পুরনো সে দিনের কথা

পূরবী বসু
মাঝখানে ধরে রেখেছে যে কালো মোটা লাঠি, তা গেঁথে রয়েছে আমার সামনে বসানো কাঁচের গোল টেবিলটার ঠিক মধ্যখানে। আমি বসে বসে বরফ দেওয়া ঠা-া চা পান করছি আর বাগানের চারদিকে বিভিন্ন রকমের ফুল ও ঝোপঝাড় দেখছি। সেই সঙ্গে লৰ্য রাখছি আমাদের ছেলে দীপনের অতি আদরের কুকুর বাবল্স্ বাগানে যেন কোন অঘটন না ঘটায়। মাটি খোঁড়া ইঁদুর জাতীয় প্রাণীর স্বভাবজাত হলেও এই কুকুরটিও সুযোগ পেলেই মাটি খুঁড়তে শুরম্ন করে, বিশেষ করে কাঠের বেড়ার নিচ দিয়ে। কে জানে এই বন্দি জীবন থেকে নিষ্কৃতি পাবার জন্যেই কিনা। নাকি বেড়ার ওধারে পাশের বাড়ির ছোটয় বড়য় মিলিয়ে গোটা চারেক কুকুর যে সারাৰণ ঘুরে বেড়ায় তাদের সানি্নধ্য পাবার লোভে যাদের সঙ্গে এখনো সাৰাৎ মোলাকাত হয়নি তার, কিন্তু যাদের সরব উপস্থিতি প্রতিনিয়তই টের পায় এখান থেকে।

আমরা কলোরাডোতে এসেছি মাত্র কয়েক মাস আগে। বহুকাল ধরে অতি ব্যসত্ম আর ঘন বসতিপূর্ণ আমেরিকার পূর্বাঞ্চলে বাস করার পর স্বাস্থ্যগত কারণে একটু আগেভাগেই অবসর নিয়ে চলে এসেছি এই নিভৃত এলাকায়। ফলে এখানকার বৈচিত্র্যময় ও ভিন্নতর প্রকৃতি এখনো গা-সহা হয়নি। রকি মাউন্টেন রাজ্য কলোরাডোর রাজধানী ডেনভার শহর এই দেশে মাইল-হাই-সিটি বলে পরিচিত।

কেননা সমুদ্রের সত্মর থেকে এই শহরের উচ্চতা এক মাইল ওপরে। মরম্নভূমির রাজ্য নিউ মেঙ্েিকার গা ঘেঁষে ঠিক উত্তরেই কলোরাডোর অবস্থান। ফলে ঠিক মরম্নভূমি না হলেও এদেশের অন্যান্য জায়গার তুলনায় কলোরাডোতে গাছপালা অনেক কম। যা আছে তাও উচ্চতায় বেশ খাটো। আমেরিকার উত্তর-পূর্ব অঞ্চলের মতো ঘন সবুজ বন আর অতি বিশাল বিশাল গাছ এখানে দেখা যায় না। একে তো অতি উঁচু জায়গা, তায় গাছগাছালির অভাব, মনে হয় সূর্যটা এখানে যেন অনেক কাছাকাছি, আর তার উত্তাপ যেন এসে সরাসরি গায়ে বিঁধে। একই কারণেই বুঝি দিগনত্মটার পরিসরও এখানে মনে হয় অনেক বেশি বিসত্মৃত। উলটো করা গম্বুজের মতো বিশাল প্রাকৃতিক এই বৃত্তের সব দিকই ফাঁকা খোলামেলা। ম্যানহাটানের মতো দৃষ্টিকে আটকে দেয় না গগনচুম্বী সারি সারি অট্টালিকা। হাইওয়ে দিয়ে ড্রাইভ করে কোথাও যাবার সময় দেখা যায় মাইলের পর মাইল খোলা মাঠ আর বিসত্মীর্ণ দিগনত্ম। অনেক অনেক দূরে দৃষ্টিকে তখন প্রসারিত করে দিলে দেখা যাবে আকাশটা যেন আসত্মে আসত্মে নেমে এসে সত্যি সত্যিই মাটিকে ছুঁয়েছে। দিগনত্মের এই ব্যাপ্তি আজ পর্যনত্ম আর কোথাও দেখিনি। এছাড়া পরিষ্কার গাঢ় নীল রঙের বিসত্মীর্ণ আকাশের ক্যানভাসজুড়ে কত রঙ বেরঙ ও বিভিন্ন আকৃতির মেঘ যে ঘুরে বেড়ায় সারাদিন, বিশেষ করে শেষ বেলায়, চোখে না দেখলে সেই অপরূপ দৃশ্য বর্ণনা করা যাবে না। মনে হয় নিপুণ কোন শিল্পীর হাতে অাঁকা বিশাল ও বিমূর্ত এক চিত্রকর্ম, যার রঙের ছটা আর ভেতরকার বিভিন্ন রেখা ও আকৃতি কখনো স্থির নয়-অনবরতই পাল্টাচ্ছে।

বারান্দায় বসে আকাশ আর মাটির দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ আমার নজরে আসে, আমাদের বাগানের ঘাস কাটার সময় হয়ে এসেছে আবার। শেষ ঘাস কাটার পর এক সপ্তাহও হয়নি এখনো। এরই ভেতর বেশ লম্বা হয়ে গেছে ঘাসগুলো। মজার ব্যাপার হলো, এই ঘাস বড় ও ঘন করার জন্যে সারা গ্রীষ্মজুড়ে কী প্রাণানত্মকর চেষ্টা সকল গৃহবাসীর। সপ্তাহে তিন দিনের বেশি লনে জল দেওয়া যেহেতু বারণ এই শহরে ঐ তিন দিনই অনত্মত দুই বেলা করে অটোমেটিক স্প্রিঙ্কলার সিস্টেমে ঘন্টাধিক কাল ধরে সামনে পেছনে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে জল ছিটানো হয় ঘাসের ওপর। এত জল, আর তার ওপরে যথেষ্ট পরিমাণে সার আর আগাছা মারার ওষুধ প্রয়োগের পর, ঘাসের দোষ কি একটু তাড়াতাড়িই বড় হয়ে উঠলে? কিন্তু না, প্রতিবেশীদের সঙ্গে পালস্না দিয়ে অথবা তাদের সঙ্গে সমতা রৰা করে চলার জন্যে সপ্তাহ যেতে না যেতেই মসৃণ করে ঘাস কেটে ফেলতেই হবে লন-মোয়ার দিয়ে, যাতে অঞ্চলের অন্যান্য বাড়ির তুলনায় দৃষ্টিকটু না ঠেকে এই বাড়ি। চাই বা না চাই, এই নিয়ম বা রম্নটিনের মধ্যে আমিও বাঁধা পড়ে গেছি, আর সেটা শুধু এই শহর বা রাজ্যেই নয়, প্রায় সব জায়গাতেই যেখানে যেখানে থেকেছি গত তিরিশ বছর ধরে। মনে পড়ে এ্যালাবামা রাজ্যের মোবিল শহরে থাকাকালীন সময়ে একবার মাসখানেকের জন্যে দেশে গেছিলাম। এদেশে আসার পর মোবিলেই প্রথমবারের মতো সামনে পেছনে জায়গাসহ একটা গোটা বাড়িতে থাকার অভিজ্ঞতা আমাদের। এর আগে বরাবর এ্যাপার্টমেন্টেই থাকতাম। সেবার দেশ থেকে ফিরে এসে দেখি বাড়ির সামনে সুন্দর করে লনের ঘাস কাটা। ভাবি হয়তো কোন সহৃদয় প্রতিবেশীর বদান্যতা। অবশ্য অনুরোধ করে গেলে এটুকু করে দিতে কার্পণ্য করে না প্রায় কোন প্রতিবেশীই। কিন্তু ব্যাপার হলো, আমরা তো কাউকে বলে যাইনি। আশপাশের প্রতিবেশীদের জিজ্ঞেস করে জানি স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে তারা কেউ আমাদের ঘাস কেটে দেয়নি, তবে দেখেছে অপরিচিত কাউকে এসে অনত্মত দুবার ঘাস কেটে দিয়ে যেতে। আমরা তো অবাক। এ ধরনের কাজ কারবার কেবল রূপকথাতেই পড়েছি। কিন্তু কদিন যেতে না যেতেই টের পেলাম রূপকথার কোন পরী বা দয়ালু কোন দানবের কা- এটা নয়। খোদ সিটি কর্পোরেশনের হসত্মৰেপ। শীঘ্রই আমরা একটা মোটা অঙ্কের বিল পাই সিটি থেকে। শহর কতর্ৃপৰ প্রথমে গাফিলতির জন্যে একটি সতর্ক নোটিস পাঠায় এবং তার ঠিক তিন দিন পরে তাদের নিজেদের লোক পাঠিয়ে ঘাস কাটায় অঞ্চলের সৌন্দর্য ও মান বজায় রৰা করবার জন্যে।

কিন্তু কদিন যেতে না যেতেই টের পেলাম রূপকথার কোন পরী বা দয়ালু কোন দানবের কাণ্ড এটা নয়। খোদ সিটি কর্পোরেশনের হস্তক্ষেপ। শীঘ্রই আমরা একটা মোটা অঙ্কের বিল পাই সিটি থেকে। শহর কর্তৃপক্ষ প্রথমে গাফিলতির জন্যে একটি সতর্ক নোটিস পাঠায় এবং তার ঠিক তিন দিন পরে তাদের নিজেদের লোক পাঠিয়ে ঘাস কাটায় অঞ্চলের সৌন্দর্য ও মান বজায় রৰা করবার জন্যে। ফলে শুধু ঘাস কাটার খরচই নয়, সঙ্গে জরিমানাও দিতে হয় বসতবাড়ি রৰণাবেৰণের নিয়ম ভঙ্গের অপরাধে।

এসব কথা ভাবতে ভাবতে ঠিক চলিস্নশ বছর আগের আগস্টের এক দুপুরের কথা মনে পড়ে যায়_ যখন ঘাস, লন, বাড়ি দূরে থাক, মাথার ওপর এই ছাতাটার মতো একটা সামান্য আচ্ছাদনও ছিল না আমাদের। আৰরিক অর্থেই আমরা এসে দাঁড়িয়েছিলাম খোলা আকাশের নিচে। সেটা ছিল ১৯৭০ সাল। আমার এদেশের প্রথম গ্রীষ্ম। স্পষ্ট মনে পড়ে সেই কাঠ ফাটা গরম আর প্রখর রোদ্দুরে সেদিন ফিলাডেলফিয়া শহরে এলেগেনী এ্যাভিনিউর ১৩৩২ নম্বর এ্যাপার্টমেন্ট বাড়িটির সামনে বাঁধানো সিঁড়ির ওপর বসে ছিলাম আমরা_ আমরা মানে আমি ও জ্যোতি। আমাদের ঘর ছিল না, যাবার কোন জায়গা ছিল না সেদিন। আমার স্পষ্ট চোখে ভাসে, কোলের ওপর স্থানীয় সংবাদপত্র ফিলাডেলফিয়া ইঙ্কুয়েরার-এর একটা ভাঁজ করা কপি রেখে ‘ফর রেন্ট’ দেখে দেখে কলম দিয়ে দাগ দিচ্ছে জ্যোতি। আর আমি পাশে বসে আছি চুপচাপ, কিছুই করছি না, কিছুই দেখছি না, কিছুই যেন ভাবতে পারছি না আর। সেদিন ভোরবেলাতেই প্রায় চৌদ্দ ঘণ্টা বাসে চড়ে ফিলাডেলফিয়া ফিরে এসেছি আমরা মায়ামী, ওহায়ো থেকে। সারারাতই কেটেছে বাসে আধো ঘুমে আধো জাগরণে। ঘণ্টা দুয়েক আগে পরিচিত বাঙালী ডক্টর সুনীল নিয়োগীর বাসা থেকে জ্যোতি একটা জরম্নরী চিঠি নিয়ে এসেছে যেটা ঢাকা থেকে শ্বশুর লিখেছেন জ্যোতিকে। চিঠিটি জ্যোতির শার্টের ওপর পকেটে। নীল রং-এর এ্যারোগ্রামের কিনারাটা বুক পকেটের ওপর দিয়ে আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি। কিন্তু ঐ চিঠি পড়তে আগ্রহ দেখানো দূরে থাক, ওটার বিষয়বস্তুর ব্যাপারেও একটা প্রশ্ন আমি করিনি জ্যোতিকে। সেও আমাকে কিছুই বলেনি। নৈঃশব্দ আর জ্যোতির মুখের অভিব্যক্তি থেকেই চিঠির বক্তব্য আমার জানা হয়ে গেছে। পরিষ্কারভাবেই কিন্তু আমরা কেউ কারো সঙ্গে এ ব্যাপারে কথা বলছি না।

আমরা বসে আছি যে এ্যাপার্টমেন্ট বাড়িটির সিঁড়িতে, কয়েক সপ্তাহ আগেও এই বাড়ির একতলায় আমাদের একটা ঘর ছিল। অথচ আজ আমরা এখানে উদ্বাস্তু। সহৃদয় কেয়ারটেকারের দয়ায় চারটি সু্যটকেস আর দুটি বড় বড় কার্ডবোর্ডের বাঙ্রে ভেতর আমাদের সংসারের নিত্যপ্রয়োজনীয় বহু টুকিটাকি এখনো এই বাড়ির বেসমেন্টে সংরৰিত। অথচ এই বাড়িটিরই সামনে বড় রাসত্মার ধারে সিঁড়িতে বসে বসে প্রচ- গরমে আমি ঘামছি। আর পিপাসায় গলা শুকিয়ে যাচ্ছে আমার, হয়তো জ্যোতিরও, তবু মুখে কিছু বলছি না আমরা। ভাবখানা এমন যেন কথা না বললেই তেষ্টা মিটে যাবে আপনাআপনিই। এই বাড়ির একটি এফিসিয়েন্সি এ্যাপার্টমেন্টেই আমার প্রথম বাস এই দেশে। আমরা যেখানে বসে আছি তার ঠিক পেছনেই ডানদিকে সেই এ্যাপার্টমেন্টের জানালা। মাত্র আট মাস আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্স পরীৰা শেষ করে দুটি সু্যটকেস নিয়ে জানুয়ারির কনকনে এক শীতের রাতে পেস্নন থেকে নেমেছিলাম ফিলাডেলফিয়া বিমানবন্দরে। জ্যোতি আগের সেমিস্টার থেকেই এই শহরে পড়াশোনা করছে। বিমানবন্দর থেকে সে সোজা আমাকে এনে তুলেছিল এই বাসাতেই। একই রম্নমের ভেতর একটি ডবল খাট, একটি ছোট্ট সোফা ও টেবিল। মাঝখানে অর্ধেক দেয়াল দিয়ে ভাগ করা রান্নার জায়গা আর ওপাশে বাথরম্নম। সব কিছুই একটা বড় ঘরের মধ্যে যা এফিসিয়েন্সি বা স্টুডিও বলে পরিচিত এই দেশে। আর ঘরে যেটুকু সামান্য আসবাবপত্র সবই এ্যাপার্টমেন্টের সঙ্গে এসেছে আমাদের কিছুই কিনতে হয়নি। জ্যোতির আড়াইশ ডলারের এ্যাসিস্টেন্টশিপ থেকে মাসে হাতে পাই আমরা ২০৭ ডলার। গ্যাস, বিদু্যতসহ বাসা ভাড়া ৭৫ ডলার। বাকি টাকা দিয়ে খাওয়াদাওয়া, যানবাহন, কাপড়চোপড় সংসারের যাবতীয় খরচ। তার ওপরে আমরা দুজনেই গ্রেজুয়েট স্কুলের ছাত্র। তবে ভাগ্য ভালো কারোরই টুইশন লাগে না টুইশন ফ্রী স্কলারশিপ রয়েছে দুজনেরই। তবু কিছু না কিছু খরচ তো রয়েছেই পড়াশোনার! আমার তখনও কোন রোজগার নেই।

দেশ থেকে আসার দুদিনের ভেতরই আমার ক্লাস শুরম্ন হয়ে যায়। জ্যোতিরও। আমরা দুজন দুই শিৰা প্রতিষ্ঠানের ছাত্র। জ্যোতি টেম্পল বিশ্ববিদ্যালয়ে আর আমি মেডিক্যাল করেজ অব পেনসিলভেনিয়াতে। যাতায়াত করি সাবওয়ে অথবা ট্রাম আর বাসে। দুপুরে খাবারের জন্যে সঙ্গে বেঁধে নিয়ে যাই স্ট্যান্ডউইচ। রাতে ভাত, মাছ বা মাংস ও তরিতরকারি রেঁধে খাই। সেই সময় বাঙালী এত কম ছিল যে, ফিলাডেলফিয়াতে মসলা, চাল, ডাল কেনার জন্যে কোন ভারত উপমহাদেশীয় গ্রোসারির দোকান ছিল না। ওসবের জন্যে যেতে হতো নিউইয়র্ক শহরের দোকান কালুসত্মিয়ানে। আমাদের পৰে সেটা সম্ভব ছিল না। ফলে এখানে সাধারণ দোকানে যা পাওয়া যেত তাই দিয়েই রান্না করতাম তখন। খারাপ লাগত না খেতে। হাতেগোনা যে কয়জন বাঙালী ছিলেন সকলেই ছিলেন উচ্চ শিৰিত এবং প্রায় প্রত্যেকেই কোন না কোন প্রফেশনাল কাজের সঙ্গে যুক্ত। আমাদের মতো আরও কয়েকজন বাঙালী ছাত্রও ছিল, শহরের অন্য শিৰা প্রতিষ্ঠানে যাদের সঙ্গে আমাদের আরও পরে আলাপ হয়েছে। সেই সময় গোটা আমেরিকাতেই ছাত্র এবং বিশেষভাবে প্রশিৰণপ্রাপ্ত বাছাই করা সীমিত কিছু প্রফেশনাল লোক ছাড়া সাধারণ, বিশেষ করে খেটে খাওয়া, বাঙালীদের আসা শুরম্ন হয়নি।

দেখতে দেখতে এক সেমিস্টার কেটে যায়। জানুয়ারি থেমে মে। তারপর প্রায় তিন মাস গ্রীষ্মকালীন ছুটি। ছুটি শুরম্ন হবার কদিন আগে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এসে জ্যোতি জানায়, ছয় সপ্তাহের জন্যে মেঙ্েিকাতে আনত্মর্জাতিক সাংবাদিকতার ওপর গ্রীষ্মকালীন একটি কোর্স ও ওয়ার্কশপ করার জন্যে তাকে বৃত্তি দিতে চাইছেন তার প্রফেসর। এ রকম একটা সম্ভাবনার কথা আগেই বলেছিলেন তিনি, তবে নিশ্চিত ছিলেন না এটা হবে কি হবে না। এটা শুরম্ন হবে জুনের তৃতীয় সপ্তাহে। একটি বিদেশী ছাত্র হিসেবে এই বিশেষ কোর্স ও ওয়ার্কশপে অংশগ্রহণ করার জন্যে স্কলারশিপ পাওয়া কম কথা নয়। কিন্তু সম্পূর্ণ বিনা খরচে এ রকম একটা একাডেমিক প্রোগ্রামে যোগদান ও সেই সঙ্গে নতুন একটা দেশ দেখার এই বিরল সুযোগের সদ্ব্যবহার করা বুঝি হলো না জ্যোতির। আর সেটা কেবল আমার কথা ভেবেই। এই ছয় সপ্তাহ আমি কোথায় থাকব। গ্রীষ্মকালে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এ্যাসিস্ট্যান্টশিপ পাওয়া যায় না। আবার নতুন শিৰা বছরে অর্থাৎ আগস্টের শেষ থেকে জার্নালিজম ডিপার্টমেন্টে জ্যোতির এ্যাসিস্ট্যান্টশিপের কাজ শুরম্ন হবে। ফলে একা একা এই বাসায় কীভাবে আমি থাকব, আর্থিকভাবে চলবই বা কেমন করে এসব ভেবে না যাওয়ার সিদ্ধানত্মই নিতে চায় জ্যোতি। ইচ্ছা ও সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও ছাত্র ভিসার নিয়মের কড়াকড়িতে প্রথম বছর ক্যাম্পাসের বাইরে কোথাও আমার কাজ করার উপায় ছিল না। জ্যোতি আমাকে বোঝায় মেঙ্েিকা না গিয়ে এখানে থাকলে সংসারের খরচের জন্য ইমিগ্রেশনের আইন অনুযায়ীই পুরো গরমকালটায় কোন জায়গায় পার্টটাইম কাজ করতে পারবে সে। যেহেতু সে আর প্রথম শিৰা বছরের ছাত্র নয়। শুনে স্থানীয় বন্ধুবান্ধবরাও সায় দেয় জ্যোতির সঙ্গে। এছাড়া উপায়ই বা কী! কিন্তু আমার কেবলই মনে হয়, যদি কোনভাবে জ্যোতিকে পাঠানো যেত মেঙ্েিকা! এ রকম সুযোগ তো রোজ রোজ আসে না।

কিছু দিন আগে এখানে আমাদের এক বয়োজ্যাষ্ঠ নিঃসন্তান বন্ধু পরিবারের কাছে চিকিৎসার জন্যে দেশ থেকে এসেছে বীথি নামে এক কিশোরী, ছোটবেলায় পোলিও হওয়ায় যে ক্রাচ ছাড়া হাঁটতে পারে না। এখানকার শ্রাইনার হাসপাতাল মেয়েটির বিনা খরচে অস্ত্রোপচার ও চিকিৎসার দায়িত্ব নিতে রাজি হয়েছে এই শর্তে যে, স্থানীয় কোন অভিভাবক দুই অস্ত্রোপচারের মাঝখানের সময়টিতে মেয়েটিকে বাড়িতে নিয়ে গিয়ে দেখাশোনা ও শুশ্রূষা করার ব্যবস্থা করবে। বীথি এই নিঃসনত্মান দম্পতির আত্মীয় নয়, তবে ওর মা-বাবা তাদের খুবই ঘনিষ্ঠ পারিবারিক বন্ধু। বীথি আসার পর থেকেই আমার সঙ্গে ওর দারম্নণ ভাব হয়ে যায়। একে দুজনেই নতুন এসেছি এদেশে, ফলে স্বভাবতই খুব ঘর-কাতর। তার ওপরে এখানে আমাদের পরিচিত যেসব বাঙালী রয়েছে অনত্মত তিরিশের কোঠায় তাদের বয়স এবং প্রায় প্রত্যেকেই মোটামুটি প্রতিষ্ঠিত। ফলে আমাকেই তার বয়সের কাছাকাছি পেয়েছিল বীথি, আর আমিও পেয়েছিলাম তাকে সেভাবেই। তাই প্রথম দেখাতেই বীথি আমার বন্ধু হয়ে যায়। যে সময়টায় জ্যোতির মেঙ্েিকা যাবার কথা চলছে, তখন হন্যে হয়ে বীথির স্থানীয় অভিভাবকরা একজন মেয়ে খুঁজছেন যে ছয়-সাত সপ্তাহ ধরে প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যনত্ম তাদের বাসায় এসে থাকবে ও সদ্য পায়ে অস্ত্রোপচার করা বীথির দেখাশোনা করবে। কেননা তারা স্বামী-স্ত্রী দুজনেই চাকরি করেন। আমার হঠাৎ কী মনে হলো লজ্জার মাথা খেয়ে সেই দম্পতিকে গিয়ে বললাম, আমিই না হয় দেখাশোনা করি বীথির। এতে বীথি যেমন খুশি হবে আমাকে পেয়ে আমারও ভালো লাগবে ওর দেখাশোনা করতে আর ওর সঙ্গে গল্প করে লুডু খেলে সময় কাটাতে। এদিকে জ্যোতিও তাহলে নিশ্চিনত্মে যেতে পারবে মেঙ্েিকাতে সামার স্কুলে, আমার জন্যে দুশ্চিনত্মা করতে হবে না তাকে। এতে করে বীথির জন্যে বাইরের লোক নিয়োগ করার ঝামেলা বা বাড়তি খরচ কোনটারই দরকার হবে না। বীথি যে ঘরে ঘুমোয়, সেখানেই সোফা বেডে আমি ঘুমুতে পারব এবং প্রয়োজনে রাতেও দেখাশোনা করতে পারব তার। ভেবেছিলাম বীথির স্থানীয় অভিভাবকরা লুফে নেবেন আমার প্রসত্মাব। কিন্তু প্রথমে একটু থতমত খেয়ে, পরে বেশ শানত্ম মাথায়, ভদ্রভাবেই তারা আমার অনুরোধ ফিরিয়ে দিলেন। পরে আমি শুনেছিলাম, যেহেতু এই দেখাশোনার খরচটা বীথির মা-বাবাই বহন করবেন, আমাকে ছয় সপ্তাহ ধরে তাদের বাড়িতে রেখে থাকা খাবার ব্যবস্থা কেন করবেন, এই যুক্তি বা বিবেচনাতেই অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন তারা। এমন সহজ ও উচিত কথাটা কেন মাথায় আসেনি তখন ভেবে আমার পরে খারাপ লেগেছে। সে যাই-ই হোক কয়েকদিনের ভেতর কাকতালীয়ভাবে একটা ভিন্নতর যোগাযোগ হয়ে গেল। জ্যোতির জগন্নাথ হলে থাকাকালীন সময় থেকে পরিচিত এক অগ্রজপ্রতিম বন্ধু ডক্টর জ্ঞান ভট্টাচার্য, ওহাইয়োতে এক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ান। বছরখানেক আগে তিনি দেশে গিয়ে বিয়ে করে এসেছেন। তার স্ত্রী মাত্র কয়েকমাস আগেই দেশ থেকে এখানে এসেছেন। ওহাইয়োতে একেবারে বাঙালী নেই, ফলে অল্প বয়সী স্ত্রীটি বড়ই একা। যেহেতু বিজ্ঞান গবেষক (মাইক্রোবায়োলজিস্ট) জ্যোতির এই বন্ধুটিকে অনেক রাত পর্যনত্ম ল্যাবে পড়ে থাকতে হয়। ফোনে কথা বলতে বলতে মেঙ্েিকাতে যাবার জ্যোতির সম্ভাবনার কথা শুনে তারা স্বামী-স্ত্রী দুজনেই জোর করে ধরলেন যাতে আমাকে বৌদির কাছে ওহাইয়োতে রেখে জ্যোতি মেঙ্েিকাতে যায়। প্রায় সমবয়সী বৌদিকে সঙ্গ দেবার হয়তো দরকার ছিল, তবে পরোৰে আমাদের সাহায্য করাই তাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল বলে আমার ধারণা।

জ্ঞানদা বৌদির বাড়ি যেতে পুরো একদিন লেগে যায় বাসে। সেখান থেকে দুতিন দিন পর জ্যোতি যাবে মেঙ্েিকা। ফেরার পথেও একই ব্যাপার ঘটবে। তাছাড়া কোর্স শুরম্ন হবার দু’তিন দিন আগেই মেঙ্েিকা সিটিতে পেঁৗছতে হবে জ্যোতিকে, ওরিয়েন্টেশন ইত্যাদি কীসব রয়েছে। হিসেব করে দেখলাম সব মিলিয়ে প্রায় দু’মাস ফিলাডেলফিয়ার বাইরে থাকব আমরা। দুজনের ওহাইয়ো যাতায়াতের খরচ ইত্যাদির পর এই খালি বাসাটি দুমাসের জন্যে রেখে দেবার জন্যে প্রয়োজনীয় ভাড়া যোগাড় করা বেশ কঠিন, যেহেতু গ্রীষ্মে কোন আয়ের সম্ভাবনা নেই। বাড়ির কেয়ারটেকারের সঙ্গে এ ব্যাপারে আলাপ করলে সে একটা পরামর্শ দেয়। বলে এই বাড়িতে এই মুহূর্তে আমাদের মতো আরও দুটো এফিসিয়েন্সি বাসা খালি। আরও তিনটি খালি হবার কথা রয়েছে সামনের মাসে। আর ঠিক পরের মাসের মধ্যেই সবগুলো ভাড়া হয়ে যাবে এমন সম্ভাবনা কম। তাছাড়া আরও কোন এ্যাপার্টমেন্টও খালি হতে পারে তখন, যখন আমরা ফিরে আসব আগস্টে। ফলে আমরা যদি ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত থাকি ঘরের জিনিসপত্র এই বাড়ির নিচে বেসমেন্টে রেখে বাসা ছেড়ে দিয়ে যেতে পারি। ভদ্রলোক আমাদের আর্থিক অবস্থা বিবেচনা করে সাহায্য করার জন্যেই এই পরামর্শ দেন। কিন্তু আমাদের এই সিদ্ধানত্ম গ্রহণ করা জীবনের একটা বড় ভুল ছিল। ধার করে হলেও বাসাটা রেখে যাওয়া অত্যনত্ম জরম্নরী ছিল। কিন্তু তখন আমরা সেটা বুঝতে পারিনি। প্রথমত, ফিরে এসে খালি বাসা যে পাবো না, সেটা কখনও ভাবিনি। দ্বিতীয়ত, মাথার ওপরে একটা আচ্ছাদন না থাকলে বন্ধু বলে যাদের জানতাম তারাও যে এক দুরাতের জন্যে ঘরে নিতে দ্বিধান্বিত হয়ে পড়বেন সেটাও মাথায় আসেনি। সবচেয়ে বড় কথা তখন কে জানত এই কয়েক সপ্তাহের ভেতর সবকিছু এমন ওলটপালট হয়ে যাবে! কে জানত আমার জীবনে যে মানুষটির অবদান সবচেয়ে বেশি, সদ্য বিবাহিতা অষ্টাদশী আমি স্বামীর চোখের দিকে তাকিয়েও অবলীলায় বলেছিলাম তার চেয়েও যাকে বেশি ভালোবাসি_ যা শুনে স্বামী বলেছিল বিবাহিতা মেয়েদের এমন কথা বলতে নেই, সেই সবচেয়ে গুরম্নত্বপূর্ণ মানুষটি অকস্মাৎ এভাবে নিঃশেষ হয়ে যাবে? কে ভাবতে পেরেছিল, একটু নিভৃতির অভাবে মাথার ওপর এক চিলতে ছাদের অভাবে আমাকে সেই ভয়ঙ্কর দুঃসংবাদটা জানাতে না পেরে নীল এ্যারোগ্রামটি বুক পকেটে লুকিয়ে রেখে অপরাধীর মতো মাথা নিচু করে হন্যে হয়ে কেবল একটা ঘর খুঁজে বেড়াতে হবে জ্যোতিকে, আগস্টের এই তপ্ত দুপুরে খোলা রাসত্মার ওপরে।

ওহাইয়োতে বেশ ভালো সময় কেটেছিল আমার। জ্ঞানদা ও বৌদি অতি চমৎকার মানুষ। দেখা হবার সঙ্গে সঙ্গে এমন করে কাছে টেনে নিলেন যে, আমাকে বুঝতেই দেননি, তারা আমার আজীবনের আপনজন নন। ভীষণ হাসিখুশি বৌদি, সারাৰণ মাতিয়ে রাখেন তার মজার মজার কথা বলে। আমাকে নিয়ে প্রতি সপ্তাহানত্মেই কোথাও না কোথাও বেড়াতে যান তারা। কখনও সিনসিনাটি কখনও কলাম্বাস ডেটন কিংবা ক্লিভল্যান্ডে। তাদের কল্যাণেই আমি পরিচিত হই এদেশের ফ্লি মার্কেট ও ফার্মার্স মার্কেটের সঙ্গে। একবার দাদা কয়েক ঘণ্টা ড্রাইভ করে শিকাগোতে নিয়ে গিয়েছিলেন আমাদের পুরো দুই দিনের জন্যে। সেখানে লেক মিশিগান ও সিয়ার্স টাওয়ার দেখে মু্গ্ধ হয়েছিলাম। স্যাম গুডিজ নামে বিশাল রেকর্ডের দোকান থেকে বৌদি আমাকে দুটি বাংলা লং পেস্ন কিনে দিয়েছিলেন। কিন্তু এত আদরযত্ন এত ভালোবাসা এত সর্বৰণিক খেয়াল সত্ত্বেও আমার মনে শানত্মি নেই। বাবা বেশ অসুস্থ। শ্বাস কষ্টটা ভীষণ বেড়েছে। বাড়ির চিঠিতে শ্বশুরের চিঠিতে (যদিও বাবা তার চিঠিতে নিজের শরীরের কথা কিছু লেখেন না) বাবার অসুস্থতার খবর শুনে খুব মন খারাপ আমার। বাবা নিজেই এখন শয্যাশায়ী পরিপূর্ণ রম্নগী। তার পৰে অন্য রম্নগীর চিকিৎসা করা বা রম্নগী দেখতে যাওয়া সম্ভব নয়। ঐ অবস্থায় সংসারের যে কী করম্নণ অবস্থা হয়েছে, এখানে বসেই বুঝতে পারি। বাবার চিকিৎসার খরচই বা চলছে কেমন করে? আমাদের মুন্সীগঞ্জের বাড়িতে কখনও কোন জমানো টাকা থাকে না ব্যাংকের কোন এ্যাকাউন্টও নেই। আমার নিজের হাতেও তখন পাঠাবার মতো টাকা ছিল না। জ্যোতির কাছেও নেই। কোর্স আর ওয়ার্কশপ নিয়ে মহাব্যসত্ম। মাঝখানে আবার মেঙ্েিকার কয়েকটি শহরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল ওদের স্টাডিটু্যরে। জ্যোতিকে চিঠি লিখি, জানাই বাবার জন্যে বড় দুশ্চিনত্মা হচ্ছে। মনে মনে ভাবি, এ সময় যদি কিছু টাকা পাঠাতে পারতাম। আর আশ্চর্য, জ্ঞানদা একদিন নিজেই প্রশ্ন করেন আমার হয়ে আমাদের বাড়িতে কিছু টাকা পাঠাবেন কিনা। একে তো তাদের বাসায় আশ্রিত, তার ওপর ধার করে টাকা পাঠানো_ আমার মধ্যবিত্ত মানসিকতা আমাকে জ্ঞানদার মহানুভবতা গ্রহণে অস্বীকৃতি জানাতে প্ররোচিত করে। পরে এজন্যেও আফসোস কম হয়নি। আমার বাবার জন্যে শেষ মুহূর্তে যৎসামান্য কিছু করতে পারার এই দুর্লভ সুযোগটাও আমি হারালাম পরিস্থিতির কারণে ঠুনকো আত্মমর্যাদা রৰার্থে। যথাসময়ে জ্যোতি ফিরে আসে। দুদিন জ্ঞানদা ও তৃপ্তি বৌদির সঙ্গে কাটিয়ে আমরা আবার রওনা হই ফিলাডেলফিয়ার উদ্দেশে। ওহাইয়ো থেকে গ্রেহাউন্ড বাস খুব ভোরবেলাতেই এসে থামে ফিলাডেলফিয়া শহরে। কাছাকাছি একটা কফি শপ থেকে দুজনে একটু চা খেয়েই সোজা চলে আসি আমাদের পুরনো সেই এলেগেনি এ্যাভিনিউর এ্যাপার্টমেন্ট হাউজে। মেইলবঙ্রে সঙ্গে লাগানো ১০৪ নম্বরে কলিং বেল টিপলে কেয়ারটেকার জন বেরিয়ে আসে।

বড় বড় ব্যাগ হাতে আমাদের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মুখটি মলিন হয়ে যায় তার। খুবই দুঃখ প্রকাশ করে জন। জানায়, আপাতত কোন এফেসিয়েন্সি এ্যাপার্টমেন্ট খালি নেই তার কাছে। আছে যা তা এক বেডরম্নমের একটি এ্যাপার্টমেন্ট, ভাড়া একশ’ পঁচিশ ডলার। আমাদের সাধ্যের বাইরে এই ভাড়া যোগানো। জন আরও জানায়, কাছাকাছি কোন বাড়িতে বা তার পরিচিতদের মধ্যে কোথাও কোন স্টুডিও খালি আছে বলে সে জানে না। শুনে আকাশ ভেঙ্গে পড়ে আমাদের মাথায়। গ্রীষ্মের শেষে টেম্পল বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের এত কাছে এ সময় ছোট বাসা পাওয়া যে সহজ হবে না এটাও আগে ভালো করে বুঝতে পারিনি। তার ওপর আমাদের বাজেট বড়ই সীমিত। জ্যোতি পাবলিক ফোন থেকে ডক্টর নিয়োগীকে ফোন করে। তিনি আমাদের ঘনিষ্ঠজনদের অন্যতম। যদি বাসার ব্যাপারে কোন সাহায্য করতে পারেন। তখনই জানা যায়, তার ঠিকানায় শ্বশুর একটা জরম্নরী চিঠি লিখেছেন জ্যোতিকে। এছাড়াও একই সঙ্গে ভিন্ন এরোগ্রামে ডক্টর নিয়োগীকেও একটা চিঠি লিখেছেন। ডক্টর নিয়োগীকে শ্বশুর চেনেন না। আমাদের কাছে তার কথা শুনেছেন মাত্র। অপরিচিত ডক্টর নিয়োগীকে কেন চিঠি দিলেন শ্বশুর, ভাবতে অজানা আশঙ্কায় সর্বাঙ্গ কেঁপে ওঠে আমার। তারপর জ্যোতি যখন আমাকে অপেৰা করতে বলে নিজে একা যায় নিয়োগীর বাসায়, চিঠি আনতে আমার সন্দেহ ও আশঙ্কা সম্পূর্ণ জমাট বেঁধে যায়। বাসত্মব চিত্রটা চোখের সামনে ভাসতে থাকে। প্রচ- এক কান্নার বেগ বুক ঠেলে উঠে গলা বেয়ে আমার চোখ মুখের কাছে এসে থেমে যায়। খোলা রাসত্মার ধারে বসে আমেরিকার মতো দেশে আর যাই হোক কাঁদা যায় না। আমার আর জানতে বা বুঝতে বাকি থাকে না কী ঘটেছে, কত বড় সর্বনাশ হয়ে গেছে আমার। ডক্টর নিয়োগীর বাড়ি থেকে চিঠিটা নিয়ে আসার পর থেকে জ্যোতি অসম্ভব গম্ভীর। খবরের কাগজ দেখে দেখে রাসত্মার কোনের পাবলিক ফোন থেকে অনবরত ফোন করছে সে। কিন্তু সামর্থ্য অনুযায়ী একটা বাসাও পাওয়া যাচ্ছে না। কোন কোন স্টুডিওতে আবার নিয়ম আছে একজনের বেশি থাকা চলবে না। ফলে খালি থাকলেও আমাদের কাজে আসে না তা। ঐ চিঠিটি নিয়ে আসার পর থেকে জ্যোতি একবারও আমার মুখের দিকে তাকায়নি। হয় খবরের কাগজ অথবা খোলা রাসত্মার দিকে ওর দৃষ্টি আটকে আছে। আমার সঙ্গে কথাও বলছে না সে। একটা সময়ে এলাকাভিত্তিক বাসা খোঁজার চেষ্টা ছেড়ে দেয় জ্যোতি। শহরের যে কোন একটি জায়গায় আপাতত মাথা গোঁজার মতো একটা ঠাঁই হলেই হলো। তবু কিছু পাওয়া যায় না। একটু আগে ফোন করতে গিয়ে এলেগিনী আর ব্রড স্ট্রিটের কোণের দোকানটি থেকে কলা আর কোক কিনে নিয়ে এসেছে। আমার অবশ্য এক ফোটা খিদে নেই পেটে, যদিও সকাল থেকে এক কাপ চা ছাড়া কিছুই খাইনি আমরা। কলাটা হাতে নিয়ে বসে থাকি চুপচাপ। পিপাসা মেটাতে খোলা কোকের বোতলটা সবে হাতে নিয়েছে জ্যোতি। হঠাৎ সে লৰ্য করে সামনের রাসত্মা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে হামদুন।

মিসরের ছেলে হামদুন। জ্যোতির মতো সে টেম্পল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। এদেশে আসার পথে ওদের আলাপ হয় পেস্ননে। ছাত্র ভিসা নিয়ে টেম্পলে পড়ার জন্যে গত আগস্ট মাসে লন্ডন থেকে একই পেস্ননে করে জ্যোতি ও হামদুন এসেছিল ফিলাডেলফিয়ায়। পেস্ননের ভেতর ইমিগ্রেশনের ফর্ম লেখার সময় হামদুনকে জ্যোতি একটু সাহায্যও করেছিল। এজন্যে সে বড়ই কৃতজ্ঞ। এখানে কাছাকাছিই কোথাও থাকে হামদুন। এর আগেও দু’একবার দেখা হয়েছে জ্যোতির সঙ্গে রাসত্মায়, ক্যাম্পাসে। নামটা পরিচিত মনে হয় আমার, জ্যোতির মুখেই শুনে থাকব। বাড়ির সামনের ফুটপাথ দিয়ে হামদুনকে হেঁটে যেতে দেখে জ্যোতি দৌড়ে গিয়ে তাকে ধরে। ওর এ্যাপার্টমেন্ট কম্পলেঙ্ েযদি কিছু খালি থাকে। আমি বসেই থাকি সিঁড়িতে। ওরা দুজন মিলে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কিছুৰণ কী কথা বলে। তারপর হামদুন আমার সামনে এসে পাশে রাখা বড় ব্যাগটি তুলে নিয়ে তার সঙ্গে আমাদের যেতে অনুরোধ করে। ভাঙ্গা ভাঙ্গা ইংরেজিতে জানায়, বাসায় সে একাই থাকে। যদ্দিন ঘর পাওয়া না যাচ্ছে ওখানে থাকতে আমাদের কোনই অসুবিধে হবে না। সে আশ্বাস দেয়, ঐ বাড়িতে এবং আশপাশে কোথাও কোন খালি বাসা আছে কিনা সেটাও সে খোঁজ নিয়ে দেখবে। সব খালি তো আর কাগজে আসে না_ বোঝায় সে। আমি তবু দ্বিধান্বিত দেখে হামদুন আমাকে ভগ্নী বলে সম্বোধন করে আর প্রায় জোর করেই আমাদের ধরে নিয়ে যায় তার বাসায়। নিরম্নপায় জ্যোতি খুব যে আপত্তি করে তা নয়। এখান থেকে তিন বস্নকের মধ্যেই তার বাসস্থান। বাসাটা আমরা যেখানে বাস করতাম তার চাইতে খানিকটা বড়। এক বেডরম্নমের এ্যাপার্টমেন্ট। ছোটবেলা থেকেই মিসরের আতিথেয়তার অনেক গল্প শুনেছি। কিন্তু আমাদের জন্যে হামদুন যে কী করল সেই রাতে সে কথা যত দিন বেঁচে থাকি কখনও ভুলব না। আমাদের বসিয়ে রেখে কফি করে খাওয়ালো, তারপর নিজের হাতে রেঁধে খাবার পরিবেশন করল। আমার তখন খাওয়ার বা কথা বলার অবস্থা ছিল না। শুধু এক কোণে চুপচাপ শুয়ে থাকার ইচ্ছা হচ্ছিল। হামদুন তবু প্রায় জোর করে কিছুটা কুসকুস খাইয়ে দেয় আমাকে। না খেলে আমি যে অসুস্থ হয়ে পড়ব বিদেশ বিভুঁইয়ে_ এটাও মনে করিয়ে দিতে ভোলে না। সে তার শোবার ঘর আমাদের ছেড়ে দিয়ে নিজে বাইরের ঘরে শোবার প্রস্তুতি নেয়। শত বারণ করেও তাকে সেই সিদ্ধানত্ম থেকে সরানো যায় না। সম্পূর্ণ অচেনা বিদেশী একটি লোকের বাসায় জীবনের এ রকম একটি রাত কাটাতে হবে কখনও ভেবেছিলাম? অবাক লাগে আমাদের পরিচিত বাঙালীরা কেউই একবার খবর নেবার চেষ্টা করে না_ আমরা কোথায় আছি, কেমন আছি, কি করছি। নিয়োগীর বাসা থেকে আসার পর আমাকে বসিয়ে রেখে পাবলিক ফোন থেকে আমাদের চেনাজানা অনেককেই ফোন করেছে জ্যোতি, যদিও আমি শুনিনি কী কথা হয়েছে তাদের সঙ্গে। তবে কেউ যে যেতে বলেনি সেটা বুঝতে পেরেছি, পরে জ্যোতির মুখেও শুনেছি সে কথা। অথচ ওহাইয়ো যাবার আগে এদের সঙ্গে কত সময়ই না কেটেছে আমাদের। কত খাওয়াদাওয়া, বেড়ানো, গল্পগুজব। সে রাতে হামদুনের বাসায় অপরিচিত খাটে শুয়ে শুয়ে সবকিছু ছাপিয়ে শুধু একটি মানুষের কথা মনে হতে থাকে, একটি মুখ চোখের সামনে সমানে জ্বলজ্বল করে ভেসে বেড়ায়। হৃদয়ের সঙ্গে গাঁথা এমন প্রিয় এমন পরিচিত মুখখানা আর জীবনেও দেখব না, এটা কখনও হয়? তার সঙ্গে যে অনেক কথা জমা হয়ে আছে আমার। আমাকে নিয়ে তার যে অনেক স্বপ্ন, অনেক আশা। সব কিছু ছেড়েছুড়ে কেমন করে সে এমন হঠাৎ করে চলে যেতে পারে? নিশ্চয় আমি ভুল ভাবছি। ঐ চিঠিতে এমন ভয়ঙ্কর কথা হয়তো লেখা নেই। কিন্তু, জ্যোতির মুখম-ল, বাড়ি থেকে অনেকদিন চিঠি না পাওয়া, ডক্টর নিয়োগীর বাড়িতে জ্যোতিকে ও নিয়োগীকে শ্বশুরের জরম্নরী চিঠি পাঠানো, চিঠি আনতে জ্যোতির একা যাওয়া, সব মিলিয়ে আমার মন বলছে_ আমি পরিষ্কার জেনে গেছি, বাবা নেই। আমার কিছুতেই তা বিশ্বাস হতে চায় না, তবু চোখ জলে ভরে যায়। ওপাশে মড়ার মতো অনড় পড়ে থাকা জ্যোতির শায়িত দেহ থেকে একটু পর পর দীর্ঘশ্বাসের মতো একটা অস্পষ্ট শব্দ শোনা যায়। লিভিং রম্নম থেকে হামদুনের নিশ্চিনত্মে ঘুমিয়ে পড়ার গাঢ় ও সামান্য উঁচু শ্বাসপ্রশ্বাসের শব্দ একই লয়ে ভেসে আসে। আমি সারারাত একটুও ঘুমুতে পারি না। তবু দীর্ঘ রাত একসময় শেষ হয়।

পরদিন খুব ভোরে উঠে হামদুন চলে যায় তার গ্রীষ্মকালীন চাকরিতে শহরের অন্য মাথায় একটা গ্রোসারি স্টোরে। আসবে সন্ধ্যার পরে। জ্যোতিও বেরিয়ে যায় কিছুৰণ পরেই। বাসা একটা খুঁজে বের করতেই হবে আজ যে করেই হোক। ঘণ্টা দুয়েক পরেই ফিরে আসে জ্যোতি। বাসার ব্যবস্থা হয়েছে। হামদুনকে বাসার টেলিফোন থেকেই তার কাজের জায়গায় খবরটা দিয়ে দেয় জ্যোতি। তারপর আমাকে সঙ্গে নিয়ে আমাদের আগের বাসা থেকে জিনিসপত্র সংগ্রহ করে একটা ট্যাঙ্ িনিয়ে সোজা আমাদের নতুন বাসায়। ওটার ঠিকানা ৩৩৪৩ ইন্ডিয়ান কুইন লেন। হেনরি এ্যাভিনিউ ও ইন্ডিয়ান কুইন লেনের সংযোগস্থল থেকে কয়েক গজ ভেতরে। আমি অবাক হয়ে লৰ্য করি, বাসাটা আমার কলেজের ঠিক উলটো পাশে। অর্থাৎ রাসত্মার এপার ওপারে আমার বাসা ও কলেজ। কলেজের ঠিকানা যদিও ৩৩০০ হেনরি এ্যাভিনিউ। এটা ঘটেছে এ জন্যে যে, কলেজ ও হাসপাতালটির মূল প্রবেশপথ হেনরি এ্যাভিনিউতে, যেটা ইন্ডিয়ান কুইন লেনের তুলনায় অনেক বড় রাসত্মা। এ পাড়ার বাসা ভাড়া অত্যনত্ম বেশি আমি জানি। কী করে সম্ভব হলো এ বাসা নেয়া? জ্যোতি জানাল, নিরম্নপায় হয়ে সে তার বিশ্ববিদ্যালয় ও আমার মেডিক্যাল কলেজ দু’জায়গাতেই গিয়েছিল যদি তারা কোনভাবে বাসার ব্যাপারে সাহায্য করতে পারে। সব শুনে আমার অ্যাডভাইজার ও ডিপার্টমেন্টের প্রধান মিলে রেসিডেন্ট ডাক্তারদের জন্যে নির্ধারিত এই চারটি এ্যাপার্টমেন্টের একটা খালি থাকায় সাময়িকভাবে আমাদের এখানে থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। ভাড়া খুবই কম, আগের বাসার মতোই প্রায়। বেশ বড় বাসা। ভিন্ন ভিন্ন শোবার ঘর, রান্না ঘর, বসার ঘর। বড় বাথরম্নম।

ফার্নিসড বাসা। রাসত্মা থেকে কয়েকটা সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে এলে দু’পাশে ছোট্ট লন। সামনেই দোতলা লাল ইটের বাড়ি। নিচে দুটো, ওপরে দুটো এ্যাপার্টমেন্ট। আমাদের জন্যে নির্ধারিত বাসাটা নিচতলার ডানদিকে। বাড়ির সামনে টুকটুকে লাল বড় বড় গোলাপ। খাটের ওপর ইস্ত্রি করা পরিষ্কার সাদা ধবধবে বিছানার চাদর ও বালিশের ওয়ার দিয়ে পাতা ফিটফাট বিছানা। বড় বড় সাদা তোয়ালে বাথরম্নমে। রান্না ঘরে রান্না করার জন্যে থাকে থাকে সাজানো রয়েছে ঝকঝকে হাঁড়ি-পাতিল ফ্রাইং প্যান, হাতা, খুনত্মি, ছুরি, বাসনকোশন সবই যেখানে যেটা দরকার। পরে বুঝেছিলাম রেসিডেনসি করার সময় তরম্নণ ডাক্তারদের যেহেতু এক নাগাড়ে চবি্বশ ঘণ্টা ছত্রিশ ঘণ্টা ডিউটি করতে হয়, কাজের শেষে ক্লানত্ম রেসিডন্টরা যাতে ঘরে ঢুকেই বিশ্রাম করতে পারে, তার জন্যে সবকিছু হাতের কাছে গোছানো এই বাসাগুলো রাখা হয়েছে। সাধারণত যাদের বাড়ি দূরে বা যারা অন্য রাজ্য বা বিদেশ থেকে রেসিডেনসি করতে আসে তাদেরই দেওয়া হয় এই এ্যাপার্টমেন্টগুলো। ফলে চাহিদা খুবই বেশি এগুলোর। প্রতিদিন সকালে মেইড সার্ভেট এসে বিছানা পালটে, বাড়িঘর পরিষ্কার করে দিয়ে যায়। অনেকটা হোটেলে থাকার মতো ব্যাপার। নতুন কোন রেসিডেন্ট না আসা পর্যনত্ম আমরা এখানে থাকতে পারব এবং কেউ আসার অনত্মত এক মাস আগে আমাদের জানিয়ে দেওয়া হবে বলেছিল কলেজের হাউজিং অফিস। আমরা ঐ বাসায় পুরো এক বছর ছিলাম। এখানেই দেশ থেকে আমাদের কাছে এসেছিলেন আমার শ্বশুর ডক্টর গোবিন্দ দেব, এখান থেকেই আবার ঢাকা ফিরে গেছিলেন ফেব্রম্নয়ারির শেষে ১৯৭১-এর। আর তার এক মাসের মধ্যেই বাবার মতো তাকেও চলে যেতে হয় বড় অসময়ে।

অবশেষে একটা ঘর পাওয়া যাওয়ায় জ্যোতির বুকের ওপর থেকে একটা ভারি বোঝা নেমে যায়। কিন্তু তবু আমার সঙ্গে তেমন কথা বলছে না সে, আমার চোখে চোখ রাখছে না। এক মনে বাসা গোছাতে ব্যসত্ম জ্যোতি। আমি ঘরে ঢুকেই সোজা বিছানায় শুয়ে পড়ি। সেদিন বিকেলে আমাদের পরিচিত কয়েকজন স্থানীয় বাঙালীকে ঘরে ডাকে জ্যোতি। সেই নিঃসনত্মান দম্পতি ও ডক্টর নিয়োগীও ছিলেন এদের মধ্যে। আমি জানতাম না তারা আসবেন। জ্যোতি কিছু বলেনি আমাকে। তবে তাদের একত্রে ঘরে ঢুকতে দেখেই আমি বুঝতে পারি কেন তারা এসেছেন। জ্যোতি ভয় পেয়েছিল, আমাকে একলা ঘরে এই সংবাদটা দিলে আমি কী জানি কী করে বসি, আমাকে একা সামলানো তার পৰে সম্ভব হবে কী না ইত্যাদি। সে জানত বাবার সঙ্গে আমার কী পরিমাণ নৈকট্য ছিল। কিন্তু কাউকে কিছু বলতে হলো না আমায়। আমি নিজে নিজেই সব জেনে গেছি বুঝে গেছি। তাই কেউ কিছু বলার আগে আমিই বললাম, আমি জানি আপনারা কেন এসেছেন। আমার বাবা আর নেই। ভাগ্যিস বীথিকে সঙ্গে আনেননি তারা। বীথি এলে নিজেকে সামলানো কঠিন হতো আমার। যারা এসেছেন তাদের সঙ্গে সম্পর্কটার স্বরূপ আজ দুদিনে এত স্পষ্ট করে বুঝে গেছি যে, তাদের কোন সানত্ম্বনার বাক্যে আমার হৃদয় ছুঁয়ে যায় না। বরং আমি অপেৰা করি কখন তারা বিদায় হবেন আর আমি একটু একা একা শুয়ে থাকব।

এত দীর্ঘ সময় ধরে এত কিছু নিজের মধ্যে ধারণ করতে করতে জ্যোতি বড়ই কাহিল হয়ে পড়েছিল। দুঃসংবাদটা প্রকাশিত হয়ে যাবার পর এবার কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে সে। জীবনে এই প্রথম ওকে কাঁদতে দেখি। কাঁদতে কাঁদতে জ্যোতি বলে গত ছত্রিশ ঘণ্টা যে সে কী দুর্বিষহ সময় পার করেছে, তা কেবল সেই জানে! ঐ ভয়ঙ্কর চিঠিটা বুক পকেটে রেখে স্বাভাবিক আচরণ করে যেতে কী যে খারাপ লেগেছে তার, বলতে বলতে চিঠিটি বের করে টেবিলে রাখে সে, যে চিঠি কোনদিনই আমি খুলে দেখিনি। জ্যোতি বলে, গত দুটো দিন শুধু পাগলের মতো হন্যে হয়ে একটা ঘর খুঁজেছে সে, যাতে এমন একটা দুঃসংবাদ যখন দেবে আমায়, তখন আমার মাথার ওপর অনত্মত একটা আচ্ছাদন থাকে, বসে বা শুয়ে কাঁদার মতো একটা জায়গা থাকে, একেবারে খোলা রাসত্মার ওপর দাঁড়িয়ে থাকতে না হয় আমাদের।

আমি অবাক হয়ে লৰ্য করি, এত বড় একটা ঘটনা ঘটে যাবার পরও, সবকিছুই ঠিকঠাক চলছে। কিছুই থেমে থাকছে না। নির্দিষ্ট গতিতেই দিন যায়, রাত আসে, আবার দিন, আবার রাত্রি। প্রতিদিন যথাসময়ে সূর্য ওঠে, গরমে আগের মতোই ঘামি, বেশি কষ্ট হলে পাখা চালাই, সন্ধ্যা হয়, দখিনা হাওয়ায় কলেজের সামনে দাঁড়ানো ক্রেব আপেল গাছের পাতা তির তির করে কাঁপে, রাসত্মার আলো জ্বলে ওঠে। বাড়ি থেকে চিঠি আসে, সাদা গাইটার একটা বাছুর হয়েছে। ছোট ভাইবোনের পরীৰার ফল বেরোয়। আমার খিদে লাগে, আমি ভাত খাই, স্নান করি, ঘুমুই। কেবল ঘুমুতে যাবার আগে প্রতিরাতে ভয় হয় আবার যদি সেই স্বপ্নটা দেখি, যেটা বহুকাল ধরে অনবরত দেখে আসছিলাম আমি_ প্রায় রাত্রিতেই। যে স্বপ্ন আমার জ্ঞান হবার পর থেকে সবচেয়ে বেশি বার দেখেছি। স্বপ্নে দেখি, বাবা মারা গেছে, আর আমি ভীষণভাবে কাঁদছি। তারপর ঘুম ভেঙ্গে যায়, বুঝি ওটা নেহায়েৎ স্বপ্ন ছিল। মনটায় কী যে প্রশানত্মি নেমে আসে তখন! কাছে থাকলে বাবাকে ঘুম থেকে ডেকে উঠাই, লাইট জ্বালিয়ে তার মাথায়, কপালে হাত বুলাই, তারপর আবার নিজের বিছানায় এসে ঘুমিয়ে পড়ি। আমার ঘন ঘন এই স্বপ্ন দেখার কথা পরিবারের সকলেই জানে। এখন ভয় হয়, ঘুমুতে গেলে আবার যদি সেই স্বপ্ন দেখি! এখন ঘুম ভাঙলে তো জানবো স্বপ্নে যা দেখলাম, তা আসলে সত্যি, ওটা নিছক নয়, তখন কী করে সইব তা? কিন্তু কী আশ্চর্য, বাবা মারা যাবার পর গত চলিস্নশ বছরে সত্যি সত্যিই আর একবারও বাবার মৃতু্যকে নিয়ে স্বপ্ন দেখিনি। অলৌকিক কোন কিছুতে কখনও বিশ্বাস ছিল না_ আজও নেই। কিন্তু এই স্বপ্নের অনত্মর্ধানের গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা আজ পর্যনত্ম খুঁজে পাইনি।

মাত্র সাতান্ন বছর বয়সে এমন আকস্মিকভাবে বাবার মৃতু্যতে আমি প্রায় ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছিলাম। আমার জীবনের ধ্রম্নবতারার মতো যার অবস্থান, আমার যা কিছু অর্জন সবই যাঁর উদ্দেশে নিবেদিত, আমাদের উচ্চশিৰার খরচ যোগাবার জন্যে দিনের পর দিন অমানবিক কষ্ট করে গেছেন যিনি, তাঁকে বিদেশে এসেই হঠাৎ করে এভাবে হারিয়ে ফেলা আমার পৰে মানা কঠিন ছিল। তবু সময় যা সব কিছুকেই এক সময় সহনীয় করে তোলে, আমার ওপরেও ধীরে ধীরে একরকম সানত্ম্বনার প্রলেপ মাখে। কিন্তু ঐ কঠিন সময়টাতে কয়েকটি বিচ্ছিন্ন ঘটনার কথা মনে পড়ে, মনে পড়ে কয়েক ব্যক্তির অবদানের কথাও, যারা ঐ সময়ে আমার বিপর্যসত্ম মনটাকে কিছুটা হলেও প্রশমিত করেছিল_ আমার গোটা অসত্মিত্বকে সমূলে নাড়িয়ে দিয়েছিল জীবনের প্রথম যে শোক, তাকে সহনীয় করে তুলতে, আমাকে নতুন করে বাঁচতে, আবার সোজা হয়ে দাঁড়াতে সাহায্য করেছিল।

১) আমার খিদে নেই। আমি খেতে চাচ্ছি না। শুয়ে আছি। জ্যোতি নিজের হাতে রান্না করে গরম গরম ভাত মেখে, বিছানাতে বসেই, খাইয়ে দিচ্ছে আমায়। এমন কি অযত্নে ফেলে রাখা আমার জটা-ধরা চুলগুলো ধীরে ধীরে অাঁচড়ে বেনী করে দিয়েছে একাধিকবার।

২) জ্যোতির ঘনিষ্ঠ বন্ধু ডক্টর মঞ্জুর আহমেদ (যিনি আমাদের বিয়েতে বরযাত্রীও ছিলেন) ও তার স্ত্রী খুকু আপা আমাকে জোর করে তাদের কানেক্টিকাটের বাসায় নিয়ে গেছেন যাতে আমার মানসিক অবস্থার একটু পরিবর্তন হয়, আমার স্বাভাবিক হয়ে আসা কিছুটা হলেও ত্বরান্বিত হয়। হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় অসময়ে খুকু আপার প্রথম স্বামীর মৃতু্য ও পরবতর্ীকালে তিনটি নাবালক সনত্মান নিয়ে তার কঠিন সংগ্রামের কথা বিসত্মৃতভাবে বর্ণনা করে খুকু আপা আমাকে বোঝাতেন, যারা বেঁচে আছে তাদের জন্যে আমাকে সোজা হয়ে দাঁড়াতে হবে। সেই সময় খুকু আপাদের রেকর্ড পেস্নয়ারে মায়ার খেলার ঐ গানটি বারবার বাজত, ‘দিবস রজনী আমি যেন কার আশায় আশায় থাকি’। শুনতে শুনতে বাবার কথা ভেবে চোখ জলে ভরে যেত। আজও সেই গান শুনলে বাবার কথা, কানেক্টিকাটে মঞ্জুর ভাইদের বাড়ির সেই সব দিনের কথা মনে পড়ে।

৩) আমার সহপাঠী চার্চের সানডে স্কুলের শিৰক ডেভিড রিফেনবারিক, যে বায়োকেমিস্ট্রিতে তখন পিএইচডি করছিল, আমাকে সানত্ম্বনা দেয়, আর আমিও বিশ্বাস করতে শুরম্ন করি, মৃতু্যর পর আমি আবার আমার বাবাকে দেখতে পাব। সে আমাকে ‘সিস্টার ইন ক্রাইস্ট’ বলে গ্রহণ করে। বাবাকে অনেক কথা বলার ছিল আমার, যা বলার সুযোগ পাইনি, যদি তার সঙ্গে সত্যি সত্যি-ই আবার দেখা হয় আর পরস্পরকে আমরা চিনতে পারি, তাহলে সে কথাগুলো বলব তাকে সবিসত্মারে, আর এর জন্যে যদি আমাকে খ্রিস্টান হতে হয়, আমি তাতেই রাজি, ডেভিডকে বলেছিলাম। ডেভিড আমার জন্যে চোখবুজে প্রার্থনা করেছিল। প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের সবচেয়ে কাছাকাছি এসেছিলাম জীবনের এই সঙ্কটকালেই।

৪) নতুন বাসায় আসার মাত্র কয়েকদিন পরের ঘটনা। দুপুরে কলেজ থেকে ঘরে ফিরছি। মনের ভেতর তখনও সর্বৰণিকভাবে বাবার স্মৃতি। আনমনে রাসত্মা পার হচ্ছি। হঠাৎ শুনি কোথা থেকে ভেসে আসছে ‘ময়ূরপঙ্খী ভেসে যায়, রামধনু জ্বলে তার গায়’। প্রথমে ভাবি, আমার মানসিক অবস্থায় আমি বোধ হয় সবই কল্পনা করছি। এই সময়ে এখানে এই বাংলা গান কোথা থেকে আসবে? এ পাড়ায় অথবা আশপাশে কোন বাঙালী আছে বলে শুনিনি, থাকার কথাও নয়। এ অঞ্চলগুলো একেবারেই ‘লিলি-হোয়াইট’ অঞ্চল। আমরাতো নেহায়েত একটি বিশেষ পরিস্থিতির শিকার হয়ে এখানে এসেছি। তাহলে ঐ গান? আমি কি পাগল হয়ে যাচ্ছি? কিন্তু চলা থামিয়ে দিয়ে, গায়ে চিমটি কেটেও শুনি একই গান সমানে চলেছে। উৎপলা সেনের অতি পরিচিত ও ব্যতিক্রমী কণ্ঠে এই গান কোথা থেকে আসছে খুঁজতে গিয়ে দেখি আমারই এক প্রতিবেশী শ্বেতাঙ্গিনী বিকিনি পরে ঘরের বাইরে ঘাসের ওপর নিচু আরাম কেদারায় শুয়ে শুয়ে সান বাথ নিচ্ছে আর গান শুনছে_ নিখাদ বাংলা গান। ততৰণে উৎপলার দ্বিতীয় গান, ‘ঝিকমিক জোনাকির দীপ জ্বলে শিয়রে, চারিধার থমথম নিঝঝুম’ শুরম্ন হয়ে গেছে। একে একে উৎপলার সবগুলো গান শেষ হয়ে গেলে সে জানালা দিয়ে ঘরের ভেতরে হাত ঢুকিয়ে লং পেস্নটির উলটো দিক চালিয়ে দেয়। সেখানে সব শ্যামল মিত্রের গান। ‘তরীখানি ভাসিয়ে দিলাম ঐ কুলে’। এ গানগুলোর মধ্যে কী যেন ছিল, কথায় এবং সুরে। কোনটিতে আসন্ন বিচ্ছেদের আশঙ্কা। কোনটিতে এই পৃথিবী থেকে অন্যত্র চলে যাবার ইঙ্গিত। একই সঙ্গে বিষাদ, বেদনা ও মাধুর্যের সমাবেশ। আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো ঐ বাড়ির সামনে রাসত্মার ধারে সিঁড়িতে বসে বসে অবশ হয়ে শ্যামল মিত্রের মাদকতাময় কণ্ঠে একটার পর একটা গান শুনতে থাকি। গান শেষ হলে আমার দিকে চোখ পড়ে মেয়েটির। একটু অবাক হয়, শাড়ি পরা একটি মেয়েকে এত কাছে এভাবে বসে থাকতে দেখে। পরিচয় হলে জানতে পারি আমার কলেজেই থার্ড ইয়ার মেডিক্যালের ছাত্রী সে। তার প্রাক্তন ভারতীয় প্রেমিক এই লং পেস্নটি তাকে দিয়েছিল। গানের কথা কিছুই বোঝে না সে। কিন্তু কি যেন আছে এই সুরে। যখনই কোন কারণে তার মন খারাপ হয়, সে এই গানগুলো শোনে। শুনলে কী রকম এক প্রশানত্মিতে নাকি মনটা ভরে যায় তার, যার কোন ব্যাখা্যা সে খুঁজে পায় না। আমি তাকে জানাই আমি বাঙালী এবং সদ্য পিতা হারিয়ে নতুন করে ঘর-কাতর। আমার অসীম শূন্যতা আর সর্বৰণিক অস্থিরতাই যে আজ তার এই নিভৃতিকে লঙ্ঘন করতে প্ররোচিত করেছে, তার ঘর থেকে ভেসে আসা বাংলা গানের সুর আমায় টেনে এনেছে তার দোরগোড়ায়, সে কথাও স্বীকার করি। শুনে সে জোর করে ঐ রেকর্ডটি আমাকে ধার দেয়। বলে যতদিন খুশি শুনে যেন ফেরত দিই তাকে। কোন তাড়া নেই। ঐ রেকর্ডের গানগুলো বেশ কিছুদিন ধরে আমার প্রতিদিনের সঙ্গী হয়েছিল ঐ সময়। আমার অস্থির মনটাকে কিছুটা হলেও শানত্ম করত উৎপলা আর শ্যামলের ঐ গানগুলো। রেকর্ডটা ফেরৎ দেবার আগে গানগুলো আবার শোনার জন্যে টেপ করে রেখেছিলাম মনে আছে।

৫) আমার দ্বিতীয় পিতা, আমার শ্বশুর ডক্টর গোবিন্দ দেব, আমার মানসিক অবস্থা শুনে ঢাকা থেকে ছুটে আসেন ফিলাডেলফিয়ায় আমাকে সানত্ম্বনা দিয়ে সুস্থ করে তোলার জন্যে। বেশ কয়েক মাস এখানে থেকে আমাকে একটু সুস্থ-সবল করে দিয়ে দেশে ফিরে যাবার এক মাসের মধ্যেই নিজের শোবার ঘরে পাকবাহিনীর হাতে নিহত হন তিনি, ২৫ মার্চ ১৯৭১-এর কালরাত।

২৫ জুলাই থেকে ২৫ মার্চ_ ঠিক আট মাসের মাথায় দু’দুবার পিতৃহীন হই আমি। আর সেটা ঘটে এই স্বর্গরাজ্য আমেরিকায় পড়তে আসার পর পরই।

এর পরের নয় মাসে ঘটে আরও কত মৃতু্য, চলে আরও কত যুদ্ধ! আমার ব্যক্তিগত শোক ততদিনে জাতীয় শোকে রূপানত্মরিত হয়। তবে শেষ পর্যনত্ম সমসত্ম দুঃখ হরণ করে আসে বিজয়ের মহাউলস্নাস। প্রবাসে মুক্তিযুদ্ধের সেই দিনগুলোর কথা আরেকদিন বলব।

ফিলাডেলফিয়া থেকে প্রায় দু’হাজার মাইল দূরে, পাহাড়ি কলোরাডোতে বসে চলিস্নশ বছর আগের এক বেদনাময় আগস্টের কথা ভাবছিলাম এতৰণ। মাঝখানে আরও কত সময় পেরিয়ে গেছে, আরও কত অভিজ্ঞতা, কত জায়গায় গেছি, কত বাড়িতে বসবাস করেছি, কত মানুষের সঙ্গে আলাপ হয়েছে, তার অনেক কিছুই আজ আর মনে নেই, আবার অনেক কিছুই মনে আছে। কিন্তু ফিলাডেলফিয়ার সেই আগস্ট, আমার এদেশের প্রথম গ্রীষ্মে সেই কষ্টকর স্মৃতি কেমন করে ভুলি?

আমি বসেই থাকি সিঁড়িতে। ওরা দুজন মিলে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ কী কথা বলে। তারপর হামদুন আমার সামনে এসে পাশে রাখা বড় ব্যাগটি তুলে নিয়ে তার সঙ্গে আমাদের যেতে অনুরোধ করে। ভাঙ্গা ভাঙ্গা ইংরেজিতে জানায়, বাসায় সে একাই থাকে। যদ্দিন ঘর পাওয়া না যাচ্ছে ওখানে থাকতে আমাদের কোনই অসুবিধে হবে না। সে আশ্বাস দেয়, ঐ বাড়িতে এবং আশপাশে কোথাও কোন খালি বাসা আছে কিনা সেটাও সে খোঁজ নিয়ে দেখবে। সব খালি তো আর কাগজে আসে না_ বোঝায় সে। আমি তবু দ্বিধান্বিত দেখে হামদুন আমাকে ভগ্নী বলে সম্বোধন করে আর প্রায় জোর করেই আমাদের ধরে নিয়ে যায় তার বাসায়। নিরম্নপায় জ্যোতি খুব যে আপত্তি করে তা নয়। এখান থেকে তিন বস্নকের মধ্যেই তার বাসস্থান। বাসাটা আমরা যেখানে বাস করতাম তার চাইতে খানিকটা বড়। এক বেডরম্নমের এ্যাপার্টমেন্ট। ছোটবেলা থেকেই মিসরের আতিথেয়তার অনেক গল্প শুনেছি। কিন্তু আমাদের জন্যে হামদুন যে কী করল সেই রাতে সে কথা যত দিন বেঁচে থাকি কখনও ভুলব না। আমাদের বসিয়ে রেখে কফি করে খাওয়ালো, তারপর নিজের হাতে রেঁধে খাবার পরিবেশন করল। আমার তখন খাওয়ার বা কথা বলার অবস্থা ছিল না। শুধু এক কোণে চুপচাপ শুয়ে থাকার ইচ্ছা হচ্ছিল। হামদুন তবু প্রায় জোর করে কিছুটা কুসকুস খাইয়ে দেয় আমাকে। না খেলে আমি যে অসুস্থ হয়ে পড়ব বিদেশ বিভুঁইয়ে_ এটাও মনে করিয়ে দিতে ভোলে না। সে তার শোবার ঘর আমাদের ছেড়ে দিয়ে নিজে বাইরের ঘরে শোবার প্রস্তুতি নেয়। শত বারণ করেও তাকে সেই সিদ্ধানত্ম থেকে সরানো যায় না। সম্পূর্ণ অচেনা বিদেশী একটি লোকের বাসায় জীবনের এ রকম একটি রাত কাটাতে হবে কখনও ভেবেছিলাম? অবাক লাগে আমাদের পরিচিত বাঙালীরা কেউই একবার খবর নেবার চেষ্টা করে না_ আমরা কোথায় আছি, কেমন আছি, কি করছি। নিয়োগীর বাসা থেকে আসার পর আমাকে বসিয়ে রেখে পাবলিক ফোন থেকে আমাদের চেনাজানা অনেককেই ফোন করেছে জ্যোতি, যদিও আমি শুনিনি কী কথা হয়েছে তাদের সঙ্গে। তবে কেউ যে যেতে বলেনি সেটা বুঝতে পেরেছি, পরে জ্যোতির মুখেও শুনেছি সে কথা। অথচ ওহাইয়ো যাবার আগে এদের সঙ্গে কত সময়ই না কেটেছে আমাদের। কত খাওয়াদাওয়া, বেড়ানো, গল্পগুজব। সে রাতে হামদুনের বাসায় অপরিচিত খাটে শুয়ে শুয়ে সবকিছু ছাপিয়ে শুধু একটি মানুষের কথা মনে হতে থাকে, একটি মুখ চোখের সামনে সমানে জ্বলজ্বল করে ভেসে বেড়ায়। হৃদয়ের সঙ্গে গাঁথা এমন প্রিয় এমন পরিচিত মুখখানা আর জীবনেও দেখব না, এটা কখনও হয়? তার সঙ্গে যে অনেক কথা জমা হয়ে আছে আমার। আমাকে নিয়ে তার যে অনেক স্বপ্ন, অনেক আশা। সব কিছু ছেড়েছুড়ে কেমন করে সে এমন হঠাৎ করে চলে যেতে পারে? নিশ্চয় আমি ভুল ভাবছি। ঐ চিঠিতে এমন ভয়ঙ্কর কথা হয়তো লেখা নেই। কিন্তু, জ্যোতির মুখম-ল, বাড়ি থেকে অনেকদিন চিঠি না পাওয়া, ডক্টর নিয়োগীর বাড়িতে জ্যোতিকে ও নিয়োগীকে শ্বশুরের জরম্নরী চিঠি পাঠানো, চিঠি আনতে জ্যোতির একা যাওয়া, সব মিলিয়ে আমার মন বলছে_ আমি পরিষ্কার জেনে গেছি, বাবা নেই। আমার কিছুতেই তা বিশ্বাস হতে চায় না, তবু চোখ জলে ভরে যায়। ওপাশে মড়ার মতো অনড় পড়ে থাকা জ্যোতির শায়িত দেহ থেকে একটু পর পর দীর্ঘশ্বাসের মতো একটা অস্পষ্ট শব্দ শোনা যায়। লিভিং রম্নম থেকে হামদুনের নিশ্চিনত্মে ঘুমিয়ে পড়ার গাঢ় ও সামান্য উঁচু শ্বাসপ্রশ্বাসের শব্দ একই লয়ে ভেসে আসে। আমি সারারাত একটুও ঘুমুতে পারি না। তবু দীর্ঘ রাত একসময় শেষ হয়।

পরদিন খুব ভোরে উঠে হামদুন চলে যায় তার গ্রীষ্মকালীন চাকরিতে শহরের অন্য মাথায় একটা গ্রোসারি স্টোরে। আসবে সন্ধ্যার পরে। জ্যোতিও বেরিয়ে যায় কিছুৰণ পরেই। বাসা একটা খুঁজে বের করতেই হবে আজ যে করেই হোক। ঘণ্টা দুয়েক পরেই ফিরে আসে জ্যোতি। বাসার ব্যবস্থা হয়েছে। হামদুনকে বাসার টেলিফোন থেকেই তার কাজের জায়গায় খবরটা দিয়ে দেয় জ্যোতি। তারপর আমাকে সঙ্গে নিয়ে আমাদের আগের বাসা থেকে জিনিসপত্র সংগ্রহ করে একটা ট্যাঙ্ িনিয়ে সোজা আমাদের নতুন বাসায়। ওটার ঠিকানা ৩৩৪৩ ইন্ডিয়ান কুইন লেন। হেনরি এ্যাভিনিউ ও ইন্ডিয়ান কুইন লেনের সংযোগস্থল থেকে কয়েক গজ ভেতরে। আমি অবাক হয়ে লৰ্য করি, বাসাটা আমার কলেজের ঠিক উলটো পাশে। অর্থাৎ রাসত্মার এপার ওপারে আমার বাসা ও কলেজ। কলেজের ঠিকানা যদিও ৩৩০০ হেনরি এ্যাভিনিউ। এটা ঘটেছে এ জন্যে যে, কলেজ ও হাসপাতালটির মূল প্রবেশপথ হেনরি এ্যাভিনিউতে, যেটা ইন্ডিয়ান কুইন লেনের তুলনায় অনেক বড় রাসত্মা। এ পাড়ার বাসা ভাড়া অত্যনত্ম বেশি আমি জানি। কী করে সম্ভব হলো এ বাসা নেয়া? জ্যোতি জানাল, নিরম্নপায় হয়ে সে তার বিশ্ববিদ্যালয় ও আমার মেডিক্যাল কলেজ দু’জায়গাতেই গিয়েছিল যদি তারা কোনভাবে বাসার ব্যাপারে সাহায্য করতে পারে। সব শুনে আমার অ্যাডভাইজার ও ডিপার্টমেন্টের প্রধান মিলে রেসিডেন্ট ডাক্তারদের জন্যে নির্ধারিত এই চারটি এ্যাপার্টমেন্টের একটা খালি থাকায় সাময়িকভাবে আমাদের এখানে থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। ভাড়া খুবই কম, আগের বাসার মতোই প্রায়। বেশ বড় বাসা। ভিন্ন ভিন্ন শোবার ঘর, রান্না ঘর, বসার ঘর। বড় বাথরম্নম। ফার্নিসড বাসা। রাসত্মা থেকে কয়েকটা সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে এলে দু’পাশে ছোট্ট লন। সামনেই দোতলা লাল ইটের বাড়ি। নিচে দুটো, ওপরে দুটো এ্যাপার্টমেন্ট। আমাদের জন্যে নির্ধারিত বাসাটা নিচতলার ডানদিকে। বাড়ির সামনে টুকটুকে লাল বড় বড় গোলাপ। খাটের ওপর ইস্ত্রি করা পরিষ্কার সাদা ধবধবে বিছানার চাদর ও বালিশের ওয়ার দিয়ে পাতা ফিটফাট বিছানা। বড় বড় সাদা তোয়ালে বাথরম্নমে। রান্না ঘরে রান্না করার জন্যে থাকে থাকে সাজানো রয়েছে ঝকঝকে হাঁড়ি-পাতিল ফ্রাইং প্যান, হাতা, খুনত্মি, ছুরি, বাসনকোশন সবই যেখানে যেটা দরকার। পরে বুঝেছিলাম রেসিডেনসি করার সময় তরম্নণ ডাক্তারদের যেহেতু এক নাগাড়ে চবি্বশ ঘণ্টা ছত্রিশ ঘণ্টা ডিউটি করতে হয়, কাজের শেষে ক্লানত্ম রেসিডন্টরা যাতে ঘরে ঢুকেই বিশ্রাম করতে পারে, তার জন্যে সবকিছু হাতের কাছে গোছানো এই বাসাগুলো রাখা হয়েছে। সাধারণত যাদের বাড়ি দূরে বা যারা অন্য রাজ্য বা বিদেশ থেকে রেসিডেনসি করতে আসে তাদেরই দেওয়া হয় এই এ্যাপার্টমেন্টগুলো। ফলে চাহিদা খুবই বেশি এগুলোর। প্রতিদিন সকালে মেইড সার্ভেট এসে বিছানা পালটে, বাড়িঘর পরিষ্কার করে দিয়ে যায়। অনেকটা হোটেলে থাকার মতো ব্যাপার। নতুন কোন রেসিডেন্ট না আসা পর্যনত্ম আমরা এখানে থাকতে পারব এবং কেউ আসার অনত্মত এক মাস আগে আমাদের জানিয়ে দেওয়া হবে বলেছিল কলেজের হাউজিং অফিস। আমরা ঐ বাসায় পুরো এক বছর ছিলাম। এখানেই দেশ থেকে আমাদের কাছে এসেছিলেন আমার শ্বশুর ডক্টর গোবিন্দ দেব, এখান থেকেই আবার ঢাকা ফিরে গেছিলেন ফেব্রম্নয়ারির শেষে ১৯৭১-এর। আর তার এক মাসের মধ্যেই বাবার মতো তাকেও চলে যেতে হয় বড় অসময়ে।

অবশেষে একটা ঘর পাওয়া যাওয়ায় জ্যোতির বুকের ওপর থেকে একটা ভারি বোঝা নেমে যায়। কিন্তু তবু আমার সঙ্গে তেমন কথা বলছে না সে, আমার চোখে চোখ রাখছে না। এক মনে বাসা গোছাতে ব্যসত্ম জ্যোতি। আমি ঘরে ঢুকেই সোজা বিছানায় শুয়ে পড়ি। সেদিন বিকেলে আমাদের পরিচিত কয়েকজন স্থানীয় বাঙালীকে ঘরে ডাকে জ্যোতি। সেই নিঃসন্তান দম্পতি ও ডক্টর নিয়োগীও ছিলেন এদের মধ্যে। আমি জানতাম না তারা আসবেন। জ্যোতি কিছু বলেনি আমাকে। তবে তাদের একত্রে ঘরে ঢুকতে দেখেই আমি বুঝতে পারি কেন তারা এসেছেন। জ্যোতি ভয় পেয়েছিল, আমাকে একলা ঘরে এই সংবাদটা দিলে আমি কী জানি কী করে বসি, আমাকে একা সামলানো তার পৰে সম্ভব হবে কী না ইত্যাদি। সে জানত বাবার সঙ্গে আমার কী পরিমাণ নৈকট্য ছিল। কিন্তু কাউকে কিছু বলতে হলো না আমায়। আমি নিজে নিজেই সব জেনে গেছি বুঝে গেছি। তাই কেউ কিছু বলার আগে আমিই বললাম, আমি জানি আপনারা কেন এসেছেন। আমার বাবা আর নেই। ভাগ্যিস বীথিকে সঙ্গে আনেননি তারা। বীথি এলে নিজেকে সামলানো কঠিন হতো আমার। যারা এসেছেন তাদের সঙ্গে সম্পর্কটার স্বরূপ আজ দুদিনে এত স্পষ্ট করে বুঝে গেছি যে, তাদের কোন সানত্ম্বনার বাক্যে আমার হৃদয় ছুঁয়ে যায় না। বরং আমি অপেৰা করি কখন তারা বিদায় হবেন আর আমি একটু একা একা শুয়ে থাকব।

এত দীর্ঘ সময় ধরে এত কিছু নিজের মধ্যে ধারণ করতে করতে জ্যোতি বড়ই কাহিল হয়ে পড়েছিল। দুঃসংবাদটা প্রকাশিত হয়ে যাবার পর এবার কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে সে। জীবনে এই প্রথম ওকে কাঁদতে দেখি। কাঁদতে কাঁদতে জ্যোতি বলে গত ছত্রিশ ঘণ্টা যে সে কী দুর্বিষহ সময় পার করেছে, তা কেবল সেই জানে! ঐ ভয়ঙ্কর চিঠিটা বুক পকেটে রেখে স্বাভাবিক আচরণ করে যেতে কী যে খারাপ লেগেছে তার, বলতে বলতে চিঠিটি বের করে টেবিলে রাখে সে, যে চিঠি কোনদিনই আমি খুলে দেখিনি। জ্যোতি বলে, গত দুটো দিন শুধু পাগলের মতো হন্যে হয়ে একটা ঘর খুঁজেছে সে, যাতে এমন একটা দুঃসংবাদ যখন দেবে আমায়, তখন আমার মাথার ওপর অনত্মত একটা আচ্ছাদন থাকে, বসে বা শুয়ে কাঁদার মতো একটা জায়গা থাকে, একেবারে খোলা রাসত্মার ওপর দাঁড়িয়ে থাকতে না হয় আমাদের।

আমি অবাক হয়ে লৰ্য করি, এত বড় একটা ঘটনা ঘটে যাবার পরও, সবকিছুই ঠিকঠাক চলছে। কিছুই থেমে থাকছে না। নির্দিষ্ট গতিতেই দিন যায়, রাত আসে, আবার দিন, আবার রাত্রি। প্রতিদিন যথাসময়ে সূর্য ওঠে, গরমে আগের মতোই ঘামি, বেশি কষ্ট হলে পাখা চালাই, সন্ধ্যা হয়, দখিনা হাওয়ায় কলেজের সামনে দাঁড়ানো ক্রেব আপেল গাছের পাতা তির তির করে কাঁপে, রাসত্মার আলো জ্বলে ওঠে। বাড়ি থেকে চিঠি আসে, সাদা গাইটার একটা বাছুর হয়েছে। ছোট ভাইবোনের পরীৰার ফল বেরোয়। আমার খিদে লাগে, আমি ভাত খাই, স্নান করি, ঘুমুই। কেবল ঘুমুতে যাবার আগে প্রতিরাতে ভয় হয় আবার যদি সেই স্বপ্নটা দেখি, যেটা বহুকাল ধরে অনবরত দেখে আসছিলাম আমি_ প্রায় রাত্রিতেই। যে স্বপ্ন আমার জ্ঞান হবার পর থেকে সবচেয়ে বেশি বার দেখেছি। স্বপ্নে দেখি, বাবা মারা গেছে, আর আমি ভীষণভাবে কাঁদছি। তারপর ঘুম ভেঙ্গে যায়, বুঝি ওটা নেহায়েৎ স্বপ্ন ছিল। মনটায় কী যে প্রশানত্মি নেমে আসে তখন! কাছে থাকলে বাবাকে ঘুম থেকে ডেকে উঠাই, লাইট জ্বালিয়ে তার মাথায়, কপালে হাত বুলাই, তারপর আবার নিজের বিছানায় এসে ঘুমিয়ে পড়ি। আমার ঘন ঘন এই স্বপ্ন দেখার কথা পরিবারের সকলেই জানে। এখন ভয় হয়, ঘুমুতে গেলে আবার যদি সেই স্বপ্ন দেখি! এখন ঘুম ভাঙলে তো জানবো স্বপ্নে যা দেখলাম, তা আসলে সত্যি, ওটা নিছক নয়, তখন কী করে সইব তা? কিন্তু কী আশ্চর্য, বাবা মারা যাবার পর গত চলিস্নশ বছরে সত্যি সত্যিই আর একবারও বাবার মৃতু্যকে নিয়ে স্বপ্ন দেখিনি। অলৌকিক কোন কিছুতে কখনও বিশ্বাস ছিল না_ আজও নেই। কিন্তু এই স্বপ্নের অনত্মর্ধানের গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা আজ পর্যনত্ম খুঁজে পাইনি।

মাত্র সাতান্ন বছর বয়সে এমন আকস্মিকভাবে বাবার মৃতু্যতে আমি প্রায় ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছিলাম। আমার জীবনের ধ্রম্নবতারার মতো যার অবস্থান, আমার যা কিছু অর্জন সবই যাঁর উদ্দেশে নিবেদিত, আমাদের উচ্চশিৰার খরচ যোগাবার জন্যে দিনের পর দিন অমানবিক কষ্ট করে গেছেন যিনি, তাঁকে বিদেশে এসেই হঠাৎ করে এভাবে হারিয়ে ফেলা আমার পৰে মানা কঠিন ছিল। তবু সময় যা সব কিছুকেই এক সময় সহনীয় করে তোলে, আমার ওপরেও ধীরে ধীরে একরকম সানত্ম্বনার প্রলেপ মাখে। কিন্তু ঐ কঠিন সময়টাতে কয়েকটি বিচ্ছিন্ন ঘটনার কথা মনে পড়ে, মনে পড়ে কয়েক ব্যক্তির অবদানের কথাও, যারা ঐ সময়ে আমার বিপর্যসত্ম মনটাকে কিছুটা হলেও প্রশমিত করেছিল_ আমার গোটা অসত্মিত্বকে সমূলে নাড়িয়ে দিয়েছিল জীবনের প্রথম যে শোক, তাকে সহনীয় করে তুলতে, আমাকে নতুন করে বাঁচতে, আবার সোজা হয়ে দাঁড়াতে সাহায্য করেছিল।

এক) আমার খিদে নেই। আমি খেতে চাচ্ছি না। শুয়ে আছি। জ্যোতি নিজের হাতে রান্না করে গরম গরম ভাত মেখে, বিছানাতে বসেই, খাইয়ে দিচ্ছে আমায়। এমন কি অযত্নে ফেলে রাখা আমার জটা-ধরা চুলগুলো ধীরে ধীরে অাঁচড়ে বেনী করে দিয়েছে একাধিকবার।

দুই. জ্যোতির ঘনিষ্ঠ বন্ধু ডক্টর মঞ্জুর আহমেদ (যিনি আমাদের বিয়েতে বরযাত্রীও ছিলেন) ও তার স্ত্রী খুকু আপা আমাকে জোর করে তাদের কানেক্টিকাটের বাসায় নিয়ে গেছেন যাতে আমার মানসিক অবস্থার একটু পরিবর্তন হয়, আমার স্বাভাবিক হয়ে আসা কিছুটা হলেও ত্বরান্বিত হয়। হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় অসময়ে খুকু আপার প্রথম স্বামীর মৃতু্য ও পরবর্তীকালে তিনটি নাবালক সন্তান নিয়ে তার কঠিন সংগ্রামের কথা বিসত্মৃতভাবে বর্ণনা করে খুকু আপা আমাকে বোঝাতেন, যারা বেঁচে আছে তাদের জন্যে আমাকে সোজা হয়ে দাঁড়াতে হবে। সেই সময় খুকু আপাদের রেকর্ড পেস্নয়ারে মায়ার খেলার ঐ গানটি বারবার বাজত, ‘দিবস রজনী আমি যেন কার আশায় আশায় থাকি’। শুনতে শুনতে বাবার কথা ভেবে চোখ জলে ভরে যেত। আজও সেই গান শুনলে বাবার কথা, কানেক্টিকাটে মঞ্জুর ভাইদের বাড়ির সেই সব দিনের কথা মনে পড়ে।

তিন. আমার সহপাঠী চার্চের সানডে স্কুলের শিৰক ডেভিড রিফেনবারিক, যে বায়োকেমিস্ট্রিতে তখন পিএইচডি করছিল, আমাকে সানত্ম্বনা দেয়, আর আমিও বিশ্বাস করতে শুরম্ন করি, মৃতু্যর পর আমি আবার আমার বাবাকে দেখতে পাব। সে আমাকে ‘সিস্টার ইন ক্রাইস্ট’ বলে গ্রহণ করে। বাবাকে অনেক কথা বলার ছিল আমার, যা বলার সুযোগ পাইনি, যদি তার সঙ্গে সত্যি সত্যি-ই আবার দেখা হয় আর পরস্পরকে আমরা চিনতে পারি, তাহলে সে কথাগুলো বলব তাকে সবিসত্মারে, আর এর জন্যে যদি আমাকে খ্রিস্টান হতে হয়, আমি তাতেই রাজি, ডেভিডকে বলেছিলাম। ডেভিড আমার জন্যে চোখবুজে প্রার্থনা করেছিল। প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের সবচেয়ে কাছাকাছি এসেছিলাম জীবনের এই সঙ্কটকালেই।

চার. নতুন বাসায় আসার মাত্র কয়েকদিন পরের ঘটনা। দুপুরে কলেজ থেকে ঘরে ফিরছি। মনের ভেতর তখনও সর্বৰণিকভাবে বাবার স্মৃতি। আনমনে রাসত্মা পার হচ্ছি। হঠাৎ শুনি কোথা থেকে ভেসে আসছে ‘ময়ূরপঙ্খী ভেসে যায়, রামধনু জ্বলে তার গায়’। প্রথমে ভাবি, আমার মানসিক অবস্থায় আমি বোধ হয় সবই কল্পনা করছি। এই সময়ে এখানে এই বাংলা গান কোথা থেকে আসবে? এ পাড়ায় অথবা আশপাশে কোন বাঙালী আছে বলে শুনিনি, থাকার কথাও নয়। এ অঞ্চলগুলো একেবারেই ‘লিলি-হোয়াইট’ অঞ্চল। আমরাতো নেহায়েত একটি বিশেষ পরিস্থিতির শিকার হয়ে এখানে এসেছি। তাহলে ঐ গান? আমি কি পাগল হয়ে যাচ্ছি? কিন্তু চলা থামিয়ে দিয়ে, গায়ে চিমটি কেটেও শুনি একই গান সমানে চলেছে। উৎপলা সেনের অতি পরিচিত ও ব্যতিক্রমী কণ্ঠে এই গান কোথা থেকে আসছে খুঁজতে গিয়ে দেখি আমারই এক প্রতিবেশী শ্বেতাঙ্গিনী বিকিনি পরে ঘরের বাইরে ঘাসের ওপর নিচু আরাম কেদারায় শুয়ে শুয়ে সান বাথ নিচ্ছে আর গান শুনছে_ নিখাদ বাংলা গান। ততৰণে উৎপলার দ্বিতীয় গান, ‘ঝিকমিক জোনাকির দীপ জ্বলে শিয়রে, চারিধার থমথম নিঝঝুম’ শুরম্ন হয়ে গেছে। একে একে উৎপলার সবগুলো গান শেষ হয়ে গেলে সে জানালা দিয়ে ঘরের ভেতরে হাত ঢুকিয়ে লং পেস্নটির উলটো দিক চালিয়ে দেয়। সেখানে সব শ্যামল মিত্রের গান। ‘তরীখানি ভাসিয়ে দিলাম ঐ কুলে’। এ গানগুলোর মধ্যে কী যেন ছিল, কথায় এবং সুরে। কোনটিতে আসন্ন বিচ্ছেদের আশঙ্কা। কোনটিতে এই পৃথিবী থেকে অন্যত্র চলে যাবার ইঙ্গিত। একই সঙ্গে বিষাদ, বেদনা ও মাধুর্যের সমাবেশ। আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো ঐ বাড়ির সামনে রাসত্মার ধারে সিঁড়িতে বসে বসে অবশ হয়ে শ্যামল মিত্রের মাদকতাময় কণ্ঠে একটার পর একটা গান শুনতে থাকি। গান শেষ হলে আমার দিকে চোখ পড়ে মেয়েটির। একটু অবাক হয়, শাড়ি পরা একটি মেয়েকে এত কাছে এভাবে বসে থাকতে দেখে। পরিচয় হলে জানতে পারি আমার কলেজেই থার্ড ইয়ার মেডিক্যালের ছাত্রী সে। তার প্রাক্তন ভারতীয় প্রেমিক এই লং পেস্নটি তাকে দিয়েছিল। গানের কথা কিছুই বোঝে না সে। কিন্তু কি যেন আছে এই সুরে। যখনই কোন কারণে তার মন খারাপ হয়, সে এই গানগুলো শোনে। শুনলে কী রকম এক প্রশানত্মিতে নাকি মনটা ভরে যায় তার, যার কোন ব্যাখা্যা সে খুঁজে পায় না। আমি তাকে জানাই আমি বাঙালী এবং সদ্য পিতা হারিয়ে নতুন করে ঘর-কাতর। আমার অসীম শূন্যতা আর সর্বৰণিক অস্থিরতাই যে আজ তার এই নিভৃতিকে লঙ্ঘন করতে প্ররোচিত করেছে, তার ঘর থেকে ভেসে আসা বাংলা গানের সুর আমায় টেনে এনেছে তার দোরগোড়ায়, সে কথাও স্বীকার করি। শুনে সে জোর করে ঐ রেকর্ডটি আমাকে ধার দেয়। বলে যতদিন খুশি শুনে যেন ফেরত দিই তাকে। কোন তাড়া নেই। ঐ রেকর্ডের গানগুলো বেশ কিছুদিন ধরে আমার প্রতিদিনের সঙ্গী হয়েছিল ঐ সময়। আমার অস্থির মনটাকে কিছুটা হলেও শানত্ম করত উৎপলা আর শ্যামলের ঐ গানগুলো। রেকর্ডটা ফেরৎ দেবার আগে গানগুলো আবার শোনার জন্যে টেপ করে রেখেছিলাম মনে আছে।

পাঁচ. আমার দ্বিতীয় পিতা, আমার শ্বশুর ডক্টর গোবিন্দ দেব, আমার মানসিক অবস্থা শুনে ঢাকা থেকে ছুটে আসেন ফিলাডেলফিয়ায় আমাকে সানত্ম্বনা দিয়ে সুস্থ করে তোলার জন্যে। বেশ কয়েক মাস এখানে থেকে আমাকে একটু সুস্থ-সবল করে দিয়ে দেশে ফিরে যাবার এক মাসের মধ্যেই নিজের শোবার ঘরে পাকবাহিনীর হাতে নিহত হন তিনি, ২৫ মার্চ ১৯৭১-এর কালরাত।

২৫ জুলাই থেকে ২৫ মার্চ_ ঠিক আট মাসের মাথায় দু’দুবার পিতৃহীন হই আমি। আর সেটা ঘটে এই স্বর্গরাজ্য আমেরিকায় পড়তে আসার পর পরই।

এর পরের নয় মাসে ঘটে আরও কত মৃতু্য, চলে আরও কত যুদ্ধ! আমার ব্যক্তিগত শোক ততদিনে জাতীয় শোকে রূপানত্মরিত হয়। তবে শেষ পর্যনত্ম সমসত্ম দুঃখ হরণ করে আসে বিজয়ের মহাউলস্নাস। প্রবাসে মুক্তিযুদ্ধের সেই দিনগুলোর কথা আরেকদিন বলব।

ফিলাডেলফিয়া থেকে প্রায় দু’হাজার মাইল দূরে, পাহাড়ি কলোরাডোতে বসে চলিস্নশ বছর আগের এক বেদনাময় আগস্টের কথা ভাবছিলাম এতৰণ। মাঝখানে আরও কত সময় পেরিয়ে গেছে, আরও কত অভিজ্ঞতা, কত জায়গায় গেছি, কত বাড়িতে বসবাস করেছি, কত মানুষের সঙ্গে আলাপ হয়েছে, তার অনেক কিছুই আজ আর মনে নেই, আবার অনেক কিছুই মনে আছে। কিন্তু ফিলাডেলফিয়ার সেই আগস্ট, আমার এদেশের প্রথম গ্রীষ্মে সেই কষ্টকর স্মৃতি কেমন করে ভুলি?

[ad#co-1]