবনের সব লেনদেন’), সেটা অনুমানসিদ্ধ হিসেবে আসে না, কারণ জীবন এবং জীবনের লেনদেনের তেমন কিছুই এখানে উন্মোচিত হয় না। এই কবিতায় বনলতা সেন এবং কথকের মধ্যকার সংক্ষিপ্ত কথোপকথনের ভেতর কেউ কিছুটা সান্ত্বনার রেশ পেতে পারেন_বস্তুত ‘বনলতা সেন’ কবিতা এটাকেই সঠিক ব্যাখ্যা হিসেবে ইঙ্গিত প্রদান করে_কিন্তু পূর্ববর্তী পঙ্ক্তিগুলো এরকম সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পাঠককে খুব একটা সাহায্য করে না। কেবল দীর্ঘটির সামস্বরিক হওয়া ছাড়া কবিতাটির ব্যর্থতা ‘বনলতা সেন’-এর সার্থকতার একটা মূল অনুষঙ্গ_সঙ্গত বিস্তারকে বিশেষায়িত করে। কেউ ভাবলেও ভাবতে পারে ‘হাজার বছর শুধু খেলা করে’ ‘বনলতা সেন’-এর প্রাথমিক খসড়া থেকে সুচিন্তিতভাবে বাতিল করে দেওয়া কোনো স্তবক কি না।

জীবনানন্দ দাশের ওপর ক্লিনটন বি সিলির ‘অ্যা পোয়েট অ্যাপার্ট’ বইটির প্রকাশিতব্য বাংলা অনুবাদগ্রন্থ থেকে নির্বাচিত অংশবিশেষ