পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজ পিছিয়ে যাচ্ছে

প্রস্তাবিত পদ্মা সেতু বিশ্বব্যাংকের আপত্তি, নতুন করে দরপত্র ডাকা হচ্ছে
পদ্মা সেতু নির্মাণের জন্য ঠিকাদার নিয়োগের প্রাকযোগ্যতা যাচাইয়ের দরপত্র আবার আহ্বান করতে হচ্ছে সরকারকে। প্রকল্পে উন্নয়ন-সহযোগীদের সমন্বয়কারী বিশ্বব্যাংকের আপত্তির কারণে গত এপ্রিলে করা দরপত্র-প্রক্রিয়া বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে যোগাযোগ মন্ত্রণালয়। এতে ঘোষিত সময়ের মধ্যে পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজ শুরু করা সম্ভব হবে না।

চলমান প্রক্রিয়ার সূত্রে সরকার ঘোষণা দিয়েছিল, ২০১১ সালের জানুয়ারি মাসে সেতুর নির্মাণকাজ শুরু হবে। আর সেতুর নকশা প্রণয়নে নিয়োজিত মনসেল এইকম যে কর্মপরিকল্পনা করেছিল, তাতে চলতি সেপ্টেম্বর মাসে কাজ শুরু হয়ে ২০১৩ সালের ডিসেম্বর মাসে শেষ করার কথা বলা হয়েছিল।

সেতু বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, দরপত্র দলিলে পদ্মা সেতুর স্প্যানের পাইলিং তিন ধরনের হতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়। এগুলো হচ্ছে—রেকিং পাইল, বোওর্ড পাইল এবং রেকিং ও বোওর্ড দুটোই। বিশ্বব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে এই তিনটি বিষয়েই অভিজ্ঞতাসম্পন্ন হতে হবে।

কিন্তু সেতু বিভাগ যে পাঁচটি প্রতিষ্ঠানকে নির্বাচন করেছে, তারা সবাই বোওর্ড পাইলিংয়ে পারদর্শী বলে উল্লেখ করে। কিন্তু নকশা অনুযায়ী সেতুর পানির অংশের স্প্যানের পাইলিংগুলো রেকিং পাইল হওয়ার কথা। যেখানে পানি নেই অর্থাৎ দুই পাড়ের কাছাকাছি অংশে বোওর্ড পাইলিং করার কথা।

সেতু বিভাগ এই যোগ্যতার ঘাটতি থাকা সত্ত্বেও পাঁচটি প্রতিষ্ঠান নির্বাচন করে। তবে শর্ত দেয়, নির্বাচিত ঠিকাদার রেকিং পাইলে বিশেষজ্ঞ অন্য কোনো ঠিকাদার নিয়ে পাইলিংয়ের কাজ করাবে। সেতু বিভাগের বক্তব্য হলো—যমুনা সেতু নির্মাণের সময়ও পাইলিং অন্য কোম্পানি দিয়ে করানো হয়েছিল। বিশ্বব্যাংক এই জায়গাতেই আপত্তি করেছে।
পদ্মা সেতুর ঠিকাদার নিয়োগে প্রাকযোগ্যতা যাচাই দরপত্র আহ্বান করা হয়েছিল গত ১০ এপ্রিল। বিভিন্ন দেশের ১১টি প্রতিষ্ঠান দরপত্রে অংশ নেয়। এর মধ্য থেকে সেতু বিভাগ পাঁচটি প্রতিষ্ঠানকে বাছাই করে মতামতের জন্য গত ১৮ জুলাই বিশ্বব্যাংকে পাঠায়।

বিশ্বব্যাংকের ওয়াশিংটন কার্যালয় ২৩ সেপ্টেম্বর সেতু বিভাগের সচিবের কাছে লেখা এক চিঠিতে নতুনভাবে দরপত্র আহ্বান করে দুই ধরনের পাইলিং বিশেষজ্ঞ ঠিকাদার নিয়োগের পরামর্শ দেয়। সংস্থাটি এও বলেছে, নতুন দরপত্র আহ্বান করা হলে পরবর্তী সময়ে দ্রুত মতামত ও পরামর্শ দিয়ে কাজটি এগিয়ে নিতে সহায়তা করবে তারা।
এর আগে গত মাসে ঢাকায় বিশ্বব্যাংকের পরিচালক অ্যালেন গোল্ড স্টেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত, যোগাযোগমন্ত্রী আবুল হোসেন, প্রধানমন্ত্রীর অর্থ উপদেষ্টা মসিউর রহমান ও প্রকল্পের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে বৈঠক করে পুরোনো দরপত্রের ত্রুটি তুলে ধরেন।

সেতু বিভাগের একজন প্রকৌশলী জানান, রেকিং পাইলে স্টিলের পাইপ দিয়ে গর্ত করে এর মধ্যে কংক্রিট ঢেলে দেওয়া হয়। আর বোওর্ড পাইলে মাটি গর্ত করে এর মধ্যে রড ও কংক্রিটের ভিত্তি তৈরি করা হয়। পদ্মা সেতুতে প্রতি ২০০ মিটার পর একটি স্প্যান হবে। সেতুটি হবে ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ।

পদ্মা সেতুর নকশা প্রণয়নের কাজ সরকার শেষ করেছে গত জুলাই মাসে। জমি অধিগ্রহণ ও পরিবেশ প্রতিক্রিয়ার ওপর সমীক্ষা চূড়ান্ত হয়েছে। নদী শাসনের দরপত্র-প্রক্রিয়া চলছে।

এ অবস্থায় মূল সেতুর জন্য আবার প্রাকযোগ্যতা যাচাই দরপত্র আহ্বান করা হলে ঠিকাদার নির্বাচনে মূল্যায়ন-প্রক্রিয়া, উন্নয়ন-সহযোগীদের মতামত, বিশেষজ্ঞ পরামর্শ নিতে বেশ কিছুটা সময় চলে যাবে। এরপর প্রাকযোগ্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে একটি প্রতিষ্ঠানকে চূড়ান্তভাবে নিয়োগের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হবে। ঠিকাদার নিয়োগের পর প্রয়োজনীয় মালামাল আসতে কয়েক মাস লাগবে।

যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘পুনরায় দরপত্র আহ্বানের কাগজপত্র তৈরির প্রক্রিয়া চলছে। শিগগিরই দরপত্র আহ্বান করা হবে।’

সম্প্রতি অর্থমন্ত্রীর কাছে লেখা এক চিঠিতে যোগাযোগমন্ত্রী জানিয়েছেন, আবার দরপত্র আহ্বান করা হলে পদ্মা সেতুর নির্মাণ এক বছর পিছিয়ে যেতে পারে।

নদী শাসনের দরপত্রে অংশ নেওয়ার সময় পেছাল: এদিকে পদ্মা সেতু এলাকায় নদী শাসনের কাজের প্রাকযোগ্যতা যাচাইয়ের জন্য গত ২৫ জুলাই সংবাদপত্রে বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয় এবং ১ সেপ্টেম্বর সম্ভাব্য বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞদের একটি সভা হয় সেতু ভবনে। সভায় যোগাযোগমন্ত্রী ঘোষণা দেন, কোনোভাবেই প্রাকযোগ্যতা যাচাইয়ের দরপত্র জমা দেওয়ার তারিখ ২৭ সেপ্টেম্বর থেকে বাড়ানো হবে না। কিন্তু দুই দিন বাকি থাকতে হঠাৎ সরকারি ছুটির দিনে ২৫ সেপ্টেম্বর দরপত্র জমার তারিখ ১০ দিন বাড়ানো হয়। বিদেশি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা এ সময় বাড়ানোকে অপ্রয়োজনীয় মনে করছেন।

অর্থায়ন: বিশ্বব্যাংক শুধু প্রাকযোগ্যতা যাচাইয়ে আপত্তি তোলেনি, তাদের চলতি অর্থবছরে প্রতিশ্রুত ১২০ কোটি মার্কিন ডলার ঋণ-সহায়তা দেবে কি না, সে বিষয়েও অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। সেতু বিভাগের একটি সূত্র জানায়, ২০১১ সালের জুলাইতে যে আর্থিক বছর শুরু হবে, তার আগে পদ্মা সেতুর জন্য বিশ্বব্যাংক থেকে অর্থ পাওয়ার সম্ভাবনা কম।

জানতে চাইলে ঢাকার বিশ্বব্যাংক দপ্তর গত রোববার প্রথম আলোকে জানায়, এই অর্থবছরে প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য বিশ্বব্যাংক সরকারসহ উন্নয়ন-সহযোগীদের নিয়ে কাজ করছে। সম্প্রতি উন্নয়ন-সহযোগীদের পরামর্শে সেতুর নকশায় কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে। এটা প্রকল্পটিকে ঝুঁকিমুক্ত ও উন্নত মানসম্পন্ন করতে সহায়তা করবে। তাদের মতে, প্রকল্পের অনুমোদনের সময়কালের ওপর কাজ শুরুর কোনো প্রভাব পড়বে না। কারিগরি ও প্রস্তুতিমূলক কিছু কাজ বাকি রয়েছে, তার ওপর প্রকল্পের কাজ শুরুর বিষয়টি নির্ভর করছে।

এ অবস্থায় আগামী মাসের মাঝামাঝি অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত, প্রধানমন্ত্রীর অর্থ উপদেষ্টা মসিউর রহমান ও যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্টসহ কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে যাবেন।

জানতে চাইলে সেতু বিভাগের নির্বাহী পরিচালক মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া প্রথম আলোকে বলেন, ডিসেম্বরে বিশ্বব্যাংকের বোর্ড সভায় পদ্মা সেতুর ঋণের বিষয়টি তোলার চেষ্টা করছে সরকার। ঋণ চুক্তি আগামী বছরের শুরুতে হবে। এরপর সরকার নিজস্ব অর্থায়নে কাজ শুরু করে দেবে এবং ২০১১ সালের জুনের পর বিশ্বব্যাংকের অর্থ ছাড় হলে সমন্বয় করা হবে।

পদ্মা সেতুর নির্মাণ খরচ ধরা হয়েছে ১৮ হাজার কোটি টাকা বা ২৬৩ কোটি ডলার। এর মধ্যে ১২০ কোটি ডলার দেওয়ার কথা বিশ্বব্যাংকের; আর এডিবি ৬৫, জাইকা ৩০ ও আইডিবি ৩৫ কোটি ডলার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

আনোয়ার হোসেন

[ad#co-1]