মুঘল স্থাপত্যশৈলীর চমৎকার নিদর্শন ইদ্রাকপুর কেল্লার বেহাল দশা

মোহাম্মদ সেলিম, মুন্সিগঞ্জ থেকে
মুঘল স্থাপত্যশৈলীর নির্দশন ইদ্রাকপুর কেল্লার বেহাল দশা বিরাজ করছে। এর জৈলুস হারিয়ে যাচ্ছে। বেহলা দশার কারণে এটি দেখতে এসে মানুষ হতাশ হয়ে ফিরে যাচ্ছে। নানা কারণে ভ্রমন পিপাসু মানুষ মুন্সিগঞ্জ থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিচ্ছে। অথচ ইদ্রাকপুর কেল্লাকে প্রয়োজনীয় উপকরণ দিয়ে সাজাতে পাড়লে এখানে মানুষের ভিড় জমে উঠতে পারতো। এটি পর্যটন কেন্দ্র আওতায় নেয়া হয়েছে। কিন্তু পর্যটন আকর্ষনের কোন ব্যবস্থা এখানে বর্তমানে নেয়া হয়নি। এর ফলে এটি ভেতরে নোংরা অবস্থা বিরাজ করছে। অযত্নে ও অবহেলার কারণে প্রাচীন এ কেল্লাটির ভেতরে চতুর্থ শ্রেণীর কিছু কর্মচারী বসবাস করছে। এখানে ঠাই নিয়েছে আবার এনএসআই অফিস। কেল্লার ছাদে অবস্থান করছে একটি বড় ঘর। এর চালা বর্তমানে খুলে খুলে পড়ছে। কিন্তু এর মেরামতে সরকারের কোন নজর নেই। এটি প্রতিরোধ করলেও কেল্লাটি কিছুটা লজ্জার হাত থেকে বাঁচতে পারতো।

পূর্বে-পশ্চিমে আর উত্তরে তিন দিকে ঘাটবাধাঁ পুকুর। এর মধ্যে পূর্বের আর উত্তরের পুকুর দুটো সীমানা প্রাচীরের বাইরে, অন্যটি ভিতরে। উত্তরের পুকুরঘাটের সামনে খিলান আকৃতির তোরণ। ভিতরে কয়েক পা এগিয়ে গেলে পশ্চিমের পুকুরঘাট বরাবার প্রায় দোতলা বাড়ির সমান উচুঁ বৃত্তাকার মঞ্চ। মোট ২৪ ধাপ সিড়িঁ বেয়ে উঠা যায় ৩৩ মিটার ব্যাসের এই মঞ্চের ছাঁদে। সেখানে তৈরি টালির ছাউনি দিয়ে তৈরী করা হয়েছে বসতবাড়ি। বাড়িটি অবশ্য মঞ্চটির মতো প্রাচীন নয়, দেখেই বোঝা যায়, বহু পরে এটি নির্মাণ করা হয়েছে এবং মূল স্থাপত্যের সঙ্গে এর কোনো মিল নেই। মুন্সিগঞ্জ জেলা শহরের কোটগাঁও এলাকায় অবস্থিত স্থাপিত্যকর্মটি খ্যাত ইদ্রাকপুর কেল্লা নামে।

মুঘল স্থাপত্যশৈলীর চমৎকার নির্দশন ইদ্রাকপুর কেল্লার আয়তন ৮২ মিটার বাই ৭২ মিটার। ঐতিহাসিকদের মতে, এটি নির্মিত হয়েছিল সম্রাট আওরঙ্গজেবের শাসনামলে। বাংলার সুবেদার ও সেনাপতি মীর জুমলা এই দুর্গটি নির্মাণ করেছিলেন। ইটসুড়কির এই দুর্গটি নির্মিত হয়েছিল ১৬৬০ সালে। উদ্দেশ্য ছিল ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ এলাকাকে মগ জলদস্যু ও পর্তুগীজদের হামলা থেকে রক্ষা করা। সে সময় ইছামতী ও ধলেশ্বরী নদীর কূলবর্তী মুন্সিগঞ্জ এলাকাটি জলদস্যু তস্করদের প্রতিরোধ করার জন্য সামরিক গুরুত্বপূর্ন স্থান হিসাবেই বিবেচিত হয়েছিল মুঘল সেনাপতির কাছে। লোকশ্র“তি অনুয়ায়ী দুর্গটির নাম ইদ্রাকপুর কেল্লা রাখা হয়েছিল তার কারণ তৎকালে এলাকাটির নাম ছিল ইদ্রাকপুর।

জানা যায়, দুর্গের মূল মঞ্চের ছাদে স্বাধীনতার পর বাড়িটি নির্মাণ করা করা হয়েছিল মুন্সিগঞ্জ মহকুমা প্রশাসকের বসবাস করার জন্য। ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত সেখানে মহকুমা প্রশাসকরা বসবাস করেন। এর পরে মুন্সিগঞ্জ জেলায় উন্নীত হলে জেলা প্রশাসকরা কেল্লার ছাদে এই বাড়িতে বসবাস করেন। ১৯৯২ সালে জেলা প্রশাসকের জন্য অন্যত্র আবাসিক ভবন হলে এ বাড়িতে বসবাস করতে আসেন জেলা ম্যাজিষ্ট্রেট । ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত ম্যাজিষ্ট্রেটবৃন্দ বসবাস করার পর তাদের জন্যও আবাসিক ভবন নির্মিত হওয়ায় কেল্ল¬ার বাড়িতে বসবাস করতে আসেন জেলা পরিষদের চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীরা। ১৯৯৬ সাল থেকে এখানে দু’টি পরিবার বসবাস করছে। অথচ ১৯০৯ সালে ইদ্রাকপুর কেল্লাটি পুরাকীর্তি হিসাবে সংরক্ষিত হয়েছিল।

পুরো দুর্গটি খিলান আকৃতির খাঁজকাটা সুদৃশ্য প্রাচীর দিয়ে ঘেরাও করা। চার কোণে রয়েছে চারটি গোলাকার মঞ্চ চৌকি দেয়ার জন্য। প্রধান মঞ্চটি এগুলোর চেয়ে দ্বিগুণ আকার ও উচ্চাতাবিশিষ্ট। এটি পূর্বদিকে প্রাচীর সংলগ্ন। মঞ্চগুলোর দেয়ালে এক সঙ্গে চারটি করে চতুস্কোণ ফোকার রয়েছে গোলা নিক্ষেপের জন্য। যদিও সে সময় চারদিকে নজরদারির জন্যই এই সুউচ্চ প্রধান মঞ্চটি নির্মাণ করা হয়েছিল, কিন্তু এখন এর ছাদে উঠলে দৃষ্টি তেমন বেশী এগোয় না। দক্ষিণে এনএসআই অফিস পশ্চিমে সরকারী উচ্চবালিকা বিদ্যালয় ও উত্তরে মুন্সিগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ের বহুতল ভবনের মাঝে এটিকে এখন নিহায়ত গেরুয়া রঙ্গের ছোট একটি ইমারত বলেই মনে হয়। মূল মঞ্চের পাশ দিয়ে সরু সিড়ি নেমে গেছে তলদেশে। সিড়ির মুখ বহুকাল আগেই বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। সম্ভবত সিড়ি দিয়ে নেমে ভিতরে প্রবেশ করা হতো এবং এর মধ্যে অস্ত্র গোলাবারুদ মজুদ করে রাখা হতো।

অন্যদিকে ছাদে ওঠার প্রশস্ত সিঁড়ির উত্তর কোনায় মুখবন্ধ একটি গুম্বজ আকারের ইটের ভগ্নস্তুপ রয়েছে। এটি ছিল সুরঙ্গপথ। পরে এর মুখ বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। লোকমুখে প্রচলিত আছে এই সুরঙ্গ দিয়ে লালবগ কেল্লার সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করা হয়েছিল। ইদ্রাকপুর কেল্লটির দৃশ্য অতি মনোহর। তবে অযত্নে অবহেলায় মূল্যবান এই পুরাকীর্তি র্ধ্বংসের দিকে এগুচ্ছে। বিশেষ করে এর সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশটি অর্থাৎ প্রধান বৃত্তাকার মঞ্চের ওপর বসতবাড়ি তৈরি করে ঘর সংসার শুরু করায় এর স্থাপত্যশৈলীর যেমন সৌন্দর্যহানি ঘটেছে তেমনি অবকাঠামোগতভাবেও দারুণ ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। অনেক স্থানে সীমানা প্রাচীররে পলেস্তারা খসে গিয়ে ইট বেরিয়ে পড়েছে। র্পূবদিকের পুকুরটি সংস্কার না করায় কচুরিপানা আর পচা পানিতে এটি প্রায় এঁদো ডোবায় পরিণত হয়েছে। অথচ প্রয়োজনীয় সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের যথাযথ ব্যবস্থা করলে মূল্যবান এই পুরাকীর্তির যেমন স্থায়িত্ব বাড়বে তেমনি নায়াভিরাম এই মুঘল স্থাপত্যকর্মটি হয়ে উঠতে পারে আকর্ষণীয় দর্শনীয় স্থান। পুকুর গুলো সংস্কার করে কেল্লার চত্বরে বাগান করে মঞ্চ গুলোকে সাজিয়ে যেমন করে লালবাগ কেল্লায় করা হয়েছে তেমন ব্যবস্থাপনা যদি ইদ্রাকপুর কেল্লাতে থাকত তবে নগরবাসী অন্তত ছুটিছাটার দিনে এই শ্বাসরুদ্বকর মহানগরীর পরিবেশ থেকে মুক্ত হয়ে চমৎকার সময় কাটিয়ে আসতে পারতেন সবুজের সমারোহে পুরানো দিনের স্মৃতিগন্ধময় এ কালজয়ী স্থাপত্যের সৌন্দর্য উপভোগ করে।

এ বিষয়ে এলাকাবাসী সরকারের উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেছে।

[ad#co-1]