বাংলার পথে মহাত্মা গান্ধী

গোলাম কাদের
তার সমস্ত কর্মের সন্ধান পাই তাঁর প্রিয় গানের ভেতর ‘ঈশ্বর আল্লা তেরে নাম, সবকো সদমতি দে ভগবান’।
নবীন ব্যারিস্টার মোহনদাস করম চাঁদ গান্ধী ভারত ছেড়ে দক্ষিণ আফ্রিকায় গিয়েছিলেন দু’পয়সা কামাই করার জন্য। কিন্তু তাঁর শিক্ষা, লেখাপড়া, পা-িত্য তাঁকে নিগৃহীত মানবতার পক্ষে কথা বলার শক্তি ও সাহস জোগায়। তিনি হয়ে ওঠেন নিগৃহীত মানবতার সোচ্চার কণ্ঠস্বর।

মহাত্মা গান্ধী ১৯০৬ সালের ১১ সেপ্টেম্বর দক্ষিণ আফ্রিকায় মানবতার বিরুদ্ধে বঞ্চনাকে প্রশমন করার অস্ত্র হিসেবে সত্য ও অহিংসাকেই গ্রহণ করেছিলেন। ব্যারিস্টার মোহনদাস করম চাঁদ গান্ধীর ভাষ্যে সেই পথের নাম সত্যাগ্রহ। সেই যাত্রা শুরু। আফ্রিকা এবং ভারত। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে তিনি হয়ে ওঠেন সর্বভারতীয় নেতা। ভারতের বহু সম্প্রদায়ের অনৈক্যের মাঝে তিনি ঐক্যের প্রতীক হয়ে ওঠেন। হয়ে ওঠেন সর্বজনপ্রিয় নমস্য ব্যক্তিত্বে। ভারত জাতির জনক মহাত্মা গান্ধী সত্যাগ্রহ, লবণ সত্যাগ্রহ, নানা আন্দোলন সংগ্রামের ভেতর দিয়ে শেষে অসহযোগ আন্দোলনের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জন করেন। তিনি কখনো ভারত বিভক্তি চাননি। তিনি বলেছেন, স্বাধীনতা দশ বছর পিছিয়ে যাক তবু ভারত বিভক্তি মানব না। কিন্তু বাস্তব সত্য গান্ধীকে ভারত বিভক্তি মানতে হয়েছিল। মহাত্মা গান্ধীর বড় বড় কাজের মধ্যে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, ভারতবাসীর ঐক্য; সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা তাঁকে ব্যথিত করেছে। তিনি সম্প্রীতি রক্ষার জন্য পাঞ্জাব থেকে পশ্চিম বাংলা, বিহার; বিহার থেকে তৎকালীন পূর্ব বাংলার নোয়াখালী, বিক্রমপুরের ফুরশাইল, লৌহজং ছুটে এসেছেন। নোয়াখালীতে তিনি একবার চার মাস অবস্থান করেন। তিনি সব ধর্মের, উঁচু-নিচু সব সম্প্রদায়ের লোক নিয়ে নীরব প্রার্থনায় মগ্ন হতেন। এক সত্যকেই তিনি মেনে নিয়েছিলেন। তাঁর নীরব প্রার্থনার ভেতরে সবাইকে নিয়ে যে শক্তির উত্থান তিনি দেখিয়েছেন, তা পৃথিবীর দেশে দেশে মানুষের বন্ধ দরজা খুলে দিয়েছে। ভ্রাতৃত্বে ঐক্যের সংগ্রামের উন্মেষ ঘটেছে।
তাঁর এ নীরব আন্দোলন ইউরোপ, আমেরিকা, দক্ষিণ আফ্রিকাসহ এ ভূ-ভারতকে এগিয়ে নিয়ে গেছে। তাঁর সেই পথে শান্তি, সম্প্রীতি, স্বাধীনতারই জয়গান। তিনি তাই আমাদের উচ্চারণে ঠাঁই নিয়েছেন। জাতিসংঘ তাঁর জন্ম দিবস ২ অক্টোবরকে অহিংস দিবস ঘোষণা দিয়েছে।

গান্ধী ছিলেন এক পড়–য়া রাজনীতিক। আবার তিনি সাধারণ পাঠক ছিলেন না। তিনি কোরআন, বাইবেল, গীতা, বড় বড় ধর্মের সব গ্রন্থ প্রায় মুখস্থই করে ফেলেছিলেন। তাঁর প্রায় বক্তব্য ধর্মাশ্রয়ী ঋষিতুল্য। আমাদের রাজনীতিকদের মতো ছিলেন না তিনি। বর্তমান রাজনৈতিক নেতাদের মতো তিনি ভোগবিলাসী ছিলেন না। ভারত স্বাধীনতা লাভের পর কংগ্রেসের নেতারা যখন ভোগ-বিলাসে মত্ত হয়ে ওঠেন, তিনি তখন ক্ষোভে কংগ্রেস ভেঙে দিতে চেয়েছিলেন। তিনি প্রতিনিয়ত লেখালেখি করতেন। অজপাড়াগাঁ নোয়াখালীতে যখন চার মাস অবস্থান করেন তখনও পত্রিকায় লেখা পাঠাতেন। তাই দেখি মহাত্মা গান্ধীর রচনাসমগ্র ৩০০ খ-ে।

তিনি ছিলেন নিরামিষ ভোজী। ছাগীর দুধ, কিছু কিশমিশ ফল আহার করতেন। কোর্ট টাইয়ের ব্যারিস্টার মোহনদাস করম চাঁদ গান্ধীর পরিচিত পোশাক এক টুকরো লেংটি আর এক টুকরো উত্তরীয় হাতে একটা লাঠি। ‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলরে…’ নীতিতে বিশ্বাসী ছিলেন তিনি।

পূর্ব বাংলার প্রতি তাঁর একটি আলাদা টান ছিল। ১৯৪৭ সালের নোয়াখালীর ঘটনা তাঁকে বড় দুঃখকাতর করে তুললো। ভারতজুড়ে দাঙ্গা শুরু হয়ে গেছে। তিনি বিচলিত হলেন। বিহারে ভয়াবহ দাঙ্গা। ৭৭ বছরের বৃদ্ধ গান্ধীজি ২৮ অক্টোবর দিল্লি থেকে ছুটলেন নোয়াখালীর পথে। পথে খবর পেলেন বিহারে দাঙ্গার কথা। ভারত সরকারও বিহার সরকারের কাছে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য পত্র দিলেন। প-িত জওহরলাল নেহেরু, সর্দার বল্লাভ ভাই প্যাটেল, লিয়াকত আলী খান, রাজেন্দ্র প্রসাদ, মৌলানা আবুল কালাম আজাদ, আচার্য্য কৃপালিনী সবাই ছুটেছিলেন বিহারের শান্তি প্রতিষ্ঠায়। শুধু গান্ধীজি ছিলেন নোয়াখালীর পথে। গান্ধীজি নোয়াখালী পৌঁছলেন। উভয় সম্প্রদায়ই যার যার অপকর্ম লঘু করে দেখতে চাইল। গান্ধীজি উপদ্রুত অঞ্চলগুলো পরিদর্শন করেন এবং সব জায়গাতেই তিনি সম্প্রীতির উপদেশ দেন। এখানকার হিন্দু-মুসলমানরা যেন শান্তিতে সহাবস্থান করতে পারে, সে জন্য তাঁর জীবন পণ। প্রয়োজনে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত নোয়াখালীতে থাকতে ইচ্ছা প্রকাশ করেন। আর সবার মন জয় করার মানসে তিনি বাংলা শিখতে আরম্ভ করেন। আর বাংলার শিক্ষক নিযুক্ত হন তখন সাংবাদিক শৈলেন চট্টোপাধ্যায়। নোয়াখালী ও ত্রিপুরায় চার মাস অবস্থান করে তিনি বিহার যান। সেখানে সম্প্রীতি ফিরিয়ে আনতে নিরলসভাবে কাজ করে যান। গান্ধীর মতো হিংসার বিরুদ্ধে শুধু লোটাকম্বল নিয়ে অবস্থান নেয়া। তার পরও তাঁকে হিংসার অনলে মরতে হয়েছে। হিন্দু মৌলবাদী নাথুরামের পরপর তিনটি গুলি তাঁকে বিদ্ধ করে। হায় রাম বলে তিনি লুটিয়ে পড়েন। ৩০ জানুয়ারি সন্ধ্যার প্রার্থনায় অংশগ্রহণ নেয়া হয়ে ওঠে না।

হিংসার বিরুদ্ধে গান্ধীর সংগ্রাম থেমে যায়নি। পৃথিবীর দেশে দেশে হিংসার আগুন যেখানেই জ্বলে ওঠে সেখানেই মহাত্মা গান্ধীর নাম উচ্চারিত হয়। তাই তাঁর জন্মদিবস ২ অক্টোবরকে দেরিতে হলেও জাতিসংঘ অহিংসা দিবস হিসেবে ঘোষণা দিয়েছে। আর এই ঘোষণা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি আন্দোলনকে কিছুটা হলেও এক ধাপ এগিয়ে দিয়েছে। বর্তমান বিশ্বে গান্ধী এখনো আগের মতোই জনপ্রিয়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা হোসেনও গান্ধী অন্তঃপ্রাণ। তাঁর পথ ধরেই এগিয়ে যেতে তাঁর বহু বক্তৃতায় মহাত্মা গান্ধীর কথা এসেছে। আমাদের অনেক নেতা-নেত্রী তাঁর আদর্শ অনুসরণ করে হিংসার না অসহযোগের পথ বেছে নিয়েছেন। সফল হয়েছেন। নতুন প্রজন্মের কাছে, নতুন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের কাছে তাঁর বাণী পৌঁছে দিতে হবে। হিংসা ও সন্ত্রাস নয়। রাজনীতিতে অহিংসার বিকল্প নেই, আর মহাত্মা গান্ধী এ জায়গায় অদ্বিতীয় হয়ে আছেন।

[ad#co-1]