মধুর ক্যানটিনের এক আড্ডায়

তাহমিনা হক
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যানটিনে চলে হরেক রকম আড্ডা। রাজনীতি-শিল্প-সংস্কৃতি থেকে প্রতিদিনের জীবনযাপন—কোনো কিছুই বাদ পড়ে না এই মধুর আঙিনায়। বর্ষাকাল ফুরিয়েছে সেই কবে। কিন্তু এখনো বৃষ্টির উৎপাত রয়েছে মাঝেমধ্যে। এমনি এক ঝিরিঝিরি বৃষ্টির বিকেলে মধুর ক্যানটিনে আড্ডায় ব্যস্ত সানজিদ, নীরা, শারমীন ও সুমাইয়া। এই আড্ডা কেবল একে অন্যের সুখ-দুঃখ ভাগাভাগির আড্ডা।

তাঁদের আড্ডার এক ছোট্ট দলে গিয়ে হাজির হই। সানজিদ মাহমুদ জয় বলছিলেন তাঁদের ক্যারিয়ার নিয়ে কী চিন্তা-ভাবনা। জয় গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী। তাঁর অন্য বন্ধুরা অনেকে খণ্ডকালীন চাকরি করছেন, জয় করছেন না। কিন্তু জয় ক্যারিয়ার নিয়ে আশাবাদী। তবে মাঝে মাঝে হতাশাও যে কাজ করে না, তা নয়, ‘জীবনে ২০টি চাকরি করতে চাই, অবশ্যই নিজ যোগ্যতা দিয়ে। তবে কোনো চাকরিতে যদি নিজ যোগ্যতা প্রমাণের সুযোগ থাকে, তাহলে সেখানে অনেক দিন কাজ করে যেতে চাই। যত দিন কর্মক্ষেত্রে স্বাধীনতা উপভোগ করতে পারব, তত দিনই থাকব। আমি যখন যথেষ্ট স্বাধীনতা ভোগ করি, তখনই শুধু দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন করি।’
ওদিকে নীরা বললেন, ‘মধুর ক্যানটিনের দই-মিষ্টি আমার খুবই পছন্দের।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যানটিনে যাননি এমন শিক্ষার্থী খুঁজে পাওয়া ভার

অ্যাসাইনমেন্ট নিয়ে আলোচনা বা বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিতেই এখানে আসা হয়। আর সাংবাদিকতা বিভাগের সবাইকে অন্য কোথাও পাওয়া না গেলেও মধুতে ঠিকই পাওয়া যাবে। মধুর গাছতলায় আমাদের আড্ডা খুবই জমজমাট।’ নীরার কথা শেষ না হতেই কাজী আবু সাঈদ মিঠুন গিটার হাতে নিয়ে মধুতে ঢুকলেন। মিঠুন ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। সুমাইয়া আহমেদের হাতে ফুল দেখে মিঠুন গান ধরলেন, ‘ফুলে ফুলে ঢলে ঢলে…’। সুমাইয়া সমাজকল্যাণের শিক্ষার্থী। সুমাইয়া বলছিলেন, ‘মধুতে প্রেম-ভালোবাসা নিয়ে আমাদের অহরহই কথাবার্তা চলে। কোন বিভাগের কার সঙ্গে কার প্রেম চলছে, কবে থেকে চলছে—এসবও আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে।’ সুমাইয়ার কথা শুনে শারমীন বলেন, ‘শুধু প্রেম কেন, পড়াশোনা নিয়েও আমরা আলোচনা করি। একই বিভাগের কার ফলাফল কেমন হলো, কে বিভাগের নতুন শিক্ষক হতে যাচ্ছে ইত্যাদি বিষয়েই কথা বলি।’ ক্যামেরাপারসন সঙ্গে নিয়ে চা খেতে হাজির হলেন সাংবাদিকতা বিভাগের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী ও একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলের রিপোর্টার রাহাত মিনহাজ। মিনহাজ বললেন, ‘ক্যাম্পাসে রিপোর্ট করতে এসেছি আর মধুতে চা খাব না, এটা হয় নাকি! মধুর লাল চা ভালো না লাগলেও গ্লাসের চা আর মিষ্টি অনেক মজা। এখানে একটি ঐতিহ্যের ছোঁয়া পাওয়া যায়, তাই সুযোগ পেলেই এখানে আসি।’

মঙ্গলপ্রদীপ আর ধূপ জ্বালিয়ে শহীদ বাবার প্রতি প্রতিদিন সন্ধ্যায় শ্রদ্ধা জানান অরুণ কুমার দে। শহীদ মধুসূদন দের ছেলে অরুণ ১৯৭২ সাল থেকেই ক্যানটিন পরিচালনার দায়িত্বে আছেন। এই ক্যানটিনের ইতিহাস, সেই একাত্তরের স্মৃতিকথা শোনা যাক অরুণদার কাছ থেকে। ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর একটি দোকান ভাড়া নিয়ে ব্যবসা শুরু করেন আদিত্য চন্দ্র দে। কিছুকাল পর তিনি মারা গেলে এই দোকানের হাল ধরেন মধুসূদন দে। খাবারের জন্য সাদামাটা হলেও রাজনৈতিক কারণে এই ক্যানটিন বিশেষ পরিচিতি লাভ করে। মধুসূদন তাঁর ব্যবহার দিয়ে ছাত্রদের সঙ্গে বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে তোলেন এবং ছাত্ররাজনীতির কেন্দ্র হয়ে ওঠে এই ক্যানটিন। সবার প্রতি ভালোবাসার কারণে শিক্ষার্থীরা তৎকালীন আমতলা প্রাঙ্গণকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘আমাদের প্রিয় মধু দা’ নামে ভূষিত করেন। এই ক্যানটিন থেকে অনেক মিছিল বের হতো, আর মিছিল শেষে মিলিত হয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হতো। এ কারণে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মধুসূদনের প্রতি আক্রোশ তৈরি হয়। ২৬ মার্চ সকালে পাকিস্তানিরা শিববাড়ি বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মচারীদের কোয়ার্টারে ঢুকে মধুর ক্যানটিনের মালিক মধুসূদন, তাঁর স্ত্রী, জ্যেষ্ঠ পুত্র ও পুত্রবধূকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করে।

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে এই ক্যানটিন ছিল শিক্ষার্থীদের অন্যতম প্রধান আশ্রয়। এরপর ১৯৬৬ সালের ছয় দফা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান ও একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ—সব সময়ই শিক্ষার্থীদের কাছে অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে মধুর ক্যানটিন।

অরুণ দে জানান, বাংলাদেশের স্বাধিকার আন্দোলনের সঙ্গে মধুর ক্যানটিন ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আবার নব্বইয়ে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুও ছিল এই ক্যানটিন।

ক্যানটিনের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় তুলসীপাতার ঘ্রাণ নাকে আসবে। এই তুলসীতলায় জ্বালানো হয় প্রদীপ, মধুদার ভাস্কর্যটি যেন ক্যানটিনে আসা সবাইকে আশীর্বাদ করে। মধুর ক্যানটিন আগে যেমন ছিল, এখনো তেমনই আছে। অরুণদার সঙ্গে কথা বলতে বলতেই শিক্ষার্থীদের পদচারণে ক্যানটিন প্রাঙ্গণ জমে উঠল।

[ad#co-1]