জনকণ্ঠ সম্পাদকের সব সাজার মামলা হাইকোর্টে বাতিল

মামলা বিদ্বেষপ্রসূত_ ব্যারিস্টার আমীর ॥ আমি আজ মুক্ত_ মাসুদ
দৈনিক জনকণ্ঠ সম্পাদক মোহাম্মদ আতিকউল্লাহ খান মাসুদ এখন দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দায়ের করা সাজাপ্রাপ্ত ৬টি মামলা থেকেই মুক্ত। বুধবার তাঁর সর্বশেষ ‘হিসাববহির্ভূত সম্পদ অর্জন’ সম্পর্কিত মামলাটি বাতিল করেছে হাইকোর্ট। এর আগে বাতিল হয়েছে রাজউক সম্পর্কিত পাঁচটি মামলা। একই সঙ্গে বাতিল হয়েছে ৬ মামলায় তাঁর ৪৮ বছরের কারাদণ্ড এবং সাড়ে ১৬ কোটি টাকার অর্থদণ্ড।

তৎকালীন বিশেষ জজ আদালত ২০০৮ সালে ‘হিসাববহির্ভূত সম্পদ অর্জন’ সম্পর্কিত মামলায় আতিকউল্লাহ খান মাসুদকে ১৩ বছর কারাদণ্ড ও দশ লাখ টাকা জরিমানা করে। এ রায়ের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ এবং মামলা বাতিলের জন্য হাইকোর্টে আপীল করলে আদালত তাঁকে জামিন দেয়

এবং কেন মামলা বাতিল হবে না_ মর্মে রুল জারি করে। দীর্ঘ শুনানির পর বুধবার বিচারপতি মোঃ শামছুল হুদা এবং বিচারপতি আবু বকর সিদ্দিকীর সমন্বয়ে গঠিত দ্বৈত বেঞ্চ মামলা বাতিল করে রায় দেয়। এ মামলাটিসহ মোট ছয়টি মামলায় সে সময় আতিকউল্লাহ খান মাসুদের ৪৮ বছর কারাদ-সহ প্রায় সাড়ে ১৬ কোটি টাকা জরিমানা করা হয়েছিল। ইতোমধ্যে একইভাবে রাজউকসংশিস্নষ্ট বাকি ৫টি মামলাও বাতিল করেছে হাইকোর্ট। দৈনিক জনকণ্ঠ সম্পাদকের পৰে শুনানিতে অংশ নেন ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম, ব্যারিস্টার তানিয়া আমীর, ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী, এ্যাডভোকেট মোঃ রফিকুল ইসলাম ও এ্যাডভোকেট নিখিলচন্দ্র দত্ত। দুদকের পৰে শুনানি করেন এ্যাডভোকেট ড. মোঃ কে. আলী ও এ্যাডভোকেট সৈয়দ মিজানুর রহমান।

নিম্নআদালতের জেল ও জরিমানার বিরুদ্ধে দায়ের করা আপীল গ্রহণ করে বিচারক বলেন, মোহাম্মদ আতিকউল্লাহ খান মাসুদ একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। তিনি বহুল প্রচারিত দৈনিক জনকণ্ঠ পত্রিকার সম্পাদক, মুদ্রাকর ও প্রকাশক। দেশের প্রথম শ্রেণীর নাগরিক এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী। মামলার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, তাঁর বিরুদ্ধে যেসব মামলা দেয়া হয়েছে তা বিদ্বেষপ্রসূত ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। মামলাগুলোয় যেসব অভিযোগ আনা হয়েছে তা বাদীপক্ষ প্রমাণ করতে পারেনি। তাই আপীল গ্রহণ করা হলো।

জনকণ্ঠ সম্পাদকের পৰে প্রধান আইনজীবী, সুপ্রীমকোর্টের প্রবীণ ও খ্যাতনামা আইনজ্ঞ ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম রায় বিশেস্নষণ করে বলেন, মিডিয়া জগতের জন্য আজ একটি আনন্দের দিন। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে দুর্নীতি দমন কমিশন জনকণ্ঠ সম্পাদকের বিরুদ্ধে যে ছয়টি মামলা করেছিল তার সবগুলো থেকেই তাঁকে বেকসুর খালাস দিয়েছে আদালত। তিনি বলেন, সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে এবং পুরো পরিবারকে হয়রানি করতে বিদ্বেষপ্রসূত হয়ে জনকণ্ঠ সম্পাদকের বিরুদ্ধে এসব মামলা দায়ের করা হয়েছিল। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে গঠিত বিশেষ জজ আদালত এসব মামলায় তাঁকে জেল ও জরিমানা দিয়েছিল। আমরা এর বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আপীল করি। আদালত দু’পৰের কথা শুনে আমাদের আপীল গ্রহণ করেছে এবং বিশেষ জজ কোর্টের রায় এবং মামলা বাতিল করে দিয়েছে। জনকণ্ঠ সম্পাদক এখন এসব মামলা ও সাজা থেকে মুক্ত।
খ্যাতনামা এ আইনজীবী আরও বলেন, জনকণ্ঠ সম্পাদকসহ তাঁর পুরো পরিবারকে হয়রানি করতে অন্যায়ভাবে তাঁকে গ্রেফতার করার পর মাত্র ৭ দিনের মধ্যে পুরো পরিবারের সম্পত্তির হিসাব দাখিল করতে বলা হয়েছিল। চরম ওই দুঃসময়েও নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই জনকণ্ঠ সম্পাদক তাঁর এবং পরিবারের ৪৫ কোটি টাকার বৈধভাবে উপার্জিত সম্পদের হিসাব দুদকে জমা দিয়েছেন। উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এক কোটি টাকা অসৎ উপায়ে অর্জন করেছে মর্মে ওই বিশেষ আদালত তাঁকে জেল ও জরিমানা করে। কিন্তু উচ্চ আদালতে তারা তা প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। আদালত জনকণ্ঠ সম্পাদককে ছয়টি মামলায় দেয়া সকল সাজা ও জরিমানা বাতিল করে তাঁকে বেকসুর খালাস দিয়েছে।

জনকণ্ঠ সম্পাদক মোহাম্মদ আতিকউল্লাহ খান মাসুদ সংশিস্নষ্ট সকলের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, আজ আমি মুক্ত এবং খুবই আনন্দিত। অন্যায়ভাবে দেয়া ৪৮ বছরের সাজা থেকে আমি মুক্তি পেলাম। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় আমার ওপর অন্যায় করা হয়েছে। আমি বার বার বলেছি আমি নির্দোষ। আজ এ রায়ের মাধ্যমে প্রমাণ হয়েছে আমি নির্দোষ।

তিনি বলেন, ২০০১ সালের পর থেকেই আমার বিরুদ্ধে নানা ষড়যন্ত্র শুরু হয়। ২০০৩ সালে আমার বাড়ির একটি অংশ ভেঙ্গে দেয়া হয়। আইনগত লড়াইয়ের মাধ্যমে আমি এ অন্যায়ের প্রতিবাদ করি এবং বাড়ি ভাঙ্গার অবৈধ সিদ্ধান্ত উচ্চ আদালত স্থগিত করে দিলে তখন একটি গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে আমাকে বিপদে ফেলার নানা ষড়যন্ত্র-চক্রান্ত চলতে থাকে। এরই ধারাবাহিকতায় আসে ওয়ান ইলেভেন।

জনকণ্ঠ সম্পাদক আরও বলেন, ২০০৭ সালের ৭ মার্চ প্রায় আড়াই শ’ সেনাবাহিনী, র্যাব ও পুলিশ জনকণ্ঠ অফিস ঘেরাও করে সাংবাদিক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের হয়রানি করে কীভাবে আমাকে গ্রেফতার করা হয়েছিল তা দেশবাসী প্রত্যৰ করেছে। এতকিছুর পরও আমাকে তারা দমাতে পারেনি। উচ্চ আদালত থেকে আজ আমি সুবিচার পেলাম। তাই প্রথমেই আমি মহান আল্লাহতায়ালার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই। একই সঙ্গে যাঁরা আমাকে দোয়া করেছেন, আমার দুঃসময়ে সহযোগিতা করেছেন সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই।

জনকণ্ঠ সম্পাদক মোহাম্মদ আতিকউলস্নাহ খান মাসুদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু হয় বিগত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে। তাঁকে অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করে দেয়ার জন্য ক্ষেত্র তৈরি করেছিল তারাই। এর ধারাবাহিকতায় ‘০৩ সালে তাঁর স্ত্রী মিসেস শামিমা এ খানের মালিকানাধীন ক্যান্টনমেন্টে তাঁর বাসভবনের প্রাচীর ভেঙ্গে দেয়া হয়েছিল। এর বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে রিট করলে আদালত পরবর্তী আর কোন ব্যবস্থা গ্রহণ স্থগিত করে দেয়। ওয়ান ইলেভেনের পর সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের একটি গোয়েন্দা সংস্থার উৎসাহী তৎপরতায় ‘০৭ সালের ৭ মার্চ আতিকউল্লাহ খান মাসুদকে কর্তব্যরত অবস্থায় জনকণ্ঠ ভবন থেকে তুলে নেয়া হয়। এরপর দুদকের মাধ্যমে একের পর এক মিথ্যা মামলা দিয়ে তাঁকে গ্রেফতার দেখিয়ে কারাগারে নিৰেপ করা হয়। বন্ধ করে দেয়া হয় তাঁর সমসত্ম ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। গ্লোব-জনকণ্ঠ শিল্প পরিবারের প্রধান কার্যালয়সহ জনকণ্ঠ ভবনের ৫টি ফ্লোর সিলগালা করে দেয়া হয়। গ্লোব-জনকণ্ঠ শিল্প পরিবারের কয়েক উর্ধতন কর্মকর্তাকে গ্রেফতার করে নিৰেপ করা হয় কারাগারে। সকল ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে বিভিন্ন ব্যাংকের হিসাবসমূহের লেনদেন বন্ধ হয়ে যায়। ফলে সব ব্যাংকের হিসাবসমূহ ঋণখেলাপীতে পরিণত হয়। বহুল প্রচারিত মুক্তিযুদ্ধের সপৰের পত্রিকা হিসেবে পরিচিত দৈনিক জনকণ্ঠ পত্রিকাটি প্রায় তিন বছর প্রচুর অর্থ লোকসান দিয়ে অতিকষ্টে চালু রাখা হয়।

দেশে অবাধ নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠা হলে আদালতের নির্দেশে আতিকউল্লাহ খান মাসুদকে ‘০৯ সালের ২০ জানুয়ারি মুক্তি দেয়া হয়। মুক্তি পাবার পর আদালতে নিয়মতান্ত্রিকভাবে মামলা মোকাবেলার পাশাপাশি শক্ত হাতে হাল ধরেন বন্ধ হয়ে যাওয়া ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর। চালু করা হয় একের পর এক প্রতিষ্ঠান। নতুন কলেবরে বর্ধিত পাতায় বের করা হয় মুক্তিযুদ্ধের সপৰের শক্তি হিসেবে সর্বজনসমাদৃত দৈনিক জনকণ্ঠ। পাঠকপ্রিয় পত্রিকাটি দ্রুত ফিরে যেতে শুরু করেছে তার আগের অবস্থানে। ধীরে ধীরে অন্যান্য প্রতিষ্ঠানও প্রাণ ফিরে পেতে থাকে। নিয়মিত লেনদেন শুরু করার কারণে ব্যাংকের হিসাবগুলোর জট খুলতে থাকে। জনকণ্ঠ সম্পাদক আতিকউল্লাহ খান মাসুদ এখন আর ব্যাংকের ঋণখেলাপী নন।

বুধবার বাতিল হওয়া সর্বশেষ মামলার আগে বাতিল হয়েছে বিশেষ জজ আদালতের আরও পাঁচটি মামলা। গত ১১ অক্টোবর হাইকোর্টের দেয়া রায়ে মিরপুর রোডে অবস্থিত গেস্নাব সেন্টার প্রকল্পসংশ্লিষ্ট রাজউকের মামলাটি বাতিল করা দেয়া হয়। বিশেষ জজ আদালত এ মামলায় জনকণ্ঠ সম্পাদককে ৭ বছরের কারাদ- ও অর্থদ- দিয়েছিল। এর আগে ৭ অক্টোবর বাতিল হয় সেগুনবাগিচা প্রকল্পসংশিস্নষ্ট মামলা। এছাড়া রাজারবাগ-১ প্রকল্পসংশ্লিষ্ট মামলা বাতিল হয় ১৫ জুলাই। মালিবাগ-২ প্রকল্পসংশ্লিষ্ট মামলা বাতিল হয় ২৩ জুন এবং হোসনী দালান প্রকল্পসংশ্লিষ্ট মামলা বাতিল হয় ১২ মে। এসব মামলায় হাইকোর্টের রায়ে বলা হয়েছে, রাজনৈতিক স্বার্থে উদ্দেশ্যমূলকভাবে এসব মামলা দেয়া হয়েছিল। মোহাম্মদ আতিকউল্লাহ খান মাসুদ একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। তিনি বহুল প্রচারিত দৈনিক জনকণ্ঠ পত্রিকার সম্পাদক, মুদ্রাকর ও প্রকাশক। তাঁর বিরুদ্ধে যে সমস্ত অভিযোগ আনা হয়েছে তা বাদীপক্ষ প্রমাণ করতে পারেনি। দুদকের আইনজীবীরা দাবি করেছেন, ৪১ জনের কাছ থেকে তিনি ফ্ল্যাট বিক্রি বাবদ অগ্রিম গ্রহণ টাকা গ্রহণ করেছেন; কিন্তু সাক্ষীরা তাঁদের সাক্ষতে এ কথা কোথাও দাবি করেননি। কাজেই বিশেষ জজ আদালতের রায় বাতিল করা হলো। আদালতের এ রায়ের মাধ্যমে বাতিল হয়ে গেল উপরোক্ত ৬টি মামলা।

[ad#co-1]